বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সুপারিশ

■ দেশে বাল্যবিবাহ বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি

■ বাল্যবিবাহ রোধে বিবাহ নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন করা দরকার

■ বিবাহ নিবন্ধনে অদ্বিতীয় শনাক্তকরণ নম্বর চালু করা প্রয়োজন

■ বাল্যবিবাহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক, সাংস্কৃতিক চর্চা, রীতিনীতি ও আচরণের পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার

■ দেশে বাল্যবিবাহের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি

■ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটি শক্তিশালী করা, সমাজের মানুষকে সচেতন করা ও বাল্যবিবাহের শিকার নারীদের এসব কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে

■ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সংশ্লিষ্ট সব উদ্যোগে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আন্তমন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন

■ বাল্যবিবাহ বন্ধের বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা জরুরি

■ বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে ব্যাপক প্রচার–প্রচারণা চালিয়ে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে

■ স্কুল পাঠ্যক্রমে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি ও বাল্যবিবাহ রোধে কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে, তা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার

আলোচনা

default-image

মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরী

বিল্ডিং বেটার ফিউচার ফর গার্লস প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলা, ৩টি পৌরসভা, ৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদে কাজ চলছে। ঢাকাস্থ সুইডিশ দূতাবাসের সহযোগিতায় আরডিআরএস এটি বাস্তবায়ন করছে। আমরা প্রায় ১৬ লাখ উপকারভোগী নিয়ে কাজ করছি। ২০২১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহের সংখ্যা ১৮ বছরের নিচে এক–তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা এবং ১৫ বছরের নিচে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনটি পরিবর্তন আনার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রথমত, মেয়েদের ক্ষমতায়ন ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। তারা যেন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারে, বাল্যবিবাহকে ‘না’ বলতে পারে। দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি সচেতনতা তৈরি করা। যেন তারা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করে। তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহ বন্ধে সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া।

২০১৭ সালে কুড়িগ্রামে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৬৫ শতাংশ। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে একটি মধ্যবর্তীকালীন মূল্যায়ন করা হয়। তখন বাল্যবিবাহের এ হার ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসে। আমরা কুড়িগ্রামে প্রতি মাসে বাল্যবিবাহের তথ্য সংগ্রহের একটি পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছি। সেখানে দেখা যায়, ২০১৯ সালে প্রতি মাসে ৯৪টি বাল্যবিবাহ হচ্ছিল। ২০২০ সালে এ সংখ্যা কমে ৩৬ হয়।

ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭০ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার কমেছে। ১৯৭০ সালে দেশে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৯৩ শতাংশ। ২০২০ সালে তা ৫১ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত ৫০ বছরে বাল্যবিবাহের হার কমেছে ৪২ শতাংশ। কিন্তু এ গতিতে বাল্যবিবাহের হার কমলে ২০৫০ সালেও দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ দূর করা যাবে না।

২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধে তিনটি কাজ করতে হবে। সেগুলো হলো: বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি শক্তিশালী করা, সমাজের মানুষকে সচেতন করা ও বাল্যবিবাহের শিকার নারীদের যুক্ত করা। বাল্যবিবাহ কমিটি শক্তিশালী করতে আমরা ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। প্রতি মাসে কতসংখ্যক বাল্যবিবাহ হচ্ছে—তার তথ্য প্রয়োজন রয়েছে। ঘটক, কাজিসহ বিয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা গেলে বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনা সম্ভব। কুড়িগ্রাম জেলায় আমরা বিয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬ হাজার ১২ জন ব্যক্তির তালিকা করেছি এবং প্রশিক্ষণ আওতায় নিয়ে এসেছি। দেশে বাল্যবিবাহ বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের আচরণের পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।

