আল-মাক্কারি: হারিয়ে যাওয়া আন্দালুসিয়ার শেষ কণ্ঠস্বর

ছবি: এআই / প্রথম আলো

স্পেনের মাটি থেকে যখন আট শতাব্দীর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটেছিল, তখন আগ্রাসীদের ইনকুইজিশনের আগুনে ভস্মীভূত হয়েছিল সেখানকার সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও অগণিত বিরল পাণ্ডুলিপি।

কিন্তু তারপরও স্পেনের সেই অনুপম জ্ঞান, সাহিত্য ও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কীভাবে টিকে রইল?

ইতিহাস থেকে জানা যায়, আন্দালুসিয়ার সমগ্র ইতিহাস ও সাহিত্যকে বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে একাই উদ্ধার করেছিলেন এক ক্ষণজন্মা পণ্ডিত—ইমাম আবুল আব্বাস আহমদ আল-মাক্কারি আত-তিলেমসানি (১৫৭৭–১৬৩২ খ্রি.)।

আধুনিক ও প্রাচীন ঐতিহাসিকেরা তাঁকে তাই আখ্যায়িত করেছেন ‘হাফিজুল মাগরিব’ বা পশ্চিমের শেষ মহাফেজখানা হিসেবে।

তিলেমসান থেকে ফেজের পাঠশালা

আল-মাক্কারির পরিবারের মূল শেকড় বর্তমান আলজেরিয়ার হাজনাহ অঞ্চলের প্রাচীন জনপদ ‘মাক্করা’-তে। তবে তাঁর জন্ম ও শৈশব কেটেছে উত্তর আফ্রিকার শিক্ষা ও সংস্কৃতির রাজধানী তিলেমসানে। তাঁর পরিবার তখন শতাব্দীপ্রাচীন এক জ্ঞানতাপস বংশ।

পূর্বপুরুষ আবু আবদুল্লাহ আল-মাক্কারি আল-কাবির ছিলেন চতুর্দশ শতকের ফকিহ ও শিক্ষক। ফলে গৃহকোণ থেকেই জ্ঞানচর্চার আবহ তিনি পেয়েছিলেন।

তৎকালীন সুলতান আহমদ আল-মনসুরের নজরে আসেন। অল্প বয়সেই তিনি ফেজের ঐতিহ্যবাহী কারাউইন মসজিদের খতিব ও প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব লাভ করেন।

তিলেমসানের প্রধান মুফতি ও দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের খতিব, তাঁর আপন চাচা সাইদ আল-মাক্কারির নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চতর শিক্ষার সূচনা ঘটে। তবে প্রতিভার পূর্ণ বিকাশের সন্ধানে তিনি তৎকালীন মরক্কোর প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র ফেজ শহরে পাড়ি জমান।

সেখানে তিনি সমকালীন মাগরিবের শ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ ও ফকিহদের সান্নিধ্য লাভ করেন; যাঁদের মধ্যে আবু মালিক আল-ওয়ানশারিসি এবং মাগরিবের শীর্ষ মুহাদ্দিস আবু আবদুল্লাহ আল-কাসসার আল-গারনাতি ছিলেন অন্যতম।

ফেজে তিনি ফিকহ, ধর্মতত্ত্ব, হাদিস এবং বিশেষ করে আরবি সাহিত্যে অভাবনীয় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তৎকালীন সুলতান আহমদ আল-মনসুরের নজরে আসেন। অল্প বয়সেই তিনি ফেজের ঐতিহ্যবাহী কারাউইন মসজিদের খতিব ও প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব লাভ করেন।

আরও পড়ুন

দামেস্ক থেকে কায়রো

১০২৮ হিজরিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আত্মিক টানে আল-মাক্কারি মাগরিবের সীমানা ছাড়িয়ে প্রাচ্যের উদ্দেশ্যে সফরে বের হন। মিসর, মক্কা ও মদিনা সফর শেষে তিনি যখন সিরিয়ার দামেস্কে প্রবেশ করেন, তখন প্রাচ্যের পণ্ডিতসমাজ তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও প্রবাদপ্রতিম স্মৃতিশক্তি দেখে হতবাক হয়ে যায়।

প্রাচীন উমাইয়া মসজিদের সুপরিসর চত্বরে সহিহ বুখারির পাঠ এবং আরবি সাহিত্যের ওপর তাঁর ধারাবাহিক বক্তৃতা শুনতে সমবেত হতেন শত শত প্রবীণ আলেম ও কৌতূহলী শিক্ষার্থী।

কোনো বইয়ের পাতা না খুলেই তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবিরাম উদ্ধৃত করে যেতেন প্রাচীন কবিদের শত শত দুর্লভ কবিতা, হাদিসের জটিল সনদ এবং স্পেনের হারিয়ে যাওয়া বহু ঘটনা। চৌদ্দ বছরব্যাপী এই দীর্ঘ প্রাচ্যজীবনে তিনি মাগরিব ও আন্দালুসিয়ার গৌরবময় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত চলন্ত বিদ্যালয়ে পরিণত হন।

রিকনকুইস্তার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্পেনের যেসব ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক দলিল চিরতরে ছাই হয়ে গিয়েছিল, আল-মাক্কারি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও স্মৃতি থেকে সেগুলোর বিপুল অংশ এই গ্রন্থে হুবহু উদ্ধৃত করে গেছেন।

‘নাফহুত তিব’

দামেস্কে অবস্থানকালেই সেখানকার আল-জাকমাকিয়্যাহ মাদ্রাসার প্রখ্যাত শিক্ষক আল-মাওলা আশ-শাহিনি আল-মওয়াহিবির নেতৃত্বে সিরিয়ার গবেষকদল আল-মাক্কারির কাছে আবেদন জানান, আন্দালুসিয়ার শেষ মহান উজির লিসানউদ্দিন ইবনুল খাতিবের একটি জীবনী যেন তিনি লিখে দেন।

আল-মাক্কারি সেই অনুরোধ রক্ষা করতে কলম ধরেন। কিন্তু লিখতে গিয়ে সেই জীবনী আর একক ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; কায়রোতে ১০৩৯ হিজরিতে যখন তিনি এর সমাপ্তি টানেন, ততক্ষণে তা রূপ নিয়েছে স্পেনের মুসলিম সভ্যতার এক সুবিশাল মহাকোষে।

বইটির নাম তিনি রাখেন নাফহুত তিব মিন গুসনিল আন্দালুসির রাতিব। এতে আন্দালুসিয়ার ভৌগোলিক সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, নগরজীবন, সামাজিক আচার-ব্যবহার, রাজবংশগুলোর উত্থান-পতন এবং সেখানকার বহু বিজ্ঞানী, ফকিহ ও সাহিত্যিকের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

গ্রন্থটির সবচেয়ে অমূল্য দিক হলো, এটি আন্দালুসিয়ার বহু হারিয়ে যাওয়া মৌলিক গ্রন্থের নির্যাস সংরক্ষণ করেছে। রিকনকুইস্তার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্পেনের যেসব ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক দলিল চিরতরে ছাই হয়ে গিয়েছিল, আল-মাক্কারি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও স্মৃতি থেকে সেগুলোর বিপুল অংশ এই গ্রন্থে হুবহু উদ্ধৃত করে গেছেন।

আরও পড়ুন

ফিকহ, সুফিবাদ ও সাহিত্যের অনন্য দলিল

আল-মাক্কারির অন্যান্য গবেষণাগ্রন্থও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মরক্কোর আইনজ্ঞ কাজি ইয়াজের জীবন, কর্ম ও ফতোয়া নিয়ে তিনি রচনা করেন আজহারুর রিয়াদ ফি আখবারি ইয়াদ; যাকে একে মাগরিবের বিচারব্যবস্থা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের এক তুলনামূলক এনসাইক্লোপিডিয়া বলা চলে।

একইভাবে ফেজ ও মারাক্কাশের যেসব সমকালীন পণ্ডিতের সান্নিধ্যে তিনি এসেছিলেন, তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন নিয়ে তিনি লিখেছিলেন রাওদাতুল উনস আল-আতিরাতুল আনফাস। দামেস্কের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তিনি উরফুন নাশ্ক ফি আখবারি দিমাশক নামে আরেকটি গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু করেছিলেন।

তিনি যেখানেই পা রেখেছেন, সেখানকার সমাজ ও সংস্কৃতির বৌদ্ধিক দলিল পরম শ্রদ্ধায় সংরক্ষণ করেছেন।

প্রাচ্যের আলেমদের অনুরোধে তিনি সেই কঠিন ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিগুলো অত্যন্ত মিষ্টি ছন্দোবদ্ধ কবিতায় রূপ দেন, যার নাম রাখা হয় ইদাতুদ দুজুন্নাহ ফি আকাইদি আহলিস সুন্নাহ

কবিতা থেকে আকিদা

ধর্মতত্ত্ব ও যুক্তিবিদ্যায়ও তিনি ছিলেন এক অনন্য রূপকার। তৎকালীন যুগে উত্তর আফ্রিকার আকিদাশাস্ত্রে ইমাম সানূসির গভীর দর্শন অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল, কিন্তু তা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য বেশ দুর্বোধ্য।

প্রাচ্যের আলেমদের অনুরোধে তিনি সেই কঠিন ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিগুলো অত্যন্ত মিষ্টি ছন্দোবদ্ধ কবিতায় রূপ দেন, যার নাম রাখা হয় ইদাতুদ দুজুন্নাহ ফি আকাইদি আহলিস সুন্নাহ। এই কাব্যগ্রন্থের আবেদন ছিল বিস্ময়কর।

আল-মাক্কারি উল্লেখ করেছেন যে তাঁর জীবদ্দশাতেই মক্কা, মদিনা, কায়রো ও দামেস্কের শিক্ষার্থীরা এর এক হাজারেরও বেশি পাণ্ডুলিপি নিজ হাতে লিখে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

এটি মৌরিতানিয়ার সাহারা মরুভূমি থেকে শুরু করে সুদূর নাইজেরিয়া ও সেনেগালের মতো অঞ্চলে সনাতন মাদ্রাসাগুলোর প্রাথমিক পাঠ্যবই হিসেবে মর্যাদা পায়।

সপ্তদশ শতকের সুফি দার্শনিক ও শাফিয়ি আলেম আবদুল গনি আন-নাবুলুসি এই রচনার গভীরতায় মুগ্ধ হয়ে এর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছিলেন রাওদুল আনাম ফি শারহি ইদাতিদ দুজুন্নাহ নামে; সেখানে তিনি আল-মাক্কারির এই সৃষ্টিকে একত্ববাদের নিখুঁত রত্ন হিসেবে অভিহিত করেন।

পাশাপাশি নবীজির প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি মহানবীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও পাদুকার ঐতিহাস রূপরেখা নিয়ে লিখেছিলেন ফাতহুল মুতাআল ফি ওয়াসফিন নিআল নামের আরেকটি অনন্য গবেষণা।

১০৪১ হিজরিতে কায়রোর মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান মনীষী। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কীর্তি চার শ বছর পরও সমান প্রাসঙ্গিক। আহমদ আল-মাক্কারি ছিলেন সেই আত্মমর্যাদাবান ঐতিহ্যের প্রতীক, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ভূখণ্ড হারিয়েও কলমের শক্তিতে সেই ভূখণ্ডের আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

আরও পড়ুন