রমজান মাস তাহাজ্জুদের শ্রেষ্ঠ সময়

.
.

পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারিত নফলের মধ্যে তাহাজ্জুদ সর্বোৎকৃষ্ট আমল। হজরত আলী (রা.) বলেছেন: ‘যাঁরাই ইবাদতে আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ঊর্ধ্বারোহণ করেছেন; তাঁরাই রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়েছেন।’ (দিওয়ানে আলী, নাহজুল বালাগা)। তাই তাহাজ্জুদ হলো মোক্ষ লাভের মোক্ষম মাধ্যম। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘ফরজ নামাজসমূহের পর উত্তম নামাজ হলো রাতের তাহাজ্জুদ।’ (মুসলিম, আলফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৯৭, হাদিস: ৪০৫)।

মধ্যরাতের পরে বা রাতের দুই-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলে তাহাজ্জুদ নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয়। রাত দুইটার পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত। সাহ্‌রির সময় শেষ হলে তথা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শেষ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জমানায় তাহাজ্জুদের জন্য আলাদা আজান দেওয়া হতো। এখনো মক্কা ও মদিনা শরিফে এই নিয়ম প্রচলিত আছে।

তাহাজ্জুদ একাকী পড়াই উত্তম; জামাতে পড়া অনেক মুজতাহিদ ফকিহ মকরুহ বলেছেন। তাই অন্য সব সুন্নত ও নফলের মতো তাহাজ্জুদ নামাজের কিরাআতও সিররি; অর্থাৎ তাহাজ্জুদে সুরা কিরাআত নিম্ন স্বরে পড়তে হয় এবং এর জন্য ইকামাতেরও প্রয়োজন হয় না।

নফল ইবাদত বিশেষ উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন ছাড়া গোপনে করাই বাঞ্ছনীয়। তবে ‘তাহাজ্জুদ অন্ধকারে পড়তে হয়’ বা ‘তাহাজ্জুদ পড়লে জিন আসে’ অথবা ‘তাহাজ্জুদ শুরু করলে নিয়মিত আদায় করতে হয়’ এসব ভুল ধারণা। তবে কারও ঘুমের ব্যাঘাত যেন না হয় এবং প্রচারের মানসিকতা যেন না থাকে; এ বিষয়ে যত্নশীল ও সতর্ক থাকতে হবে। তাহাজ্জুদ নিয়মিত আদায় করতে পারলে তা অতি উত্তম।

নফল নামাজে কিরাআতে তিলাওয়াতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি নয়। নফল নামাজে রুকু, সিজদাসহ প্রতিটি পর্ব দীর্ঘ করা সুন্নত ও মোস্তাহাব। এ জন্য রুকু ও সিজদায় তাসবিহ অনেকবার পড়া যায় এবং অন্যান্য পর্বেও বেশি পরিমাণে বিভিন্ন দোয়া (যা কোরআন-হাদিসে আছে) পাঠ করা যায়।

নফল নামাজ এক সালামে তথা এক নিয়তে দুই রাকাত, চার রাকাত, ছয় রাকাত ও আট রাকাত বা আরও বেশি পড়া যায়। তবে দিনের বেলায় এক নিয়তে চার রাকাত ও রাতের বেলায় এক নিয়তে আট রাকাতের অধিক না পড়াই উত্তম; আর দুই দুই রাকাত করে আদায় করা সর্বোত্তম।

এক তাহরিমায় তথা এক নিয়ত ও এক সালামে দুইয়ের অধিক রাকাত নফল নামাজ পড়লে, প্রতি দুই রাকাত অন্তর ‘আত্তাহিয়্যাতু’ এরপর দরুদ শরিফ ও দোয়া মাছুরা পড়তে হবে এবং শুধু সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়াবে। তবে পরবর্তী দুই রাকাতের শুরুতে ‘সানা’ (সুবহানাকা) পড়া লাগবে না। তাহাজ্জুদের কিরাআত হলো সবচেয়ে দীর্ঘ। এই নামাজে যত ইচ্ছা দীর্ঘ কিরাআত পাঠ করা যায়। এতে রাকাত দীর্ঘ করার জন্য এবং তিলাওয়াতের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য একই রাকাতে বিভিন্ন সুরা ও বিভিন্ন আয়াত পড়া যায় এবং একই রাকাতে একই সুরা বারবার পড়া যায়।

নবীজি (সা.) সব সময় তাহাজ্জুদ পড়তেন। কোরআনুল করিমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-এর উদ্দেশে বলেন: ‘এবং রাত্রির কিছু অংশ তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, ইহা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমুদে)।’ (আল কোরআন, সুরা-১৭ [৫০] আল ইসরা-বনি ইসরাইল, রুকু: ১৬/২২, আয়াত: ৭৯, পারা: সুবহানাল্লাহজি-১৫, পৃষ্ঠা: ২৯০/৮)। ‘হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রিতে দণ্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশি এবং কোরআন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে। আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাত্রিতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। নিশ্চয় দিবাভাগে রয়েছে আপনার দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। আপনি আপনার পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন এবং একাগ্রচিত্তে তাতে মগ্ন হোন। (আল কোরআন, সুরা-৭৩ [৩] আল মুজাম্মিল, রুকু: ১/১৩, আয়াত: ১-৮, পারা: তাবারাকাল্লাজি-২৯, পৃষ্ঠা: ৫৭৭/১৫)। ‘হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন। অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দেবেন না। এবং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে সবর করুন। (আল কোরআন, সুরা-৭৪ [৪] আল মুদ্দাচ্ছির, রুকু: ১/১৫, আয়াত: ১-৭, পারা: তাবারাকাল্লাজি-২৯, পৃষ্ঠা: ৫৭৯/১৭)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘আল্লাহ তাআলা সেই স্বামীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়েন এবং তাঁর স্ত্রীকে জাগান। যদি তিনি উঠতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁর মুখমণ্ডলে পানির ছিটা দেন। আল্লাহ তাআলা সেই স্ত্রীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়েন এবং তাঁর স্বামীকে জাগান। যদি তিনি উঠতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁর মুখমণ্ডলে পানির ছিটা দেন। (আবু দাউদ ও নাসায়ি, আলফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৯৭, হাদিস: ৪০৭)।

তাহাজ্জুদের আগে-পরে কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করা যারপরনাই উপকারী আমল। এ সময় সুরা মুজাম্মিল, সুরা মুদ্দাচ্ছির, সুরা মুলক, সুরা ওয়াকিআহ, সুরা দুখান, সুরা আর রহমান, সুরা ইয়াসিন, সুরা হাশর ও সুরা কাহাফ এবং অন্যান্য
সুরা তিলাওয়াত করা অত্যন্ত বরকতময় ও ফলপ্রসূ। এটি দোয়া কবুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দার ফরিয়াদ শোনেন। 

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।