ঘড়ির কাঁটার বাইরে মুমিনের সময়ের হিসাব

ছবি: এএফপি

আধুনিক পৃথিবী আমাদের সময়ের সংজ্ঞাকে বদলে দিয়েছে। সময় মানেই এখন টাকা; একে খরচ করতে হয়, জমাতে হয় কিংবা অর্থনৈতিক মুনাফার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হয়। একে আমরা বলি ‘প্রোডাক্টিভিটি’ বা উৎপাদনশীলতা।

কিন্তু এই ইঁদুরদৌড়ে পড়ে আমরা কি সময়ের প্রকৃত গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছি?

যখন আমরা বিশ্বাস করি সময় মানেই টাকা, তখন আমাদের দিনগুলো অর্থবহ হওয়ার বদলে কেবল কাজের চাপে পিষ্ট হতে থাকে। ১০ মিনিট নামাজ পড়ার সময় মনে হয়, এই সময়টুকু কাজে লাগালে হয়তো বাড়তি কিছু আয় হতো।

মায়ের সঙ্গে বসে চা খাওয়ার এক ঘণ্টা সময়কে মনে হয় ‘লস’। এমনকি কোরআন তেলাওয়াতের সময়ও মাথায় ঘোরে—কাজটা কি খুব জরুরি ছিল?

এভাবে পবিত্র ও প্রশান্তির কাজগুলো আমাদের কাছে সময়ের অপচয় মনে হতে থাকে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সময়ের হিসাব একেবারেই ভিন্ন। ইসলাম সময়কে কেবল ঘড়ির কাঁটায় মাপে না, বরং একে আমলের ‘ওজনে’র স্কেলে বিচার করে।

প্রতিটি মুহূর্ত হয় আল্লাহর স্মরণে ‘ভারী’ হতে পারে, অথবা অবহেলায় ‘হালকা’ হয়ে যেতে পারে। তবে এই ওজন কিন্তু কাজের পরিমাণের ওপর নয়, বরং নিয়তের বিশুদ্ধতা বা ইখলাসের ওপর নির্ভর করে।

যে দাঁড়িপাল্লায় মাপা হবে সময়

আল্লাহ–তাআলা সময়কে কোনো মুদ্রা বা কারেন্সি হিসেবে দেখেননি। তিনি একে এমন কিছু হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা কেয়ামতের দিন মাপা হবে।

তিনি বলছেন, ‘অতঃপর যার নেকির পাল্লা ভারী হবে, সে তো লাভ করবে সন্তোষজনক জীবন। আর যার নেকির পাল্লা হালকা হবে, তার ঠিকানা হবে হাবিয়া।’ (সুরা কারিয়া, আয়াত: ৬-৯)

আমাদের সব কাজই সময়ের ফ্রেমে বন্দি। তাই প্রতিটি মুহূর্ত হয় আল্লাহর স্মরণে ‘ভারী’ হতে পারে, অথবা অবহেলায় ‘হালকা’ হয়ে যেতে পারে। তবে এই ওজন কিন্তু কাজের পরিমাণের ওপর নয়, বরং নিয়তের বিশুদ্ধতা বা ইখলাসের ওপর নির্ভর করে।

আরও পড়ুন

সময়কে অর্থবহ করার ৬ ধাপ

১. বর্তমান মুহূর্তের ওজন

সময়ের ক্ষুদ্রতম একক হলো বর্তমান মুহূর্ত। আধ্যাত্মিক পরিভাষায় বলে ‘ইবনুল ওয়াক্ত’ বা সময়ের সন্তান। অর্থাৎ, অতীত নিয়ে আফসোস বা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে বর্তমানে নিমগ্ন থাকা।

লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় মোবাইল স্ক্রল না করে জিহ্বাকে জিকিরে সিক্ত রাখা কিংবা কোনো খারাপ কিছুর দিকে নজর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সরিয়ে নেওয়া—এগুলোই মুহূর্তকে ভারী করে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুটি বাক্য আছে যা উচ্চারণে সহজ, মিজানের পাল্লায় অনেক ভারী এবং দয়াময় আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়; তা হলো—সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৫৬৩)

