কোভিড-১৯ বাস্তবতায় নিরাপদে স্কুলে ফেরা: শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

সম্মানিত অতিথি

সৈয়দ গোলাম ফারুক

মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

শিক্ষার্থী প্রতিনিধি

প্রতিভা প্রভা

শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি, হলি ক্রস স্কুল

মিনা আক্তার

শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ

কথক বিশ্বাস জয়

শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি, সরকারি হাতেম আলী কলেজ, বরিশাল

গবেষণা সম্পাদক, জাতীয় শিশু টাস্ক ফোর্স (এনসিটিএফ), কেন্দ্রীয় কমিটি

শেখ সাদি

শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণি, ধামরাই উচ্চবিদ্যালয়

সানজিদা

শিক্ষার্থী, একাদশ শ্রেণি, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ

গ্রিন ক্লাব মেম্বার

রাফসান জানি সৌরভ

শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ

গণমাধ্যম সম্পাদক, জাতীয় শিশু টাস্ক ফোর্স (এনসিটিএফ)

কাজী আবদুল হালিম

শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট

চৌধুরী রাজিয়া সুলতানা

শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি, ঠুটিয়া উচ্চবিদ্যালয়, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ

গ্রিন ক্লাব মেম্বার

এমদাদুল হক

শিক্ষার্থী, একাদশ শ্রেণি, নিউ ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী

সভাপতি

রিফাত বিন সাত্তার

পরিচালক, প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোয়ালিটি, সেভ দ্য চিলড্রেন, বাংলাদেশ

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

স্কুল মাসের পর মাস বন্ধ। এই অবস্থায় স্কুলের শিক্ষার্থীদের মতামত কী, তা আলোচনায় আসবে। সব সময় তো আমরা জ্ঞানগর্ভ কথা বলি। কিন্তু যাদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করি, তাদের কথা আমরা কম শুনি। সেদিক থেকে আজকের আলোচনাটা একটু ব্যতিক্রমী। আলোচনা থেকে শিক্ষার্থীদের মনোভাব, বক্তব্য ও সমস্যাগুলো বুঝতে পারা যাবে। কীভাবে সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়, সে বিষয়টিও আজকের আলোচনায় আসবে।

বিজ্ঞাপন

রিফাত বিন সাত্তার

default-image

সেভ দ্য চিলড্রেন শিশুদের নিয়েই কাজ করে। আমরা প্রায় ৫০ বছর বাংলাদেশে কাজ করছি। আমাদের কাছে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অধিকার সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কোভিডে প্রায় ৯ মাস পার করলাম। কোভিড একটা জনস্বাস্থ্যসংকট নিয়ে এসেছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করছে। পাশাপাশি এটাও সত্য যে শিশুদের শিক্ষার মধ্যে থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মানে শুধু স্কুলে যাওয়া নয়। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা অনেকগুলো উপাদানের সম্মুখীন হয়। ওরা এখন একটা মানসিক অস্থিরতার মধ্যে আছে। বাসায় বন্দী হয়ে আছে। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। শুধু স্কুলে যাওয়া নয়, এর সঙ্গে থাকা আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। সে জন্য এ সংকটকে আমরা জনস্বাস্থ্যসংকট মনে করছি। যদিও এটা একটা শিক্ষাসংকট। ফলে শিক্ষার্থীদের জায়গা থেকে স্কুল খোলা গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে কিছু গবেষণা হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে প্রায় পাঁচ কোটি শিশু শিক্ষার বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশেও এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ৮৪ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, তঁাদের সন্তানেরা হয়তো আর স্কুলে ফিরতে পারবে না। কোভিডের সংকট অনেকটা বহুমাত্রিক। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পাশাপাশি এখানে অর্থনৈতিক সংকটও আছে। নিম্ন আয়ের মানুষ কোভিডের কারণে অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছেন। অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে পড়লে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের ঘটনা বেড়ে যায়। এমনিতেই প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। কোভিডের মতো বাড়তি সংকটে শিশুশ্রম ও মেয়েশিশুদের বাল্যবিবাহের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তার মানে হলো, এ শিশুরা হয়তো আর স্কুলে ফিরে আসবে না।

গবেষণায় এসেছে, ৫৮ শতাংশ শিশু বাল্যবিবাহের শিকার হতে পারে। ৭১ শতাংশ শিশু হয়তো শিশুশ্রমে যুক্ত হবে। অর্থাৎ আমরা হয়তো বিশালসংখ্যক শিশুকে স্কুলে ফিরিয়ে আনতে পারব না। সে জন্য একটা ক্যাম্পেইন খুব জরুরি। সেভ দ্য চিলড্রেন ইতিমধ্যে একটা ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। আমরা শিক্ষা নিয়ে কাজ করা অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। সে ক্ষেত্রে আমরা বলার চেষ্টা করছি যে স্কুলকে অবশ্যই নিরাপদ হতে হবে। নিরাপদ বলতে আমরা বোঝাচ্ছি স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদ রাখা। অর্থাৎ, হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা। শিশুরা স্কুলে ফিরে এলে যেন এ সময়ে হওয়া শিক্ষার গ্যাপটা পূরণ করা যায়।

সৈয়দ গোলাম ফারুক

default-image

স্কুল কখন ও কীভাবে খুলব, সেটা সরকারের খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়। কখন খুলব, সেটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। কিন্তু কীভাবে খুলব, সেটা এখন মোটামুটি ভেবে রাখতে পারি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কীভাবে স্কুলগুলো খোলা হবে, কীভাবে শিক্ষার্থীরা আসবে ও স্বাস্থ্যবিধি মানবে, ইতিমধ্যে আমরা সের কম একটা পরিকল্পনা করেছি। স্কুল খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব। আমার ধারণা, আমাদের শিক্ষার্থীরাও সেগুলো ইতিমধ্যে জেনে গেছে। কীভাবে হাত ধুতে, মাস্ক পরতে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয় ইত্যাদি বিষয় তারা জেনে গেছে। আমরা আশা করছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই স্কুলগুলো খোলা সম্ভব হবে।

আমরা ৪৬টি জেলার ১১৫টি উপজেলায় তথ্য নিয়েছি, আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট প্রোগ্রামে কতসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে। সেখানে আমরা লক্ষ করেছি, শতকরা ৮৫ ভাগ শিক্ষার্থী অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছে। আশা করছি, এই ৮৫ ভাগ শিক্ষার্থী অন্তত ঝরে পড়বে না, বরং আরও কিছু শিক্ষার্থী হয়তো যুক্ত হবে। কারণ, অনেকে হয়তো কোনো কারণে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে পারেনি। ফলে ঝরে পড়ার বিষয়টি অতটা ভয়াবহ নয়।

প্রতিভা প্রভা

default-image

বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে আমরা প্রায় নয় মাস ধরে বাসায় আছি। যদিও এর মধ্যে আমাদের অনলাইনে ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা অনলাইন ক্লাসের সুবিধাটা পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয়। অনেকে ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনে ক্লাস করে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট খরচটা তাদের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া আরও অনেক কারণে অনলাইন ক্লাসের সুবিধা সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। আবার স্কুল বন্ধ থাকার কারণে আমাদের সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। আগে আমরা শিক্ষকের সামনে বসে সরাসরি ক্লাস করতাম। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতাম। অনলাইনে এ কাজটা করা হলে দুইটার মধ্যে পার্থক্য থেকেই যায়। অর্থাৎ স্কুল খোলা খুবই জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হবে। যেমন মাস্ক ব্যবহার করা, হাত ধোয়া, তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা। দেশের সব স্কুলে এ বিষয়গুলো মানা হলে স্কুলে পুনরায় ফিরে যেতে পারব বলে আশা করা যায়। এ ছাড়া অনেক স্বাস্থ্যবিধি আমাদের মেনে চলতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবকেরা যেন এ বিষয়ে আমাদের আরও প্রশিক্ষণ দেন। স্কুল খোলা হলে আমাদের নিরাপত্তার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

