ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের রমজান

ধর্ম
ধর্ম

মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনই রমজানের মূল লক্ষ্য। এ মহান লক্ষ্য পূরণে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আদি যুগ থেকে সব নবী, রাসুল ও তাঁদের উম্মতদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের উৎকর্ষের পূর্ণতা প্রদানের জন্য রমজান দান করেছেন। রমজানের প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন। সুন্দর, সুশৃঙ্খল, সুনিয়ন্ত্রিত জীবনই তাকওয়ার জীবন। রাসুলে করিম (সা.) বলেন: ‘আমাকে পাঠানো হয়েছে সুন্দর চরিত্রের পূর্ণতা প্রদানের জন্য। (মুসলিম ও তিরমিজি)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোরআনে বলেছেন, ‘ওয়া ইন্নাকা লাআলা খুলুকিন আজিম।’ অর্থাৎ হে মুহাম্মদ, নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সুরা-৬৮ কলম, আয়াত: ৪)।
মানব চরিত্রের উত্তম গুণাবলির অন্যতম হলো ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। পবিত্র কোরআনে স্থানে স্থানে মহান আল্লাহ নিজেকে ধৈর্যশীল ও পরম সহিষ্ণু হিসেবে পরিচয় প্রদান করেছেন। ধৈর্যের আরবি হলো সবর। সহিষ্ণুতার আরবি হলো হিলম। হিলম সবর অপেক্ষা উন্নততর পর্যায়ের। হিলম তথা সহিষ্ণুতা সম্পর্কে মহাগ্রন্থ কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আল্লাহ তো সম্যক প্রজ্ঞাময়, পরম সহনশীল।’ (সুরা-২২ হজ, আয়াত; ৫৯)। সবর অর্থাৎ ধৈর্য সম্পর্কে কোরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আমি তো তাকে পেলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল আমার অভিমুখী।’ (সুরা-৩৮ ছোয়াদ, আয়াত: ৪৪)। ‘নিশ্চয় ইহাতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।’ (সুরা-১৪ ইবরাহিম, আয়াত: ৫)।
ধৈর্যের গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআন মজিদে বলেছেন, ‘মহাকালের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান আনে ও সত্কর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়। (সুরা-১০৩ আসর, আয়াত: ১-৩)। এই সুরার শেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ধৈর্যকে সাফল্যের নিয়ামক রূপে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং সুসম্পর্ক তৈরি করো, আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ২০০)।
ধৈর্যধারণকারীর সাফল্য সুনিশ্চিত কারণ আল্লাহ তাআলা ধৈর্যধারণকারীর সঙ্গে থাকেন; আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যার সঙ্গে থাকবেন তার সফলতা অবধারিত। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৫৩)।

ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সফলতার সুসংবাদ
এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা কোরআন মজিদে বলেন, ‘আমি তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে, যারা তাদের ওপর বিপদ আপতিত হলে বলে, (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর নিকটেই প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৫৫-১৫৭)। এই আয়াতে ক্ষুধার কথা রয়েছে, যা সরাসরি রমজান ও রোজার সমার্থক জ্ঞাপক; এবং সম্পদ ও ফসলহানির কথা বলা হয়েছে, যা জাকাত, উশর ও সদকার পরিচায়ক।

>আমাদের উচিত সকল অনভিপ্রেত অবস্থায়, যেকোনো অযাচিত পরিবেশ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে নিজেকে সংযত রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে লক্ষ্য পানে এগিয়ে যাওয়া। তবেই আল্লাহর সাহায্য আমাদের সাথি হবে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গী হবেন

আমরা বিপদ-আপদে পড়লে পড়ি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (নিশ্চয় আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁর নিকটেই প্রত্যাবর্তনকারী)। এটি হলো ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ; কিন্তু এটি আমরা পড়ি অধৈর্য হয়ে পড়লে তখনই। মূলত আমরা এর দর্শন ভুলে গিয়ে এটিকে প্রথায় পরিণত করেছি। অনুরূপ হাদিস শরিফে আছে, রোজা অবস্থায় যদি কেউ তোমার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে, তখন তুমি বিনয়ের সঙ্গে বলো, ‘আমি রোজাদার’। কিন্তু আমরা এই কথাটুকুও রাগ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলি, বিনয়ের সঙ্গে নয়। রোজা যেন আমাদের বিনীত না করে বিক্ষুব্ধ করেছে, যা কখনো কাম্য নয়; এটি রমজানের শিক্ষার পরিপন্থী।

ধৈর্যের পরম শিক্ষা রমজান
আমরা সাধারণত বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবতে বিচলিত না হওয়াকেই ধৈর্য বলে মনে করি। মূলত ধৈর্য অনেক ব্যাপক অর্থ ধারণ করে। ধৈর্য তিন প্রকার। এক হচ্ছে, অন্যায় অপরাধ থেকে বিরত থাকা। দুই হচ্ছে, ইবাদত আল্লাহর আনুগত্য ও সৎকর্মে কষ্ট স্বীকার করা। তিন হচ্ছে, বিপদে অধীর না হওয়া। (তাফসিরে বাইজাভি)। রমজানে গুনাহ বর্জন করে, পানাহার ত্যাগ করে, রাত জেগে ইবাদতের কষ্ট স্বীকার করে আমরা সেই ধৈর্যেরই পূর্ণাঙ্গ অনুশীলনে ব্যাপৃত হই।
কোনো ব্যক্তি যদি উপরিউক্ত অর্থে ধৈর্য অবলম্বন করেন; তবে তাঁর জীবনে পূর্ণতা ও সফলতা অনস্বীকার্য। কারণ প্রথমত, অন্যায় অপরাধ তথা পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা সকল প্রকার অকল্যাণ ও গ্লানি থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়। দ্বিতীয়ত, ইবাদত ও সত্কর্ম সম্পাদন করা সফলতার একমাত্র সোপান। তৃতীয়ত, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দৃঢ় ও অবিচল থাকা লক্ষ্যে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম। সুতরাং ‘সবর কামিল’ বা পরিপূর্ণ ধৈর্যই মানবজীবনকে পূর্ণতা দিতে পারে। আমাদের উচিত সকল অনভিপ্রেত অবস্থায়, যেকোনো অযাচিত পরিবেশ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে নিজেকে সংযত রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে লক্ষ্য পানে এগিয়ে যাওয়া। তবেই আল্লাহর সাহায্য আমাদের সাথি হবে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গী হবেন।
রমজানে রোজা, সাহরি, ইফতার, তারাবি, তিলাওয়াত ও ইতিকাফ এবং জাকাত, সদকাসহ ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আমরা তিন প্রকার ধৈর্যের পরিপূর্ণ অনুশীলন করতে পারি।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
[email protected]