‘যে বাড়িতে খেজুর নেই, সে বাড়ির লোকেরা ক্ষুধার্ত’

ছবি: ফ্রিপিক

নবীজি (সা.) খেজুরকে কেবল দস্তরখানের সৌন্দর্য হিসেবে দেখেননি, একে ক্ষুধা নিবারণ ও শরীরে দ্রুত শক্তি জোগানোর প্রধান উৎস হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তিনি আয়েশা (রা.)–কে সম্বোধন করে বলেছেন, “আয়েশা, যে বাড়িতে খেজুর নেই, সে বাড়ির লোকেরা ক্ষুধার্ত।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫১৬৮)

মহানবী (সা.)-এর এই কালজয়ী বাণীটি আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের এক গভীর সারসংক্ষেপ।

শতাব্দী পরে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে ইফতার বা দৈনন্দিন খাবারে খেজুরের নির্বাচন কেবল কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে নিখুঁত পুষ্টিগত যুক্তি।

মানবদেহের জন্য খেজুর আসলে একটি প্রাকৃতিক ‘ইমার্জেন্সি ব্যাটারি’ বা জরুরি শক্তির আধার।

তিনটি খেজুর থেকে প্রায় ১৮০ ক্যালরি পাওয়া যায়, যা শরীরে চর্বি জমানোর চাপ সৃষ্টি না করেই তাৎক্ষণিক ‘চার্জ’ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

খেজুর দ্রুত ‘ক্ষুধার তুফান’ শান্ত করে

সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। খেজুর মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এতে থাকা গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ নামক সরল শর্করাগুলো রক্তে মিশে যায়। এই শর্করাগুলো খুব দ্রুত শোষিত হয়, ফলে শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তির সঞ্চার ঘটে।

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খেজুর খাওয়ার ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্ক স্নায়বিক সংকেত পাঠাতে শুরু করে, যা তীব্র ক্ষুধার অনুভূতি কমিয়ে দেয় এবং শরীরের জৈবিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে।

ফলে ইফতারে ভারী খাবার খাওয়ার আগেই শরীর একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় চলে আসে। খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করার এটিই প্রধান বৈজ্ঞানিক রহস্য।

আরও পড়ুন

কয়টি খেজুর খাবেন

সুন্নাহ ও আধুনিক পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি খেজুর খাওয়া আদর্শ। এতে রক্তে শর্করার মাত্রার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বা ‘গ্লাইসেমিক লোড’ তৈরি হয় না।

মুসলিম বিশ্বে ইফতারে খেজুর ও পানি দিয়ে রোজা ভাঙার যে চিরাচরিত নিয়ম, তা মূলত এই বৈজ্ঞানিক সত্যেরই প্রতিফলন। খেজুর খাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়া এবং তারপর মূল খাবার গ্রহণ করা শরীরের হজমপ্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

খেজুরে কখন সমস্যা হতে পারে

খেজুরের পুষ্টিগুণ অপরিসীম হলেও পুষ্টিবিদেরা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন। রমজানের সন্ধ্যায় বা রাতে বারবার স্ন্যাকস হিসেবে খেজুর খাওয়া।

বিশেষ করে যখন খেজুরের ভেতর বাদাম, চকলেট বা ক্যারামেল যোগ করা হয়, তখন তা উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি করতে পারে।

এই ধরনের মিশ্রণ রক্তে শর্করার মাত্রা এবং ক্যালরির পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন কোনো বিষ বা জাদু তার ক্ষতি করতে পারবে না।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৪৫
আরও পড়ুন

‘ছোট্ট দানার বিশাল শক্তি’

খেজুর আকারে ছোট হলেও এটি শক্তিতে ভরপুর। গড়ে একটি খেজুরে ৬০ থেকে ৭০ ক্যালরি শক্তি থাকে।

তিনটি খেজুর থেকে প্রায় ১৮০ ক্যালরি পাওয়া যায়, যা শরীরে চর্বি জমানোর চাপ সৃষ্টি না করেই তাৎক্ষণিক ‘চার্জ’ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ধর্মীয় গুরুত্ব

ইসলাম খেজুরকে বরকতময় ফল হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর ওষধি গুণ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন কোনো বিষ বা জাদু তার ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৪৫)

তবে এই উপকারের পাশাপাশি ইসলাম আমাদের পরিমিতিবোধেরও শিক্ষা দিয়েছে। অতিরিক্ত যেকোনো কিছুই স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর।

তাই পরিমিত খেজুর গ্রহণ একদিকে যেমন সুন্নাহর অনুসরণ, অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞানের দাবি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার চাবিকাঠি।

আরও পড়ুন