ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল
পলিথিনের ব্যবহার আত্মহত্যার শামিল
জীবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্লাস্টিক ও পলিথিনজাতীয় পণ্যের ব্যবহার বন্ধে সরকারকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অঙ্গীকার করার আহ্বান।
পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার দেশে দ্রুত বাড়ছে। এই পণ্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক বিপদে ফেলছে। এসব পণ্য প্রকৃতিতে হাজার বছর রয়ে যায়, তৈরি করে নানা রোগব্যাধি। তাই আমাদের জীবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্লাস্টিক ও পলিথিনজাতীয় পণ্যের ব্যবহার বন্ধে সরকারকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অঙ্গীকার করতে হবে। আর বিকল্প পণ্যকে সস্তা ও জনপ্রিয় করতে হবে। তেমনি নাগরিকদেরও এ ব্যাপারে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে।
‘বন্ধ হোক পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরইডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এই ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ ও পলিথিন বন্ধে বৈশ্বিক চুক্তিতে বাংলাদেশ প্রথম স্বাক্ষরকারী। পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আসলেই আত্মঘাতী। পরিবেশ অধিদপ্তর ভবন থেকেই পলিথিন ব্যবহার বন্ধের কার্যক্রম শুরু হোক। তারপর পর্যায়ক্রমে তা মন্ত্রণালয় ও সংসদ ভবনেও চালু করা যেতে পারে। আমার নির্বাচনী এলাকায় একটি ওয়ার্ড নিয়ে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে পাইলট প্রকল্প শুরু করব। সবাই মিলে আমরা একটা পথনকশা করে এটা বাস্তবায়ন করতে পারি।’
বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘পরিবেশের ক্ষতি করে, এমন পণ্য নানা রংবেরঙের বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করা যাবে না। আমরা এগুলোর বিরুদ্ধে প্রচারে নামব। কারণ, পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার আমাদের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এটা একধরনের আত্মহত্যার শামিল, তাই এগুলোর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। উচ্চ আদালতের এক রায়ে বলা হয়েছে, সব হোটেল-মোটেলে পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বন্ধ করতে হবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তর ভবন থেকেই পলিথিন ব্যবহার বন্ধের কার্যক্রম শুরু হোক। তারপর পর্যায়ক্রমে তা মন্ত্রণালয় ও সংসদ ভবনেও চালু করা যেতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, ‘প্লাস্টিক একটি বড় ধরনের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ। এটি সর্বোপরি মানবস্বাস্থ্যের ওপরে বড় প্রভাব ফেলছে। হাইকোর্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, উপকূলীয় এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। চা-বাগান এবং মাছের পোনায় ব্যবহারে পলিথিনের পুরুত্বের সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন হাজার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সেখান থেকে ১৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রচার-প্রচারণা দিয়ে মানুষের প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না। আমরা এখন কঠোর হতে যাচ্ছি।’
বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমেদ খান পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।
এএলআরইডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ‘আমাদের আরও বেশি কার্যকর হয়, এমন কর্মপরিকল্পনা করতে হবে। পলিথিন বন্ধের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে সম্ভাবনা হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। এর মাধ্যমে বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়িয়ে এই শিল্পের পুনর্জাগরণ সম্ভব।’
প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের ব্যবহার শুরু হয়েছে। অনেক দেশে কলার আঁশ ও সুতার মতো প্রাকৃতিক পণ্যে তৈরি খাবার প্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব দেশ পারলে আমরাও পারব। এ জন্য সবাইকে মিলে চেষ্টা করে যেতে হবে।’
এসডোর সেক্রেটারি জেনারেল ড. শাহরিয়ার হোসেন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় বলেন, প্লাস্টিক মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়। এর জীবনকালের মধ্যে শুধু পরিবেশকে ক্ষতি করে না, এটি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে। এটি পরিবেশের তিনটি প্রধান উপাদান মাটি, পানি ও বায়ুর ক্ষতি করছে। আর প্লাস্টিক পণ্য তিনবারের বেশি ব্যবহার করা যাবে না।
শাহরিয়ার হোসেন উল্লেখ করেন, ‘প্রতি ১১ বছরে বিশ্বে সমুদ্রে প্লাস্টিক জমা হওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণ হচ্ছে। ভাতের মধ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। আমরা এক বেলা ভাত খেলে বছরে শরীরে এক কেজি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হচ্ছে। এটা ধীরে কাজ করে, এমন একধরনের বিষ। এর ফলে গত ১৫ বছরে দেশে ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৫ গুণ বেড়েছে। এখন শিশুরাও ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ কেউ খুঁজে পাচ্ছেন না।’
গবেষক খোরশেদ আলম তাঁর উপস্থাপনায় প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের ওপরে উপস্থাপনা করেন। এতে তিনি বলেন, একটা সময় গ্রামে মাটি, কাঁসা ও পিতলের তৈরি পণ্য জনপ্রিয় ছিল। সেগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। বাঁশের তৈরি পানির বোতল ও কলমদানি, কাপড়ের তৈরি ব্যানার ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ইকবাল আহমেদ বলেন, প্লাস্টিকের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। তবে তা বাস্তবায়ন করতে হলে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্য বিভাগগুলোতে তা থাকতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতন করা যেতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা ওয়েস্ট কনসার্নের নির্বাহী পরিচালক আবু হাসনাত মো. মাকসুদ সিনহা বলেন, ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে রাখার অনেকগুলো জায়গা আমরা চিহ্নিত করেছি। অর্ধেক প্লাস্টিক মাটিতে গিয়ে মিশছে। তবে একবারে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না, পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘এই আলোচনার সঙ্গে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। আমরা প্রচুর পণ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করছি। তবে বছরে ৫০ হাজার মেট্রিক টন প্লাস্টিক পণ্য সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করছি। তবে আমরা প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের ব্যবহার খুঁজছি।’
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির মহাসচিব নারায়ণ চন্দ্র দে বলেন, ‘করোনার সময় পিপি ও মাস্ক প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয়েছে। পাতলা প্লাস্টিক সবচেয়ে বিপজ্জনক। প্লাস্টিক ছয়বার ব্যবহার করা যায়, শেষ পর্যন্ত তা রাস্তা নির্মাণে ব্যবহার করা যাবে। এ জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।’
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্টাল সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, সৈকতে হোটেল-মোটেলে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হলে সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সক্রিয় করতে হবে। তবে ওই কমিটির সভাপতি হচ্ছে জেলা প্রশাসক। তিনি শতাধিক কমিটির সভাপতি, ফলে তার পক্ষে এ ধরনের কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হবে না।
খাদ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার বিপণন বিভাগের পরিচালক মাকসুদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সিটি করপোরেশনের সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করছি। এই উদ্যোগগুলোকে আমরা আরও এগিয়ে নিয়ে যাব।’
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।