বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

প্রায় এক বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনলাইনে পড়াশোনা করতে গিয়ে অনেকের চোখে চাপ পড়েছে। অনেক মেয়ে ঝরে পড়ছে। তারা স্কুলে যাচ্ছে না। অনেক অভিভাবক মনে করছেন, মেয়েদের বিয়ে দেওয়াই নিরাপদ। এ জন্য বাল্যবিবাহের হার আগের থেকে বেড়েছে। বাল্যবিবাহের ফলে আবার মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আজকের আলোচনায় এসব বিষয় আসবে।

শাহীন আনাম

default-image

অনেক দিন থেকে এ বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাল্যবিবাহ একটা মেয়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমান। কারণ, পরবর্তী সময়ে একটা মেয়ের বেড়ে ওঠা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তার জীবনের স্বপ্ন, আশা—সব শেষ হয়ে যায়। মেয়েদের জীবনে এর একটা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যায়। বাল্যবিবাহ রোধে সরকারেরও আন্তরিকতার অভাব নেই। বিশ্বে যেসব দেশে বাল্যবিবাহ বেশি হয়, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সামাজিক সূচকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছি।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সামাজিক ধারণা হলো একটা মেয়ের বিয়ে হলে সংসার দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না। বিয়ের সঙ্গে তার জীবনের স্বপ্নও শেষ হয়ে যায়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সাহায্যে ব্যাপক সচেতনতা চালানো প্রয়োজন যে একটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেই তার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় না।

দিনাজপুরে আমাদের একটি সহযোগী সংগঠন আছে। করোনার সময় বিয়ে হয়েছে, এমন ৫০টি মেয়েকে তারা স্কুলে ফিরিয়ে এনেছে। আপনারা অনেকে হয়তো প্রথম আলোতে একটি সুন্দর ছবি দেখেছেন যে একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রীর সন্তানকে কোলে নিয়ে পড়াচ্ছেন। আর ওই ছাত্রী পড়াশোনা করছে। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে, যারা মনেপ্রাণে চায় যে মেয়েরা স্কুলে পড়ুক, স্কুলে ফিরে আসুক। আমাদের নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

আমরা দেখি কোনো মেয়ের বিয়ে হলে তার বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। আজকের আলোচনায় উপস্থিত নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাববেন বলে আশা করি। বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিক সহযোগিতা দিতে হবে। আমরা আশঙ্কা করছিলাম এবং বলে যাচ্ছিলাম কারোনায় অনেক মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। স্কুল খুললে তাই দেখলাম বিশেষ করে নবম-দশম শ্রেণিতে প্রায় অর্ধেক মেয়ে স্কুলে আসেনি। ধারণা করছি, এই মেয়েগুলোর বিয়ে হয়ে গেছে।

শাহানা হুদা রঞ্জনা

default-image

আমার তথ্যগুলো বিভিন্ন পত্রিকা থেকে নেওয়া। সম্প্রতি আমাদের নারী ক্রিকেট দল ভারতকে হারিয়েছে। রাঙামাটির একটা স্কুল থেকে পাঁচজন মেয়ে খেলেছে। ২০১৭ সালে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি প্রাথমিক গোল্ডকাপের একটি মেয়ে হ্যাটট্রিক করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়েছিল। এ দলের সাতজন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তারা এখন ফুটবলের বদলে সংসার করছে।

আমাদের তথ্য থেকে দেখা যায় শতকরা ৫১ জন মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। কারোনায় লকডাউনের সময় টেলিফোনে আমরা জরিপ করেছিলাম। ২১ জেলার কয়েকটা উপজেলায় দেখেছি ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে বয়স, এমন ১৩ হাজার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। করোনার পর দেশের অনেক স্কুলে নবম ও দশম শ্রেণিতে ছাত্রী প্রায় ছিলই না। কারণ, তাদের বিয়ে হয়েছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল যে জরিপ করেছে, সেখানেও এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সবচেয়ে বেশি বিয়ে হয়েছে বরগুনা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও লক্ষ্মীপুরে। এদের ৫০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ১৭ বছর। ৭৮ শতাংশ বিয়ে মা-বাবা নিজেরাই দিয়েছেন। ৩৫ শতাংশ বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছে। ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার সময় ১৩ শতাংশ বাল্যবিবাহ বেড়েছে। গত ২৫ বছরে এটা সর্বোচ্চ। সরকারি পরিসংখ্যানে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এ সংখ্যা ৩৭ শতাংশ। সরকার মনে করছে, করোনায় এ সংখ্যা বেড়েছে।

সরকার এ বছর ৭৭ লাখ বই কম ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করোনার সময় অনেক কিন্ডারগার্টেন ও নন-এমপিওভুক্ত স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধরনের ৪০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার বন্ধ হয়ে গেছে। গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা এখানে পড়ত। গণসাক্ষরতা অভিযান তাদের এডুকেশন ওয়াচ রিপোর্টে বলেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। সেটা অর্জিত হয়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা যায়, দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণভাবে রোধ করাই লক্ষ্যমাত্রা। যাদের বাল্যবিবাহ হয়েছে, তাদের অধিকাংশেরই কাবিননামা নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাবিননামা নেওয়ার আগেই অনেক মেয়ে নির্যাতিত হয়ে সন্তান নিয়ে ফেরত আসছে।

লুকিয়ে, গভীর রাতে বিভিন্ন কৌশলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দরিদ্র পরিবারে মেয়ে বড় হলে তারা এটাকে বোঝা মনে করে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নদীভাঙন এলাকায় এর প্রবণতা অনেক বেশি। বাল্যবিবাহের এমন কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই, যেটা দিয়ে আমরা এক বছরের সঙ্গে অন্য বছরের তুলনা করতে পারি যে বাল্যবিবাহ বেড়েছে না কমেছে। এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

মো. আক্তারুজ্জামান ভূঞা

default-image

মেয়েরা যেমন ঝরে পড়ছে, তেমনি ছেলেরাও ঝরে পড়ছে। ঝরে যেন না পড়ে, সে জন্য আমাদের কিছু উদ্যোগ আছে। এ জন্য আমাদের উপবৃত্তি রয়েছে। কী কারণে ঝরে পড়ছে, আমরা সেটা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। এগুলো নিয়মিত তদারক করি।

আমার কাজের ক্ষেত্র হলো মাধ্যমিক পর্যায়ে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলার বিষয়টা দেখা। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সঙ্গে খেলাধুলায় যুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন এনেছি। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা যেভাবে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাতে ঝরে পড়ার হার অনেক কমে যাবে। ঝরে পড়ার অনেক কারণের মধ্যে একটা হলো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ভীতি। পড়াশোনাবান্ধব কিছু প্রক্রিয়া আরোপ করার চেষ্টা করছি। এটা নিয়ে পাইলটিং চলছে। আশা করছি এর মাধ্যমে ঝরে পড়ার হার অনেকটা কমে যাবে।

ছেলেমেয়েরা যেন ঝরে না পড়ে, সে জন্য দুপুরে শিক্ষার্থীদের খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। করোনার জন্য সেটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষার্থী ঝরে না পড়ার জন্য এ বিষয়গুলো আনা হয়েছিল। আজকের আলোচনায় যে পরামর্শ আসবে, সেটা আমাদের উদ্যোগের মধ্যে বিবেচনায় আসবে।

মো. ইকবাল হোসেন

default-image

২০২০ সালের মার্চ থেকে করোনা শুরু হয়। তারপর আসে লকডাউন। এ সময় বাল্যবিবাহের খোঁজখবর রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম, এরই মধ্যে অনেক বাল্যবিবাহ হয়েছে। এর অনেক বিয়ে নিবন্ধন হয়নি। মেয়েদের বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে কাজি সাহেবরা নিবন্ধন করেন না। আমি অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কাজিরা বাল্যবিবাহ দেন না।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ৩৯ হাজার বিয়ে হয়েছে। এর আগে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ বিয়ে হতো। এখন আমাদের একটা জরিপে দেখা গেছে, ইউনিয়নপ্রতি ১১৮টি বিয়ে হয়েছে। আগে একটি ইউনিয়নে প্রায় ৩০০ বিয়ে হতো। বিয়ের সংখ্যা কমে আসার অন্যতম কারণ হলো আমরা বাল্যবিবাহ দিই না। তাহলে কেন বাল্যবিবাহ হচ্ছে?

আমাদের জানামতে, বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্য। একজন গরিব মানুষের তিন-চারটা মেয়ে থাকলে মেয়েদের নিয়ে তিনি খুব বিপদে থাকেন। দারিদ্র্য তো থাকেই, তারপর বখাটেরা এমনভাবে উৎপাত করে যে মেয়ের পরিবারের পক্ষে তাদের সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা এমনও খবর দেখি, বাবা, ভাই প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন পর্যন্ত হয়েছেন।

আমার অফিসে কেউ যদি বাল্যবিবাহের জন্য আসে, আমি না করে দিই। বিভিন্ন জেলায় কাজিদের নিয়ে সভা করে বলে দিয়েছি, কোনোভাবেই যেন বাল্যবিবাহ না দেয়। কেউ বাল্যবিবাহ দিতে আনলে যেন প্রশাসনকে জানায়।

মমতাজ আরা বেগম

default-image

স্কুলে না ফিরলে মেয়েদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি। আমরা একটা ফার্নিচার করতে গেলে দেখে নিই কাঠ পরিণত কি না। তা না হলে ফার্নিচার ঘুণে নষ্ট হয়ে যাবে। একটা মেয়ের যদি বাল্যবিবাহ হয়, তাহলে সে ভেতরে-ভেতরে শেষ হয়ে যায়। তার বিভিন্ন সমস্যায় তাকে বলা হয় জিনে ধরেছে। সে শিশু হয়ে আরেক শিশুর জন্ম দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই শিশুও নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগে। এরা ব্যক্তিগত জীবনসহ সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।

মা-বাবা প্রধানত দারিদ্র্য ও বখাটেদের উৎপাতের জন্য বিয়ে দেন। অনলাইনে তাদের অধিকাংশই পড়াশোনা করতে পারেনি। আবার অনেক ক্ষেত্রে ছেলেরা অনলাইনে পড়তে পারলেও মেয়েরা পারেনি। মেয়েরা যখন বাড়িতে বসে থাকে, তখন তাকে বোঝা মনে করা হয়। বাধা এলেও এলাকা পরিবর্তন করে বিয়ে দেওয়া হয়।

আমরা ৬১ জন বিবাহিত মেয়েকে স্কুলে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। আর ১৬৫ জন অবিবাহিত মেয়েকে স্কুলে আনতে পেরেছি। এখন প্রশ্ন, কীভাবে স্কুলে এনেছি। শিক্ষক, বিবাহিত মেয়েদের শ্বশুর-শাশুড়ি, এলাকার সম্ভ্রান্ত—সবার সঙ্গে কথা বলে তাদের স্কুলে আনার ব্যবস্থা করেছি।

যাঁরা মেয়ের বিয়ে না দিয়ে পড়াচ্ছেন, তাঁদের পুরস্কার দিয়েছি। এমন ৬০ জন অভিভাবককে আমরা পুরস্কার দিয়েছি। এটা করতে গিয়ে অনেক বাধার মুখে পড়েছি। অনেক পরিবার কথাই বলতে চায় না। তারা মনে করে বিয়ের পর মেয়েদের পড়ার দরকার নেই। একই এলাকার কাজি যেন অন্য এলাকায় গিয়ে বিয়ে না পড়াতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জন্ম, মৃত্যু ও বিয়ে নিবন্ধন হওয়া জরুরি। মেয়েদের জুডো-কারাতে শিখিয়েছি, যেন তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়। এসব কাজে আমাদের সহযোগিতা দিয়েছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

উম্মে নাহার

default-image

২০১৯ সাল থেকে আমরা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কাজ করছি। আমরা বাবা ও মায়েদের বোঝাই। এটা নিয়ে বিতর্ক করি। বাল্যবিবাহ রোধে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কাজ করেছি। কিন্তু কোভিড এসে অনেক ক্ষতি করেছে। প্রায় দুই বছর স্কুল বন্ধ ছিল। মেয়েরা এ সময় বাড়িতে ছিল। মা–বাবা সর্বক্ষণ তাদের দেখেছে। ঘটক এসে অভিভাবককে উসকে দিয়েছে। এ জন্য কোভিডের সময় অনেক বাল্যবিবাহ হয়েছে।

আমরা ৫৬টি বিবাহিত মেয়েকে স্কুলে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। এর মধ্যে ৪০ জন এসএসসি পাস করেছে। ৬৪ জন অবিবাহিত মেয়েকে স্কুলে এনেছি। সহজে এ কাজ করতে পারিনি। অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যারা এসএসসি পাস করেছে, সরকারি–বেসরকারিভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। আমরা কয়েকটি স্কুলে কাজ করেছি। সেখানে এ উন্নতিটা হলো। কিন্তু সারা বাংলাদেশে তো এমন অবস্থা রয়েছে। আমরা দেখেছি যে একটা বিবাহিত মেয়েকে স্কুলে ফিরিয়ে আনা কত কষ্টকর। কয়েকটি পক্ষকে বোঝাতে হয়। তাদের অনেক কাউন্সেলিং করতে হয়। আশা করি মেয়েগুলো যেন উচ্চশিক্ষা নিতে পারে, সে বিষয়ে আপনারা সহযোগিতা করবেন।

নবনীতা চৌধুরী

default-image

এটি একটি অত্যন্ত জরুরি আলোচনা। বাল্যবিবাহের কথা বলতে গেলে একটা বিষয় সামনে আসে, সেটা হলো সঠিক তথ্য। এ বিষয়ে পরিসংখ্যানের ঘাটতি আছে। প্রায় কারও কাছে সঠিক তথ্য নেই। জাতীয়ভাবে এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আশঙ্কাজনক হারে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। এটা শুধু এনজিওগুলোর ইস্যু থাকতে পারে না। এটা জাতীয় ইস্যু হওয়া উচিত। কোভিডের আগেও মেয়েরা বেশি ঝরে পড়ত। ৫১ শতাংশ মেয়ে যে ঝরে পড়ে, এটা কোভিডের আগের পরিসংখ্যান। নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে কোভিডের সময় বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়েছে। কেউ জানি না কত বেড়েছে। এ বিষয়টি জাতীয়ভাবে দেখা উচিত। বাল্যবিবাহমুক্ত জেলা, উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে বাল্যবিবাহের বিষয়টি স্বীকার করা হচ্ছে না।

দেশে কতটা বাল্যবিবাহ রোধ করা গেছে, এর পরিসংখ্যান রাখা হয়। এক গ্রামে প্রতিরোধ হলে অন্য গ্রামে নিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। নৌকায় বিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে বিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের একটি দেশ। এখানে দারিদ্র্যের জন্য বাল্যবিবাহ হবে, এটি এখন আর মেনে নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। যে ছেলের কাছে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার কতটুকু সামর্থ্য আছে, একটি মেয়ের যাবতীয় খরচ বহন করার—সেটাও দেখা উচিত।

কোনো মেয়ের বাড়িতে খোঁজ নিতে গেলে বলে বেড়াতে গেছে। স্কুলে খোঁজ নিলে বলে আজ আসেনি। পরের দিনও স্কুল একই কথা বলছে। অর্থাৎ স্কুলেরও এমপিওভুক্তি চলে যাওয়ার ভয় আছে। প্রতিটি বিষয় দেখেতে হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তারা যেন কোনোভাবে পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিয়ের ক্ষেত্রে কাবিন বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করা জরুরি। আমার কাছে মনে হচ্ছে, বাল্যবিবাহের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে।

আবদুল্লাহ আল মামুন

default-image

ক্ষতিটা শুধু একজন মেয়ে বা পরিবারের জায়গা থেকে দেখলে হবে না। দেশের জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ মেয়ে। তারা যদি যোগ্য নাগরিক হয়ে বেড়ে না ওঠে, তাহলে এটা দেশের অর্থনীতিতে ভীষণ ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। মেয়েরা স্কুলে না গেলে নারীর উন্নয়ন হবে না। ক্ষমতায়ন হবে না। এ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারীর উন্নয়ন মানে জাতীয় উন্নয়ন, জাতীয় ক্ষমতায়ন এভাবে দেখতে হবে।

৫১ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। যে ৪৯ শতাংশের হচ্ছে না, তারা আসলে কী করছে। তাদের স্বপ্ন কি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এমন কোনো গবেষণা তথ্য–উপাত্ত আমাদের কাছে নেই। মেয়েদের নিয়ে অধিকাংশ অভিভাবকের স্বপ্ন হলো একটি ভালো বিয়ে। এ ধারণা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে হবে। লেখাপড়া শিখে প্রত্যেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন দেখে। বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মেয়েদেরও এ স্বপ্ন দেখেতে হবে। তার জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বিয়ে একটি অনুষঙ্গ। কিন্তু বিয়েই একটি মেয়ের স্বপ্ন হতে পারে না।

যে ৪৯ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়নি, তারা কি কোনো রোল মডেল হতে পেরেছে। বাল্যবিবাহ না হওয়ার জন্য তাদের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে। এ জায়গায় আমাদের সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের কাজ করতে হবে।

আমরা চাইলে কালকেই বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পারব না। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে কতটা কমিয়ে আনা যায়। একই সঙ্গে যাদের বিয়ে হয়ে যাবে, তাদের জন্য প্ল্যান বি থাকতে হবে। যেন তারা স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে কাজ করতে হবে।

বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। যে ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, কেন মেয়ে ও তার পরিবারকে এর সব দায় নিতে হচ্ছে। কেন ৫১ ভাগ পুরুষ যারা এই মেয়েদের বিয়ে করছে, তাদের অভিযুক্ত করছি না। এদের সামাজিক লজ্জা দিতে হবে। সব আলোচনা মেয়ে ও পরিবারকেন্দ্রিক হয়। এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তাহমিনা হক

default-image

শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরা, বাল্যবিবাহ—এসব বিষয়ে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক জরিপ থাকা দরকার। ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও বিবিএস যৌথভাবে এ জরিপ করছে। এটা আমরা খুব দ্রুত করব। আমাদের এ জরিপ থেকে কিশোর-কিশোরীদের ঝরে পড়া, নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমসহ বিভিন্ন বিষয় জানা যাবে। বিষয়টা এমন না যে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত একটি মেয়েকে স্কুলে রাখলে বা বিয়ে না দিলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

একটি মেয়ে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, ক্ষমতায়িত হবে, নেতৃত্বে আসবে, এটা ওই মেয়ে ও তার পরিবার—দুদিক থেকেই উপলব্ধি করতে হবে। গোপনে বিয়ে দিচ্ছে কেন, কারণ তারা এটাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। সবাই মিলে বুঝতে পারলে গোপন বলে কিছুই থাকবে না। এ জায়গায় আমাদের কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে।

সবাই জনসংখ্যার সুবিধার কথা বলি। কন্যাশিশুরা কি জনসংখ্যার সুবিধার অংশ নয়। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে সামনে যেতে পারব? আগামী ১২ থেকে ১৫ বছর পর আমরা জনসংখ্যার সুবিধা হারাতে শুরু করব। এর পর থেকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য যুবাদের চার গুণ দক্ষ করতে হবে। মেয়েদের স্কুলে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাজ, অর্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

মৌসুমী শারমিন

default-image

আমাদের কাজের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা পথে থাকে বা ছিন্নমূল, তাদের জন্মনিবন্ধন অনেক বড় সমস্যা। ভাসমান জন্মনিবন্ধনের জন্য যে তথ্য লাগে, সেটা তাদের নেই। ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য সরকারের দিক থেকে এমন উদ্যোগ নিতে হবে, যেন তারা জন্মনিবন্ধনের আওতায় আসতে পারে।

জন্মনিবন্ধন না থাকার জন্য তারা স্কুলে ভর্তির সময় বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা যখন স্কুলে যাওয়ার কথা বলছি, সেখানে কিছু মানুষ প্রথমেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। পরবর্তী সময়ে বিয়েসহ সব ধরনের কাজের জন্য তাদের সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

এরা গৃহকর্মীসহ বিভিন্ন নিম্ন আয়ের কাজের মধ্যে থাকে। আমরা ‍একটা দক্ষ জনগোষ্ঠী চাইছি। সেটা কি বিয়ের মাধ্যমে সম্ভব? এ ক্ষেত্রে সবাইকে কাজ করতে হবে। সবার জন্য উপবৃত্তি আছে কি না, হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা আছে কি না, সেটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এমন একটা নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেন অভিভাবকেরা কন্যাশিশুদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহী হন।

সানজিদা আখতার

default-image

গ্রাম, শহর, হাওর, নদীভাঙন, পাহাড়িসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাল্যবিবাহের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কোনো একটা অঞ্চলে বন্যা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। আবার কোনো অঞ্চলে বিশেষ কোনো দুর্যোগ হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এসব বিষয় বিবেচনা করে নীতি নির্ধারণ করতে হবে।

আলোচনায় এসেছে নৈতিক অবক্ষয়সহ বিভিন্ন সমস্যায় একটি মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়ের পর নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে মেয়েটি বাবার কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এটা আরও বড় নৈতিক অবক্ষয়। এ অবস্থাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রভাবশালী ও বখাটেদের উৎপাতের সমাধান হিসেবে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয়।

বাল্যবিবাহতেই সবকিছুর সমাধান হয়েছে—এমন দেখা হচ্ছে। আমাদের এ প্রবণতা থেকে বের হতে হবে। স্কুল ব্যবস্থাপনা নারীবান্ধব হতে হবে। বাড়ি বা বাসা থেকে স্কুল পর্যন্ত যেকোনো মূল্যে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে প্রশাসনকে।

কোনো অভিভাবক যদি ভয়ে থাকেন—তাঁর মেয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে অপমানের শিকার হবে, তাহলে স্কুলে পাঠাবেন না। বিবাহিত মেয়েদের জন্য ভাতা চালিয়ে যেতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন

default-image

আমরা বলি যে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই দুই বছরে মেরুদণ্ডের ওপর বড় ধরনের আঘাত এসেছে। ইউনিসেফের এক জরিপ থেকে জানা যায়, যেসব দেশে বাল্যবিবাহ হয়, বাংলাদেশ তার মধ্যে চতুর্থ। অন্য দেশগুলো হলো নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া ইত্যাদি।

বাল্যবিবাহের বিষয়টা আমরা স্বীকার করছি না। আমাদের তথ্যভীতি কাটাতে হবে। যেকোনো পরিকল্পনার জন্য সঠিক তথ্যের প্রয়োজন। ২০১০ সাল থেকে সরকার জেন্ডার বাজেট করছে। কিন্তু সেখানে সত্যিকারভাবে নারীর উন্নয়নে কতটুকু ব্যয় হচ্ছে, সেটা জানা যায় না। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এত দায়িত্ব, কিন্তু সেখানে বরাদ্দ ১ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয় নারীর উন্নয়নে কাজ করে। সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

শিক্ষাই বা আমাদের কতটুকু স্বাবলম্বী করছে! শিক্ষা তো কাজের নিশ্চয়তা দেয় না। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অর্থ কীভাবে ব্যয়িত হচ্ছে, সেটাও দেখার সময় এসেছে। ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সঠিক তালিকার অভাবে ৩৮ লাখের বেশি দেওয়া যায়নি। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীকে সর্বজনীন করতে হবে। তাহলে সংকটের সময় কোষাগারে চাপ পড়বে না। সামান্য বৃদ্ধি করলে হবে। এখন সর্বজনীন শিক্ষা-স্বাস্থ্যের কথাও ভাবতে হবে। মেয়েরা স্কুলে আসছে। পড়ালেখা শেষে তারা কী করবে, এর পরিকল্পনা করতে হবে।

রিয়াদ চৌধুরী

default-image

আজকের শিরোনামে মেয়েরা স্কুলে না ফেরার ক্ষতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমাদের এখনকার কাজ হচ্ছে, ঝরে পড়া বন্ধ করা। এ জন্য একটা সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। মেয়েরা ঝরে পড়ার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কারণ আলোচনায় এসেছে। কিন্তু কোভিডের সময় অনেকে গ্রামে বা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে গেছে। এটাও ঝরে পড়ার একটা কারণ।

সমন্বিত পরিকল্পনার কথা বলা হয়। এটা একটা স্লোগানের মতো হয়ে গেছে। সমন্বিত পরিকল্পনার বিষয়টি স্লোগান থেকে বেরিয়ে বাস্তবে গ্রহণ করতে হবে। বছরভিত্তিক সময় ধরে কাজ করতে হবে। তথ্যের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রেজিস্টার রাখা হয়। সে রেজিস্টার থেকে শিক্ষকদের মাধ্যমে সহজেই ঝরে পড়া সংখ্যাটা জানতে পারি।

সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি—দেশে এই তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। অধিদপ্তরের মাধ্যমে এসব শিক্ষাব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ করা যায়। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সরকারের নেটওয়ার্ক রয়েছে। তথ্য একেবারেই যে নেই, তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), গণসাক্ষরতা অভিযানসহ কিছু প্রতিষ্ঠান তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেসব কাজে লাগাতে পারি।

বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবক, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি, ধর্মীয় নেতাসহ সবাইকে নিয়ে কাজ করতে পারি। বাল্যবিবাহ হলে অভিভাবকদের বোঝাতে হবে, আপনারা এটা অন্যায় করেছেন। এ অন্যায় সংশোধনের জন্য মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে হবে। এদের নিয়মিত ক্লাসের সঙ্গে বিশেষ তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা থাকতে পারে। আর একটা ফলপ্রসূ তদারকের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বদিউল আলম মজুমদার

default-image

করোনাকালে বিরাটসংখ্যক কন্যাশিশু ঝরে পড়েছে। তাদের অধিকাংশ বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। এটি একটি ভয়াবহ জাতীয় দুর্যোগ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫১ শতাংশ কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের শিকার। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আমরা সবাই এর জন্য দায়ী। সবাইকে এর অবসানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। একটি উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা জানাতে চাই। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের ছাত্রীসংখ্যা ৯০৪। তার মধ্যে ৫২ জন ঝরে পড়েছে। ৭৪ জনের বিয়ে হয়েছে। এটা মোট ছাত্রীসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। এই হার অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম। কারণ, এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান। এতে নিয়মিত অভিভাবক সভা হয়।

আমরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঝরে পড়া ঠেকানো এবং যারা ঝরে পড়েছে ও বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমাদের গভর্নিং বডির সদস্য এবং শিক্ষকেরা প্রত্যেকে কয়েকজন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়ে তাদের এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ করে তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য সব রকম চেষ্টা করছেন। এর সুফল পেয়েছি।

আমরা ৩৮ জন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সবাইকে পরীক্ষা দিতে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। অন্যদের ফিরিয়ে আনতেও আমরা সর্বতোভাবে চেষ্টা করছি। তবে এ ব্যাপারে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো, বিবাহিতদের অনেকেই এলাকায় নেই। আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিলে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের এ কাজে যুক্ত করলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঙ্গনে বহুলাংশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এ জন্য বিবাহিত মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি অব্যাহত রাখতে হবে। তাদের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ফিরোজ চৌধুরী

মেয়েরা স্কুলে না ফিরলে সাধারণত তাদের বাল্যবিবাহ হয়। করোনাকালে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া মেয়েদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। যেকোনোভাবে হোক এটা বন্ধ করতে হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাববেন বলে আশা করি।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

পরামর্শ

  • এক এলাকার কাজি যেন অন্য এলাকায় বিয়ে না পড়াতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

  • জন্ম, মৃত্যু ও বিয়ে নিবন্ধন হওয়া জরুরি।

  • স্কুলে ফিরিয়ে আনা মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদে্যাগ নিতে হবে।

  • মধ্যম আয়ের একটি দেশে দারিদ্রে্যর জন্য বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে।

  • বিয়ের ক্ষেত্রে কাবিন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

  • বিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করতে হবে।

  • ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষদের জন্মনিবন্ধনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

  • এমন একটা নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেন অভিভাবকেরা তাদরে কন্যাশিশুদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহী হয়।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন