আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে আল্লাহ তাদেরকে যে চতুষ্পদ জন্তুসমূহ দিয়েছেন, তাতে তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৪)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা জামাখশারি (রহ.) বলেন, ‘আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নৈকট্যলাভের মাধ্যম হিসেবে এই কোরবানির বিধান দিয়েছেন।’ (তাফসিরে কাশশাফ: ২/৩৩)
রাসুল (সা.)-কে কোরবানি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের সুন্নত’ এবং কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে নেকি রয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৭)
কোরবানির অর্থ
আরবি ‘কুরব’ শব্দ থেকে ‘কুরবানি’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ কোনো বস্তুর নৈকট্য লাভ করা।
শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ–তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ঈদুল আজহার দিন (১০ জিলহজ) থেকে আইয়ামে তাশরিকের শেষ দিন (১২ জিলহজ) সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়।
কেন কোরবানি করবেন
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কোরবানির চেয়ে অন্য কোনো আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৯)
তিনি মদিনায় দশ বছর অবস্থানকালে প্রতি বছরই নিয়মিত কোরবানি করেছেন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৫০৭)
অপরদিকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কোরবানি করে না, তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কোরবানি করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৩৫১৯)
কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত
১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো ব্যক্তির মাঝে নিম্নোক্ত পাঁচটি শর্ত পাওয়া গেলে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব:
মুসলমান হওয়া: কোরবানিসহ যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলাম গ্রহণ করা পূর্বশর্ত।
স্বাধীন হওয়া: পরাধীন ব্যক্তি বা ক্রীতদাসের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ-মস্তিষ্ক সম্পন্ন হওয়া: নাবালেগ শিশু-কিশোর এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নেসাবের মালিক হলেও তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয় (বাদায়িউস সানায়ি: খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-৬৩; রদ্দুল মুহতার: খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-৩১৬)।
মুকিম হওয়া: হানাফি মাজহাবে মুসাফিরের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
নেসাবের মালিক হওয়া: জিলহজের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩)।
নেসাব হিসাব করবেন যেভাবে
কোরবানির নেসাব হলো সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ কিংবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক পণ্য।
নেসাব নির্ধারণের জন্য নিজের মালিকানায় থাকা সোনা-রুপা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত নগদ অর্থ, ব্যাংক সঞ্চয় এবং ব্যবহারের আওতাভুক্ত নয় এমন আসবাবপত্র বা অতিরিক্ত ফ্ল্যাট/জমির হিসাব করতে হবে।
যদি সোনা বা রূপা এককভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু সবকিছুর মোট মূল্য সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার সমমূল্য হয়ে যায়, তবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
ইলিয়াস মশহুদ : লেখক ও অনুবাদক