মানুষ সাধারণত তার বর্তমান বাস্তবতার মধ্য দিয়েই চিন্তা করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং আইনকানুন প্রণয়ন করে। ব্যক্তি হোক বা সমাজ, সংসদ হোক বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই মানুষের চিন্তার পরিসর সীমাবদ্ধ থাকে সময় ও পরিস্থিতির গণ্ডিতে।
মানুষ যে সংকটের মুখোমুখি হয়, সে সংকটের সমাধানকেই সে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। ফলে তার সিদ্ধান্ত হয় তাৎক্ষণিক, বর্তমানকেন্দ্রিক এবং প্রায়ই স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন।
সমাজ বা রাষ্ট্র যখন কোনো নীতি বা আইন তৈরি করে, তখন সে বর্তমান সমস্যার আলোকে সেটি করে। ভবিষ্যতের কথা ভাবলেও তা হয় সীমিত পরিসরে, অনুমাননির্ভর ও অনিশ্চিত। কারণ, মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ, সে ভবিষ্যৎ জানে না, পরিণতি পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
এই সীমাবদ্ধতার কারণেই মানব–প্রণীত আইন ও মানবাধিকারের ধারণা সময়ের সঙ্গে বদলায়, সংশোধিত হয়, কখনো বাতিলও হয়ে যায়।
এর বিপরীতে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। শরিয়ত কোনো সিদ্ধান্ত কেবল বর্তমানের আয়নায় বিচার করে না; বরং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—এই তিন কালের সমন্বিত জ্ঞানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়।
কেননা শরিয়তের প্রণেতা আল্লাহ তায়ালা, যিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বদ্রষ্টা। মানুষের ভবিষ্যৎ দুর্বলতা, বার্ধক্য, অক্ষমতা, মানসিক পরিবর্তন—সবকিছুই তার জ্ঞানের আওতায়। তাই শরিয়তের বিধান তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর বা বোধগম্য মনে না হলেও সময় গড়ালে তার প্রজ্ঞা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।
ইসলাম কোনো চরমপন্থা সমর্থন করে না—না সন্ন্যাসবাদ, না ভোগবাদ। ইতিহাসে একদল মানুষ স্রষ্টার সন্তুষ্টির নামে দুনিয়া ও সৃষ্টিকে পুরোপুরি বর্জন করেছে। তারা মনে করেছে, দুনিয়া ত্যাগ করলেই স্রষ্টার হক আদায় হয়ে যায়।
একজন মানুষ যখন তরুণ, তখন তার শক্তি, সামর্থ্য ও উদ্যম থাকে প্রবল। সে মনে করে, যা আজ পারছে, তা সে আজীবনই পারবে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর দুর্বল হয়, মন ক্লান্ত হয়, পরিস্থিতি বদলে যায়। শরিয়ত এ বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই মানুষের ওপর দায়িত্ব আরোপ করে। তাই শরিয়তের সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে নয়; বরং ভবিষ্যতের সীমাবদ্ধতাকেও বিবেচনায় নিয়ে প্রণীত।
এই প্রেক্ষাপটে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-এর ঘটনার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। তিনি ছিলেন ইবাদতে অত্যন্ত আগ্রহী, কঠোর আত্মসংযমী একজন সাহাবি। কিন্তু তাঁর এই অতিরিক্ত কঠোরতা যে তাঁর নিজের শরীর, সংসার ও স্ত্রীর অধিকারের ওপর প্রভাব ফেলছিল—তা তিনি তখন উপলব্ধি করতে পারেননি।
আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে ইবাদত কখনোই মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও অধিকার ধ্বংস করার মাধ্যম হতে পারে না। স্ত্রী, পরিবার ও শরীর—সবকিছুরই মানুষের ওপর অধিকার আছে। এই হকগুলো উপেক্ষা করে কেবল আল্লাহর ইবাদতে ডুবে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়।
এখানেই শরিয়তের ভারসাম্যপূর্ণ রূপ স্পষ্ট হয়। ইসলাম কোনো চরমপন্থা সমর্থন করে না—না সন্ন্যাসবাদ, না ভোগবাদ। ইতিহাসে একদল মানুষ স্রষ্টার সন্তুষ্টির নামে দুনিয়া ও সৃষ্টিকে পুরোপুরি বর্জন করেছে। তারা মনে করেছে, দুনিয়া ত্যাগ করলেই স্রষ্টার হক আদায় হয়ে যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) এসে এ ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, ইসলামে সন্ন্যাসবাদের কোনো স্থান নেই।
অন্যদিকে আরেক দল মানুষ দুনিয়ার চাকচিক্য, ভোগবিলাস ও মানবিক অধিকারের নামে আল্লাহকে পুরোপুরি ভুলে গেছে। তারা মনে করে, আল্লাহর হক আদায় করা জরুরি নয়; মানুষে মানুষে অধিকার রক্ষা করলেই যথেষ্ট।
শরিয়ত কোনো মানববিরোধী বা অধিকারবিরোধী ব্যবস্থা নয়; বরং মানবাধিকারের সবচেয়ে গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপ। মানুষের সীমাবদ্ধ বুদ্ধি যেখানে বর্তমানেই আটকে যায়, শরিয়ত সেখানে ভবিষ্যৎকেও আগলে রাখে।
কোরআন এই মানসিকতাকে ভয়াবহ বিভ্রান্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পরিণতি হলো, মানুষ নিজেকেই ভুলে যায়, নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে।
এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানে ইসলামের অবস্থান। ইসলাম বলে, স্রষ্টার হক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সৃষ্টির হকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি পূর্ণ হয় না। কোরআনের ভাষায়, আল্লাহর জন্য নির্ধারিত অংশ মানুষ অবহেলায় অন্যের দিকে সরিয়ে দেয়, কিন্তু মানুষের অংশ আল্লাহর দিকে গেলে তারা তা সহ্য করতে পারে না। এটি মানুষের বিকৃত বিচারবোধেরই পরিচয়।
নবীজি (সা.) এই বিকৃতি স্পষ্টভাবে সংশোধন করেছেন। তিনি আল্লাহর হক ও বান্দার হককে আলাদা করে বুঝিয়েছেন, কিন্তু একটিকে আরেকটির বিরোধী হিসেবে নয়—বরং পরিপূরক হিসেবে। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন, যেমনভাবে আল্লাহর হকে শিথিলতা গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি বান্দার হকেও কোনো ছাড় নেই। স্ত্রী, প্রতিবেশী, সমাজ, শরীর—সবাই হকদার। এদের কারও হক নষ্ট করে ইবাদতের দাবি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।
মানবাধিকার আর শরিয়তের মূল পার্থক্য এখানেই। আধুনিক মানবাধিকার সাধারণত মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ। সেখানে স্রষ্টার অধিকার অনুপস্থিত। ফলে এই মানবাধিকার ধারণা অসম্পূর্ণ, একপেশে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মবিধ্বংসী। পক্ষান্তরে শরিয়ত মানবাধিকারের কথা বলে আল্লাহর অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে। তাই শরিয়তের অধিকারবোধ ভারসাম্যপূর্ণ, পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘস্থায়ী।
কোরআন যখন অধিকারের কথা বলে, তখন উভয় পক্ষের কথাই একসঙ্গে উচ্চারণ করে—আল্লাহ ও বান্দা, ব্যক্তি ও সমাজ, দেহ ও আত্মা। এই সমতাই ইসলামের সৌন্দর্য। যেখানে এই সমতা রক্ষা করা হয়, সেখানেই ইসলাম কার্যকর হয়। আর যেখানে অধিকার আদায়ের নামে এক পক্ষকে বাদ দিয়ে আরেক পক্ষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেখানে ইসলামি আদর্শ ভঙ্গ হয়।
শরিয়ত কোনো মানববিরোধী বা অধিকারবিরোধী ব্যবস্থা নয়; বরং মানবাধিকারের সবচেয়ে গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপ। মানুষের সীমাবদ্ধ বুদ্ধি যেখানে বর্তমানেই আটকে যায়, শরিয়ত সেখানে ভবিষ্যৎকেও আগলে রাখে।
তাই শরিয়তের সিদ্ধান্ত সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোধগম্য না হলেও সময়ের পরীক্ষায় সেটিই সবচেয়ে কল্যাণকর প্রমাণিত হয়। ইসলামের শিক্ষা হলো, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝখানে ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রকৃত ন্যায়বিচার, প্রকৃত মানবাধিকার ও প্রকৃত মুক্তি।
আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক