বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
‘গ্যাস্ট্রিক’ বলে কিছু নেই। উপসর্গ প্রতিরোধে প্রাণিজ আমিষ ও শর্করা কম খেয়ে শাকসবজি বেশি খেতে হবে। শরীরের ওজন বাড়ানো যাবে না।
মাহমুদ হাসান, বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় অধ্যাপক

বৈঠকে অনলাইনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় অধ্যাপক মাহমুদ হাসান বলেন, গলা ও বুক জ্বালাপোড়া প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে চিকিৎসকদের সহজ ভাষায় জনগণকে বোঝাতে হবে। পাকস্থলী থেকে মূলত অ্যাসিড বা জারক রস খাদ্যনালিতে চলে এলে গলা-বুক জ্বালাপোড়া করে। সাধারণ মানুষ তথাকথিত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবন করেন বছরের পর বছর। অথচ ‘গ্যাস্ট্রিক’ বলে কিছু নেই। উপসর্গ প্রতিরোধে প্রাণিজ আমিষ ও শর্করা কম খেয়ে শাকসবজি বেশি খেতে হবে। শরীরের ওজন বাড়ানো যাবে না।

শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ফারুক আহমেদ বলেন, একটু সচেতনতাই গলা-বুক জ্বালাপোড়া উপসর্গের জটিল অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

হাসপাতালের মেডিকেল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান তৌহিদুল করিম মজুমদার বলেন, গলা-বুক জ্বালাপোড়া থেকে কখনো কখনো বুকে ব্যথা হতে পারে। এ উপসর্গে যেসব জটিলতা দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে খাবার খেতে গেলে গলায় আটকে যায়, আলসার হয়, খাদ্যনালি সরু হয়ে যায়, ১ শতাংশের অবস্থা ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, বিশেষজ্ঞদের আলোচনা থেকে বোঝা গেল উপসর্গ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে কম জানার কারণে অনেককে নানা জটিলতায় ভুগতে হয় এবং বেশি বেশি ওষুধ খেতে হয়। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ থেকেও বিরত থাকতে হবে। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে গলা-বুক জ্বালাপোড়া চিকিৎসায় যে আধুনিক ব্যবস্থা আছে, সে সম্পর্কেও বেশি বেশি প্রচার চালাতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিয়ে অভিনয়শিল্পী মেহ্জাবীন চৌধুরী বলেন, বিশেষজ্ঞদের মতামত শোনার পর সবার জন্য তাঁর পরামর্শ হচ্ছে, পুরোপুরি পেট ভরে না খেয়ে পাকস্থলীর এক—তৃতীয়াংশ জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। যত ব্যস্ততাই থাকুক, সুস্থতার জন্য অন্তত হাঁটাহাঁটি করার জন্য সময় বের করে নিতে হবে।

ওষুধ সেবনের বিষয়ে শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মেডিকেল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের অধ্যাপক সাইদা রহিম বলেন, সচেতন থাকার পরও ৪০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁরা উপসর্গে ভোগেন। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে, সঠিক মাত্রার প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরস (পিপিআই) ওষুধ সেবন করতে হবে।

সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, গলা-বুক জ্বালাপোড়া উপসর্গে কমবেশি সবাই ভোগেন। তবে এই উপসর্গে বুকে ব্যথা হলে অনেকে বিভ্রান্তিতে ভোগেন যে এটা হৃদ্‌রোগ, নাকি ‘গ্যাসের চাপ’।

শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক গোলাম কিবরিয়া বলেন, প্রচলিত শব্দে যেটিকে ‘টক ঢেকুর’ ওঠা বলে, সেটি খাবার খাওয়ার পরপর বা কয়েক ঘণ্টা পরও হতে পারে। কিছু অপ্রচলিত উপসর্গও আছে, যেমন রাতে কাশি হওয়া, ঘুম না হওয়া, গলা ফ্যাসফেসে হয়ে যাওয়া এবং হাঁপানি ওঠা। উপসর্গ ঘাড় বা হাতের দিকে চলে এলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি আছে বলে ধরে নিতে হবে।

দেশের উপসর্গ পরিস্থিতি তুলে ধরে হাসপাতালের মেডিকেল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ঢাকায় এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনে ২২ জন গলা–বুক জ্বালাপোড়া উপসর্গে ভোগেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জ জেলার তিনটি গ্রামে পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৫ শতাংশ মানুষ গত তিন মাসে (সমীক্ষার সময়ে) কোনো না কোনো সময়ে এ উপসর্গে ভুগেছেন। ১৪ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার ভুগেছেন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশ মানুষ নিজে নিজেই পিপিআই ওষুধ সেবন করেছেন, যেগুলোকে তাাঁরা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বলে থাকেন। ২৭ শতাংশ বলেছেন, এ উপসর্গ তাঁদের জীবনযাত্রার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

হাসপাতালের মেডিকেল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মীর জাকিব হোসেন বলেন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর দিয়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি পান করা যাবে না। অতিরিক্ত পানি পানে পাকস্থলী স্ফীত হয়ে যায় এবং খাবার ওপরে উঠে আসে।

হাসপাতালের সার্জিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মামুনুর রহমান বলেন, উপসর্গগুলো দীর্ঘদিন ধরে থাকলে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। সেসব ক্ষেত্রে এন্ডোস্কোপি ও ল্যাপ্রোস্কোপি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়।

হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ সায়েদুল আরেফিন জানান, গলা-বুক জ্বালাপোড়া রোধে সচেতনতা সপ্তাহ পালনে সংবাদ সম্মেলন, আলোচনা সভা, গোলটেবিল বৈঠক, বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, পোস্টার সাঁটানো ও প্রচারপত্র বিতরণের কর্মসূচি চলছে।

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (বিপণন ও বিক্রয়) মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, গলা-বুক জ্বালাপোড়া রোধে দেশে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধও আছে। কোভিড মোকাবিলায় গত বছর মার্চে বিশ্বে রেমডেসিভির উৎপাদন অনুমোদন পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে এসকেএফ তা দেশে সহজলভ্য করেছে। গলা-বুক জ্বালাপোড়া রোধেও এসকেএফ অধিক কার্যকর ৯৫০ মাইক্রো প্যালেটসের পিপিআই ওষুধ এসোমেপ্রাজল বাজারে এনেছে।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন হাসপাতালের রেজিস্ট্রার শারমিন তাহমিনা খান এবং প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন