বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

সুপারিশ

■ পরিবার পরিকল্পনা, যৌনপ্রজনন স্বাস্থ্য ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সঙ্গে যে আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে, তা সবাইকে জানাতে হবে

■ নারীকে জন্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া বাঞ্ছনীয়

■ পরিবার পরিকল্পনার সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন

■ পরিবার পরিকল্পনা সেবায় পুরুষকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে

■ জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে

■ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কার্যক্রমে সংযোগ তৈরি করতে হবে

■ সেবাদানকারীদের সংখ্যা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে

■ নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন

■ ডে-কেয়ার সেন্টার আইনসহ এ সংক্রান্ত অন্য আইনগুলো ঢেলে সাজাতে হবে

■ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রসমূহের কার্যক্রমকে জোরদার করতে হবে

■ পরিবার পরিকল্পনার কার্যক্রমগুলোর প্রচার বৃদ্ধি করতে হবে

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

সন্তান গ্রহণের বিষয়ে প্রত্যেক নারীর নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁর বাসার লোকজন তা পছন্দ করেন না। এ ছাড়া জন্মবিরতিকরণ-সংক্রান্ত যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, সেসব ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা থাকে। ফলস্বরূপ, নারীর প্রজননস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজকে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।

default-image

শামীমা পারভীন

প্রকল্পের শুরুতেই ‘সুখী জীবন’ একটি ফ্যাসিলিটি অ্যাসেসমেন্ট করে। ফলাফলে দেখা যায় যে সমাজে অনেকগুলো ভুল ধারণা বিদ্যমান। মনে করা হয়, পরিবার পরিকল্পনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে পুরুষেরা দুর্বল হয়ে পড়বেন। এমনকি পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলবেন। তাই পুরুষদের জন্য এগুলো এড়িয়ে চলা ভালো। এমনকি সেবাকেন্দ্র থেকে কনডম নেওয়ার প্রয়োজন হলে তা-ও নারীরাই নিচ্ছেন।

২০১৯ সালে ইউএনএফপির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ২১৪ মিলিয়ন নারী জন্মবিরতি নিতে চান, কিন্তু জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতির অভাবে তা তাঁরা পারেন না। বিশ্বে প্রতিদিন ৮৩০ জন নারীর মৃত্যু হয় মাতৃস্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রতিরোধযোগ্য কারণে। প্রতিদিন ৩৩ হাজার কিশোরী বাল্যবিবাহে বাধ্য হচ্ছে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ। প্রতিবছর প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় একজন নারী তাঁদের সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। ২০১৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৭৩ ভাগ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ ভাগই শারীরিক নির্যাতন। ২৭ ভাগ যৌন নির্যাতন, ২৯ ভাগ মানসিক নির্যাতন এবং ১১ ভাগ অর্থনৈতিক নির্যাতন। উপরন্তু ৫৫ ভাগ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। ৩৬ ভাগ নারী সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতি পান না। তিন ভাগ নারী পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণে বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকেন।

কখনো কখনো পুরুষেরা নারীদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার অপছন্দ করেন এবং এই অজুহাতে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সংঘটিত হয়। ফলাফলে আরও দেখা যায় যে নির্যাতনের শিকার নারীদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এই বয়সী নারীরাই পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার গ্রহীতা। সুতরাং, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার একটি বয়সভিত্তিক সম্পর্ক রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবাগ্রহীতাদের ৯০ ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর কারণে সমাজে নারীরা অধস্তন অবস্থায় আছে। ফলস্বরূপ জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বাড়ছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবার সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেবাদানকীরারা নীরবতার সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেন।

default-image

সামিনা চৌধুরী

ক্ষমতাভিত্তিক সমাজ কখনো কখনো কোনো গোষ্ঠীকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করে। কখনো জেন্ডার বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে দুর্বল বলে চিহ্নিত করা হয়। এর মাধ্যমে তাদের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের রাস্তা খুঁজে বের করা হয়। আর নারী তারই শিকার। নারীর প্রজনন ক্ষমতাকে দুর্বলতা ও পণ্য হিসেবে দেখার একটি প্রবণতা দেখা যায়। এই ধরনের চিন্তা থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার রাস্তা তৈরি হয়। ইউএসএআইডি বাংলাদেশে যেসব কর্মসূচিতে সহায়তা প্রদান করে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও অনুশীলনের প্রসার, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধাদির সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার উন্নয়ন ও অভিযোজন এবং পরিবেশ সুরক্ষার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো।

প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য স্পষ্টভাবে চোখে পড়ার মতো। একদিকে পরিবার পরিকল্পনার বোঝা যেমন নারীর ঘাড়ে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নারীর নেই। খুব দুঃখজনক হলেও সত্য যে ঘরে-বাইরে নারীরা যে শুধু শারীরিক ও যৌন সহিংসতার এ শিকার হচ্ছেন তা নয়, পাশাপাশি মানসিক, আবেগিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নিয়মিতভাবে। বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজনকে শারীরিক অথবা যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে এবং মোট ৩৫ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় তাঁর নিকটতম সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই সহিংসতা কোনো না কোনোভাবে প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাল্যবিবাহ, অপূর্ণ চাহিদা, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ—এসবের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে আমরা দেখি, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এর মূল কারণ। একজন নারীর যদি কৈশোরে বিয়ে হয়, তখন কম বয়সে গর্ভধারণের বিরুদ্ধেও সে তার মতামত দিতে পারে না। এই সব কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ হচ্ছে ও মাতৃমৃত্যুর হার বাড়ছে। ছেলেসন্তানের প্রত্যাশা একজন নারীকে বারবার গর্ভধারণে বাধ্য করে। যার ফলাফল উচ্চ মাতৃমৃত্যু।

default-image

রফিকুল ইসলাম তালুকদার

পরিবার পরিকল্পনা মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমায়। কিন্তু এই সেবা নিতে গিয়েই অনেককে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৪৯ দশমিক ৪ ভাগ নারী এবং ৫০ দশমিক ৬ ভাগ পুরুষ। গ্রহীতার চাহিদা অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনার সেবা প্রদান ও প্রাপ্তি এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা অপ্রতুল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একজন নারী নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারেন না। এমনকি কখন সন্তান নেবেন, সে সিদ্ধান্তও একজন নারী নিজে নিতে পারেন না। বাংলাদেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ পরিবার পরিকল্পনার সেবা নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু সেখানে আমরা সেবা দিতে পারছি মাত্র ৬২ শতাংশ সক্ষম দম্পতিকে।

বিডিএইচএসের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের মায়েদের মাথাপিছু সন্তান সংখ্যা ২ দশমিক ৩। যেখানে কাম্য সন্তান সংখ্যা ১ দশমিক ৬। আমরা যদি মায়েদের সম্মান করতে পারি, স্বাধীনতা দিতে পারি, সহযোগিতা করতে পারি, তাহলে এই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। দেখা যায়, অনেক নারী কোনো নারী চিকিৎসকের সেবা নিতে চান। কিন্তু সেখানে পুরুষ চিকিৎসকের সেবা নিতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের একধরনের মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

সেবা প্রদানকারীর অপ্রতুলতাও একটি সমস্যা। কাউন্সেলিংয়ের জন্য আমাদের জায়গা দরকার, গোপনীয়তা দরকার। উন্নত সেবা দিতে কর্মীদের আরও প্রশিক্ষিত করতে হবে।

default-image

মো. আমিনুল ইসলাম

সমাজে বিদ্যমান জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখেই আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি এবং সে অনুযায়ী কাজ করছি। পাথফাইন্ডারের সহযোগিতায় আমরা বিষয়টিকে আরও সামনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি এবং ইতিমধ্যে জেন্ডার সমন্বিত পরিবার পরিকল্পনা সেবা ম্যানুয়েল, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নিরসনে টুলকিট তৈরি করেছি। পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরুষের কম উপস্থিতি। দেখা যায়, বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারী নারী। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহন প্রতিবেদন অক্টোবর ২০২১ অনুযায়ী জানা যায়, আমাদের সেবা গ্রহণকারীদের পরিমাণ ৭৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর সেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। কনডম গ্রহণকারীর সংখ্যা মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

গর্ভবতী মায়েরা অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হন। পারিবারিক সংস্কৃতি, কুসংস্কার ও পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছার ভিত্তিতে তাঁদের হাসপাতালের বদলে হোম ডেলিভারি করাতে হচ্ছে। মায়েদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও তাঁরা আমাদের সমাজে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেবাদানকারীদের এই বিষয়গুলোর ভিত্তিতে দক্ষ করে তুলতে পারলে ও পুরুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য নীতিমালা তৈরি করা গেলে এ সহিংসতার বিরুদ্ধে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বড় একটি ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

default-image

জাকিয়া আখতার

বিশ্বব্যাপী উন্নত-অনুন্নত সব দেশের বেশির ভাগ পরিবারে নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সেবাকেন্দ্রসমূহে আসা নারীদের তাঁদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিতে কর্মীদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ নিলেই কর্মীরা জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা চিহ্নিত করতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী সেবা দিতে পারবেন। পুরুষ তাঁর সঙ্গিনীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করলে সহিংসতা অনেকাংশে কমবে। আমাদের উপজেলা পর্যায়ে, ইউনিয়ন পর্যায়ে যে সেবাকেন্দ্রগুলো রয়েছে এবং সেখানে যাঁরা একেবারে মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা প্রদান করছেন, তাঁদের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ধারণা দিতে হবে এবং প্রশিক্ষিত করতে হবে। আমরা প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল তৈরি করেছি এবং সে অনুযায়ী কর্মীদের আরও উন্নত সেবাদানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।

আপনারা জানেন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে কাজ করে থাকে। সারা দেশের ৫০০টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ৬৭ থেকে ৭০টি উপজেলা রয়েছে, যেখানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল ও সেন্টার রয়েছে। এর বাইরে যতগুলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে, সেখানে আরএমও বা আবাসিক মেডিকেল অফিসার প্রাথমিকভাবে উপজেলা পর্যায়ের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের সেবা প্রদান করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্রগুলোর এ রকম সংযোগ তৈরি করতে হবে।

মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক যে সমস্যা, সেগুলো বেশির ভাগ নারী গোপন রাখেন। তাঁরা তাঁদের সমস্যাগুলো নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে পারেন না, এলেও বান্ধবী বা অন্য কোনো নারীকে নিয়ে আসেন। বেশির ভাগ সময়ই স্বামীকে নিয়ে আসেন না। এই গোপনীয়তাটা ভাঙতে হলে আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

default-image

তানিয়া হক

আমরা দেখতে পাই, শিশুজন্ম, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ পুরো বিষয়টিকে নারীর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবার পরিকল্পনার পুরো প্রক্রিয়া, প্রকল্প প্রভৃতি হচ্ছে নারীকেন্দ্রিক। সেখানে ৯০ শতাংশ জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতিই নারী ও নারীর শরীরকে কেন্দ্র করে। স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবেও সেখানে নারীর সংখ্যা বেশি। যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, নারীদের এই ব্যাপারে সহজেই উৎসাহিত করা যায়। পুরুষদের করা যায় না। পুরুষকে রুটিরুজির ব্যবস্থা করতে হবে। পুরুষকে আয় করতে হবে, তাই প্রজননের পুরো বিষয় নারীকেন্দ্রিক হবে। এই হচ্ছে খোঁড়া যুক্তি।

বিয়ের পর নারীর কাছে কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কবে সন্তান হবে, সন্তান হচ্ছে না কেন, পুরুষসন্তান হলো না কেন ইত্যাদি প্রশ্ন করা হয়। প্রতিবন্ধী কোনো সন্তান জন্ম নিলেও তার দায়িত্ব কেবল নারীর ওপর বর্তায়। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখি, দায়িত্বের জায়গা নারীর ওপর দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু অধিকারের জায়গায় বৈষম্য করা হচ্ছে।

যদি মাতৃকালীন ছুটির কথা চিন্তা করেন, প্রজনন, সন্তান লালন-পালন সবকিছুর মাধ্যমে কিন্তু নারীর ওপর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্যারেন্টাল লিভ একটি সময়োপযোগী বিষয়। কারণ, সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে মা-বাবা উভয়ের ওপর দায়িত্ব রয়েছে। সুতরাং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেবল নারীর ওপর এই দায়িত্ব দেওয়া যায় না।

দ্বিতীয়ত, ডে কেয়ার সেন্টারের যে আইন আছে, তা সম্পূর্ণ নারীকেন্দ্রিক। শ্রম আইনে বলা আছে, কোনো নারী শ্রমিকের যদি পাঁচ বছরের নিচে কোনো সন্তান থাকে, তবে সে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ডে কেয়ার সেন্টারের সুবিধা পেতে পারে। এক থেকে তিন বছরের শিশুর ক্ষেত্রে হয়তো মায়ের সঙ্গে একপ্রকার সংযুক্ততা আছে। কিন্তু চার থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের দায়িত্ব তো বাবা নিতেই পারেন। সুতরাং এই আইনকে আমাদের ঢেলে সাজাতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রজনন শিক্ষা খুব বেশি প্রয়োজন। আমাদের দেশে তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। বাংলা, ইংরেজি ও মাদ্রাসা মাধ্যম। প্রতিটা মাধ্যমে প্রজননশিক্ষাকে নিয়ে আসা উচিত।

default-image

লিজা তালুকদার

আমাদের সমাজে পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা এখনো সংবেদনশীল একটি বিষয়। খুব কাছের বন্ধু, আত্মীয় কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী ছাড়া অন্য কারোর সঙ্গে এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে সংকোচ বোধ করি। সহিংসতার শিকার হওয়া নারীর প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। অনেকে রিপোর্ট করছেন না, জানাচ্ছেন না। আর এই সহিংসতা যদি পরিবার পরিকল্পনাসম্বন্ধীয় হয়, সে ক্ষেত্রে হয়তো সহিংসতার ঘটনাগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে আসছেই না।

এমনিতেই আমাদের সমাজে স্বামীর সিদ্ধান্তই মূল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। পুরুষতন্ত্র আমাদের মধ্যে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে পরিকল্পিত পরিবার গঠনের ক্ষেত্রে স্বামী–স্ত্রীর যৌথ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, তা অনেকেই গুরুত্ব দেন না।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে এখনো আমাদের দেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। করোনার সময়ে বাল্যবিবাহের সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই কিশোরী মায়ের সংখ্যাও বেড়ে গেছে বা যাবে। একজন নারী কখন বিয়ে করবে, কাকে বিয়ে করবে, সন্তান কখন নেবে, একটি সন্তান নেওয়ার পর কত দিন বিরতিতে অন্য সন্তান নেবে কিংবা কোন নিরাপদ স্থানে সন্তান প্রসব করাবে, সেই সিদ্ধান্তের ওপরও তঁার নিয়ন্ত্রণ কম।

লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা দূর করতে এবং পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে আমরা এখন আচরণগত পরিবর্তনের উপর জোর দিচ্ছি। যেহেতু আচরণগত পরিবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের একটা বড় ভূমিকা থাকে, তাই পরিবারে, বিদ্যালয়ে, সামাজিকভাবে সাবলীল, স্বতঃস্ফূর্ত ও গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ প্রয়োজন যেন বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই কিশোর কিশোরীরা প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সঠিক ধারনা পায় এবং স্বামী–স্ত্রী পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সুন্দর পরিবার গড়তে পারে।

default-image

ফাতেমা শবনম

একজন নারী তাঁর জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার মুখোমুখি হন। ইউএসএআইডির সুখী জীবন প্রকল্প পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌন প্রজননস্বাস্থ্যসহ পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে জোরদার করার জন্য কাজ করছে। আমরা মূলত কিশোর-কিশোরী, প্রসূতি, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চেয়েও নানা সমস্যার কারণে পারছেন না, এমন মানুষজনকে লক্ষ্য রেখে কাজ করি। বাংলাদেশ সরকারের ‘১৮-এর আগে বিয়ে নয়, ২০-এর আগে সন্তান নয়’ স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে আমরা কাজ করছি।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী নারীর গড় বিয়ের বয়স ১৬.৩। ৫৯ শতাংশ কিশোরীই মা হচ্ছেন। এমনকি কিশোরীদের একাধিক সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বাল্যবিবাহ নারীর প্রতি সবচেয়ে সহিংসতার বড় একটি জায়গা। এটি প্রতিরোধে সরকার কাজ করছে। যদি বিয়ে হয়েও যায়, তাহলে অন্তত যেন তাঁর গর্ভধারণ বিলম্বিত করা হয়। কারণ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। একজন গর্ভবতী মায়ের কমপক্ষে চারবার আবশ্যক চেকআপ করতে হয়। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা করাতে পারেন না। পারেন না স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে প্রসব করাতে ও পছন্দমতো পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে।

default-image

মোহাম্মদ শরীফ

একসময় পরিবার পরিকল্পনা বলতেই মানুষ বুঝত পরিবার পরিকল্পনা সেবা—পিল, কনডম, ইনজেকশন, টিউবেকটমি, এনএসভি। বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম অনেক বিস্তৃত। এর মধ্যে আছে মাতৃত্ব, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, বয়ঃসন্ধিকালীন প্রজননস্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়সমূহও। এমসিএইচ ইউনিট, ফিল্ড সার্ভিস ডেলিভারি ইউনিট ও সিসিএসডিপি ইউনিটের মাধ্যমে এ সেবাসমূহ প্রদান করা হচ্ছে। আমাদের ১১০৩টি যুববান্ধব ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকে সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যা ১৫ শতাংশের বেশি। যুববান্ধব ক্লিনিক থেকে কিশোরীদের জন্য বিনা মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। এরপরও কয়েকটি ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব (ডেলিভারি) এখনো ১৫ শতাংশের ওপরে যেতে পারিনি। শ্রীলঙ্কায় প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে দেশটিতে মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখে মাত্র ৩৬। অথচ আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখে ১৬৩। এত উচ্চ মাতৃমৃত্যুর একমাত্র কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি কম হওয়া। সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও এমসিএইচ ইউনিট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেলিভারির ক্ষেত্রেও কিট দেওয়া হয়। এতে স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ ১৫ রকমের ওষুধ থাকে।

আমাদের দেশে পরিবার পরিকল্পনার কার্যক্রমগুলোর প্রচারও কম হয়। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যরাও অনেকাংশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমি এমনও দেখেছি, স্বামী রাজি থাকার পরও পরিবারের অন্য সদস্যের বিরোধিতায় অনেক নারী চাইলেও জন্মনিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন না।

আমাদের দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার বড় একটি কারণ বাল্যবিবাহ। এর ফলে অল্প বয়সে কিশোরীদের মা হতে হয়। দেশের ৫৯ শতাংশ কিশোরীই তাঁদের জীবনের এ স্তরে মা হচ্ছেন। এতে মাতৃমৃত্যু বাড়ছে। আর মাতৃমৃত্যু বাড়া মানেই শিশুর মৃত্যু বৃদ্ধি পাওয়া। একটার সঙ্গে একটা জড়িত। এ বিষয়ে সরকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। ৫৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রকে মডেল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে যুববান্ধব ক্লিনিক থেকে শুরু করে সব সেবাই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এরপরও কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রের মতো কিছু কার্যক্রম রয়েছে, যা বিশ্বের কোনো দেশেরই নেই। আমি মনে করি, ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজ করা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র এখনো অবহেলিত। একে আরও কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

default-image

মো. আব্দুস সালাম খান

নারীর প্রতি সহিংসতা অনেকাংশেই ভিন্নভাবে ভাবা হয়। অনেকেই ভাবেন নারীর প্রতি শারীরিক সহিংসতাই বুঝি নারীর প্রতি সহিংসতা। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দেয়। সরকারের পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে এবং তা বরাদ্দও দেওয়া হচ্ছে। বরাদ্দকৃত অর্থ অনেক সময় ব্যয় করা সম্ভবও হয় না। নানান সমস্যা সত্ত্বেও প্রজননস্বাস্থ্যসেবায় দেশ অনেক এগিয়েছে। এটি সরকারের সফলতা। ১৯৭৫ সালে দেশে সন্তান জন্মদানের সামগ্রিক হার ছিল নারীপ্রতি ৬ দশমিক ৩। একজন নারী তাঁর প্রজনন সময়ের মধ্যে প্রায় সাতজন সন্তানের জন্ম দিতেন। বর্তমানে এ হার ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৮ সাল থেকে সেক্টর প্রোগ্রাম নামে বড় আকারে একটি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এখন চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাথফাইন্ডার ও ইউএসএআইডির মতো দাতা সংস্থাগুলো এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করছে। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করা। বিগত তিনটি সেক্টর প্রোগ্রাম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী এমডিজি অর্জন করে পুরস্কৃত হয়েছেন। এর পেছনে গণমাধ্যম, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও), দাতা সংস্থাসহ সবার অবদান রয়েছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৩ (এসডিজি-৩)-এর মধ্যে সবকিছু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ২৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার অন্যতম। এটি অর্জন করা গেলে বাকিগুলো সহজেই অর্জন করা যাবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি-৩ অর্জন করা। আমরা এ লক্ষ্যেই কাজ করছি। নারীর নিজস্ব অধিকার বাস্তবায়নে প্রকল্প নিতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও এসব কাজের পাশে থাকা প্রয়োজন।

default-image

সুলতানা কামাল

নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের অধিকারের সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সম্পর্ক রয়েছে। যেকোনো ধরনের সহিংসতা আসে অন্যজনের প্রতি আমাদের মনোভাব, মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা থেকে কিংবা তাঁকে আমাদের সমাজে বা পরিবারে কতটা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, এর ওপর নির্ভর করে। আমাদের আনন্দের বিষয় হচ্ছে বর্তমানে নারীর অবস্থান অনেকটাই সুবিধাজনক। নারীকে অস্বীকার করে এখন কেউ কিছু করতে পারে না। এটি একটি বড় সাফল্য।

এ দেশে পরিবার পরিকল্পনার প্রথম উদ্যোগটি ছিল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিয়ে নয়। বাংলাদেশে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। জনসংখ্যাও ছিল বেশি। ১৯৭২ সাল থেকে নারী আন্দোলনের বড় একটি দাবি ছিল নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য। যুদ্ধাহত নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল।

ঘুরেফিরে পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্ব নারীর ওপর বর্তায়। তবে দায়িত্ব নারীকে দেওয়া হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর থাকে না। এ সংস্কৃতি সমাজে এখনো বিরাজমান। নারীর নিজস্ব ব্যক্তি অধিকারের দিক থেকে তাঁর প্রজনন স্বাস্থ্যের দিকটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করা ব্যতীত নারীও তাঁর স্বাধীনতার মধ্যে এটি অনতে পারবেন না। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যের কাজটি বাস্তবায়ন করাও সহজ হবে না। মোদ্দা কথা, নারীর ব্যক্তিগত অধিকারের জায়গা থেকেই বিষয়টিকে দেখতে হবে। মানবাধিকারে বলা হয়ে থাকে, মানুষ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, নারীজন্মের সঙ্গে সঙ্গে কোনো অধিকার না নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। আমাদের কাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে, উঠান বৈঠক, আলোচনা, কমিউনিটি ক্লিনিক উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, গণমাধ্যম অনেক সোচ্চার। কিন্তু তারপরও একজন নারীকে নারী হিসেবে মনে করতে হবে, তার প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়টি একটি অধিকার।

প্রজনন স্বাস্থ্য বলতে গর্ভধারণ, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যুর সঙ্গে একসঙ্গে চিন্তা করা হয়৷ কিন্তু প্রজনন স্বাস্থ্য নারীর মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তার বৈবাহিক অবস্থা যা-ই থাকুক না কেন, যে মুহূর্তে তিনি প্রজনন ক্ষমতা অর্জন করবেন, তখনই তা বিবেচনা করতে হবে। আমাদের সংবিধানে প্রজনন অধিকারের কথা নেই। তবে ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নারীর স্বাস্থ্যগত অধিকার রক্ষা করা ও সেবা প্রদান করার বিষয়ে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রয়েছে। নারীর ব্যক্তি অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনের পাশাপাশি সামাজিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও জরুরি।

default-image

ক্যারোলিন ক্রসবি

আমরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে কথা বললেও আমাদের লক্ষ্য কিন্তু এক। তা হলো বাংলাদেশে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নির্মূল করা। পরিবার পরিকল্পনা, প্রজননসেবা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে সমাজের সব খাতের সব স্তরের মানুষকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার পরিবার পরিকল্পনা সহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। সরকারের পাশাপাশি জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও অর্থায়নের মাধ্যমে ভূমিকা রাখছে। তাদেরও ধন্যবাদ। আমি আশা করছি বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এ কাজগুলোকে আরও গতিশীল করা হবে।

ফিরোজ চৌধুরী

আজকের গোলটেবিল বৈঠকে অত্যন্ত ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে। প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার পরিপ্রেক্ষিতে নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে যে সব সুপারিশ এসেছে, আশা করা যায় নীনির্ধারকেরা তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সকলকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন