নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কেমন বাজেট চাই

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সিপিডি ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কেমন বাজেট চাই?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৬ জুন ২০২২। এ আলোচনার বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।

অংশগ্রহণকারী

আরমা দত্ত

সংসদ সদস্য, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য

ফাহমিদা খাতুন

নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

কাশফিয়া ফিরোজ

পরিচালক (গার্লস রাইটস), প্ল্যান

ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

সীমা মোসলেম

যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

তানিয়া হক

অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নবনীতা চৌধুরী

পরিচালক, জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি, ব্র্যাক

শরমিন্দ নীলোর্মি

সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কানিজ ফাতেমা

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিডিওএসএন; ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি

মানসী সাহা

প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ (ভ্রমণকন্যা)

রফিকুল ইসলাম

উপপরিচালক, ব্রতী সমাজকল্যাণ সংস্থা

ফজিলা বানু লিলি

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, নারীপক্ষ

নাদিয়া নওরিন

প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট, সিপিডি

রাফসান জানি সৌরভ

যুব প্রতিনিধি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

ফারজানা আক্তার প্রীতি

যুব প্রতিনিধি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীরা প্রায় প্রতিদিনই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে কোভিডের সময় এ সহিংসতা অনেক বেড়েছে। সহিংসতার মতো আরও একটা দিক হলো প্রত্যেক নারীকে সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়। পরিবহনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অফিসে—যেখানেই তিনি যান না কেন; সব সময় একধরনের ভয় কাজ করে যে তিনি নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন তো! এ ধরনের ভয় থেকে নারীকে মুক্ত করতে হবে। ৯ জুন বাজেট ঘোষণা। নারীর প্রতি সহিংসতা ও তাঁর ভীতি দূর করতে কেমন বাজেট চাই, সেটাই আজকের আলোচনা।

নাদিয়া নওরিন

এসডিজি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যথেষ্ট উন্নতি হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা এখনো একটি ব্যাপক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন সহিংসতা রোধে যে আইন রয়েছে, তার সঠিক প্রয়োগ এবং একই সঙ্গে বাজেটে সহিংসতা রোধে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন শুরু হয়। ওই বছর জিডিপির অনুপাতে জেন্ডার বাজেট ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। যদিও বছরভিত্তিক বরাদ্দের প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে আমরা যথেষ্ট মাত্রায় ওঠা–নামা লক্ষ করি।

২০০৯-১০ অর্থবছরে থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পায়। কিন্তু ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে তা কমতে থাকে। কেবল নারী উন্নয়নের বারাদ্দ ছাড়া এই মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য খাতে বরাদ্দ বাড়তে থাকে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২১-২২ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় নারী উন্নয়নের জন্য বেশি বরাদ্দ পায়।

সরকার ৪৩টি মন্ত্রণালয়কে জেন্ডার বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটের ক্ষেত্রে এখনো কিছু দুর্বলতা লক্ষণীয়। যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা নারীর উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না। জেন্ডার বাজেটের কাঠামো স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দের তথ্য এবং সেখানে কত ব্যয় হচ্ছে, সে সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।

একই সঙ্গে জেন্ডার বাজেটের যে কাঠামো রয়েছে, তা নারীদের প্রতি সহিংসতার ভয় প্রতিরোধে কার্যকর হচ্ছে না। তাই এই কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন। সহিংসতার ভয় প্রতিরোধে বাজেটে চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ১. নারী বিষয়ে বিভাজিত তথ্য, ২. বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত আলোচনা, ৩. বাজেট ব্যয়ের গুণগত মান বাড়ানো, ৪. রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো ও তার ব্যবহার। নারীদের ভেতর সহিংসতার ভয় থাকলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে যাবে। সে জন্যই এ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি।

আরমা দত্ত

আমরা সবাই জানি, নারীর জন্য বাজেট খুবই প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমাদের কারও মতবিরোধ নেই। নারী হলো সব উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। তাই নারী উন্নয়নের বিষয়টি আমাদের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। যদিও কোভিডকালে অনেক কিছুই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে নারী বাজেট থেমে ছিল। আমরা যদি দেখি, আশির দশকে নারীদের জন্য বাজেট নিয়ে যে আলোচনা হতো, বর্তমানের আলোচনার সঙ্গে সেটির তেমন পার্থক্য নেই। তবে পার্থক্য যেটা দেখছি, তা হচ্ছে আগের চেয়ে নারীর অগ্রগতি হয়েছে।

প্রায় সব মন্ত্রণালয়েই আলাদা বাজেট আছে, তবে কোন খাতে আছে, তার পরিসংখ্যান নেই। সে কারণে আমাদের কাজ করতে সমস্যা হয়। আমি মনে করি, ২০২২ সালে এগিয়ে যেতে হলে আমাদের কৌশলগত উপায়ে এগোতে হবে। তা না হলে মুখের কথা আর আবেগ দিয়ে কাজ এগোবে না। কোথায় কী ঘাটতি আছে, সেটি খতিয়ে দেখে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। সেটা একবারে প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। আমাদের দেশে যেসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসে, সেখানে অধিক হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বাজেট বাড়াতে হবে। আমরা দেখি, বস্তিগুলোতে মেয়েরা যেকোনো সহিংসতা রুখে দাঁড়ান, কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা সেটি করতে পারেন না। তাঁদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সবাইকে একত্র হয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কাজ করতে হবে, তবেই আমরা নারী সহিংসতাবিহীন একটি সমাজ পাব।

কাশফিয়া ফিরোজ

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ১০ বছরব্যাপী কৌশলপত্র তৈরির সময় কিশোর-কিশোরী ও যুবদের সঙ্গে আলোচনায় ‘সহিংসতা ও ভয়’ বিষয়টি সামনে আসে। তাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে যতই উদ্যোগ গ্রহণ করি না কেন, সহিংসতার ভয় তাদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। একজন ছেলে যেভাবে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায়, একজন মেয়ে বা যুব নারীকে তার চেয়ে অনেক বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।

এই বিষয়গুলো ভেবেই সম্প্রতি প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ দেশব্যাপী একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ নারী গণপরিসরে বিভিন্ন রকম হয়রানির শিকার হন। ৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ কিশোরী ও নারী জানান যে তঁারা নিজ পরিবারেই বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী, তঁাদের শিক্ষক, সিনিয়র স্টুডেন্ট দ্বারা বিভিন্ন বিরূপ ও অশালীন মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিরূপ মন্তব্যের শিকার হওয়ার কথা জানান অংশগ্রহণকারীদের ৫৭ শতাংশ। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৫৬ শতাংশ, যা তঁাদের মনে দীর্ঘমেয়াদি ভয়ের সঞ্চার করেছে। জরিপে ৩৫ শতাংশ মা–বাবা জানান যৌন হয়রানির ভয় বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ।

জরিপে দেখা গেছে, বাবা-মায়েরা তঁাদের কন্যাসন্তানকে সহিংসতার ভয়ে কোচিংয়ে, স্কুলের পিকনিকে, এমনকি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করেন। জরিপ বলছে, মেয়ে ও যুব নারীদের এই ভয় পারিবারিক পরিমণ্ডলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, গণপরিসরে এবং অনলাইনে বিদ্যমান।

আমাদের দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যুগান্তকারী আইন আছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন বিদ্যমান। তবে, জাতীয় বাজেটে এই আইন বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ এখন পর্যন্ত দেখতে পাইনি। এমনকি জেন্ডার বাজেট অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সহিংসতা রোধে কতটুকু বরাদ্দ, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কী করা হচ্ছে, এর কোনো সুস্পষ্ট তথ্য নেই। অথচ সমন্বিত বাজেট পরিকল্পনায় এসব তথ্য-উপাত্ত খুব প্রয়োজন। তাহলে সহিংসতা রোধ ও সহিংসতার ভয় দূরীকরণ নিশ্চিত করা যাবে। আমাদের প্রত্যাশা, জাতীয় বাজেটে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটবে।

সীমা মোসলেম

নারীর প্রতি সহিংসতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে। নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ যদি আমরা খুঁজে বের করতে না পারি, তাহলে নারী-পুরুষের সমতা আসা সম্ভব নয়। নারীদের বিভিন্ন ধরনের ভয় থেকে মুক্ত রাখতে হবে। নারী সহিংসতা রোধে আলাদা বাজেট করতে পারলে, আমরা সহিংসতা কমাতে পারব বলে বিশ্বাস। তিনটি বিষয় আমাদের ভাবতে হবে। ১. সহিংসতা থেকে সুরক্ষা ও প্রতিকার; ২. মনিটরিং সেল গঠন; ৩. নারীর কাজের পরিধি বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে নারী অনেক বেশি দৃশ্যমান। নারী এখন সমাজের সর্বত্র কাজ করছেন।

নারীরা স্টেশন ও লঞ্চঘাটে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। মনের মধ্যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়ে গেলে আমরা ভয় থেকে বের হতে পারব না। সমাজের অভ্যন্তর থেকে নারী সহিংসতার যে বিষয়গুলো বের হয়ে আসছে, সেগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে। গবেষণা ও তথ্য যদি আমাদের কাছে না থাকে, তাহলে আমরা কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারব না।

আমাদের নারীরা যে অর্জনগুলো করেছিলেন, তা করোনার কারণে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। বাল্যবিবাহের কারণে একজন মেয়ের জীবনটাই ঝরে যায়। বাল্যবিবাহের কারণে যে প্রভাব পড়ে, তা কিন্তু সারা দেশের প্রতিটি সূচকে পড়ে। লেখাপড়া থেকে অনেক মেয়ে বিমুখ হয়ে গেছে। অর্ধেক নারী যদি অশিক্ষিত থাকেন, তাহলে জাতি কীভাবে এগিয়ে যাবে? করোনার কারণে অনেক নারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের কীভাবে আবার কর্মে ফিরিয়ে আনতে পারি, তা আমাদের ভাবতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। আলাদা করে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

তানিয়া হক

নারীর প্রতি সহিংসতার সংস্কৃতি অনেক আগে থেকেই আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আমাদের জানা উচিত, কারা সহিংসতা করছেন? কারা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন? কোথায় সহিংসতা হচ্ছে? কেন আমরা সহিংসতা মেনে নিচ্ছি? এ অবস্থা থেকে আমাদের পরিত্রাণ দরকার।

আমরা দেখি পরিবার, শিক্ষাঙ্গন, কর্মক্ষেত্র—কোনো জায়গা থেকে নারী সহিংসতামুক্ত হতে পারছেন না। আমরা সম্প্রতি করোনার সময়ে দেখতে পেয়েছি, অনেক নারী প্রথমবারের মতো সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বাস্তব জীবনের পাশাপাশি অনলাইনেও সহিংসতা হচ্ছে। এ পর্যায়ে আমাদের করণীয় কী? বাজেটটা আমরা কোথায় করব? সে ক্ষেত্রে আমি বলব, তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাজেট প্রয়োজন।

সহিংসতার কারণে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সে জায়গা থেকে আমাদের উঠে আসা উচিত। একজন শিক্ষক হিসেবে বলব, শিক্ষা খাতে বাজেট প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শুধু পুঁথিগত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করা সম্ভব নয়। অনেক সময় শিক্ষক দ্বারাও শিক্ষার্থী সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সমাজনেতা বা ইমামদের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।

নারীদের সময়ের অভাব। তাঁরা ঘরে–বাইরে কাজ করছেন। যে কারণে তঁারা নিজেদের তৈরি করতে পারছেন না। এ বিষয়ে আমাদের সবার ভাবা উচিত। পুরুষদের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে হবে। জাতীয় বাজেটে এসব বিষয় যুক্ত থাকা উচিত।

নবনীতা চৌধুরী

সহিংসতার ভয় বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন সমতার কথা বলি, তখন আমরা সম–অধিকারের কথা বলি। জননিরাপত্তার বিষয় রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা দেশের উন্নয়নের কথা বলি, কিন্তু জননিরাপত্তার কথা ভাবি না। জননিরাপত্তার বিষয়টি সমাধান করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

আমরা জনপরিসরে নিরাপত্তার কথা বলছি, গণপরিবহনের কথা বলছি; কিন্তু আমরা নারীর নিরাপত্তার কথা বলছি না। একজন ভদ্র পুরুষও বাসে চাপাচাপি করে চলাফেরা করতে পছন্দ করেন না। তা আমরা কখনো চিন্তা করি না। এক দশক আগে কখনো কোনো পুরুষ অর্থনীতিবিদকে দেখিনি যে তাঁরা বলেছেন, নারী সহিংসতা রোধে বাজেট বরাদ্দ লাগবে। বর্তমানে যখন নারী অর্থনীতিবিদেরা পত্রপত্রিকায় লিখছেন, মিডিয়ায় বলছেন, তখন আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দের কথা শুনছি।

আমাদের সুশীল সমাজের মানুষদের মননে জেন্ডার লেন্স বিষয়টি ঢোকাতে হবে। আমরা সামাজিকভাবে নারীকে সম্পদ বলার জায়গায় যেতে পারিনি। আমরা প্রাথমিক শিক্ষায় নারীদের যুক্ত করতে পেরেছি। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে সমান সুযোগ দিয়ে নারীকে সহিংসতামুক্ত রাখতে পারি।

আমরা যদি নারীকে সম্পদ বিবেচনা করতে পারি, তাহলে আসলে পরিবারে নারীর নিরাপত্তা বাড়বে, নারীর অগ্রগতি টেকসই হবে। রাষ্ট্রের উন্নতি হবে। সমাজে জননিরাপত্তা বাড়াতে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যদি নীতিনির্ধারকেরা বৈষম্যমুক্ত নীতি নির্ধারণ করেন, তাহলে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ হবে।

রফিকুল ইসলাম

আমি একটু মাঠের কথা বলি। বাংলাদেশের নওগাঁ ও রাজশাহী জেলার প্রান্তিক পর্যায়ে ২৬০টি গ্রামে কাজ করছি। এর মধ্যে ১৭৫টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর গ্রাম। এখানে আমরা ১৭টি কমিউনিটি নিয়ে কাজ করি। ১৭টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করি। এদের মধ্যে সাঁওতাল, ওঁরাও, চাকমা, মারমা, গারো সবাই আছে। দক্ষিণে আছে ৮৫টি গ্রাম। এগুলো মুসলিম–অধ্যুষিত গ্রাম। নারী সহিংসতা নিয়ে কাজ করতে গেলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয় দিক থেকে অনেক প্রতিরোধে পড়তে হয়। আমরা দেখেছি, জাতি ও ধর্ম সম্প্রদায়কে পুঁজি করে সহিংসতার সূত্রপাত হয়। পরে তার সবচেয়ে বড় সহিংসতার শিকার হন নারীরা। নারী বা আমাদের কোনো লোক একা গেলে তঁাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। একসঙ্গে থানা বা উপজেলায় গেলে সেখানে আবার তঁাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

এই জায়গায় আমাদের একটু খুঁজে দেখা দরকার। নারীদের সহিংসতার কারণের মধ্যে রয়েছে পুরুষদের অর্থনৈতিক সুযোগ ও একচ্ছত্র আধিপত্য, সম্পদের অসম বণ্টনব্যবস্থা, আর্থিক সক্ষমতার অভাব, শিক্ষার অভাব, ধর্মের অপব্যবহার, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা ইত্যাদি। এগুলো নিরসনে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা প্রয়োজন। বাজেটেও বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অধিক বরাদ্দ করা যেতে পারে। ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে সব কাজ হতে হবে দুর্নীতিমুক্ত।

শরমিন্দ নীলোর্মি

অর্থনীতি মূলত মানুষের জীবনযাত্রাকে পর্যবেক্ষণ করে। সম্পদের ব্যবহার আমরা কীভাবে করব, সে বিষয়ে অর্থনীতি কতগুলো কৌশল বাতলে দেয়। আমরা প্রত্যেকেই অর্থনৈতিক মানুষ। ফলে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে বলে আমি তেল পাঁচ লিটার কিনব নাকি দুই লিটার কিনব, এর জন্য অর্থনীতি পড়তে হয় না।

নারীরা কেউ কোথাও নিরাপদ নই। আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে দেখেছি, আশ্রয়কেন্দ্রে সমতলের বাসিন্দাদের জায়গা হয়, সেখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জায়গা হয় না। তারা পাহাড়েই দাঁড়িয়ে থাকে। আমি মনে করি, নারী ও পুরুষের পরিসংখ্যান রাখতে হবে। এটা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তাহলে আমরা সমস্যার জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পারব।

আর সমস্যার জায়গাগুলো খুঁজে পেলে তার সমাধান সহজ হবে।

খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, জেন্ডার বাজেটে নারী উন্নয়নের সংবেদনশীল আচরণ নিয়ে কথা বলা উচিত। বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে ১৪টি প্রশ্ন আছে। আমি মনে করি, সেই জায়গায় নারীর প্রতি সংবেদনশীল খরচটা কীভাবে করা যায়, সেটা উল্লেখ থাকা উচিত। আমাদের এবারের বাজেট সাত লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

সেখানে বাইরের যারা আমাদের সহযোগিতা করে, সেটা কত টাকা। অথচ আমরা বলি, তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য অনেক ডলার দেয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বন্যাকবলিত এলাকা হচ্ছে গাইবান্ধা। আমি জানলাম, সেখানে ২০০ পরিবারের ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়েছে সংবাদ প্রেরণের জন্য। আমি জানতে চাইলাম, ২০০ জনের মধ্যে কজন নারীর ফোন নম্বর আছে? তারা আমাকে জানাল, এই ২০০ জনই পুরুষ, এর মধ্যে কোনো নারীর ফোন নম্বর নেই। অথচ অধিকাংশ পুরুষ থাকেন ঘরের বাইরে। নারীরা থাকেন ঘরে। সে ক্ষেত্রে নারীরা সংবাদ পেলে তাঁরা মালপত্র গোছাতে পারেন, দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেন।

কী হওয়ার কথা, আর কী হচ্ছে? তাহলে আমরা কীভাবে নারীদের প্রাধান্য দিচ্ছি? কীভাবে আমাদের উন্নয়ন হবে?

নারীদের জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে। সচেতন করতে হবে। নারী উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। তাহলে আমরা নারী সহিংসতা কমাতে পারব।

কানিজ ফাতেমা

আমার আলোচনা আমি তথ্য ও প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব। নারী বাসে নিরাপদ নন, ঘরে নিরাপদ নন। গত ৩০–৪০ বছরের মধ্যে আমরা যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তার মধ্যে আশপাশের অনেক দেশের আগেই কিন্তু বাংলাদেশ ডিজিটাল দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়টাতে নারী-পুরুষ সবাই অনলাইনে সক্রিয়। আমাদের কাজের জন্য এবং সবকিছুর জন্য আমরা এখন অনলাইনে আছি। সহিংসতার একটা ভীতি সব জায়গায় আছে।

আমাদের জনসংখ্যা নারী ও পুরুষ অর্ধেক অর্ধেক। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে পড়ালেখা করা নারীর সংখ্যা ২৯ শতাংশ। কর্মক্ষেত্রে টেকনোলজি খাতে কাজ করছেন ২০ শতাংশ। তথ্যপ্রযুক্তির খাতে ব্যবসা করেন মাত্র ৩ শতাংশ নারী। আশপাশের দেশগুলোতে এর পরিমাণ ১২ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেয়েদের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিতে আসন কম।

এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে তথ্যপ্রযুক্তিতে মেয়েরা অনেক পিছিয়ে আছেন। শিক্ষার জায়গাটায় যেহেতু আমরা পিছিয়ে আছি, তাই সচেতনতা কম। আমাদের কতজন নারী অনলাইনে আছেন? সে ক্ষেত্রে তঁারা নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারছেন কি না। আমরা অনলাইনে কতটা নিরাপদ, এটা নিজেরাও জানি না। অনলাইনেও আমরা সহিংসতার শিকার হতে পারি। অনলাইনে যদি আমার আপনার একটা ছবি এক্সপোজ হয়ে যায়, তাহলে আমরা কী করতে পারি? বড়জোর নিজে সাইট বন্ধ করে রাখতে পারি। কিন্তু মেসেঞ্জারের মাধ্যমে সেটা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটা একটা ভয়াবহ সহিংসতা।

অনলাইনে নারীদের সহিংসতা বন্ধের জন্য সব মহলকে কাজ করতে হবে। তাহলে নারী সহিংসতা কমানো সম্ভব হবে। তাই আমি বলব, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হোক।

মানসী সাহা

‘ভ্রমণকন্যা’ নামে আমাদের একটি সংগঠন আছে। সেখানে আমরা মেয়েরা একত্র হয়ে ভ্রমণ করি। সদস্য প্রায় সব বয়সের, সব পেশার ৬৫ হাজার নারী। আমরা স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তা নিয়ে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণের সামাজিক সচেতনতার কাজ করে থাকি। নারী হিসেবে পরিবারের পুরুষ সদস্য ছাড়া বাইরে বের হওয়া বা ভ্রমণ করতে যাওয়ায় সম্মুখীন হতে হয়েছে অনেক কটূক্তিরও। কিন্তু কোনো কিছুই আমাদের বাধা হতে পারেনি। আমরা যেমন স্কুলপড়ুয়া শিশুদের সেলফ ডিফেন্স শিখিয়েছি, তেমনি ছয় থেকে ষাটোর্ধ্ব মায়েদের নিয়েও দেশ ও বিদেশে ভ্রমণে বেরিয়েছি।

আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার কিছু ফলাফল স্বচক্ষে দেখেছি। থানা পর্যায়ে যখন আমি দুই বছর কাজ করেছি, তখন দেখেছি কীভাবে একজন মেয়ে সহিংসতার শিকার হচ্ছে, বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিকারের পাশাপাশি প্রতিরোধ আর ‘সহিংসতার ভয়’ দূরীকরণও অবশ্যদরকারি।

দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে নারীর কর্মপরিধি বেড়েছে বহু অংশে। বর্তমানে মেয়েদের ঘরের বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রও অনেক বেশি। সমাজের সব স্তরে সব ধরনের কাজে মেয়েরা যখন অংশ নিচ্ছেন, তখন তঁাকে প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে। বাসাবাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য তঁাকে কোনো পরিবহন ব্যবহার করতে হচ্ছে। কর্মস্থল ছাড়াও যখন ভ্রমণে যাবেন, তখনো তঁাকে কোনো না কোনো গণপরিবহন ব্যবহার করতে হচ্ছে। আমরা কি বলতে পারি আমরা তঁাকে নিরাপদ একটা পথ বা নিরাপদ একটা পরিবহন দিতে পেরেছি? গণপরিসরে এবং গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করেছি যে পরিবহনে চলাচলের ক্ষেত্রে নারীরা বেশি সহিংসতার শিকার হন। সেটা ভার্বাল অথবা নন–ভার্বাল। আমরা জানি যে বর্তমানে ঢাকা মহানগরে কয়েকটি বিআরটিসি দোতলা বাস চলছে, যা কিনা শুধু নারীদের জন্য। এর সংখ্যা আরও বাড়ানোর কথা থাকলেও বাড়ানো হয়নি। এত বড় ঢাকা শহরে মেয়েদের কাজে যাওয়া ও আসার জন্য অল্প কটি বাস খুবই কম। আবার অন্যান্য গণপরিবহনে অল্প কিছু আসন বরাদ্দ রাখা হয় নারীদের জন্য, সেটাও তো পর্যাপ্ত নয়। নারী আসন খালি নেই—এই অজুহাতে অনেককে পরিবহনে উঠতে মানা করে দেওয়া হয়। অনেক সময় দেখা যায়, সেই মেয়েদের সিটে পুরুষেরা বসেন। আর পরিবহনে অযাচিত স্পর্শ, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের ব্যাপারে তো অহরহ শোনা যায়, পত্রিকার পাতায় পড়া হয়।

যে নারীরা আমাদের দেশের কর্মশক্তির অর্ধেক, সেই নারীর জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত না করা যায়, তারা যদি সারাক্ষণ ‘সহিংসতার ভয়’ মনের মধ্যে বয়ে বেড়ান, তাহলে তা আমাদেরই ক্ষতি, দেশেরই ক্ষতি। এবারের বাজেটে তাই নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিকার হিসেবে একটি নিরাপদ চলার পথ ও মাধ্যম দেওয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা একান্ত জরুরি।

ফজিলা বানু লিলি

সহিংসতার ভীতির বিষয়টি ঘরে-বাইরে উভয় জায়গায় আছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে আছে। আমি আমার ঘরে নাতি–নাতনিকে কেয়ার করার জন্য যে লোক আছে, সে না থাকলে অন্যের কাছে রেখে যেতে ভয় পাই। কারণ, আমি অন্যের প্রতি বিশ্বাস পাই না।

সহিংসতার ভয়টা আমি ছোটবেলা থেকে এই বৃদ্ধ বয়সেও পাচ্ছি। আমাদের এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করতে হবে। ভীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় নারীর মাধ্যমেও নারীর প্রতি যে সহিংসতা হয়, এ ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে। পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মনিটরিং বাড়াতে হবে।

বাজেট বরাদ্দের যে টাকা আসছে, সেটার কতটুকু সুষম বণ্টন হচ্ছে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাহলে আমরা নারী সহিংসতামুক্ত সমাজ পাব।

রাফসান জানি সৌরভ

আপনারা যদি জাপানি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন, তারা একটা মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করে। সেটা হচ্ছে, ভিত্তি হবে মজবুত। জাতির ভিত্তিকে মজবুত করার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয় সবচেয়ে ভালো ছাত্রকে। সবদিক থেকে বিশ্লেষণ করে বলতে পারি, আমাদের সমস্যা হচ্ছে গোড়াতে। দেশে চাকরির ক্ষেত্রে ১৩তম স্তরে রাখা হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। তাহলে দেশের ভিত্তি কীভাবে মজবুত হবে?

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্ররা পর্যন্ত এখন প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে গেছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের ভিপিএন টাইপ সাইটগুলো বন্ধ করতে হবে। আমার মাথা থেকে যদি নোংরা চিন্তাগুলো চলে যায়, তাহলে আমরা সুন্দর চিন্তার অধিকারী হব। তাহলে আমি আর কোনো নারীকে অসম্মান করব না, নারীর প্রতি সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত হব না।

ফারজানা আক্তার প্রীতি

নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে আমরা পিছিয়ে আছি। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আমরা প্রশিক্ষণ নিই। যারা নারীর প্রতি সহিংসতা করে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দ দরকার। আমরা যখন পড়ালেখার মধ্যে থাকি, তখন অনেক কিছু শিখি। কিন্তু আমাদের ব্যবহারিক জ্ঞান না থাকায় তা কাজে লাগাতে পারি না। আমার মনে হয়, সে ক্ষেত্রে ছেলেদের আলাদা করে তাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়া দরকার। এ ধরনের প্রশিক্ষণ যদি করাতে পারি, তাহলে নারীর প্রতি সহিংসতা অনেক কমে যাবে।

ফাহমিদা খাতুন

শুধু নারীর জন্য বাজেট বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা করলে চলবে না, নারীর ভয়ের বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তাঁরা কী কী বিষয়ে ভয় পান, সে জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আমাদের সমাজে শুধু নারীদের সহিংসতার শিকার হতে হয় না; আমরা দেখি, ছেলেশিশুরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে মারা হয়।

এ ছাড়া তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সহিংসতার শিকার হতে হয়। আমাদের সমাজে যারা দুর্বল, তাদের যেমন ভয় দেখানো হয়, শাসন-শোষণ করা হয়; তেমনি আমাদের সমাজে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত নারী সবাইকে দুর্বল হিসেবে দেখা হয়। আমরা সহিংসতার অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বলি। এ ক্ষতি নারীর একার ক্ষতি নয়, সমাজের ক্ষতি। এটা মূলত রাষ্ট্রের ক্ষতি। আমরা বাজেটকাঠামোর চারটি মূল স্তম্ভের কথা বলেছি। আমাদের প্রণয়ন করা বাজেট সবার জন্য একই রকমভাবে প্রয়োগ হয় না।

কিছু বাজেট সুনির্দিষ্ট মানুষের জন্য করা হয়। বাজেট স্বল্প আয়ের মানুষ ও বৃহৎ আয়ের মানুষের কাছে একেক রকম। নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করার জন্য কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে গেলে অর্থের প্রয়োজন। বাজেট করতে অর্থ মন্ত্রণালয় কাজ করে থাকে। সে ক্ষেত্রে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কতটুকু সহায়তা দেয়, সে দিকটা খেয়াল রাখতে হবে।

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়। আমাদের নারী সহিংসতার ক্ষতিটা দেখতে হবে। পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। সবার সংযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ বাস্তবায়নের বিষয়টি অবশ্যই তদারক করতে হবে। তাহলে আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করতে পারব।

ফিরোজ চৌধুরী

আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।

সুপারিশ

  • নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ প্রয়োজন

  • নারীর জন্য যেমন বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে, তেমনি তাঁরা যেন নির্ভয়ে চলাচল করতে পারেন, তা বাজেটে নিশ্চিত করতে হবে।

  • বাল্যবিবাহ রোধে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

  • নারীর উচ্চশিক্ষায় অধিক বরাদ্দ প্রয়োজন।

  • নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাজেট বাড়াতে হবে।

  • নারীদের নিরাপদ পরিবহন-ব্যবস্থার জন্য বাজেট প্রয়োজন।

  • নারীকে দায় হিসেবে না দেখে সম্পদ মনে করতে হবে।

  • দেশে কতজন নারী সহিংসতার শিকার হন, কতজন নারীর বাল্যবিবাহ হয়—এসবের সঠিক কোনো তথ্য নেই। এসব তথ্য–উপাত্তের জন্য বাজেট দরকার।

  • নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার জন্য বাজেট প্রয়োজন।

  • বাজেটের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন করতে হবে।