প্রাণ ও পরিবেশের সুরক্ষায় ইসলামের ১০ শিক্ষা

ছবি: পেক্সেলস

জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণ বর্তমানে বৈশ্বিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ নিয়ে মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আমাদের এই পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। 

অথচ ইসলাম পরিবেশ রক্ষা এবং প্রতিটি প্রাণের প্রতি দয়া প্রদর্শনের যে রূপরেখা দিয়েছিল, তা আজও পরিবেশবিজ্ঞানের জন্য এক অনন্য দিশারি। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইসলামের ১০টি সূত্র তুলে ধরা হলো:

১. প্রকৃতিকে আল্লাহর নিপুণ সৃষ্টি হিসেবে দেখা

এই বিশাল মহাবিশ্ব ও প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান একটি সুক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে। মানুষের দায়িত্ব হলো সেই ভারসাম্য নষ্ট না করে তা সংরক্ষণ করা।

আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি এক সুনির্দিষ্ট পরিমাপে (ভারসাম্য বজায় রেখে)।” (সুরা কামার, আয়াত: ৪৯)

২. বৃক্ষরোপণকে ইবাদত মনে করা

গাছ লাগানো শুধু পরিবেশের কাজ নয়, বরং এটি একটি চলমান সওয়াব বা ‘সদকায়ে জারিয়া’। গাছ থেকে মানুষ বা প্রাণী যা কিছু গ্রহণ করবে, তা রোপণকারীর আমলনামায় পুণ্য হিসেবে জমা হবে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যদি কোনো মুসলিম একটি গাছ রোপণ করে অথবা শস্য বপন করে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা রোপণকারীর জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)

আরও পড়ুন

৩. পানিসম্পদ ও নদীর সুরক্ষা

পানির অপর নাম জীবন। পানির অপচয় রোধ এবং পানির উৎসসমূহ দূষণমুক্ত রাখা ইসলামের কঠোর নির্দেশ। এমনকি অজুর মতো ইবাদতেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি খরচ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

রাসুল (সা.) প্রবাহিত নদীর কিনারে বসেও অজু করার সময় পানি অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫)

৪. প্রাণিকুলের প্রতি অকৃত্রিম দয়া

মানুষের মতো ইতর প্রাণীদেরও অনুভূতি আছে এবং তারা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে। কোনো প্রাণীকে অকারণে কষ্ট দেওয়া বা লক্ষ্যবস্তু বানানো সরাসরি পাপ।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “জমিনে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া করো, তবে আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯২৪)

৫. যুদ্ধের ময়দানেও প্রকৃতি রক্ষা

ইসলামে যুদ্ধের মতো চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও পরিবেশ ধ্বংস করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সবুজ গাছপালা কাটা বা জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়া ইসলামের সমরনীতির পরিপন্থী। (আলি মুহাম্মদ সাল্লাবি, ফাসলুল খিতাব ফি সিরাতি আমিরিল মুমিনিন আবু বকর আস-সিদ্দিক, ১/১২২, দার ইবনে কাসির, বৈরুত, ২০০২)

৬. প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় বর্জন

মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং আমানতদার। তাই সম্পদের অতিভোগ বা অপচয় করা প্রকৃতি ও আল্লাহর অধিকার হরণের শামিল।

আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা খাও এবং পান করো; কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

আরও পড়ুন

৭. রাস্তাঘাট ও উন্মুক্ত স্থান পরিষ্কার রাখা

পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ইমানের অংশ। পথে পড়ে থাকা ময়লা বা কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাকে ইসলাম ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “ইমানের সত্তরটিরও বেশি শাখা রয়েছে... যার সর্বনিম্ন স্তর হলো পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)

৮. প্রাণীদের অধিকার ও খাদ্য নিশ্চিত করা

বোবা প্রাণীদের ওপর তাদের ক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝা চাপানো বা তাদের ক্ষুধার্ত রাখা জুলুম। নবীজি (সা.) ক্ষুধার্ত উটের কষ্ট দেখে মালিককে তিরস্কার করেছিলেন।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “এই নির্বাক পশুদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪৮)

৯. পরিবেশ দূষণ থেকে বিরত থাকা

স্থির পানি বা ছায়াযুক্ত স্থানে—যেখানে মানুষ বিশ্রাম নেয়—সেখানে মলমূত্র ত্যাগ বা ময়লা ফেলে পরিবেশ দূষিত করাকে অভিশপ্ত কাজ বলা হয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা তিনটি অভিশপ্ত কাজ থেকে বেঁচে থাকো: পানির ঘাটে, রাস্তার মাঝখানে এবং গাছের ছায়ায় মলমূত্র ত্যাগ করা।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬)

১০. শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইতিবাচক কাজ

পৃথিবী ধ্বংসের কাছাকাছি থাকলেও মানুষের উচিত ইতিবাচক কোনো কাজ করে যাওয়া, যা পরিবেশের উপকারে আসে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যদি কেয়ামত শুরু হওয়ার উপক্রম হয় আর তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।” (আল-আদাবুল মুফরাদ, বুখারি, হাদিস: ৪৭৯)

ইসলামের এই পরিবেশদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এই পৃথিবীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎকে ধ্বংস করে মানুষের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন