বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন-১৮৯-এর মূল বিষয়বস্তু গৃহশ্রমিকের মানবাধিকারের কার্যকর সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া। ২০১১ সালে এ কনভেনশন বা সনদ গৃহীত হয়। ফিলিপাইন প্রথম দেশ হিসেবে এটি অনুসমর্থন দেয়। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৩৫টি দেশ এতে অনুসমর্থন দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ সনদের পক্ষে ভোট দিলেও এখন পর্যন্ত অনুসমর্থন জানায়নি। আইএলও সনদ-১৮৯ অনুসমর্থনে দেশের গৃহশ্রমিকদের তুলনায় প্রবাসী গৃহশ্রমিকেরা বেশি লাভবান হবেন।

অভিবাসন ও উন্নয়নবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ মাহজাবিন খালেদ বলেন, আইএলও ১৮৯ সনদটি বাংলাদেশ এখনো অনুসমর্থন করেনি, বিষয়টি দুঃখজনক। প্রবাসী নারী শ্রমিকেরা নানা ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের অভিযোগ করেন। তাঁদের অধিকার রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইএলও ১৮৯ সনদ অনুসমর্থন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, সংসদীয় ককাসের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে এটি অনুসমর্থনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি করা হবে।

সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসনের লক্ষ্যে বৈশ্বিক চুক্তি (জিসিএম) গৃহীত হয় ২০১৮ সালে। এ চুক্তির পেছনে বাংলাদেশের রয়েছে অগ্রগণ্য ভূমিকা। বৈশ্বিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে দুর্দশা আর বিশৃঙ্খলা দূর করতে এ চুক্তির প্রস্তাবক ছিল বাংলাদেশ। এ চুক্তিতে ১৮৭ ধরনের কাজের কথা বলা হয়েছে।

কনভেনশনে অনুসমর্থন করলে সরকারের কিছু বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় বলে জানান আইএলওর ঢাকাস্থ ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার রাহনুমা খান। তিনি বলেন, কনভেনশনের প্রতিটি আর্টিকেল অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই অনুসমর্থনের আগে সরকার অনেক কিছু চিন্তাভাবনা করে। অন্যদিকে জিসিএমে স্বাক্ষর করলেও এটি বাস্তবায়নে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি বলেন, দেশে গৃহকর্মী নীতিমালা করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, কিন্তু এটি বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি আছে কি?

default-image

আইএলও ১৮৯ সনদে গৃহকর্মীদের অধিকারগুলো স্পষ্ট করা হয়েছে বলে জানান কেয়ার বাংলাদেশের উইমেন অ্যান্ড গার্লস এমপাওয়ারমেন্ট প্রোগ্রামের পরিচালক হুমায়রা আজিজ। তিনি বলেন, এটি অনুসমর্থন করলে যাঁরা গৃহকর্মীদের অধিকার নিশ্চিতের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। নারী শ্রমিকেরা যে দেশে যাচ্ছেন, সে দেশকেও জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে।

আইএলও ১৮৯ সনদে যেসব বিষয় রয়েছে, তার মধ্যে শ্রমিকের মানবাধিকার সুরক্ষা; নিয়োগকারীদের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ; নিপীড়ন-নির্যাতন, সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষা; দৈনিক কর্মঘণ্টা ও ছুটি; ন্যূনতম মজুরি অন্যতম। এটি অনুসমর্থন করলে গৃহশ্রমিকের বিষয়ে সরকারের দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা তৈরির পাশাপাশি জবাবদিহির সুযোগও থাকবে। পাশাপাশি যেসব দেশে বাংলাদেশ থেকে গৃহশ্রমিক যান, সেসব দেশের ওপর প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষাপ্রাপ্তিতে চাপ প্রয়োগ করা সহজ হবে।

ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, সরকারের অভিবাসন নীতিমালা ও জিসিমএমে বলা আছে, নারীদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক যেসব সনদ ও আইন আছে, সেগুলো অনুসমর্থন করা হবে। আইএলও ১৮৯ সনদে অনুসমর্থন করলে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, এটি অনুসমর্থন করলে দেশের গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ভার্চ্যুয়াল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন কেয়ার বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোস্তফা সরোয়ার। তিনি বলেন, আইএলও সনদ ১৮৯ অনুসমর্থনের বিষয়টি এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে।

আইসিএমপিডির কাউন্সিলর গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বাংলাদেশের নারীদের জন্য নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ’ প্রকল্পটির আওতায় অভিবাসী নারীদের জন্য নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় মাইগ্রেশন রিসোর্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও নবাবগঞ্জে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিচালক নাজমা ইয়াসমিন বলেন, সরকারের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী,
দেশে ১৩ লাখের বেশি গৃহকর্মী আছেন। অন্যদিকে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মধ্যে ৮ লাখই গৃহকর্মী। প্রবাসী নারী শ্রমিকদের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের সুরক্ষায় খুব বেশি উদ্যোগ নেই। দেশের নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে আইএলও সনদ ১৮৯ অনুসমর্থনের বিকল্প নেই।

আইএলও সনদ ১৮৯ অনুসমর্থন করলে দূতাবাসগুলো তাদের নজরদারি কার্যক্রম বাড়াতে বাধ্য হবে বলে মনে করেন জাতীয় গার্হস্থ্য
নারী শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদা আক্তার। তিনি বলেন, অনুসমর্থন করলে প্রবাসে নারী গৃহশ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার পথ তৈরি হবে।

নারী গৃহশ্রমিকদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম। তিনি বলেন, গৃহশ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্বের ৩৫টি দেশ আইএলও সনদ-১৮৯ অনুসমর্থন করলেও বাংলাদেশ করছে না। অনুসমর্থন করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে না। দূতাবাসগুলোতে নারী শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে, কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়াতে হবে।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন ওকাপের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুপ্রিয়া শাহনেওয়াজ ও ফিল্মস ফর পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পারভেজ সিদ্দিকী।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন