
সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সত্যবাদিতা, ন্যায়নীতি, শিষ্টাচার, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, সদাচরণ প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তি বা মানবীয় গুণাবলির সমষ্টি। ইসলাম মানবজাতিকে এসব মহৎ গুণাবলি অর্জনের জন্য আজীবন প্রয়াস চালাতে বিশেষভাবে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
সামাজিক মূল্যবোধ হলো সমাজের ভিত্তি। সমাজজীবনে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আচরণ এবং কর্মকাণ্ড যেসব ইসলামি নীতিমালার আলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাদের সমষ্টিই সামাজিক মূল্যবোধ। জীবনে কোনো প্রকার অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন থাকবে না, মানুষ স্বার্থপরতা-সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত থাকবে—এটি ইসলামের শিক্ষা। সব ধরনের দুর্নীতি থেকে মুক্ত জীবনই আদর্শ জীবন। নীতি থেকে বিচ্যুত জীবন কখনোই আদর্শ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। নবী করিম (সা.) মানবজাতিকে অন্যায় প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখ, তাহলে সে যেন তার শক্তি দ্বারা তা প্রতিহত করে, যদি সে এতে অক্ষম হয়, তবে মুখ দ্বারা নিষেধ করবে, যদি সে এতেও অপারগ হয় তবে সে অন্তর দ্বারা ঘৃণা পোষণ করবে।’ (মুসলিম)
বর্তমান সমাজে নানা রকম দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটায় নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটছে। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে দুর্নীতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কোনো প্রকার অন্যায়ই যেন অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না। নীতিভ্রষ্ট মানুষ নিজেকে অপরাধী বা হীন বলে গণ্য করে না। দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্তশালী হয়েও সংকোচবোধ করে না বরং অর্থের অহংবোধে গৌরবান্বিত হয়। সমাজে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন ও আত্মসাতের প্রতিযোগিতা চলছে। সীমাহীন দুর্নীতি সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে সমাজজীবনকে কলুষিত করে ফেলছে। অথচ পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯)
সামাজিক ঐক্য ও নিরাপত্তা বিধানে এবং একটি সংঘাতমুক্ত গঠনমূলক আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে মাহে রমজান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।রমজান মাসে কঠোর সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদার ব্যক্তিরা অপরের বদনাম ও কূটনামি থেকে বিরত থাকেন। তাঁরা সকল প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, ফিতনা-ফ্যাসাদ, অযথা বাগ্বিতণ্ডা ও যাবতীয় খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকেন। তাঁদের মুখ থেকে কোনো প্রকার অশ্লীল কথা বের হয় না। নবী করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোনো দিন রোজা রাখে তখন তার মুখ থেকে যেন কোনো রকম খারাপ কথা ও শোরগোল বের না হয়। যদি কেউ তাকে গালিগালাজ করে বা ঝগড়া-বিবাদে প্ররোচিত করতে চায়, তখন সে যেন বলে, ‘আমি রোজাদার ব্যক্তি।’ (বুখারি)
সামাজিক মূল্যবোধ মানুষের প্রতি সাহায্য ও সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে। ফলে সমাজের মধ্যে মানববন্ধন গভীর হয়, মানুষের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হয়। দেশের জন্য ভালোবাসা জন্মে। সামাজিক মূল্যবোধ মানুষের প্রতি সদাচরণ করতে শেখায়, জীবনে শৃঙ্খলা আনে এবং মানুষকে পরিপূর্ণ হতে সাহায্য করে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের অভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা বা অসংগতি বৃদ্ধি পায়। পরমতসহিষ্ণুতা ও সহনশীলতার অভাবে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ প্রভৃতি অনাচারের ফলে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়। বিশ্বনবী (সা.)-এর চরিত্রের অন্যতম ভূষণ ছিল ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘সহনশীলতা অপেক্ষা অধিক উত্তম ও অত্যধিক কল্যাণকর বস্তু আর কিছুই কাউকে দান করা হয়নি।’ (বুখারি)
>রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কঠোর ত্যাগ, উদারতা, সততা, ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ মাসটি ধৈর্য অবলম্বনের মাস
রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কঠোর ত্যাগ, উদারতা, সততা, ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ মাসটি ধৈর্য অবলম্বনের মাস। ধৈর্যধারণের বিনিময়ে নির্ধারিত রয়েছে অতুলনীয় শান্তির আবাস বেহেশত। তাই এ মাসটির পরিচয় তুলে ধরে ধৈর্য ও সবরের গুরুত্ব প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এটা ধৈর্যের মাস, আর সবরের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।’ (মিশকাত) সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ধৈর্য ও সহনশীলতার যে মানবিক গুণটি অর্জিত হয়। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জিত সহনশীলতা তাই শুধু ব্যক্তিগত কল্যাণই বয়ে আনে না বরং মুসলমান সমাজের জন্য একটি দলগত কল্যাণ বয়ে আনে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘ধৈর্যশীলদের তো অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে।’ (সূরা আল-জুমার, আয়াত: ১০)
দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য জাতীয় জীবন থেকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সমাজের সর্বস্তর থেকে সর্বপ্রকার দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে সুদক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম-দেশাত্মবোধ জাগ্রত করতে হবে। ইসলামের সর্বজনীনতা মেনে নিয়ে ধর্মীয় বিধিবিধান ও অনুশাসনকে রোজাদারদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা হলেই সমাজ থেকে যাবতীয় অনৈতিকতা দূর হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।