ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনে পূর্বসূরিদের নির্দেশনা

শিক্ষকের কথা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শোনা ইলম অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠিছবি: এএফপি

ধর্মীয় জ্ঞান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এমন এক নুর, যা মানুষকে সঠিক পথ দেখায়, পাপাচার থেকে মুক্ত রাখে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়তা করে। এই নুর কেবল তাদের অন্তরেই বর্ষিত হয় যারা পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী, আন্তরিক এবং কঠোর পরিশ্রমী।

কোরআন, সুন্নাহ এবং পূর্বসূরিদের জীবনী থেকে ইলম অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিমালা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. উপকারী ইলমের জন্য দোয়া করা

ইলম অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হলো আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) সবসময় উপকারী ইলমের জন্য দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট উপকারী ইলম, পবিত্র রিযিক এবং কবুলযোগ্য আমল চাই।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯২৫)

২. নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা

ইলম অর্জনের মূল শর্ত হলো নিয়ত কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া। নিয়ত লোকদেখানো হলে সেই জ্ঞান বরকতহীন হয়ে যায়।

আল্লাহ বলেন, “আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯)

৩. যোগ্য আলেমদের সাহচর্য গ্রহণ

কেবল বই পড়ে পূর্ণাঙ্গ ইলম অর্জন সম্ভব নয়। ইলমের সঠিক মর্ম, প্রেক্ষাপট এবং প্রয়োগ বোঝার জন্য অভিজ্ঞ আলেমদের তত্ত্বাবধান অপরিহার্য।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন, “যে কেবল বইপত্র থেকে ফিকহ অর্জন করে, সে শরীয়তের বিধিবিধান ধ্বংস করে।” (আন-নববি, আল-মাজমু’, ১/৩৮)

আরও পড়ুন

৪. কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্য

ইলম অর্জনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলতেন, “আরাম-আয়েশের মাধ্যমে ইলম অর্জিত হয় না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬১২; হাদিসের আলোচনায় ইমাম মুসলিম এই কথাটি উদ্ধৃত করেছেন)

কঠোর অধ্যবসায় ছাড়া এই পথে সফল হওয়া অসম্ভব। ইমাম শাফেয়ির ভাষায়, “নাজাত আশা করো, অথচ তার পথ অবলম্বন করো না? জেনে রেখো, ডাঙায় কখনো নৌকা চলে না।” (দিওয়ানুশ শাফিয়ি, পৃ. ৪২)

৫. অহংকার ও অতিরিক্ত লজ্জা বর্জন

অহংকার মানুষকে শিখতে বাধা দেয়, আর অতিরিক্ত লজ্জা প্রশ্ন করতে দ্বিধা তৈরি করে। জ্ঞান অর্জনে এই দুটিই বড় অন্তরায়। মুজাহিদ (রহ.) বলেন, “লাজুক এবং অহঙ্কারী ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করতে পারে না।” (সহিহ বুখারি, কিতাবুল ইলম, অধ্যায়: ৫০)

আয়েশা (রা.) আনসারি নারীদের প্রশংসা করে বলতেন যে লজ্জা তাদের জ্ঞান অন্বেষণে বাধা দিতে পারেনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৩২)

৬. একাগ্রতা ও মনোযোগ

শিক্ষক বা আলেমের কথা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শোনা ইলম অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠি। হজরত আলী (রা.)-এর মতে, মৃত জমিন যেমন বৃষ্টিতে জীবিত হয়, মৃত অন্তর তেমনি ইলমের আলোয় প্রাণ ফিরে পায়। (ইবনুল জাওজি, সিফাতুস সাফওয়াহ, ১/৩২০)

৭. পাপাচার থেকে দূরে থাকা

গুনাহ বা পাপ মানুষের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয় এবং ইলমের নুরকে নিভিয়ে দেয়। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-কে তাঁর শিক্ষক ইমাম মালেক (রহ.) নসিহত করেছিলেন, “আমি দেখতে পাচ্ছি আল্লাহ তোমার অন্তরে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছেন, তুমি পাপের অন্ধকার দিয়ে তা নিভিয়ে দিও না।” (ইবনুল কাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফি, পৃ. ৫২)

৮. অল্প জ্ঞানে তুষ্ট না হওয়া

ইলম এক অসীম সমুদ্র। যতো বেশি শেখা যায়, নিজের সীমাবদ্ধতা ততো বেশি স্পষ্ট হয়। আল্লাহ তাআলা নবীজি (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, “বলো, হে আমার প্রতিপালক, আমার ইলম বৃদ্ধি করে দাও।” (সুরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৪)

ইমাম শাফেয়ি বলতেন, “আমি যতো শিখি, ততই বুঝতে পারি আমি কতটা অজ্ঞ।” (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ৫১/৩৮৩)

আরও পড়ুন

৯. বিনয় ও নম্রতা

ইলমের প্রকৃত ফল হলো বিনয়। নিচু জমিতে যেমন পানি জমে, তেমনি বিনয়ীর অন্তরেই ইলম স্থায়ী হয়। দাম্ভিকতা মানুষের গ্রহণক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

জনৈক মনীষী বলেছেন, “ইলম হলো উদ্ধত ব্যক্তির শত্রু, যেমন পাহাড়ি ঢল নিচু জমির শত্রু।” (ইবনুল মুকাফফা, আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দীন, পৃ. ৮১)

১০. ‘অল্প বিদ্যা’র ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা

পরিপূর্ণ জ্ঞান না নিয়ে ফতোয়া দেওয়া বা ধর্মীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। আল্লাহ বলেন, “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রতিটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)

১১. ধারাবাহিকতা বজায় রাখা

ইলম অর্জনে নিয়মিত অভ্যাস জরুরি। প্রতিদিন অল্প অল্প করে শেখাই দীর্ঘমেয়াদে বড় অর্জনে রূপ নেয়। কবি যেমনটি বলেছেন, “ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।” (কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, ‘সদ্ভাব শতক’)

হজরত আলী (রা.) বলেছিলেন, “যা অর্জন করেছ তাতে পরিতুষ্ট হয়ে বসে থেকো না, আর যা অর্জন করোনি তা নিয়ে হতাশও হবে না। আমল ছাড়া পরকালের সফলতা আশা করো না, দীর্ঘ জীবনের আশা করেও তাওবা বিলম্ব করো না।” (নাহজুল বালাগাহ, হিকমাহ অংশ)

১২. ইমাম শাফেয়ির ৬ মূলনীতি

ইলম অর্জনের জন্য তিনি তাঁর কবিতায় ছয়টি উপাদানকে অপরিহার্য বলেছেন : ১. মেধা ২. প্রবল আগ্রহ ৩. কঠোর পরিশ্রম ৪. প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় ৫. শিক্ষকের সাহচর্য ৬. দীর্ঘ সময় লেগে থাকা। (দিওয়ানুশ শাফিয়ি, পৃ. ৬৬)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে যাবতীয় বাধা অতিক্রম করে সঠিকভাবে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের তৌফিক দান করুন। তিনি আমাদের এমন প্রজ্ঞা দান করুন, যেন আমরা অর্জিত ইলমের যথাযথ প্রয়োগ করতে পারি এবং তা যেন আমাদের ও মানবতার জন্য কল্যাণকর হয়। আমিন।

[email protected]

ইসমত আরা : লেখক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন