ধৈর্য ও সহমর্মিতার রমজান

ধর্ম
ধর্ম

ইসলাম মানে শান্তি। ইসলাম মানে নিরাপত্তা। ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ। ইসলাম পালনের দ্বারাই নিশ্চিত হয় দুনিয়ার শান্তি ও পরকালের মুক্তি। ইসলামের এই মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আল্লাহ তায়ালা শরিয়তের বিভিন্ন বিধিবিধান দিয়েছেন। ইসলাম
পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত: সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ বা মাবুদ নাই এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা
ও রাসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, হজ করা ও রমজান মাসে রোজা রাখা। (বুখারি)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) জনসমক্ষে বসা ছিলেন, এমন সময় তাঁর কাছে এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ইমান কী? তিনি বললেন, ইমান হলো আপনি বিশ্বাস রাখবেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, কিয়ামতের দিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি এবং তাঁর রাসুলগণের প্রতি, আপনি আরও বিশ্বাস রাখবেন পুনরুত্থানের প্রতি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইসলাম কী? তিনি বললেন, ইসলাম হলো আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবেন না, সালাত কায়েম করবেন, জাকাত আদায় করবেন এবং রমজানের সাওম পালন করবেন। ওই ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, ইহসান কী? তিনি বললেন, আপনি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবেন, যেন আপনি তাঁকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাঁকে দেখতে না পান, তবে বিশ্বাস রাখবেন যে অবশ্যই তিনি আপনাকে দেখছেন। ওই ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, কিয়ামত কবে? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে যিনি জিজ্ঞাসিত তিনি জিজ্ঞাসাকারী অপেক্ষা বেশি জানেন না। (বুখারি, ই. ফা.: হাদিস-৪৮)।
রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রমজানের এ মাসটি হচ্ছে সহনশীলতা অর্জনের মাস, নেকি ও কল্যাণের একটি স্বর্ণালি মৌসুম। বর্ষা মৌসুমে যেরূপ বৃষ্টি হয়, তদ্রূপ ওই মহান মাসটিতেও উম্মাতে মুহাম্মদির ওপর অফুরন্ত রহমত ও বরকত নাজিল হয়ে থাকে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলে কারিম (সা.) বলেন: রোজার মাস হলো সহনশীলতা ও সহমর্মিতার মাস। (মুসলিম)। এই পবিত্র মাসে দিনের বেলায় রোজা পালন করার পাশাপাশি যাবতীয় পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা, ধৈর্য ধারণ, সততা ও সদ্ব্যবহার করা, আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযম, রিপু নিয়ন্ত্রণ করা এবং কপটতা, প্রবঞ্চনা, কলহ-কোন্দল, মিথ্যা, গিবত, চোগলখুরি, অশ্লীলতা, অবিচার-জুলুম–অত্যাচার ইত্যাদি বর্জন করা অবশ্য কর্তব্য। হাদিস শরিফে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: প্রত্যেক জিনিসের জাকাত আছে, শরীরের জাকাত রোজায়। (বুখারি ও মুসলিম)। এটা প্রত্যেক সুস্থ সাবালক নর-নারীর ওপর ফরজ। অবহেলা ও অলসতাবশত রোজা পালন না করলে ফাসিক বা পাপাচারি বলে গণ্য হয়, অস্বীকার ও উপহাস করলে ইমান নষ্ট হয়ে যায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাকে দাইনুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর প্রাপ্য বলে উল্লেখ করেছেন। (তাজরিদুল বুখারি)।
ধৈর্য বা সংযম মানবের উত্তম গুণাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্য। ধৈর্য সফলতার চাবিকাঠি। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন: মহাকালের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়। (সূরা আসর, আয়াত: ১-৪)। মানবজীবনে সফলতার জন্য চারটি অপরিহার্য শর্ত—বিশ্বাস, সৎকর্ম, সত্যোপদেশ ও ধৈর্য। হাদিস শরিফে আছে, ধৈর্য হলো গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, ইবাদতের জন্য কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করা, বিপদে বিচলিত না হওয়া। এ প্রসঙ্গে কোরআনুল কারিমে বলা হয়েছে: হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)।
রোজা পালনের দ্বারা ধনীরা ক্ষুধার জ্বালা বুঝতে পারে। গরিবের সঙ্গে সাদৃশ্য সৃষ্টি হয়। বেপরোয়া ভাব দূর হয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের মনোভাব তৈরি হয়। এ মাসের নফল ইবাদত অন্যান্য মাসের ফরজের সমতুল্য এবং এই মাসের একটি ফরজ আমল অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরজের সমতুল্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন: আমার উম্মাতের হিজরত (দেশত্যাগ) হলো রোজা। (ইবনে মারদুইয়া)। নবী কারিম (সা.) আরও এরশাদ করেছেন: হিজরত যেরূপ কষ্টসাধ্য, রোজাও তদ্রূপ কষ্টকর সাধনা। ইবনু উআইনা (রা.) বলেন, রোজাদার পানাহার–কাম-সম্ভোগ ত্যাগ করে বলে তাকে মুহাজির বলা হয়েছে। (রূহুস সিয়াম)।
রোজা পালন মূলত তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি বা পরহেজগারির অসাধারণ শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। কাম-রিপু ও পশুবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার জন্য। এ লক্ষ্য হাছিল করার জন্য ও রোজা কবুল হওয়ার জন্য দৃষ্টি সংযম, সৎ সংকল্প, উত্তম বাক্য, নেক আমল, হালাল জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সুচিন্তা ও একনিষ্ঠ সাধনা থাকা দরকার। তবেই তার যথার্থ ফল পাওয়া যাবে। যদি কেউ ইমানের বলে বলীয়ান হয়ে রোজা রাখে, তাহলে রোজা পালন দ্বারা সাহসিকতা, কুপ্রবৃত্তি দমনে শক্তি সৃষ্টি হবেই।
যারা রোজা করবে আর আত্মশুদ্ধির প্রতি উদাসীন ও গাফিল থাকবে, তাদের রোজা শুধু শুধুই উপবাস থাকা। কেননা, প্রবৃত্তির কামনার যে ভয়াবহতা ও উচ্ছৃঙ্খলতা, যা মানুষকে পশুতে পরিণত করে, সেগুলো বর্জন করা ও রিপুগুলোকে সংযত রাখার শক্তি অর্জনই রোজার অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য প্রয়োজন ১০টি সদ্গুণ অর্জন করা ও ১০টি বদগুণ বর্জন করা। ১০টি বদগুণ যথা—লোভ–লালসা, হারাম, পরনিন্দা ও মিথ্যা অপবাদ, অহংকার, মিথ্যা, খোদপছন্দী, শত্রুতা পোষণ, লোক দেখানো আমল করা, কৃপণতা, পরশ্রীকাতরতা। এ ১০টি মন্দ স্বভাব দূরীভূত না করলে রোজা রাখার লক্ষ্য হাসিল হবে না।
রমজান মাসে ইবাদতের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা অতি সহজ। কোরআন মাজিদে এরশাদ হয়েছে: হে মুমিনগণ! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের ন্যায় সিয়াম তোমাদের জন্য ফরজ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পারো। রোজার অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা! পরিভাষায় উহার অর্থ হলো জাগতিক আরাম-আয়েশ ও সব মানবীয় দুর্বলতা, সব অপবিত্রতা থেকে দেহ ও আত্মাকে রক্ষা করা। এটাই হচ্ছে রোজার মূল তত্ত্ব ও অভীষ্ট লক্ষ্য। অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে: মাহে রমজানে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যে কোরআন মানুষের দিশারি ও হিদায়েতের স্পষ্ট নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী, সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাসকে পায়, তারা যেন সিয়াম পালন করে। (সূরা বাকারা: ১৮৫)।
আমাদের অবশ্যই এ সত্যটি স্মরণ রাখতে হবে যে সহনশীলতা অর্জনের জন্য কেবল উপবাসই যথেষ্ট নয়, তার জন্য চাই আত্মসংযম ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ। তাহলেই রোজা পরিপূর্ণভাবে পালিত হবে। উদ্দেশ্য অজ্ঞাত বা উপেক্ষিত হলে সেখানে অভীষ্টের প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ফলে আমাদের ইবাদত-রিয়াজতের পক্ষে আমাদের ভেতরে ও বাইরে পরিবর্তন সাধন এবং জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করা আদৌ সম্ভবপর হয় না। নবী কারিম (সা.) এরশাদ করেছেন, অনেক রোজাদার এমন আছে, যাদের রোজা দ্বারা ক্ষুধার্ত থাকা ছাড়া আর কিছুই লাভ হয় না। বহু নামাজ আদায়কারী এমন আছে, যাদের জাগ্রত থাকা ব্যতীত অন্য কিছু অর্জন হয় না। যাদের দেহ রোজা পালন করেছে, কিন্তু অন্তর রোজা পালন করেনি। হাদিসে কুদসিতে আছে: মহিমাময় আল্লাহ এরশাদ করেছেন: যার সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আমার নির্ধারিত বিধানের ওপর পরিচালিত না হয়, আমার নিকট তার পানাহার ত্যাগ বা রোজা রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।
ধৈর্য, সহনশীলতা, সমমর্মিতা, আত্মত্যাগ ও সংযম ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অনন্য ভূমিকা পালন করে, যা রোজা পালন করা দ্বারা আমরা সহজে অর্জন করতে পারি।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: প্যানেল খতিব, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম ও জাতীয় ঈদগাহ; যুগ্ম মহাসচিব: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক: আহছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম (খান বাহাদুর আহছান উল্লাহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ)।
[email protected]