জুমার দিন যে ১০ কাজ করা অনুচিত

ছবি: পেক্সেলস

জুমার দিন মুসলমানদের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের রয়েছে বিশেষ কিছু ফজিলত ও আমল। একই সঙ্গে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকারও নির্দেশনা রয়েছে।

জুমার দিনের পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখতে যেসব কাজ পরিহার করা উচিত, তার কয়েকটি আলোচনা করা হলো।

১. জুমার আজানের পরে বেচাকেনা

জুমার আজান দেওয়ার পর দুনিয়াবি ব্যস্ততা ছেড়ে নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। 

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)

তাই জুমার আজানের পর নামাজে যাওয়ার পরিবর্তে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কেনাবেচায় ব্যস্ত থাকা অনুচিত।

২. খুতবার সময় কথা বলা:

জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং এ সময় নীরব থাকা জরুরি। খুতবা চলাকালে কথা বলা তো নিষেধই, এমনকি কাউকে নীরব থাকতে বলাও অনর্থক কথা হিসেবে গণ্য হয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি যদি জুমার দিন ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় তোমার সঙ্গীকে বলো, “চুপ করো”, তবে তুমি অনর্থক কথা বললে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)

শুধু কথাবার্তাই নয়, মোবাইল দেখা, জায়নামাজ বা পোশাক নিয়ে অযথা নড়াচড়া করাসহ যে কোনো অনর্থক কাজ থেকেও বিরত থাকা উচিত।

হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কঙ্কর স্পর্শ করল, সে অনর্থক কাজ করল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৭)

তাই খুতবার সময় পূর্ণ মনোযোগ ইমামের বক্তব্যের দিকে রাখা জুমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আদব।

আরও পড়ুন

৩. মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া

জুমার দিন আগে আগে মসজিদে আসার ফজিলত রয়েছে। কিন্তু দেরিতে এসে মুসল্লিদের কষ্ট দিয়ে তাদের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের দিকে যাওয়া সমীচীন নয়। 

এক সাহাবি জুমার দিন মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছিলেন। রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘বসে পড়ো, তুমি তো মানুষকে কষ্ট দিয়েছ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১১১৮)

জুমার অধিক ফজিলত লাভের চেষ্টা যেন অন্য মুসল্লির অধিকার নষ্ট করার কারণ না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

সুতরাং মসজিদে দুই মুসল্লি পাশাপাশি বসে থাকলে তাদের মাঝখানে জোর করে ঢুকে বসা উচিত নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুই ব্যক্তির মাঝখানে তাদের অনুমতি ছাড়া কেউ বসবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৪৪)

তা ছাড়া মসজিদে কেউ কোনো জায়গায় বসে থাকলে তাকে উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় বসাও অনুচিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যেন অন্য ব্যক্তিকে তার বসার স্থান থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে না বসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৬৯)

৪. দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে যাওয়া

পেঁয়াজ-রসুন, তামাক, জর্দা কিংবা অন্য কোনো কারণে মুখে বা শরীরে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হলে তা দূর না করে মসজিদে যাওয়া উচিত নয়।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রসুন বা পেঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে এবং নিজের ঘরেই বসে থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৩৫৯)

জুমার দিনে মুসল্লির সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রাসুল (সা.) জুমার দিন গোসল, মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮০)

তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন জুমায় আসবে, সে যেন গোসল করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৭৭)

আরেক হাদিসে জুমার দিনের প্রস্তুতি সম্পর্কে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, যথাসাধ্য পবিত্রতা অর্জন করে, তেল বা সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর জুমার জন্য বের হয়, দুই ব্যক্তির মাঝে গিয়ে তাদের পৃথক না করে এবং তার জন্য নির্ধারিত নামাজ আদায় করে, এরপর ইমাম বের হলে নীরব থাকে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)

আরও পড়ুন

৫. নামাজে অবহেলা করে ঘরে বসে থাকা

জুমার নামাজ সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। কোনো বৈধ ওজর ছাড়া জুমা ছেড়ে দেওয়া ভয়াবহ পাপের কাজ।

রাসুল (সা.) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘লোকেরা যেন জুমা ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকে, নতুবা আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেবেন, অতঃপর তারা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬৫)

অসুস্থতা, সফর বা শরিয়তসম্মত অন্য কোনো ওজর থাকলে বিধান ভিন্ন। কিন্তু বিনা কারণে জুমাকে অবহেলা করা মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়।

৬. দরুদ না পড়া

জুমার দিন নবীজির ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)

দরুদ পাঠের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পড়বে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত বর্ষণ করবেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৯০৬)

এ দিন তাই দরুদ পাঠের আমল থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখা উচিত নয়।

৭. দোয়া কবুলের সময়ের প্রতি উদাসীনতা

জুমার দিনের এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার বিশেষ আশা রয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, কোনো মুসলিম বান্দা সেই সময়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেন।’

এরপর তিনি হাতের ইশারায় সময়টি অতি সংক্ষিপ্ত হওয়ার কথা জানান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫) 

জুমার দিনে দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে আসরের পর সূর্যাস্তের আগের সময়টির কথাও হাদিসে এসেছে। তাই এ সময়টিতে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা 

আরও পড়ুন