সৈয়দ গোলাম ফারুক

প্রতিভা খুব চমৎকারভাবে বলেছে যে আমাদের অনলাইন ক্লাসের সুবিধা সবাই পাচ্ছে না। ডিজিটাল ডিভাইডের যে কথাটা আমরা বড়রা বলি, তা–ও তারা উপলব্ধি করেছে। ডিজিটাল ডিভাইডের বিষয়টা আমাদের মাথায় আছে। আমাদের হিসাবমতে, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী হয়তো এই অনলাইন ও টিভি সুবিধাটা পায়নি। এদের জন্য কী করব, ক্ষতিটা কীভাবে পুষিয়ে নেব, সেটা আমরা ভাবছি। সে জন্য এবার আমরা একটা অ্যাসাইনমেন্টের ব্যবস্থা করেছিলাম। যার জন্য কোনো অনলাইন ডিভাইস বা সংযোগ লাগবে না। সেখানে আমাদের ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী খুব উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে। সে জন্য আমি তোমাদের মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীকে ধন্যবাদ জানাই। তোমাদের জমা দেওয়া অ্যাসাইনমেন্টগুলো আমরা মূল্যায়ন করব। ইতিমধ্যে আমাদের শিক্ষকেরা মূল্যায়ন করেছেন। সেগুলো তঁারা আবার শিক্ষার্থীদের দেখিয়েছেন। এগুলো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন হবে। আরেকটা মূল্যায়ন আমরা করব, যেটা হচ্ছে জাতীয় মূল্যায়ন। সারা দেশ থেকে আমরা স্যাম্পল ভিত্তিতে বিভিন্ন স্কুলের অ্যাসাইনমেন্ট আনব। সেগুলো পুরো দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করে দেখবেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু এগোল বা পেছাল।

মিনা আক্তার

default-image

প্রতিভা প্রভা বলল, অনলাইন ক্লাস করার চেয়ে সরাসরি ক্লাস করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে আগামী বছর বা তার কয়েক মাসে আদৌ আমরা সরাসরি ক্লাসে পৌঁছাতে পারব কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমাদের দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাব ৯ মাস ধরে চলমান আছে। কোভিড-১৯–এর কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা সবাই শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পড়াশোনা থেকে দূরে চলে এসেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিছু ইংরেজি মাধ্যম স্কুল অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছিল। প্রথম দিকে সমস্যার সম্মুখীন হলেও তারা সেটা চালু রেখেছে। কিন্তু বাংলা মাধ্যমে সবখানে সেভাবে অনলাইন ক্লাস করতে পারেনি। সে জন্য সরকার একটা টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে। আমাদের দেশে সবার অর্থনৈতিক অবস্থা সমান নয়। সে ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকের ঘরে টেলিভিশনও নেই। এ ছাড়া যঁারা ক্লাস নিচ্ছেন, তঁারা ঠিকভাবে অনলাইন ক্লাস নিতে পারছেন কি না, তা নিয়েও সমস্যা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা–ও দেখতে হবে। এমন একটা ব্যবস্থা করা দরকার, যেন সুবিধাগুলো সবাই পায়। বৈষম্য না হয়। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কীভাবে আমরা আবার যুক্ত করব?

সৈয়দ গোলাম ফারুক

সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি মিনা আক্তার বলেছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আমরা হঠাৎ করেই শিক্ষার্থীদের হাতে এ রকম ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দিয়েছি। এটা কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করবে, তা আমরা তাদের শেখাইনি। ফলে অনেক ধরনের সমস্যা হতেও পারে। এ বিষয়েও আমরা চিন্তা করছি। মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। করোনার সময় শিক্ষার্থীদের ওপর যেমন মানসিক চাপ পড়েছে, একইভাবে অভিভাবকদের ওপরেও একটা মানসিক চাপ পড়েছে। ফলে এখানে একটু সমস্যা হতেই পারে। সেটা আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। সামনের মাস থেকেই এ বিষয়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করব। পারস্পরিক সম্পর্কগুলো কীভাবে আরও সুন্দর, ভালো ও স্বাস্থ্যসম্মত করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের দেশের প্রথিতযশা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কথা বলবেন এবং পরামর্শ দেবেন। শিক্ষকেরা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসবেন।

অনলাইন ক্লাস কখনোই সামনাসামনি ক্লাসের বিকল্প নয়। আমরা সব সময় সামনাসামনি ক্লাসে অভ্যস্ত ছিলাম। অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। শিক্ষকেরা জানতেনই না, কীভাবে এ ক্লাস নিতে হয়। ফলে এ নতুন বিষয়টি প্রথম থেকে একেবারে ভালো ও শতভাগ কার্যকর হবে, তা আশা করা ঠিক নয়। সাধারণত ধরে নেওয়া হয়, সামনাসামনি ক্লাস অবশ্যই বেশি ভালো হবে।

বিজ্ঞাপন

কথক বিশ্বাস জয়

default-image

আমি দ্বাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছি। বিজ্ঞান বিভাগে আমাদের দুটি পত্র রয়েছে। প্রথম পত্রটা আমরা মোটামুটি সরাসরি ক্লাসে শেষ করতে পেরেছি, কিন্তু দ্বিতীয় পত্রের একটা ক্লাসও আমরা পাইনি। এ ক্ষেত্রে দু-তিন মাসের নোটিশে পরীক্ষা নেওয়া হলে আমরা বড় একটা সংকটে পড়ব। শিক্ষার্থীরা পুরো বছর বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদানের বাইরে। বর্তমানে বাড়িতে তারা অনেকটা অসহায়ত্বের মধ্যে রয়েছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বা মূল্যায়ন ছাড়াই পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন সব ক্ষেত্রেই লার্নিং গ্যাপ তৈরি হয়েছে। যেটা আমাদের ক্ষেত্রেও উপলব্ধি করতে পারি। আমরা দ্বিতীয় পত্রের বইটি পুরোপুরি পড়তে পারলাম না। চরাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্কের সমস্যা রয়েছে। কলেজের সব ক্লাস টেলিভিশনেও দেখানো হয় না। ক্লাসগুলো কলেজভিত্তিক ইন্টারনেটে হয়। ফলে ইন্টারনেটের সমস্যার কারণে অনেকেরই লার্নিং গ্যাপ থেকে যাবে। এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে? আমাদের লার্নিং গ্যাপ থেকে উত্তরণের জন্য সরকার কী পদক্ষেপ নেবে?

সৈয়দ গোলাম ফারুক

কথক বিশ্বাস পরীক্ষার আগে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি বলেছে। এটা আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন। এরপরে যারা পরীক্ষা দেবে, তাদের অটো প্রমোশন দেওয়া হবে না। এর আগে কেন অটো প্রমোশন দেওয়া হলো। কারণ, যারা অটো প্রমোশন পেয়েছে, তাদের সব লেখাপড়া শেষ হয়ে গিয়েছিল, শুধু পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিল। ফলে তাদের অটো প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পড়ালেখা ও জ্ঞানার্জনের কাজটা সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু এখন যারা আছে, তাদের লেখাপড়াটা ভালোভাবে হয়নি। তাই মাননীয় মন্ত্রী বলেছেন, ক্লাস নিয়েই আমরা তাদের পরীক্ষা নেব। সামনের বছর আমরা যদি স্কুল-কলেজ খুলতে পারি, তাহলে তাদের স্কুলে ক্লাস করিয়ে পরীক্ষায় বসাব। অনেকেই আমাকে বলেছেন, হুট করে যেন পরীক্ষাটা না দিই। সে বিষয়টি আমরা আগেই ভেবে রেখেছি। আমরা হুট করে চাপিয়ে দেব না। তোমরা স্কুলে আসবে, ক্লাস হবে। তারপর আমরা পরীক্ষা নেব।

শেখ সাদি

default-image

আমাদের স্কুলে ভালোমতো অনলাইন ক্লাস করানো হয়নি। মাঝেমাঝে করানো হয়েছে। এদিক দিয়ে একটা সমস্যা হয়েছে। বছরের শুরুতে কিছুদিন স্কুলে সরাসরি ক্লাস হয়েছে। প্রথম দু-তিন মাসের ক্লাসে আমরা ভালোভাবে জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি। কারণ, আমরা সরাসরি শিক্ষকদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। কিন্তু অনলাইনে আমরা ভালোমতো শিখতে পারছি না। অনেকটা নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে। আবার শিক্ষকের সরাসরি কথা শুনতে না পারার কারণেও আমরা ঠিকমতো শিখতে পারছি না। এসব বিষয়ে সমস্যা রয়েছে। আমি চাই, যেন ইন্টারনেট সমস্যা ঠিক করা হয়, আরও উন্নত করা হয়। যেন আমরা সহজে অনলাইন ক্লাস ও অন্যান্য কাজ করতে পারি।

সৈয়দ গোলাম ফারুক

ইন্টারনেট সমস্যার কথা বলেছে শেখ সাদি। এটা একটা সমস্যা তো বটেই। আমরা এ সমস্যা দূর করার উপায় খতিয়ে দেখছি। আমাদের অবকাঠামোগত সমস্যা আছে। সারা পৃথিবীতেই আছে। নেটওয়ার্কের বিষয়টি নিয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তারা চেষ্টা করছে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে নেট সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। আমরা জানি না করোনা পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে। ফলে আগামী বছরেও আমাদের অনলাইন ক্লাস চালাতে হতে পারে। এ জন্য নেট সমস্যা সমাধানে সরকার খুব সচেষ্ট ও যত্নবান।

অনেকে ডিজিটাল ডিভাইডের কথা বলেছ। এটা খুবই যৌক্তিক কথা। ক্ষতি যেটা হয়েছে, আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমাদের শিক্ষার্থীরা সেটা খুব দ্রুত পুষিয়ে নিতে পারবে।

সানজিদা

default-image

দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় সেখানে অনেক ময়লা–আবর্জনা জমা হয়েছে। স্কুল–কলেজগুলোর ব্ল্যাকবোর্ড, ফ্যান, ইলেকট্রিক বিভিন্ন জিনিসপত্র হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া স্কুল ও কলেজের মাঠগুলো বিয়ে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যা বিভিন্ন সংক্রামক রোগের উৎস হতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মেরামত করে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। আর এতে যদি কোনো অর্থের প্রয়োজন হয়, সরকার যেন সেই ব্যয়ভার বহন করে। অনেকে অনলাইনে ক্লাস করার সুযোগ পায়নি। যাদের বাসায় টিভি বা স্মার্টফোন নেই, তারা তো ক্লাসের ধারেকাছেই যেতে পারেনি।

এ জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়? নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রুপভিত্তিক বিষয়গুলো একেবারে নতুন। তারা তো কিছুই বোঝে না। তাদের জন্য যেন কিছু করা হয়। আমার বাসায় অনলাইনে ক্লাস করার জন্য কোনো স্মার্টফোন সুবিধা ছিল না। টিভি ছিল। টিভিতে কিছুদিন ক্লাস করেছি। সেখানে আসলে মন বসে না। স্কুলের শিক্ষকেরা পড়া দিলে এবং তা আদায় করলে পড়াটা হতো। আমাদের ছোট ভাইবোনেরা কোভিড-১৯–এর কারণে স্কুলে যেতে পারছে না, কিন্তু বেতন ঠিকই দিতে হচ্ছে। অথচ আমরা কোনো সেবাও পাচ্ছি না।

সৈয়দ গোলাম ফারুক

সানজিদা খুবই চমৎকার একটা কথা বলেছে। প্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলেছে। কয়েক মাস আগে আমি প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা স্কুলে গিয়ে দেখলাম, সত্যি সত্যি অনেক স্কুলে রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। মাঠে ঘাস উঠে গেছে। ময়লা–আবর্জনা দেখা গেছে। কম্পিউটারগুলো খোলা হচ্ছে না। তখনই আমরা নির্দেশ দিয়েছি প্রতিটি স্কুল রক্ষণাবেক্ষণ করে তৈরি রাখার, যেন যেকোনো মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের এনে লেখাপড়া শুরু করা যায়। সানজিদাকে ধন্যবাদ। একটা চমৎকার বিষয় এ বয়সে তার মাথায় এসেছে।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা গ্যাপ মেপে আমরা তাদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বেতনের কথা জিজ্ঞেস করেছ। বেতনের ব্যাপারে আমরা একটা নির্দেশনা দিয়েছি। টিউশন ফি অভিভাবকেরা দেবেন। কারণ, অনেক স্কুলে শিক্ষকদের বেতন নির্ভর করে তোমাদের টিউশন ফির ওপর। ফলে টিউশন ফি অবশ্যই দিতে হবে। তবে যদি কোনো অভিভাবকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না হয়, তার বিষয়টি অবশ্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান বিবেচনা করবেন।

রাফসান জানি সৌরভ

default-image

এ বছরের মার্চ থেকে আমাদের দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সে জন্য সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ। এ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় আমরা অনলাইন বা টেলিভিশনে ক্লাস করছি। সে ক্ষেত্রে আমাদের ক্লাসগুলো ঠিকমতো হচ্ছে না। সিলেবাসের চাপ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমার অনুরোধ থাকবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলে সিলেবাসে অতিরিক্ত চাপ যেন শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মাধ্যমে যেন তাদের মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি আমি আপনাকে বিনীতভাবে একটি প্রশ্ন করতে চাই। শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আপনারা আগামীতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন; বিশেষ করে ২০২১ সালের এইচএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে?

সৈয়দ গোলাম ফারুক

রাফসান জানি সৌরভ বলেছে, সিলেবাস যেন চাপিয়ে দেওয়া না হয়। শিক্ষার্থীদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা সে জানতে চেয়েছে। এবারের মূল্যায়নটি আগের মতোই হবে। স্বাভাবিকভাবে যে রকম পরীক্ষা হয়, সে রকম পরীক্ষা নেব। সেভাবেই মূল্যায়ন হবে। তবে আমরা সামনের বছর মূল্যায়নে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসব। যেটাকে আমরা বলি ফরম্যাটিভ অ্যাসেসমেন্ট। যে অ্যাসাইনমেন্ট হলো, সেটা একটা ফরম্যাটিভ অ্যাসেসমেন্ট। এ ধরনের ফরম্যাটিভ অ্যাসেসমেন্ট আমরা নিয়ে আসছি। আমরা প্রজেক্ট বেজড লার্নিংয়ে চলে যাব। আগে যে রকম সব বিষয় তোমরা পরীক্ষার হলে খাতায় লিখে দিতে, পুরো নম্বর সেভাবে দেবে না। এবার আমরা চেষ্টা করব বড় একটা অংশ যেন তোমরা কাজ করতে করতে দাও। খাতায় লিখে নয়। তোমাদের ব্যবহারে, কাজে, নৈতিকতায়, খেলাধুলায়, সংগীতচর্চায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে—এগুলোর মধ্য থেকে শিক্ষকেরা নম্বর দেবেন। ফলে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অন্যান্য ক্লাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। কিন্তু এসএসসি ও এইচএসসি আগের মতোই হবে।

কাজী আবদুল হালিম

default-image

কোভিড-১৯–এর সম্পর্কে আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। স্কুল, কলেজ বন্ধ দেওয়া হয়েছে। আমরা বর্তমানে অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত আছি। কিন্তু এটার সঙ্গে আমরা কেউই সেভাবে অভ্যস্ত নই। কাজেই আমাদের মানিয়ে নিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। যে জায়গায় অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেয়েছিল। আমাদের পূর্বের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু আমরা সেভাবে সুযোগ পাইনি। আমাদের প্রথম ষাণ্মাসিক পরীক্ষার পরেই এ দুর্যোগ শুরু হয়। সিলেটে যতগুলো কলেজ আছে, তার বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর বাসা গ্রামে। তারা পড়াশোনা করে শহরে গিয়ে। কিন্তু তাদের বাসা হচ্ছে গ্রামে। কাজেই মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে তারা গ্রামে অবস্থান করছে। কারণ, তাদের পক্ষে এখন টাকা খরচ করে হোস্টেল কিংবা মেসে থাকা সম্ভব নয়। কাজেই তারা এখন গ্রামে অবস্থান করছে। গ্রামের সব জায়গায় অনলাইন নেটওয়ার্ক অতটা শক্তিশালী নয়। ফলে তারা ঠিকভাবে যুক্ত হতে পারছে না। গ্রামে ওয়াই–ফাইয়ের ব্যবস্থা নেই। সিলেটের সব এলাকায় ওয়াই–ফাইয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে ইন্টারনেট ডেটা কিনে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। আর এতে অনেক টাকাপয়সার প্রয়োজন। আমরা অটো প্রমোশন চাই না, পরীক্ষা চাই। পরীক্ষার সময় যেন পেছানো হয়। সিলেবাস যেন সংক্ষিপ্ত করা হয়। এ ছাড়া ব্যবহারিক পরীক্ষার অতিরিক্ত চাপ মওকুফ করা হলে আমাদের জন্য ভালো হবে।

সৈয়দ গোলাম ফারুক

আবদুল হালিম বলেছে, সে অটো প্রমোশন চায় না। খুবই চমৎকার তার কথা। অবশ্যই আমরা অটো প্রমোশনের ব্যবস্থা করব না। এবার যেটা হলো, এটাও কিন্তু পুরোপুরি অটো প্রমোশন নয়। এখানে ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী খুব কষ্ট করে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছে। আমরা সবাইকে প্রমোশন দিচ্ছি, এটা ঠিক। কিন্তু তারা যে কাজ না করে, পরীক্ষা না দিয়ে প্রমোশন পাচ্ছে, তা–ও কিন্তু নয়। তারা যথেষ্ট পরিশ্রম করে এই প্রমোশন পাচ্ছে। ই-লার্নিংয়ের ওপর ভিত্তি করে যেন পরীক্ষা না নেওয়া হয়, সেটা তারা বলেছে। ই-লার্নিংয়ের ওপর ভিত্তি করে সব সময় যে রকম পরীক্ষা নিতাম, সে রকম একটা পরীক্ষা নেব—এ রকম আমরা ভাবছি না। আমরা তো জানি, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী ই-লার্নিংয়ের সুযোগই পায়নি। তাই আমরা অনলাইন বা টিভি ক্লাসের ওপর ভিত্তি করে কোনো পরীক্ষা নেব না।

চৌধুরী রাজিয়া সুলতানা

default-image

কোভিড-১৯ আমাদের সামনে মহামারি আকারে এসেছে। এ কারণে আমাদের পড়াশোনার দিকটিই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এখন অনলাইন ক্লাসকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমি তো একজন গ্রামের শিক্ষার্থী। সে ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাসগুলো আমার কাছে সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না। কারণ, এতে যুক্ত হওয়ার সুবিধা আমার নেই। কোভিডের কারণে স্কুলগুলো বন্ধ থাকায় আগের পড়াশোনা পুষিয়ে নিতে পারছি না। এ জন্য অনেক জায়গায় অনলাইন ক্লাসকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনলাইন ক্লাস শুধু যান্ত্রিক স্ক্রিনে দেখাশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর মাধ্যমে কখনোই বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই অনলাইন ক্লাস বাদ দিয়ে যদি শিক্ষার অন্য মাধ্যম কিংবা কোনোভাবে গ্রামের স্কুলগুলো খুলে দেওয়া গেলে ভালো হয়। গ্রামের স্কুলগুলো স্বাভাবিকভাবে দুই শিফটে করা হয় না। শুধু সকালেই করা হয়। শহরের স্কুলগুলো দুই শিফটে শুরু হয়।

বেশি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি যেমন অষ্টম শ্রেণি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য স্পেশাল ক্লাসের ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হতো। স্কুল তো করোনার এই সময়ের মধ্যে খোলা সম্ভব নয়। তাই যাদের বেশি প্রয়োজন, তাদের কিছুদিনের জন্য স্কুল খুলে দেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।

সৈয়দ গোলাম ফারুক

পরীক্ষার্থীদের জন্য স্পেশাল ক্লাসের কথা বলেছে রাজিয়া সুলতানা। আমাদের মাননীয় মন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের স্কুলে এনে ক্লাসে করিয়ে তারপর পরীক্ষা নেব। কিন্তু এরপরেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের একটা ভয় চলে এল। তোমরা তো জানো করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়টি। আসলে েসটি কোন পরিস্থিতিতে রয়েছে, আবার কোন পর্যায়ে যায়, কী হয়, এটা না দেখে আমরা স্কুল খুলতে পারছি না। যদি এটা আমাদের অনুকূলে আসে, তাহলে তাদের স্কুলে এনে স্পেশাল ক্লাস করিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে।

এমদাদুল হক

default-image

আমরা এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকে কোভিড-১৯ শুরু হয়েছে। যার কারণে আমরা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এক দিনও কলেজে গিয়ে ক্লাস করতে পারিনি। এসএসসির ফলাফল পাওয়ার পর একাদশ শ্রেণির ভর্তিসহ সবকিছুই অনলাইনে হয়েছে। কলেজের ক্লাসগুলো অনলাইনেই হচ্ছে। বিজ্ঞান বিভাগের জন্য দিনে দুটি করে অনলাইন ক্লাসের রুটিন দেওয়া আছে। মাত্র দুটি করে ক্লাস করে উচ্চমাধ্যমিকের বিশাল সিলেবাস শেষ করা কখনোই সম্ভব নয়। সেদিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের শিক্ষাবছর ঠিক কতটা বৃদ্ধি করা হবে, মন্ত্রণালয় থেকে তা–ও বলা হয়নি। এটা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।

রাজশাহীতে পড়লেও আমি মূলত গ্রামের ছাত্র। গ্রামে ইন্টারনেট সংযোগ তেমন ভালো নয়। আজকে এখানে যুক্ত হতেও আমার অনেক সমস্যা হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষা নিলে শিক্ষা ব্যবধান তৈরি হবে। কারণ, শহরের শিক্ষার্থীদের ভালো ইন্টারনেট ব্যবস্থা আছে, যা গ্রামের শিক্ষার্থীদের নেই। ফলে আমরা পিছিয়ে থাকব। আমার অনুরোধ, এই বৈষম্যের দিকটা যেন দেখা হয়।

সৈয়দ গোলাম ফারুক

এমদাদুল হক পরীক্ষা পেছানোর বিষয়ে কথা বলেছে। পরীক্ষা পেছানোর প্রয়োজন হলে অবশ্যই পেছাব। আমরা যদি ক্লাস না নিতে পারি, আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি লেখাপড়া না করতে পারে, তাহলে কীভাবে ফলাফল হবে? লেখাপড়া ছাড়া আমরা অটোপ্রমোশন দেব না। আমরা পরীক্ষা নিয়েই প্রমোশন দেব। পরীক্ষা নিতে হলে যদি পরীক্ষা পেছাতে হয়, ঠিকমতো ক্লাস করানোর জন্য পরীক্ষা পেছাতে হলে সরকার অবশ্যই সেটা বিবেচনা করবে। সেভাবেই আমরা আমাদের সামনের বছরের পরিকল্পনা করছি।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করা সব শিক্ষার্থীর কথায় আমি মুগ্ধ। তারা শুধু যে নিজেদের কথা বলেছে, তা নয়। তারা সব শিক্ষার্থীর কথা চিন্তা করে কথা বলেছে। তাদের জন্য শুভকামনা।

ফিরোজ চৌধুরী

আজকের এই ভার্চ্যুয়াল সংলাপে অত্যন্ত চমৎকার আলোচনা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা খুবই ভালো কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে। এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করার জন্য সম্মানিত মহাপরিচালক ও শিক্ষার্থীদের প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানাই অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সুপারিশ

  • অনলাইন ক্লাসের কারণে গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া বৈষম্য দূর করতে আশু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

  • লার্নিং গ্যাপ কমিয়ে আনতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

  • শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

  • করোনা–পরবর্তী সময়ে স্কুল খোলা হলে শিক্ষার্থীদের সংক্রামক রোগ থেকে নিরাপদ রাখতে স্কুলগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি।

  • পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে।

  • শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় প্রচারণা দরকার।

  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বিশ্লেষণ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

  • পরীক্ষা শুরু করার পর্যাপ্ত সময়ের আগে নোটিশ দেওয়া জরুরি, হুট করে পরীক্ষা নেওয়া ঠিক হবে না।

  • শিক্ষার্থীদের সুলভ মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন