অপরিণত শিশুর জীবন বাঁচাতে, একসাথে করি কাজ আগামীর পথে

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

মোহাম্মদ সহিদুল্লা

চেয়ারম্যান, নবজাতক বিভাগ, বিএসএমএমইউ। সভাপতি, জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি, কোভিড-১৯

তাহমিনা বেগম

প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরাম

মো.শামসুল হক

লাইন ডিরেক্টর, এমএন-সিএএইচ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

মোহাম্মদ শরীফ

পরিচালক (মা ও শিশুস্বাস্থ্য) ও লাইন ডিরেক্টর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

সামিনা চৌধুরী

প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ধাত্রী ও গাইনোকোলজি সোসাইটি (ওজিএসবি)

জিয়াউল মতিন

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক (এমএন-সিএএইচ), ইউনিসেফ

শামস এল আরেফিন

সিনিয়র ডিরেক্টর, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, আইসিডিডিআর,বি

মুহাম্মদ শরিফুল ইসলাম

প্রোগ্রাম ম্যানেজার, এনএনএইচপি ও আইএমসিআই, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

ফারহানা আক্তার

প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট (মাতৃস্বাস্থ্য), অফিস অব পপুলেশন, হেলথ, নিউট্রিশন অ্যান্ড এডুকেশন, ইউএসএআইডি, বাংলাদেশ

মোমেনা খাতুন

হেলথ টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট, এফএসএস গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা

উম্মে সালমা জাহান মীনা

চিফ অব পার্টি, ইউএসএআইডির ‘মামনি’ মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন প্রকল্প (মামনি এমএনসিএসপি), সেভ দ্য চিলড্রেন

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

সন্তান ধারণের ৩৭ সপ্তাহের আগে শিশুর জন্ম হলে তার কিছু সমস্যা হয়। শরীর গঠনে কিছু অপূর্ণতা থাকা, শ্বাসকষ্ট হওয়া ও মস্তিষ্ক গঠনে কিছু অপূর্ণতা থেকে যেতে পারে। এমনকি খুব আগে জন্মালে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সুতরাং আমাদের একটা বড় কাজ হচ্ছে যে কোনো শিশু যেন অন্তত ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্মগ্রহণ না করে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুর জন্য অন্তত দুটি বিষয় নিশ্চিত করা উচিত। প্রথমত গর্ভবতী মায়ের প্রতি বেশি যত্ন নিতে হবে। তাঁর খাওয়াদাওয়া, বিশ্রাম,এমনকি মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে। সারা দিন শুয়ে–বসে থাকবেন, তা নয়। স্বাভাবিক কাজকর্ম করবেন। কোন কাজগুলো ঝুঁকিপূর্ণ, তা কোনো চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিলে ঝুঁকি কমে যাবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সন্তানসম্ভবা মায়ের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এখন গ্রাম পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি ও এনজিওর উদ্যোগে অনেকগুলো ব্যবস্থা হয়েছে। সেগুলো যদি আমাদের হাতের কাছে থাকে এবং শিশু জন্মের আগে–পরে অন্তত চারবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিই, তবে অনেকটা এগিয়ে যেতে পারব। সরকারি, বেসরকারি এবং এনজিও সবাই মিলে কাজ করলে শিশুর স্বাভাবিক জন্ম নিশ্চিত করা যাবে। এসব বিষয়ে আজকের আলোচনা হবে।

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ সহিদুল্লা

default-image

সারা পৃথিবীতে দেড় কোটি অপরিণত শিশুর জন্ম হয়। এর মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ শিশু মারা যায়। প্রতি ১০টি নবজাতকের ১টি অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়। নবজাতকের মোট মৃত্যুর ৩৫ শতাংশ মারা যায় অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া ও এর জটিলতা থেকে। এটা হলো বৈশ্বিক অবস্থা।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার অপরিণত শিশু জন্ম নেয়। অপরিণত অবস্থায় জন্মানোর কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সের ২৩ হাজার ৬০০টি শিশুর মৃত্যু হয়। অপরিণত অবস্থায় জন্মানো বেঁচে যাওয়া শিশুরা নানা রকম জটিলতায় ভুগতে পারে। অন্ধ, বধির ও মস্তিষ্কের সমস্যা হতে পারে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় উপহার নবজাতক। কিন্তু নবজাতকটি যদি অপরিণত হয়, তখন বুকে কাঁপন লাগে।

আর ১০ বছর পরই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) পৌঁছাতে হবে। এ জন্য নবজাতকের মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ১২ জনে নামিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে নবজাতকের মৃত্যু প্রতি হাজারে প্রায় ২৮ জন। এটা খুব সহজ কাজ নয়। এখন অপরিণত শিশুর জন্ম ঠেকানোর উপায় কী? আমরা জানি, ১৮ বছরের পর বিয়ে ও ২০ বছরের পরে মা হলে ভালো হয়। অল্প বয়সে মা হলে অপরিণত জন্ম নিতে পারে। এটা ঠেকানোর জন্য প্রথমত মানসম্পন্ন শিশু জন্ম–পূর্ব যত্ন (আন্টিন্যাটাল) নিতে হবে। মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। মায়ের মাধ্যমে ভ্রূণ (ফিটাস) পুষ্টি পাবে। ম্যাটারন্যাল ইনফেকশনের স্ক্রিনিং ও ট্রিটমেন্ট। মায়ের ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেশার থাকলে, সেটার ব্যবস্থাপনা। অপরিণত শিশু জন্ম কমাতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারব না।

অপরিণত শিশু মারা যায় কেন? তার শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই ঠান্ডা হয়ে মারা যেতে পারে। তাদের আমরা ঠিকমতো খাওয়াতে পারি না। তাদের সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি। কখনো তাদের এত শ্বাসকষ্ট হয় যে ভেন্টিলেটর পর্যন্ত লাগে এবং অনেক সময় বাঁচানো যায় না। এ ছাড়া জন্মগত ত্রুটিও কারণ। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ কী? এখানে বেশ কিছু কাজ আছে যেগুলো করলে আমরা উপকার পাব। একটি হলো এত কিছুর পরও যে অপরিণত নবজাতকের জন্ম দিতে যাচ্ছে তাঁকে আন্টিন্যাটাল কর্টিকসটেরোইডস দিলে সেই শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকে। আরেকটি হলো অপরিণত শিশুর জন্ম হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার খুব কার্যকর। এটা হলো মায়ের দুই স্তনের মাঝে ত্বকের কাছাকাছি নবজাতককে রাখা।

২০৩০ সালের মধ্যে আমদের কী দরকার? একটা হলো দক্ষ ধাত্রীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। দক্ষ ধাত্রীর সংখ্যা এখন হয়তো ৫২ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু এটাকে ৯২ শতাংশে নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ৮টি শিশু জন্ম–পূর্ব সেবা নিতে বলে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের জন্য চারটা শিশু জন্ম–পূর্ব সেবা নিতে বলেছি। যেন চারটা শিশু জন্ম–পূর্ব সেবা ঠিকমতো পায়। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটা হাসপাতালে যেন নবজাতক ও অপরিণত শিশুর সেবার ব্যবস্থা থাকে, তা নিশ্চিত করা দরকার।

জিয়াউল মতিন

default-image

উপস্থাপনায় দুটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একটা হলো প্রতিরোধ। অর্থাৎ অপরিণত নবজাতক যেন না জন্মায়, সে জন্য কিছু ব্যবস্থা আছে। আর যদি নবজাতক অপরিণত অবস্থায় জন্মায়, সে জন্যও কিছু ব্যবস্থা আছে। আলোচনায় অনেকগুলো বিষয় এসেছে। বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য, কিশোর স্বাস্থ্য, গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে নবজাতককে প্রদেয় সেবার কথা এসেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ করে এনএনএইচপি ও আইএমসিআই ২০০৯ সালে জাতীয় নবজাতক কর্মকৌশল প্রণয়ন করেছিল। ২০০৯ সালের পরে আমরা অনেক বছর পার করেছি। এর মধ্যে অনেক নতুন বিষয় (এভিডেন্স) এসেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কিছু পরামর্শ রয়েছে।

আন্টিন্যাটাল কর্টিকসটেরোইডস ও ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ারের (কেএমসি) কথা বলা হয়েছে। যেটা খুবই কার্যকর ও সাশ্রয়ী। ক্যাঙারু মাদার কেয়ারের মাধ্যমে খুব সহজে বেশিরভাগ অপরিণত শিশুর যত্ন নেওয়া যায়। এনএনএইচপি ও আইএমসিআইয়ের (ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব চাইল্ডহুড ইলনেস) কর্মসূচিতে এ সবই বলা আছে। কিন্তু সারাদেশের প্রত্যেকটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ সেবাগুলো এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কেএমসি, আন্টিন্যাটাল কর্টিকসটেরোইডস এ সেবাগুলো নিশ্চিত করতে যথেষ্ট বরাদ্দ যেন থাকে।

ইতিমধে্য ৪২টি জেলায় স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট (এসসিএএনইউ) করা হয়েছে। এখনো ৬৪ জেলায় এ সেবা চালু করা হয়নি। এগুলো অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কর্মপরিকল্পনায় যথেষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে। এ সেবাগুলোর প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বিশেষ করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও কমিউনিটি পর্যায়ে তদারকি ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য লোকবল বহুলাংশে বাড়ানো দরকার। অপরিণত নবজাতকের যথেষ্ট তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিশেষ করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের তথ্যগুলো ঠিকমতো আসছে না। এদিকে আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন। হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমকে (এইচএমআইএস) শক্তিশালী করতে হবে।

আমাদের পরিবার, কমিউনিটি ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। এটা আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এখন অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতায় ক্যাঙারু মাদার কেয়ারের মতো সহজ পদ্ধতি সারা দেশে নিয়ে যেতে পারি।

বিজ্ঞাপন

ফারহানা আক্তার

default-image

অপরিণত নবজাতকের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচিউরিটি (আরওপি)। নবজাতক যখন অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়, তখন নবজাতকের চোখের রেটিনায় রক্ত সঞ্চালনের প্রক্রিয়া সঠিকভাবে তৈরি না হওয়ার ফলে রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচিউরিটি দেখা দিতে পারে। এ জন্য প্রত্যেক অপরিণত নবজাতকের আরওপি শনাক্ত করা উচিত। এ ছাড়া অনেক সময় অপরিণত শিশুদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে সেবাদানকারীদের অসচেতনতার কারণে আরওপি হতে পারে। অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থাপনায় অক্সিজেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নবজাতকের চিকিৎসায় অক্সিজেন যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিণত শিশুকে সর্তক মাত্রায় বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা প্রয়োজন ছাড়া প্রতিষেধক হিসেবে অক্সিজেন দিলে রেটিনোপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই রোগ হলে শিশুর চোখে নানা সমস্যা দেখা দেয়। যেমন চোখ সাদা হয়ে যাওয়া, চোখে ঠিকমতো দেখতে না পাওয়া এবং অনেক সময় শিশু অন্ধও হয়ে যেতে পারে। হাসপাতালে রেটিনোপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে হলে সঠিক ব্যবস্থাপনায় অক্সিজেন দিতে হবে। এ জন্য আমাদের ২৪ ঘণ্টা দক্ষ নার্স ও চিকিৎসকের উপস্থিতি দরকার।

পালস অক্সিমিটারের মাধ্যমে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা তদারকি করা ও অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
হাসপাতালগুলোতে চক্ষুবিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচিউরিটি (আরওপি) শনাক্তের কার্যকর পদ্ধতি চালু করার প্রয়োজন আছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত আরওপি শনাক্তের ব্যবস্থা কম। এ ছাড়া সেবাদানকারীদের মধ্যে রেটিনোপ্যাথি সম্পর্কে ধারণা ততটা নেই। তা ছাড়া শিশু বিভাগে সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট ও চক্ষু বিভাগের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। সবার চেষ্টা ছাড়া এ কাজগুলো করা সম্ভব না।

শামস এল আরেফিন

default-image

এ কৌশলগত আলোচনাগুলো সঠিক সময়ে ও নিয়মিত হওয়া উচিত। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, মাতৃকালীন সংক্রমণ ও গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের অর্জন খুব কম। এসব কারণে মাতৃমৃত্যু এখনো অনেক বেশি। এসব জায়গায় কী ব্যবস্থা নিলে অপরিণত শিশু ও মাতৃমৃত্যু ঠেকানো যাবে, তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। নবজাতক জন্ম–পূর্ব সেবার (অ্যান্টিনেটাল কেয়ার) যত পদক্ষেপ আছে সব সরকারি সেবাদাতাদের নিয়ে। বাংলাদেশে দক্ষ সেবাদাতা হতে শিশু জন্ম–পূর্ব সেবা নেওয়া বেড়েছে। এর বেশির ভাগ বেড়েছে বেসরকারি খাতে। কিন্তু এ মুহূর্তে বেসরকারি খাতের সেবাদাতাদের সঙ্গে আমাদের সে রকম সংযুক্ততা নেই যে আমরা বলতে পারি বেসরকারি সেবা খাত ঠিকমতো সেবা দিচ্ছে।

যদি না দিয়ে থাকে তবে ডায়াবেটিস, মাতৃকালীন সংক্রমণ, হাইপারটেনশনসহ যেসব কারণ এসেছে, সেসব কমাতে পারব না। অপরিণত শিশুমৃত্যু কমাতে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) একটি বড় পদক্ষেপ। কেএমসি কর্মসূচিতে আমাদের অনেক অর্জনও আছে। আমাদের লক্ষ্য হলো ২০২২ সালের মধ্যে ২৭০টি কেএমসি সেবা চালু হবে। এ মুহূর্তে ২০০টির মতো কেএমসি সেবা সচল। প্রশ্ন হলো, এগুলো ঠিক যেভাবে চাইছি সেভাবে কি সচল আছে? ২৭০টি কেএমসি সেবা কি যথেষ্ট? বছরে ৪ লাখ ৩৯ হাজার অপরিণত শিশুর জন্য কয়েক গুণ বেশি কেএমসি লাগবে।

মুহাম্মদ শরিফুল ইসলাম

default-image

প্রায় ৫০ শতাংশ শিশুর ডেলিভারি বাড়িতেই হয়। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অপরিণত অবস্থায় জন্মানো শিশু যেন যথাযথ কেএমসি সেবা পায়, সে জন্য আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আমাদের লক্ষ্য ছিল ২০২২ সালের মধ্যে সারা দেশে ২০০টি কেএমসি সেবাকেন্দ্র চালু করা। কিন্তু ইতিমধ্যে আমরা ১৯২টি কেএমসি সেবাকেন্দ্র চালু করতে পেরেছি, যেটা ২০২২ সালের জুনে চালু করার কথা ছিল। এটা আরও সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিচ্ছি। এ বছর যে সংশোধিত কর্মপরিকল্পনা হলো, সেখানে আমরা ২৭০টি কেন্দ্রে কেএমসি সেবা চালু করতে চাইছি। কেএমসি সেবা চালু করার ক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, এটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী পদক্ষেপ। এ সেবা ঠিকমতো চালু করার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে দুটি করে হাসপাতাল শয্যা সংরক্ষিত রাখতে হবে।

এ ছাড়া প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুজন চিকিৎসক, দুজন নার্স ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপককে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর তাঁরা যেন তা কাজে লাগান, সেটাও দেখতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অপরিণত শিশুর সেবাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু কাজের সময় তাদের অন্য ওয়ার্ডে দায়িত্ব পড়ে। যিনি অপরিণত শিশু সেবাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিলেন, তিনি হয়তো গাইনি বা অন্য কোনো ওয়ার্ডে বদলি হয়ে গেলেন। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এ সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। আরও বেশি চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রী প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করছি।

আমদের জন্য একটা সুখবর হলো ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিডওয়াইভস নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সরাসরি ডেলিভারির সঙ্গে যুক্ত। তাই তাঁদের নবজাতকের সেবা ও পরিচর্যা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দিলে উপকার মিলবে। আমাদের পরিকল্পনা হলো আমরা সব মিডওয়াইভসকে প্রশিক্ষণ দেব। এ ক্ষেত্রে সরকারি–বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও এগিয়ে আসতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সামিনা চৌধুরী

default-image

অপরিণত শিশু যেন না হয়, হলে কী পরিণতি এবং কী করতে হবে, সেসব নিয়ে আজ খুব চমৎকার একটা ওয়েবিনার হয়েছে। এটা প্রতিরোধ করা খুবই জরুরি। প্রতিরোধে শুধু শিশু জন্ম–পূর্ব যত্ন (অ্যান্টিনেটাল কেয়ার) নিয়ে কাজ করব, তা না। তার আগে থেকেই আমাদের এ বিষয়ে কাজ করতে হবে। সন্তান নেওয়ার আগেই শারীরিক সুস্থতা জেনে নিতে হবে। এটা হলো লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচ। যেমন মায়ের যদি রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) থাকে, তবে অপরিণত শিশুর জন্ম হতে পারে।

এর সঙ্গে হাইপারটেনশন থাকলে তা মাতৃমৃত্যুর কারণ হতে পারে। ডায়াবেটিস থাকলেও সমস্যা হতে পারে। কাজেই গর্ভধারণের আগেই মাকে সুস্থ শরীরে থাকতে হবে। তাঁর যদি পুষ্টি ঘাটতি থাকে, সেটা আমরা পূরণ করব। এ ক্ষেত্রে আমরা কিছু ওষুধের পরামর্শ দিই।

গর্ভবতী হওয়ার কমপক্ষে তিন মাস আগে থেকে ফলিক অ্যাসিড বড়ি সেবন করতে হবে। ফলিক অ্যাসিড হলো এক ধরনের ভিটামিন, যা শাকসবজিতে বেশি পাওয়া যায়। তাই এ ধরনের খাদ্যাভ্যাসে আমরা পরিবারকে উৎসাহিত করি। এরপর গর্ভবতী হলে কী করণীয়?

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চারটি অ্যান্টিনেটাল কেয়ার (শিশু জন্মের পূর্ববর্তী সময়ে নেওয়া সেবা) নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আটবার এ সেবা নেওয়ার কথা বলেছে। এই হিসেবে কোভিডকালে আমরা নির্দেশিকা তৈরি করেছি। সেখানে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী চারটি অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের সঙ্গে অনলাইনে আরও চারটি অ্যান্টিনেটাল কেয়ার দেওয়ার কথা বলেছি। কোভিডকালে এটার গুরুত্ব অপরিসীম।

মার্চ থেকে আমরা শুরু করেছিলাম। শুধু ছয় মাসে কমপক্ষে সাড়ে তিন লাখ মা ও নারীকে চিকিৎসা দিয়েছি। আমাদের প্রতিটি শাখার সবার টেলিফোন নম্বর অনলাইনে দেওয়া হয়েছে। এ সময় তাঁরা আমাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন। এ সময় সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা দরকার।

৩৫ সপ্তাহের আগে অথবা শিশুর ওজন দুই কেজির কম হলে তাকে ৩০ দিনের মধ্যে অবশ্যই চোখের স্ক্রিনিং করতে হবে, যেন শিশুর রেটিনোপ্যাথি না হয়। আর যদি শিশুর ওজন ১২০০ গ্রাম বা জন্ম ২৮ সপ্তাহের মধ্যে হয়, তবে ২০ দিনের মধ্যে চোখের স্ক্রিনিং করতে হবে।

মোমেনা খাতুন

default-image

উন্নয়ন সংস্থাগুলো সব সময়ই সরকারের সহায়ক সহযোগী হিসেবে কাজ করে। সরকারই হলো এর চালক। একটা সময় প্রকল্প শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সরকারের উদ্যোগ থেকে যায়। তাই এসব প্রকল্প হতে যেসব শিক্ষামূলক ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম আসে, সেগুলো সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। সে ক্ষেত্রে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার, প্রয়োজনীয় শিশুসেবাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। সরকার অবশ্যই এর সঙ্গে জড়িত। একসাথে করি কাজ আগামীর পথে। একসঙ্গে করতে হলে চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক ও বাস্তবায়নকারীদের সঙ্গে পরিবারকে যুক্ত করতে হবে। অপরিণত শিশু কেন জন্ম নেয়, সে সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। মানুষের মধ্যে বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে সন্তান নেওয়া প্রভৃতি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমাজ ও গণমাধ্যম যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। ২৭০টি ক্যাঙারু মাদার কেয়ার সেবা চালু করার লক্ষ্য কেবল একটি সংখ্যা। কীভাবে এ সেবা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে ভাবলে হবে না। অনেকগুলো প্রশিক্ষণ হয়েছে। এগুলো টেকসই করতে প্রশিক্ষণ–পরবর্তী ফলোআপ জরুরি।

মোহাম্মদ শরীফ

default-image

অপরিণত শিশুর জন্মহার বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহ রোধসহ এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এনসিআরএস কার্যক্রম থেকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪/৭ নরমাল ডেলিভারির ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছি। এটা গত তিন বছরে সারা দেশে প্রায় ৩৮০টি উপজেলায় শেষ করেছি। অর্থাৎ এখানে অনেক বেশি কাজ হয়েছে। এনজিও, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিক—সবাইকে নিয়ে এসব কর্মসূচি করার পরে অনেক সাড়া পড়েছে। এখানে বাল্যবিবাহ কমানোর জন্য কথা বলতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর একসময় শুধু পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করত। এখন মা ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে জোরেশোরে কাজ করছে। সহিদুল্লা সাহেব ‘হেল্প বেবি ব্রিদ’ নামে একটা কর্মসূচির মাধ্যমে ন্যূনতম রিসোর্স ব্যবহার করে ন্যূনতম দক্ষতার সেবাকর্মীদের দিয়ে কীভাবে শিশুদের শ্বাসকষ্ট বন্ধ ও অপরিণত শিশুদের চিকিৎসা করানো যায়, তা দেখিয়ে দিয়েছেন। এ প্রশিক্ষণগুলো আমরা সব পর্যায়েই দিয়েছি। গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে, তাহলে গর্ভের সন্তান সুস্থ থাকবে। মা বেশি খেলে গর্ভের শিশু বড় ও মোটা হবে, এই ভয়ে আমাদের দেশে অনেকে ঠিকমতো খেতেন না। তা ছাড়া আগে আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ভালো ছিল না। গত ১০ বছরে তা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। মায়ের পুষ্টির ব্যাপারে আমরা উৎসাহিত করছি। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে কেন্দ্রগুলোতে আয়রন ফলিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট পর্যাপ্ত পরিমাণে দিচ্ছি।

মো. শামসুল হক

default-image

অপরিণত শিশু জন্মহার ঠেকানোর দুটো জায়গা। একটা হলো প্রতিরোধমূলক, আরেকটা জন্ম–পরবর্তী চিকিৎসাসেবা। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে অনেক সুযোগ আছে। যেমন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বাল্যবিবাহ রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকারও বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে আইন করেছে। শুধু একটা হাসপাতালে যদি স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট থাকে এবং অন্যগুলোতে না থাকে, তাহলে তো হবে না। আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনবল সমস্যা। লজিস্টিকসের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ বছর আগে যে সমস্যাগুলো ছিল, এখন সেগুলো একেবারেই নেই। এখন উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ওষুধপত্র বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির জন্য তাদের কারও মুখাপেক্ষী হতে হয় না। তাদের বরাদ্দ দিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তারা প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনতে পারে।

উম্মে সালমা জাহান মীনা

default-image

বিশ্বের অনেক দেশই কেএমসি–বিষয়ক প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশেও কিছুটা সে রকম হয়েছে। অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া শিশুদের বেঁচে থাকা ও বিকাশের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে সক্রিয় ফলোআপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ। বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রায় এক দশক ধরে কেএমসি সেবা দিয়ে এলেও বাংলাদেশের ক্যাঙারু মাদার কেয়ারের ধারণা তুলনামূলকভাবে নতুন। বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘আ প্রমিজ রিনিউড’ নামে একটি অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেছে ২০৩৫ সালের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার ২০–এ কমিয়ে আনার জন্য। এই অঙ্গীকারের মাধ্যমে নবজাতকের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত ওজনের চেয়ে কম এবং অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া নবজাতকের যত্নে কেএমসিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সারা দেশে দাতাগোষ্ঠী, উন্নয়ন সংস্থা ও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কেএমসি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৪ সালে কেএমসি প্রবর্তনের জন্য উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স ও তার ওপরের স্তরের হাসপাতালের জন্য জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। পরবর্তীকালে কেএমসি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ও অন্যান্য সহায়ক উপকরণ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দেশের বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেও কেএমসি সেবা প্রদান সম্ভব। এখন প্রয়োজন একটি নির্ধারিত কেএমসি কর্নার ও রিপোর্টিং সিস্টেম কার্যকর করা। কেএমসি সেবা প্রদানে মায়ের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত এবং সেবার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক নিশ্চিত করতে হবে।

কেএমসি কর্নারে প্রশিক্ষিত ও নিবেদিত সেবাদানকারী নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় কেএমসি প্রটোকল অনুযায়ী হাসপাতাল থেকে বাড়িতে যাওয়ার পর দুটি নির্ধারিত ফলোআপের পদ্ধতি অবশ্যই অনুসরণ করা প্রয়োজন। ডিসচার্জের পর শিশুকে প্রতি সপ্তাহে একবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে ফলোআপের জন্য, যেখানে কেএমসি সেবা রয়েছে।

এটি করতে হবে যত দিন না শিশু ৪০ সপ্তাহের গর্ভকালীন বয়সে পৌঁছায় বা ২ হাজার ৫০০ গ্রাম ওজনের না হয়। এ ছাড়া কোনো জরুরি অবস্থা দেখা দিলে তখনই তাকে কেএমসি সেবাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। অপর দিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার তিন দিনের মধ্যে প্রথম, আট দিনের মধ্যে দ্বিতীয় ও ছয় সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় পরিদর্শন করে বাড়িতে শিশুর অবস্থা নির্ণয় করবেন। সেভ দ্য চিলড্রেনের মামনি প্রকল্প ১০ জেলায় ও ইমপ্রুভিং নিউবর্ন সারভাইভাল প্রজেক্টের মাধ্যমে শহর পর্যায়ে সরকারের অপরিণত ও অসুস্থ নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগে কৌশলগত সহায়তার পাশাপাশি অনেক কেন্দ্রেই কেএমসি কর্নার প্রতিষ্ঠা ও স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট স্থাপনের পাশাপাশি সচল রাখার জন্য সহায়তা করে যাচ্ছে।

তাহমিনা বেগম

default-image

বাংলাদেশে নবজাতকের চিকিৎসার গুণগত মান বাড়ানো ও নবজাতকদের নিয়ে গবেষণা করার উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরাম (বিএনএফ) ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল। এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা নবজাতক বিশেষ করে অপরিণত শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। বিএনএফ অন্যান্য খাতের নার্স ও চিকিৎসকদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুহার কমাতে আমরা চেষ্টা করছি। প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার অপরিণত শিশু মারা যাচ্ছে। তাদের জন্য সেবাটা অনেকটা শহরকেন্দ্রিক। গ্রামে জন্মানো নবজাতকদের ঠিকমতো সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। প্রায়ই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কম ওজনের শিশুদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আনতে দেখা যায়, এটা অত্যন্ত বেদানাদায়ক।

এটা থেকে বের হতে স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিটের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সবাই কেএমসি সেবার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আশা করছি প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেএমসি সেবা ছড়িয়ে দিতে পারব। অপুষ্টিতে আক্রান্ত মা অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেন। বাল্যবিবাহ যেন কোনোভাবে না হয়। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো তাঁর এলাকায় যেন কোনো বাল্যবিবাহ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা। এসব কাজ করতে পারলে অপরিণত শিশু জন্মের হার কমাতে পারব।

মোহাম্মদ সহিদুল্লা

অপরিণত অবস্থায় কোনো শিশু জন্ম নিক, এটা আমরা চাই না। কারণ জন্মের পরপরই এ শিশুদের অনেক জটিলতা দেখা দেয়। অনেকে মারা যায়। অনেকে অন্ধ হয় ও কানে শুনতে পায় না।

প্রতিবছর বাংলাদেশে যে ৪ লাখ ৪০ হাজার অপরিণত শিশু জন্ম নেয়, এটা হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু সংখ্যাটা যেন আমরা কমিয়ে আনতে পারি। এ ক্ষেত্রে লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচ নিতে হবে। এরপরও অপরিণত শিশু জন্মালে সঙ্গে সঙ্গে যেন জন্মকালীন সেবা দিতে পারি। স্কিন টু স্কিন কন্ট্যাক্ট, ক্যাঙারু মাদার কেয়ার, বুকের দুধ খাওয়ানো ছাড়া বেশি প্রয়োজন হলে স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিটে নিতে হবে।

ফিরোজ চৌধুরী

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাই নবজাতকের সুরক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদে্যাগ প্রয়োজন। আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সুপারিশ

  • দক্ষ ধাত্রীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ সংখ্যা এখন ৫২ শতাংশ আছে, এটাকে ৯২ শতাংশে নিতে হবে।

  • প্রায় ৪২টি জেলায় স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট করা হয়েছে। সব জেলার জন্য এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ও যথেষ্ট বরাদ্দ দেওয়া জরুরি।

  • কেএমসি সেবা অত্যন্ত সাশ্রয়ী পদক্ষেপ। এ সেবা ঠিকমতো চালুর জন্য প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুটি করে শয্যা সংরক্ষিত রাখতে হবে।

  • ২৪ ঘণ্টা দক্ষ নার্স ও চিকিৎসকের উপস্থিতি দরকার।

  • রেটিনোপ্যাথি হওয়ার ঝুঁকি রোধ করতে হলে সঠিক ব্যবস্থাপনায় অক্সিজেন দিতে হবে।

  • গর্ভবতী হওয়ার কমপক্ষে তিন মাস আগ থেকে ফলিক অ্যাসিড বড়ি খেতে হবে।

  • বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে সন্তান নেওয়া প্রভৃতি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

  • সমাজের নেতৃস্থানীয়দের দায়িত্ব হলো তঁার এলাকায় যেন কোনো বাল্যবিবাহ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

মন্তব্য করুন