বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

আজকের আলোচনার মূল বিষয় চা–বাগানের নারী ও শিশুদের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা। তাদের সামাজিক রীতিনীতি, চলাফেরা অন্যদের চেয়ে আলাদা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে তারা এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। দারিদ্র্যের হারও বেশি। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কীভাবে তাদের আরও বেশি হারে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

শেলডন ইয়েট

default-image

বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে। কিন্তু বিশেষ করে যে দরিদ্র নারী ও শিশুরা চা–বাগানে কাজ করে, তারা কতটুকু সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আছে, সেটি দেখা প্রয়োজন। আমরা সবাই জানি যে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি বড় চা উৎপাদনকারী দেশ। চা–শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এর ফলে অনেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। পাশাপাশি এটা একশ্রেণির দরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্বাহে অবদান রাখছে। কিন্তু চা–বাগানের দরিদ্র শ্রমিকেরা বছরের পর বছর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ দরিদ্র মানুষের জন্যই সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি।

দরিদ্র মানুষদের সহায়তার জন্য সরকারের বেশ কটি কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু এসব কর্মসূচি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। চা–শ্রমিকেরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ প্রায় সব সূচকে পিছিয়ে আছে। এদের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি। বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরা সহিংসতার শিক্ষার হয়। মাত্র ১৫ শতাংশ শ্রমিক স্বাস্থ্যসেবা পান। চা–শ্রমিকের ৬০ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পায়। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশু প্রাথমিকে ভর্তি হয়। এটা জাতীয় গড় থেকে অনেক কম।

শ্রম আইন অনুযায়ী গর্ভবতী চা-শ্রমিকেরা ১৬ সপ্তাহের ছুটিসহ আরও কিছু সু‌বিধা পাওয়ার অ‌ধিকারী। কিন্তু প্রসবপূর্ব ও প্রসব–পরবর্তী সেবার সীমিত সুযোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতার মতো বিষয়গুলো নারী চা-শ্রমিকদের গর্ভকালীন জটিলতা ও মাতৃমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই চা–শ্রমিকদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মাতৃত্বকালীন সেবার জন্য অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এখানকার শিশু সুরক্ষার বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। চা-বাগানের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে ইউনিসেফ সব অংশীজনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করতে চায়। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে শুধু মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা না করে একে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

মেকোনেন ওল্ডগোর্গিস

default-image

বাংলাদেশ সরকার টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে কাজ করছে। এ জন্য তাদের ব্যাপক সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ রয়েছে, যা এসডিজি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এসডিজির একটি স্লোগান হলো ‘কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না’। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচ ও সামাজিক সুরক্ষার কার্যক্রম করে যাচ্ছে।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু। বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনসংখ্যা সুবিধা) ভোগ করছে। চা–বাগানে মানসম্মত প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি সর্বজনীন উপবৃত্তি কার্যক্রম নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন। সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিশুদের জন্য যথেষ্ট বিনিয়োগের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১০টি চা–বাগানসহ অনেক চা–বাগান রয়েছে। এখানে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এসব চা–বাগানের অধিকাংশই সিলেট বিভাগে। চা–বাগানের কর্মীর অর্ধেক নারী। কিন্তু এখানকার নারী ও শিশুরা দেশের জাতীয় গড় উন্নয়ন থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গর্ভবতী নারীর সেবাসহ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে চা–বাগানের শ্রমিকেরা পিছিয়ে আছে। সরকার এখন চা–শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েছে। কিন্তু এটা পর্যাপ্ত নয়। সরকার প্রচলিত সামাজিক সুরক্ষার নিয়মিত সুবিধা ও চা-বাগানের জন্য বিশেষ সুবিধা—দুটিই চা–বাগানের শ্রমিকদের জন্য জরুরি।

জাতিসংঘের চারটি প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ, ইউএন উইমেন ও আইএলও একসঙ্গে সিলেট বিভাগে চা–বাগানের নারী শ্রমিকের উন্নয়নের জন্য নাগরিক সমাজের সহযোগিতায় একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচি সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, সিলেটের প্রশাসন, বাংলাদেশে টি অ্যাসোসিয়েশন ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কাজ করছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলো, তিন মাস কাজ শুরুর পর কোভিডের সময় এটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের এই কর্মসূচি চা–বাগানের ঝুঁকিপূর্ণ নারী ও শিশুদের নীতিসহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, তথ্য সংগ্রহ বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করছে।

আব্দুর রাজ্জাক

default-image

চা–শ্রমিকদের সার্বিক জীবনমান নিয়ে আমরা গবেষণা করেছি। গবেষণায় দেখা গেছে চা–শ্রমিকেরা অনেক বিষয়ে পিছিয়ে আছেন। চা-বাগানের শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। একজন চা-শ্রমিক দৈনিক ন্যূনতম ১২০ টাকা মজুরি পান। মজুরির বাইরে তঁারা রেশনসুবিধা পান। কিছু সীমিত চিকিৎসা, শিশুদের জন্য পড়ালেখা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাও আছে। তবে বাগানভেদে এবং স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার মধ্যে তারতম্য রয়েছে। একটা ভালো বিষয় হলো, চা–বাগানের মালিকেরা স্থায়ী শ্রমিকদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করেছেন। ৬০ বছর বয়সে অবসরে যাওয়ার সময় তারা একটা এককালীন আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন এবং ১৫০-২০০ টাকা সাপ্তাহিক ভাতা পান। চা-বাগানে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার বিধান রয়েছে। এটাকে খুব ইতিবাচক বলতে হবে।

কিন্তু তারপরও আমাদের গবেষণায় এসেছে, চা-বাগানের ৬১ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ অতিদরিদ্র। নারীপ্রধান পরিবারগুলোতে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি। মূলত কম মজুরি ও অনান্য আয় উপার্জনের খুবই সীমিত সুযোগ দারিদ্র্যের এই উচ্চহারের জন্য দায়ী। পাশাপাশি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাল্যবিবাহ—এ রকম অনেক সূচকে চা-বাগানের শ্রমিকেরা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় পিছিয়ে আছেন।

স্থায়ী শ্রমিকদের বাসস্থানের জন্য জায়গা দেওয়া হয়। তবে কিছু বাগানে সুপেয় পানির অভাব রয়েছে। ২০ শতাংশ শ্রমিক এখনো খোলা জায়গায় মলত্যাগ করেন। কিছু বাগানে কাজের জায়গায় শেল্টার সুবিধা আছে। অনেক বাগানেই তা নেই। ফলে ঝড়–বৃষ্টির সময় তারা নিরাপদ জায়গায় সহজে আশ্রয় নিতে পারেন না।

চা–বাগানগুলো নিজস্ব উদ্যোগে শিশুদের জন্য স্কুল পরিচালনা করে। এটা একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সমস্যা হলো, এক বা দুজন শিক্ষক সব বিষয় পড়ান। সারা দেশের প্রথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকার থেকে প্রতি মাসে উপবৃত্তি পাচ্ছে। কিন্তু চা-বাগানের স্কুলে যারা পড়ে, তারা এই বৃত্তি পায় না। চা-বাগানের স্কুলগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি চালু করা অতীব জরুরি।

চা-শ্রমিকদের জন্য নেওয়া বিশেষ ‘সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি’র আওয়তায় এক-চতুর্থাংশ চা-শ্রমিক বার্ষিক ৫,০০০ টাকা ভাতা পেয়ে থাকেন। কিন্তু অস্থায়ী শ্রমিকেরা এই ভাতা পান না। স্থায়ী ও অস্থায়ী সব চা-শ্রমিকের জন্য এই ভাতাসুবিধা উন্মুক্ত করা দরকার।

বিশেষ ভাতা ছাড়া মাত্র ১২ শতাংশ চা-শ্রমিকদের পরিবার কমপক্ষে একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে সুবিধা পেয়ে থাকে। অথচ বাংলাদেশের আয় ও ব্যয় জরিপ থেকে আমরা দেখতে পাই, প্রায় ২৮ শতাংশ পরিবার কমপক্ষে একটি কর্মসূচি থেকে ভাতা পায়। এখানে বৈষম্য রয়েছে। আমরা গবেষণায় দেখেছি চা–বাগানে মাত্র ১২ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা মা ও দুগ্ধদানকারী মায়েরা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ভাতা পান। সরকার এই ভাতা কর্মসূচিকে শক্তিশালী করে ‘মা ও শিশুসহায়তা কর্মসূচি’ নামের একটি ভাতা কর্মসূচি চালু করেছে। চা-বাগানের সব অন্তঃসত্ত্বা নারীকে এই ভাতা কর্মসূচির আওতায় মাসিক ৮০০ টাকা প্রদান করা হলে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্রে্যর হার যথাক্রমে ২.৫ ও ৩.৬ শতাংশ কমে যাবে। এটি করা হলে বহুমুখী দারিদ্রে্যর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। কিন্তু এই কর্মসূচির দুটি শর্ত—সুবিধাগ্রহীতার বয়স ২০-৩৫ বছর এবং শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের জন্য সুবিধা, যা অধিকাংশ নারী পূরণ করতে পারেন না। চা–বাগানের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে এই শর্তগুলোকে শিথিল করা যেতে পারে।

মিতালী দত্ত

default-image

আমার এলাকা শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রায় প্রতিটি চা–বাগানে প্রাথমিক স্কুল আছে। কিছুদিন আগে একটি উচ্চবিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাগানে কাজ করা নারীদের অনেক সমস্যা। তাদের বিশ্রামের জায়গা নেই। ‍পানির ব্যবস্থা নেই। মাসিকের সময় স্বাস্থ্যসুবিধার কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। শ্রমিকেরা দৈনিক মাত্র ১২০ টাকা মজুরি পান। এটা দিয়ে সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসাসহ প্রায় কিছুই করা সম্ভব না। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু পারি করছি। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা—সবই তঁারা পাচ্ছেন। চা–বাগানের মালিকেরা যদি তঁাদের খাবার পানি, টয়লেট–সুবিধা বৃদ্ধি করে বিনা মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করে, তাহলে তাঁদের কষ্ট কিছুটা দূর হয়।

বজলে মুস্তাফা রাজী

default-image

নব্বইয়ের দশকে চা–বাগানের ভেতর এনজিও–কর্মীরা যেতে পারতেন না। বাগানের আশপাশে অবস্থান করে তঁাদের সহযোগিতা করতে হতো। এখন অবস্থা পাল্টেছে। বিভিন্ন সংস্থা তঁাদের সেবা দিচ্ছেন। তবে এর মধ্যে একটা সমন্বয় থাকা জরুরি। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে চা–শ্রমিকেরা তেমন অংশ নিতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে এনজিওগুলোও কোনো সহযোগিতা করতে পারে না। এখানে চা–শিল্পসংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষভাবে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। গত ৪০ বছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা খাতে এনজিওদের অভিজ্ঞতা হয়েছে। একে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

অ্যালেক্সসিউস চিছাম

default-image

চা–শিল্প একটি বিশেষ খাত। অন্য খাতের সঙ্গে এর তুলনা করলে চলবে না। তাই এই শিল্পের শ্রমিক— সে স্থায়ী হোক বা অস্থায়ী হোক, তঁাদের জন্য বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। মালিক, চা সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন সবার দায়িত্ব তঁাদের উন্নয়নে কিছু করা। জীবনের শুরু থেকেই তঁারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। সরকারের অনেক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে। এটা পাওয়ার ক্ষেত্রে যদি তঁাদের সহযোগিতা করা যায়, তাহলে তঁারা আরও কিছুটা ভালো থাকতে পারবেন। শ্রম আইন অনুসারে সব শিল্পে সামাজিক বিমার বিষয়টি বলা হয়েছে। বাংলাদেশ চা সমিতি ও চা–শ্রমিক ইউনিয়ন দুই বছর অন্তর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে। সেখানে তারা তাদের সব সদস্য প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক বিমার আওতায় আনার কথা বলেছে। মাত্র কয়েকটি বাগানে গ্রুপ বিমা বা সামাজিক বিমা চালু হয়েছে। সব চা–বাগানে বিমাব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। সামাজিক বিমার ক্ষেত্রে শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিতে পারে।

দেওয়ান মো. এমদাদ হক

default-image

চা–শ্রমিকের উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘের চারটি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করছে। আমরা ইউএনএফপিএ থেকে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করে থাকি। এখানে নারী ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে চা–বাগান থেকে কিছু সেবা দেওয়া হয়। আবার সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু সেবা দেওয়া হয়। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। চা–বাগানগুলোর অবস্থান প্রান্তিক অঞ্চলে হওয়ায় এগুলোর আশপাশে তেমন কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। তাই চা–বাগান এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা খুব চ্যালেঞ্জিং। কোনো গর্ভবতী মায়ের জটিলতা দেখা দিলে তঁাদের কোথাও সহজে কোনো ভালো সেবাকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে যঁারা স্থায়ী কর্মী, মালিকেরা তঁাদের একপ্রকার স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু যঁারা অস্থায়ী, তঁাদের তেমন কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে চা–শ্রমিকদের জন্য একটা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা জরুরি।

সায়েমা হক বিদিশা

default-image

আজকের মূল প্রবন্ধে চা-শ্রমিকদের অনেক সমস্যার কথা বলা হয়েছে। নারীদের মাতৃত্বকালীন ভাতার ক্ষেত্রে যখন বলা হয়, পরিবারে আট হাজার টাকার কম আয় থাকতে হবে; দুটির বেশি সন্তান থাকা যাবে না; সেটা কিন্তু অনেক গর্ভবতী মাকে ভাতা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। এ ক্ষেত্রে পরিবারে আয়সীমা বাড়ানো ও সন্তানধারণের সীমা কমপক্ষে তিনজন করা প্রয়োজন। সরকার সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এখনো প্রয়োজনীয়সংখ্যক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। কিন্তু চা-শ্রমিকদের মতো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুরা যেন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে আসতে পারে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

নারীদের স্বাস্থ্য, মাসিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি খাতের এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। তাঁদের মজুরিবহির্ভূত সুবিধা যেমন খাওয়ার পানি, স্বাস্থ্য, শৌচাগার ইত্যাদির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। চা-বাগানের নারী ও শিশুদের লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচের মধ্যে আনা জরুরি। এভাবে উদ্যোগ নিতে পারলে চা-বাগানের নারী ও শিশুদের মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান

default-image

সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকার ২ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় করে। এখান থেকে পেনশন বাদ দিলে থাকে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে মা ও শিশুর কৌশলপত্রে ৭০ লাখ মা ও শিশুকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার কথা ছিল। সেখানে ১১ লাখ মা ‍ও শিশুকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক জনগণের উন্নয়ন শুধু অধিকারের বিষয় নয়, জাতীয় উন্নয়নেরও বিষয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কখনো দেশের স্বাভাবিক গড়ের কাছে নিতে পারব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি না দেওয়া হয়। বাংলাদেশে ২৬ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। সেখানে চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে দারিদ্রে্যর হার ৬১ শতাংশ। তাই চা–শ্রমিকদের জন্য আলাদা পদক্ষেপ প্রয়োজন।

চা-বাগানের অনেক স্কুল এনজিওরা চালায়। এসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারি বৃত্তি পায় না। তাদের সরকারি বৃত্তি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশ হতে যাচ্ছি। এসব বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, চা-বাগানসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।

শাহ আলম

default-image

চা–বাগানে সাধারণত একটি পরিবারের দু–তিনজন আয় করেন। সবার আয় পরিবারে আসে। চা-বাগানে ৫০ শতাংশ নারী। তাঁরা আমাদের সম্পদ। আমরা তাঁদের বাসস্থান, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্ব দিই। গ্রুপ হাসপাতাল আছে। চা-বাগানের কর্মীসহ তাঁর পরিবারে সবাই স্বাস্থ্যসুবিধা পান। ১৯৩৯ সাল থেকে এখানে মাতৃত্ব–আইন আছে। একজন গর্ভবতী নারী ৮ থেকে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন সুবিধা পান। তাঁদের জন্য আমাদের প্রশিক্ষিত মিডওয়াইভস, নার্স ও চিকিৎসক রয়েছেন। চা-বাগান থেকে কেউ অবসর নিলে তাঁর সন্তানদের আমরা চাকরি দিই।

বাগানের মালিকানায় বর্তমানে ১৭০টি প্রাইমারি স্কুল আছে। আমি ১৯৭৩ সাল থেকে চা-বাগানের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭২–৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা সরকারীকরণ করেন। তখন চা-বাগানেও অনেক স্কুল সরকারি করা হয়। বর্তমান প্রক্ষাপটে চা–বাগানের অন্য স্কুলগুলো সরকারি করা দরকার। চা–শ্রমিকদের আমরা রেশন দিয়ে থাকি। চা-বাগানের শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা আছে। এটা একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ ফান্ডে ৬০০ কোটি টাকা আছে। সরকারি নিয়মে এটা আবার বিনিয়োগ করা হয়।

চা-বাগানের বিষয়টি দেখা হয় ৬০ শতাংশ কৃষি আর ৪০ শতাংশ শিল্প হিসেবে। কিন্তু কৃষিঋণের সুবিধা আমরা পাই না। আমাদের টিকে থাকার বিষয়টিও ভাবতে হবে। বছরে আমাদের কত উৎপাদন হবে, সেটা বলা যায় না। অথচ উৎপাদনের ওপর ব্যয় নির্ভর করে। চা অকশনে বিক্রি হয়। এর আমরা মূল্য নির্ধারণ করতে পারি না। কোভিডের জন্য গত দুই বছরে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। উৎপাদন খরচের কম টাকায় আমাদের চা বিক্রি করতে হয়েছে। আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকের কল্যাণে আমরা কাজ করছি।

শেখ মুসলিমা মুন

default-image

উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যমসহ সবার ভূমিকা রয়েছে। চা-বাগানের মেয়েরা কম মজুরি পান। আমাদের দেশে প্রায় ক্ষেত্রে মেয়েদের কম মজুরি দেওয়া হয়। কোনোভাবেই এটা ঠিক নয়। নারী, শিশুসহ চা-বাগানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেকে না জানার জন্য এসব সুযোগ নিতে পারেন না। এনজিও, গণমাধ্যম তাঁদের সচেতন করতে পারে। শিশুদের যেন বাল্যবিবাহ না হয়, দ্রুত গর্ভধারণ না করে—এসব বিষয়েও সচেতন করতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চা–বাগানে শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থা না থাকায় নারীরা পানি পান করেন না। ফলে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা হয়। আমরা চাই, চা-বাগানের নারী, শিশুসহ সবাই যেন ভালো থাকেন। এখানে কেউ একা কাজ করলে সব সমস্যার সমাধান হবে না। সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

কামরুল হাসান খান

default-image

চা-শ্রমিকেরা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অংশ। তঁাদের মৌলিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পারিবারিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ‘চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম’ বাস্তবায়ন করছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও পঞ্চগড় জেলার চা-শ্রমিকেরা এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত। তঁাদের জীবনমান উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। এ জন্য তথ্য সংগ্রহ ও ডেটাবেইস দরকার। তাই সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন কার্যালয়গুলো নির্ধারিত ফরম অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ৫০ হাজার চা-শ্রমিককে প্রতিবছর এককালীন পাঁচ হাজার টাকা করে প্রদান করে থাকে। সারা দেশে সরকার মাসিক ৫০০ টাকা হারে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করে থাকে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়, যা চা-শ্রমিকদের সন্তানেরাও পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ কর্তৃক মুজিব বর্ষ উপলক্ষে চা-শ্রমিকদের মধ্যে ২০০টি গৃহ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে ৫৭টি গৃহ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেগুলো চা-শ্রমিকদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, যা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

মো. হুমায়ুন কবীর

default-image

বাংলাদেশ চা সমিতি ও চা-শ্রমিকদের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে দুই বছর পরপর চা-শ্রমিকদের ভাতা নির্ধারিত হয়ে থাকে। একজন শ্রমিক দৈনিক ১২০ টাকা মজুরির সঙ্গে অন্য সুযোগ–সুবিধাসহ হিসাব করলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার টাকা। স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক সাপ্তাহিক ভিত্তিতে চারজনের রেশন পেয়ে থাকেন। বাগানের মালিকপক্ষ শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে থাকেন। বাংলাদেশ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন আটটি শ্রমকল্যাণকেন্দ্রের মাধ্যমেও তাঁদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এখানে তাঁদের বিনা মূল্যে ওষুধ ও পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী দেওয়া হয়।

চা-শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সব সময় সচেতন রয়েছে। আমরা ক্রমাগত তাঁদের জন্য বাজেট বৃদ্ধি করছি। তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য পরিদর্শকের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ জন করেছি। দেশে ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে চা-শিল্পের ট্রেড ইউনিয়ন সবচেয়ে শক্তিশালী। জীবনমানের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন তাঁদের জীবনযাপন প্রণালির পরিবর্তন, সঞ্চয়প্রবণতা বৃদ্ধি, সচেতন করা এবং মা ও শিশুদের অপুষ্টি দূর করা, প্রাথমিক শিক্ষাসহ পরবর্তী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। তাঁদের অন্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে।

নাজনীন কাউসার চৌধুরী

default-image

মোট ১৬৭টি অনুমোদিত চা–বাগানের মধ্যে ৩৫টি বাগানের তথ্য আজকের জরিপে এসেছে। ১২০ টাকা মজুরি দেওয়া হয় ২৪ কেজি চা তোলার জন্য। এটা নির্ধারিত সময়ের আগেই তঁারা করতে পারেন। কেউ যদি আট ঘণ্টা কাজ করেন, তাহলে তিনি অনেক বেশি মজুরি পান। চা তোলার ভরা মৌসুমে অনেক শ্রমিক ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পেয়ে থাকেন। জরিপে এটা এলে ভালো হতো।

১৬৮ বছরের ইতিহাসে গত বছর সবচেয়ে বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে। আমাদের স্থানীয় বাজার অনেক বড় হয়েছে। এ জন্য উৎপাদন ও রপ্তানির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমাদের অন্য সবকিছু ঠিক থাকে বলেই সরবরাহ চেইন সব সময় কার্যকর থাকে। দূষণের জন্য সাধারণত যেকোনো ফসলের পাশে শৌচাগার থাকে না। এ জন্য চা-বাগান থেকে শৌচাগার কিছুটা দূরত্বে রাখা হয়। নারী বা পুরুষ শ্রমিকেরা যখন কাজ করেন, তখন মালিক তাঁর নিজের শৌচাগার বা অন্য কোনোভাবে শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ করে দেন। এখানে মাদারস ক্লাব আছে। এ ক্লাবে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সমাধান করা যায়।

চা সমিতিতে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাকল্যাণ ট্রাস্ট ও শ্রমিককল্যাণ তহবিল আছে। এনজিও পরিচালিত স্কুলে এ দুটি উৎস থেকে অর্থ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে চা-শিল্পের একটা রোডম্যাপ করা হয়, ২০১৭ সালে এটা অনুমোদিত হয়।

শামসুল আলম

default-image

আজ যে জরিপ উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটাতে শুধু সিলেটের ৩৫টি চা-বাগানের তথ্য এসেছে। সারা দেশের চা-বাগানের তথ্য এলে ভালো হতো। উপস্থাপনায় বেশ কিছু বিষয় এসেছে। কিন্তু শিশু ও মাতৃমৃত্যু, প্রাতিষ্ঠানিক–অপ্রাতিষ্ঠানিক জন্মহার, গড় আয়ু—এই বিষয়গুলো আসা দরকার ছিল। যেহেতু চা-বাগানে সরকারি ও এনজিওদের স্কুল আছে, তবুও কেন শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে, এটা আমারও প্রশ্ন। চা-শ্রমিকদের দৈনিক ১২০ টাকা মজুরির সঙ্গে যদি সবকিছু মিলিয়ে ৪০০ টাকা হয়, এটা তো কৃষিশ্রমিকের চেয়ে কম। কৃষিতে একজন শ্রমিক কমবেশি ৫০০ টাকা পান।

২০১৫ সালের ১ জুন সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রয়োজনে সামাজিক কর্মসূচি এসেছে। ২০১৫ সালে আমরা দেখলাম, ছোটখাটো প্রায় ১৪৭টি কর্মসূচি আছে। এগুলো গ্রুপ করে ২০১৫ সালে সামাজিক কৌশলপত্র তৈরি করা হয়। ২০২৫ সালের মধ্যে যাঁরা হতদরিদ্র, তাঁদের সবাইকে কোনো না কোনো সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে আনা হবে। বেকার ভাতা, ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স ও সরকারি–বেসরকারি খাতে পেনশন স্কিম চালু করা প্রয়োজন। সরকার ব্যক্তি খাতে পেনশন চালুর কথা ভাবছে। আমরা শহর-গ্রামের পার্থক্য কমিয়ে আনতে চাচ্ছি। এখন এমন গ্রাম নেই, যেটা পাকা রাস্তার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। গ্রামীণ উন্নয়নের জন্যই প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে, যেন কৃষির বাইরেও কর্মসংস্থান তৈরি হয়।

সব প্রান্তিক মানুষের কাছে উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। ক্রমান্বয়ে ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। এখন বাজেটের ১৭ শতাংশের বেশি ব্যয় হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা খাতে। এটা দেশের জন্য সুখবর। সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ব্যয় বর্তমানে ৩ শতাংশের ওপরে রয়েছে এবং তা ক্রমান্বয়ে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। চা-বাগানের কর্মীসহ জীবনচক্রে ঝুঁকিতে রয়েছে, এমন মানুষদের আরও সহায়তার আওতায় আনা হবে।

ফিরোজ চৌধুরী

আজকের গোলটেবিল বৈঠকে অনেকগুলো পরামর্শ ও সুপারিশ এসেছে, আশা করা যায় নীতিনির্ধারকেরা তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

সুপারিশ

  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গর্ভবতী নারীর সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চা-বাগানের শ্রমিকেরা দেশের জাতীয় গড় উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে আছেন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • চা-শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের আরও সুবিধা বাড়ানো দরকার।

  • চা-বাগানের মেয়েদের যেন বাল্যবিবাহ না হয়, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

  • চা-শ্রমিকের সবাইকে সামাজিক বিমার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

  • চা-বাগানে এনজিও পরিচালিত স্কুলের শিক্ষার্থীদের সরকারি বৃত্তি প্রদান অত্যন্ত জরুরি।

  • চা–বাগানের মাত্র ১২ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা ও দুগ্ধদানকারী মায়েরা সরকারের মা ও শিশুসহায়তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত। আরও বেশিসংখ্যক নারী চা–শ্রমিক যেন এই কর্মসূচির আওতায় আসেন, সে বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন