ইসলামের দর্শন বিশ্বশান্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি

.
.

ইসলাম মানে শান্তি, ইমান মানে নিরাপত্তা। ইসলামের উদ্দেশ্য ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন নিরাপত্তা। ইসলামি জীবনাদর্শ বিশ্বের সব মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য। পৃথিবীর সব মানুষের ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ইসলামের লক্ষ্য। মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং যাবতীয় অকল্যাণ ও ক্ষতিকর দিক থেকে মানবসমাজকে রক্ষা করা ইসলামের শিক্ষা। বিশ্বশান্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য প্রয়োজন মানবাধিকার সংরক্ষণ।

মানুষের ব্যক্তিগত সম্মান
ইসলাম ব্যক্তি মানুষের সম্মানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংরক্ষণ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই আমি মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা–তিন, আয়াত: ৪)।
সব মানুষ ভাই ভাই, কারণ সবাই একই পিতা-মাতার সন্তান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক প্রাণ থেকে সৃজন করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন; এরপর তাদের উভয় থেকে বহু নর ও নারী সম্প্রসারণ করেছেন। (সুরা–নিসা, আয়াত: ১)। ইসলামে ভৌগোলিক, আঞ্চলিক, নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত ও ধর্মীয় প্রভেদে
মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সমর্থন করে না। ইসলামি শরিয়ার ফিকহের বিধান হলো সব মানুষ  পবিত্র, তাদের ঘামও পবিত্র। তা যেকোনো মানুষের জন্য, যেকোনো মোমিন মুসলমানের জন্য পবিত্র ও হালাল। ইসলামে কোনো প্রকার শ্রেণিবৈষম্য নেই, নেই কোনো অস্পৃশ্যতার স্থান।

কর্মেই মানুষের পরিচয়

ইসলাম মানুষকে জাতি ও বর্ণ দিয়ে বিচার করে না; বরং তার বিশ্বাস ও কর্মের মূল্যায়ন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের এক নর ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তোমাদের বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি; যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে অধিক সম্মানিত, যে অধিক সতর্ক ও সংযত। (সুরা-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)।

ইমানের জন্য শক্তি প্রয়োগ প্রযোজ্য নয়

ইমান বা বিশ্বাস হলো আদর্শ ও জীবনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এ ইমান আনার ক্ষেত্রে ইসলামে বল প্রয়োগের বা জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। মানুষের কাছে সত্য ও মিথ্যার, ন্যায় ও অন্যায়ের, হেদায়াত ও গোমরাহির বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরা ছিল নবী-রাসুলদের দায়িত্ব। ইমান আনা না-আনার বিষয়টি মানুষের বিবেক, বুদ্ধি ও ইচ্ছার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘দ্বীন সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই; সত্য ভ্রান্তি থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। যে তাগুতকে অস্বীকার করবে আর আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে, সে এমন এক মজবুত হাতল ধরবে, যা কখনো ভাঙার নয়। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা-বাকারা, আয়াত: ২৫৬)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘বলো, সত্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে; সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক এবং যার ইচ্ছা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করুক।’ (সুরা–কাহাফ, আয়াত: ২৯)।

বিশ্বাসের জন্য কটাক্ষ নয়

বিশ্বাস মানুষের অন্তরের বিষয়; কর্মে তা কখনো প্রকাশ পায় আবার কখনো প্রকাশ পায় না। বিশ্বাস গড়ে ওঠে জ্ঞানের আলোয়; বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এ জন্যই যার যার বিশ্বাস তার তার; তাই কারও বিশ্বাস নিয়ে বিদ্রূপ, কটূক্তি বা কটাক্ষ করা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ; গাল–মন্দ ইসলামে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহ ছাড়া যেসবকে ডাকে, তোমরা তাদের গালি দিয়ো না; ফলে তারা আল্লাহকে গালি দেবে শত্রুতাবশত অজ্ঞতার সঙ্গে। (সুরা-আনআম, আয়াত: ১০৮)।

ভিন্নতাসহ ঐক্য

বিচার–ফয়সালার ভার আল্লাহর হাতে। এ প্রসঙ্গে কোরআন করিমে রয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা মোমিন আর যারা ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ছাবিঈন; তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে, তবে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে বিনিময় রয়েছে।’ (সুরা-বাকারা, আয়াত: ৬২)। ‘নিশ্চয় যারা মোমিন আর যারা ইহুদি, ছাবিঈন, খ্রিষ্টান ও মাজুস এবং মুশরিক; কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন।’ (সুরা–হজ, আয়াত: ১৭)।

ইসলামে নিরাপত্তাই প্রথম

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব তারা ইবাদত করুক এই গৃহের মালিকের, যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ করেছেন।’ (সুরা-কুরাইশ, আয়াত: ৩-৪)। অর্থাৎ তাদের উচিত বায়তুল্লাহ তথা কাবা শরিফের রবের ইবাদত-বন্দেগি করা, যিনি ক্ষুধা ও ভয়ভীতি থেকে নিরাপত্তা বিধান করেছেন। মানুষ দুনিয়ার জীবনে বেঁচে থাকার তাগিদে চায় সব ধরনের ভয়ভীতি থেকে তার জান, মাল, ইজ্জত, আব্রু হেফাজতের নিশ্চয়তা। ইসলামি জীবনব্যবস্থার প্রতিটি দিক ও বিভাগেই রয়েছে মানুষের সব অধিকারের বাস্তব প্রতিফলন। নবী-রাসুলদের আগমন ও আসমানি কিতাবের মূল লক্ষ্য মানুষের সমাজে প্রকৃত শান্তি, কল্যাণ ও ইনসাফ নিশ্চিত করা। সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন এবং সর্বশেষ কিতাব আল-কোরআন নাজিলের চূড়ান্ত লক্ষ্য এটাই। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।

ইসলামে বিশ্বভ্রাতৃত্ব

বিশ্বময় চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম মানবভ্রাতৃত্ব তথা বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলাম সমগ্র মানবজাতিকে একই পরিবারভুক্ত মনে করে। ইসলাম মনে করে, সব মানুষই এক আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি এবং তিনি সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও প্রতিপালক। তিনি প্রত্যেক মানুষকেই মানবীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টির সেরা করেছেন। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে সব মানুষের উৎপত্তি এক আদম ও হাওয়া থেকে। ইসলাম আরও শিক্ষা দেয়, হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে পরবর্তী সব নবী-রাসুল যেমন: হজরত নূহ (আ.), হজরত ইব্রাহিম (আ.), হজরত মুসা (আ.), হজরত ঈসা (আ.), হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রত্যেকেই ছিলেন ভাই ভাই এবং তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ ছিল একই উম্মত, পরে তারা মতভেদ সৃষ্টি করে। তোমার প্রতিপালকের পূর্বঘোষণা না থাকলে তারা যে বিষয়ে মতভেদ ঘটায়, তার মীমাংসা তো হয়েই যেত।’ (সুরা-ইউনুস, আয়াত: ১৯)।

মানবজাতি একই অঙ্গের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ

হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সকল বিশ্বাসী মানুষ এক দেহসম; দেহের যেকোনো জায়গায় ব্যথা পেলে চোখে পানি আসে, সারা শরীরে জ্বর আসে।’ (বুখারি ও মুসলিম)। পারস্যের মহাকবি সুফি শেখ সাদী বলেন, ‘আদম সন্তান একই অঙ্গের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ, যেহেতু সে একই বস্তু হতে সৃষ্ট; অঙ্গের কোনো অংশ যদি ব্যথা পায়, অন্য অঙ্গগুলো আরাম নাহি পায়; যদি তুমি অন্যের ব্যথায় না হও ব্যথিত, মানব নাম ধারণ তোমার হবে অনুচিত।’ (গুলিস্তানে সাদী)।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম