৬ বছরের সাধনা, হাতে লেখা বিশাল কোরআন

নিবিষ্ট মনে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি আঁকছেন আলী জামানছবি: এপি

ভোর থেকে সন্ধ্যা—টানা ছয়টি বছর এভাবেই কেটেছে তাঁর। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের মিহরিমাহ সুলতান মসজিদের একটি ছোট কামরায় নিবিষ্ট মনে তুলি চালিয়েছেন তিনি।

লক্ষ্য ছিল পবিত্র কোরআনের এক অনন্য পাণ্ডুলিপি তৈরি করা। দীর্ঘ শ্রম ও শৈল্পিক নৈপুণ্যের পর অবশেষে সেই মহৎ কাজ শেষ করেছেন ইরাকি ক্যালিগ্রাফার আলী জামান।

৫৪ বছর বয়সী এই শিল্পীর তৈরি করা কোরআনের পাণ্ডুলিপিটি এখন ইস্তাম্বুলের ওই মসজিদেই সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটির বিশালত্ব যে কাউকেই চমকে দেবে। এতে রয়েছে ৩০২টি দ্বিমুখী স্ক্রল বা পাতা, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪ মিটার (১৩ ফুট) এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৫ মিটার (৫ ফুট)।

আলী জামান বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘যখনই আমি এই কোরআনটির কথা ভাবি, আমার এক অদ্ভুত প্রশান্তি লাগে। মহান আল্লাহ আমাকে এটি শেষ করার তৌফিক দিয়েছেন, এ জন্য আমি গর্বিত।’

আলী জামানের দাবি, এটি বিশ্বের বৃহত্তম হাতে লেখা কোরআন। যদিও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ এখনো এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।
আরও পড়ুন
ছবি: এপি

অদম্য স্পৃহা

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য সাধারণ কাগজ ব্যবহার করেননি জামান। ডিমের সাদা অংশ, কর্ন স্টার্চ (ভুট্টার আটা) এবং ফিটকিরির বিশেষ মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছিল টেকসই বিশেষ কাগজ।

১২ বছর বয়স থেকে ক্যালিগ্রাফির প্রেমে পড়া জামান মূলত ইরাকের সোলাইমানিয়া প্রদেশের বাসিন্দা। তবে ক্যালিগ্রাফি বা হস্তশিল্পের কদর তুরস্কে বেশি হওয়ায় ২০১৭ সালে সপরিবারে ইস্তাম্বুলে চলে আসেন তিনি।

আলী জামানের এই দীর্ঘ সাধনায় বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাঁর পরিবারকেও।

তাঁর ছেলে রেকার জামান স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বাবার এই প্রকল্পের কাজ চলাকালীন আমরা তাঁকে খুব কমই কাছে পেয়েছি। শুধু তাঁর খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় অথবা রাতে যখন তিনি ঘুমাতে আসতেন, তখনই তাঁর দেখা মিলত। আলহামদুলিল্লাহ, কাজ শেষ হওয়ার পর এখন আমরা তাঁকে বেশি সময় পাচ্ছি।’

ইসলামি ক্যালিগ্রাফি কেবল সাধারণ কোনো লেখা নয়, এটি একধরনের ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম।
তরস্কের শিল্প বিশেষজ্ঞ উমিত কোসকুনসু
আরও পড়ুন
ছবি: এপি

বিশ্ব রেকর্ডের হাতছানি

আলী জামানের দাবি, এটি বিশ্বের বৃহত্তম হাতে লেখা কোরআন। যদিও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ এখনো এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের মক্কার ‘হলি কোরআন মিউজিয়ামে’ সংরক্ষিত একটি কোরআনকে বিশ্বের বৃহত্তম ছাপানো কোরআন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে জামানের শিল্পকর্মটি হাতে লেখা হওয়ার কারণে এর গুরুত্ব আলাদা।

শিল্প বিশেষজ্ঞ উমিত কোসকুনসু বলেন, ‘ইসলামি ক্যালিগ্রাফি কেবল সাধারণ কোনো লেখা নয়, এটি একধরনের ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম।’

বর্তমানে এই বিশাল পাণ্ডুলিপিটি ধুলাবালি ও আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে বিশেষ আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছে।

আলী জামানের শেষ ইচ্ছা, কোনো বিশেষ জাদুঘর বা শিল্পসংগ্রাহক যেন এটি সংগ্রহ করেন, যেখানে সাধারণ মানুষ এই অনন্য শিল্পকর্মটি দেখার ও মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে।

সূত্র: এপি

আরও পড়ুন