২. দিনকে সাজানো

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের মূল খুঁটি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। নামাজই দিনের কাজের কাঠামো তৈরি করে দেয়। সূর্য ও প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে আমাদের শরীর ও মনের সংযোগ ঘটায় এই নামাজ। বিশেষ করে ফজর ও আসর—এই দুই সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমলসমূহ আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি, আমার আমলগুলো রোজা রাখা অবস্থায় পেশ করা হোক।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৪৭

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে রাতে একদল ফেরেশতা এবং দিনে একদল ফেরেশতা পালাক্রমে আসে। তারা ফজর ও আসর নামাজের সময় একত্র হয়... আল্লাহ তখন জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দাদের কোন অবস্থায় রেখে এলে? ফেরেশতারা বলেন, আমরা তাদের নামাজ পড়া অবস্থায় রেখে এসেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৫)

৩. সপ্তাহের বরকত

ইসলামে সপ্তাহের শুরু ও শেষ হলো জুমাবার। এটি কেবল ছুটির দিন নয়, বরং আধ্যাত্মিক রিচার্জের দিন। এ ছাড়া সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার মাধ্যমে সপ্তাহের ওজন বাড়ানো যায়।

মহানবীকে এই দিনগুলোতে রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমলসমূহ আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি, আমার আমলগুলো রোজা রাখা অবস্থায় পেশ করা হোক।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৭৪৭)

আরও পড়ুন

৪. মাসের আবর্তন

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মাসগুলো প্রশাসনিক কাজে লাগলেও হিজরি মাসগুলো আধ্যাত্মিকভাবে জীবন্ত। চাঁদের বাড়া-কমা আমাদের জীবনের শৈশব থেকে বার্ধক্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ‘আইয়ামে বিজ’-এর রোজা রাখা কিংবা হারাম মাসগুলোতে (জিলকদ, জিলহজ, মহরম ও রজব) গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সময়কে মহিমান্বিত করে।

জীবনের সব মুহূর্ত, দিন ও বছরের যোগফলই হলো আমাদের লাইফটাইম। তবে আল্লাহ দয়া করে আমাদের জন্য ‘হার্ড রিসেট’-এর ব্যবস্থা রেখেছেন, তা হলো হজ।

৫. বছরের সঞ্চয়

একটি বছরের সার্থকতা নির্ভর করে রমজান মাসের ওপর। রমজানের গুরুত্ব কতটা তা বোঝা যায় একটি হাদিস থেকে, যেখানে সাধারণ মৃত্যু হওয়া এক ব্যক্তি এক বছর বেশি বেঁচে রমজান পাওয়ায় শহীদের চেয়েও আগে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৯২৫)

আর এই রমজানেই আছে লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

৬. জীবনের ওজন

জীবনের সব মুহূর্ত, দিন ও বছরের যোগফলই হলো আমাদের লাইফটাইম। তবে আল্লাহ দয়া করে আমাদের জন্য ‘হার্ড রিসেট’-এর ব্যবস্থা রেখেছেন, তা হলো হজ।

মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সঠিকভাবে হজ সম্পাদন করল, সে যেন মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়া নিষ্পাপ শিশুর মতো ফিরে এল (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮২০)

এমনকি মৃত্যুর পরেও সদকায়ে জারিয়া বা সুসন্তানের দোয়ার মাধ্যমে আমাদের আমলনামার ওজন বাড়তে থাকে।

আমাদের জীবনটা কোনো প্রতিযোগিতার দৌড় নয় যে, কে কত বেশি সম্পদ বা স্ট্যাটাস অর্জন করল। বরং সুরা তাকা সুরে আল্লাহ সতর্ক করেছেন—সম্পদের মোহ আমাদের কবরে পৌঁছানো পর্যন্ত মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। (সুরা তাকাসুর, আয়াত: ১-২)

আরও পড়ুন