default-image

মনিরা নাজমী জাহান

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭–তে ১৮ বছরের নিচে কাউকে বিয়ে দিতে আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিশেষ বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে আদালতে আবেদন করতে হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। সে কমিটি কিছু বিষয় নজরে রেখে বিয়ে হওয়া বা না হওয়ার সিদ্ধান্ত দেবে। তবে এ বিশেষ বিধানের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালায় ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে দেওয়া নেই। এর সঙ্গে জড়িত আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। আমাদের দণ্ডবিধিতে বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে বয়স ১২ বছরের নিচে বলা হয়েছে। আবার শাস্তির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ১৩ বছরের নিচে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী শারীরিক সম্মতি দেওয়ার জন্য ন্যূনতম ১৬ বছর হতে হবে। পারিবারিক সহিংসতা আইনে ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সব কটি আইনই আন্তসম্পর্কযুক্ত। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে বয়সের বিচার ভিন্নভাবে করা হচ্ছে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ বিয়ে করলে তাকে ছয় মাসের কারাবাস দেওয়ার কথা আছে। কিন্তু সেখান থেকে তারা অন্য অপরাধীদের সঙ্গে মিলে পরে অন্য কোনো অপরাধ করবে না—সে নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ফৌজদারি আইনে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা মানার নিয়ম (তামাদি) থাকে না। কিন্তু বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭–এর ১৮ ধারা অনুযায়ী বাল্যবিবাহ হওয়ার দুই বছরের মধ্যে অভিযোগ জানাতে হবে। দুই বছর পার হলে আদালত তা আর গ্রহণ করবেন না। ফলে দুই বছর পার হলে আমার আর বিচার চাওয়ার অধিকার থাকে না। এসব সমস্যা দূর করা, আইনগুলো স্পষ্ট করা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে একটি বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়তে পারি।

default-image

তানজিলা তাসনিম

আমার মতো স্কুল বা কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন দেখে তার সহপাঠীর বিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সে রাজি নয়, তখন আমরা কী করতে পারি? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোথায় গেলে সাহায্য পাব, তা আমরা জানি না। চ্যালেঞ্জটা হলো আমি নিজেও প্রাপ্তবয়স্ক নই। আমি বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কথা বললে তারা শুনবে না। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই কোনো ক্ষমতাশালী কারও কাছে সাহায্য চাইব। তার পরে সাহায্য না পেলে ফেসবুক কমিউনিটি হেল্প ফিচারে পোস্ট করতে পারি। বাসায় বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে খুব সহজেই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে একটা জনমত তৈরি করতে পারি। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো গ্রুপে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করা সব জেলা প্রতিনিধি থাকলে সেখানে সাহায্য চেয়ে পোস্ট করা যাবে। শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের ফলে আমার বয়সী প্রায় সবাই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতন আছে। কিন্তু বাল্যবিবাহ কীভাবে আটকাব—তা আমি নিজেই জানি না। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সপ্তাহে অন্তত একটি বিশেষ ক্লাস রাখা প্রয়োজন। যেখানে কোথায় গেলে সাহায্য পাব—তা জানানো হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

default-image

সরদার আকিব লতিফ

আলোচনায় একটি প্রকল্পের কথা এসেছে। সেখানে বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত অভিভাবক, আত্মীয়স্বজনসহ সবাই অন্তর্ভুক্ত আছে। কিন্তু আমাদের বয়সী কাউকে ওভাবে যুক্ত করা হচ্ছে না। স্কুল ও কলেজশিক্ষার্থীদের এখানে যুক্ত করা প্রয়োজন। বাল্যবিবাহ রোধের ক্ষেত্রে মেয়েশিক্ষার্থীদের বেশি এগিয়ে আসতে দেখা যায়। কিন্তু ছেলেশিক্ষার্থীদের সেভাবে দেখা যায় না। কারণ হলো এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খুব একটা উদ্বুদ্ধ করা হয় না। শহর ও গ্রামের মধ্যকার পার্থক্য আমাদের মেনে নিতেই হয়। শহরে বাল্যবিবাহের হার খুব কম। শহরের ছেলেরা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতন। কিন্তু গ্রামের অনেক ছেলে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। সে জন্য পাঠ্যক্রমে বাল্যবিবাহের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যেন ছেলে-মেয়ে উভয়ই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হয়।

default-image

চৌধুরী মোহাম্মদ মোহায়মেন

শিশুদের জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯৮-এর কাজই হলো শোনা। আমরা গ্রাম পর্যায় থেকেই শুনতে চাই। এ হেল্পলাইন নম্বরটি টোল ফ্রি। দিনে ২৪ ঘণ্টাই শিশুসহায়ক জাতীয় হেল্পলাইন সেবা কার্যক্রম চলমান থাকে। এর মাধ্যমে আমরা সমস্যাগুলো শুনছি, প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি তাৎক্ষণিক সহায়তার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার টিমকে অবহিত করছি। এখানে উপজেলা পর্যায়ে সমাজসেবা কর্মকর্তা, সমাজকর্মী, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা, পুলিশ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রয়েছেন। শিশুদের জন্য হেল্পলাইন ১০৯৮-এর কথোপকথন পুরোটাই গোপন থাকে। আজকাল শিশুরা অনেক সময় অভিভাবকদের বিশ্বাস করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আশার জায়গা তৈরি হয়েছে যে শিশুরা এখন মনের কথাগুলো খুলে বলতে পারছে। ফলে আমরা তাদের পথ দেখানোর সুযোগ পাচ্ছি। অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে শিশুদের ভুল-বোঝাবুঝি হয়। হয়তো অভিভাবক ঠিক বলছেন কিন্তু শিশুরা বুঝতে পারছে না। ফলে বিষয়গুলো আমাদের জানানোর পর আমরা তাদের সে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দিচ্ছি।

বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে এখন অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে। মেয়েশিশুর পাশাপাশি ছেলেশিশুরাও বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। গত বছর আমরা ২১টি ছেলেশিশুর বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছি। এখন শিশু হেল্পলাইন সহায়তা চাওয়ার পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এককভাবে কাজ করে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বাল্যবিবাহ বন্ধ করার পাশাপাশি কেন বাল্যবিবাহ হলো, সেগুলো কেস ম্যানেজমেন্টের আওতায় নিয়ে আসছি। ১০৯৮-এ শিশুরা যোগাযোগ করুক, বড়রা যোগাযোগ করুক, আমরা শুনছি। আমরা সব সময় শিশুদের পাশে রয়েছি।

default-image

সাদেকা হালিম

বিল্ডিং বেটার ফিউচার ফর গার্লস প্রকল্পটি কুড়িগ্রাম জেলায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মডেলটি আমরা দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যবহার করতে পারি। এ প্রকল্পের সাফল্য আশাজাগানিয়া।

আমাদের অনেক প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও দেশে এখনো বাল্যবিবাহের হার ৫১ শতাংশ, যা বিশ্বে বাল্যবিবাহের হারের দিক থেকে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। তাই বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আইনি নমনীয়তার কারণে একদিকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ হচ্ছে না, অন্যদিকে বাল্যবিবাহের মাধ্যমে মেয়েটিকে আরও ক্ষমতাহীন ও প্রান্তিক করা হচ্ছে। বাল্যবিবাহের কারণগুলো নিয়ে কোনো দ্বিমত করব না। তবে এখানে সুযোগ ব্যয়ের বিষয়টি আসেনি। আমাদের অনেক আইন হয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় বাল্যবিবাহ ও যৌতুক সামাজিকীকরণ হয়ে গেছে।

আমরা দেখেছি স্কুলে ভর্তির হার অনেক বেশি৷ এ ক্ষেত্রে আমরা চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। এর কারণ হলো ছোট মেয়েকে বয়স্ক লোকের কাছে বিয়ে দেওয়া গেলে যৌতুকের পরিমাণ অনেক কমে আসে। বাল্যবিবাহের আরেকটি বড় কারণ হলো নিরাপত্তাহীনতা। পরিবারগুলো মনে করে ১৫ বছরের মধ্যে বিয়ে না দিলে পরিবারের সুনাম নষ্ট হবে। এ ক্ষেত্রে একটা সামাজিক চাপও কাজ করে। ধর্ম ও সংস্কৃতি মিলে এমন একটা রীতি তৈরি করে যে আমরা বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি।

সব কাজ কোনো এনজিওর পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে একটা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। করোনা-পরবর্তী সময়ে রাজশাহীতে ৬ হাজার ৫০০ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। টাঙ্গাইলে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী স্কুলে আর ফেরেনি। এখন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমাদের করণীয় কী? এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধনের কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ তথ্যগুলো রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু ১৫ থেকে ১৯ বছরের মেয়েদের মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশের কম্পিউটারে প্রবেশাধিকার আছে। মাত্র ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ নারীর ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে অজপাড়াগাঁয়ের মেয়েরা কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করবে? দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। ফলে কন্যাসন্তানদের আমরা বিন্দুমাত্র অবহেলা করতে পারি না।

default-image

মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ

বিবাহ নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অদ্বিতীয় শনাক্তকরণ নম্বর (ইউনিক আইডি) ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অদ্বিতীয় শনাক্তকরণ নম্বর কার্যক্রম চালাচ্ছে। এটা আরও এগিয়ে আনা প্রয়োজন। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই। ২০১৬ সালে গার্লস সামিটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেন যে ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা চালানো হবে। সে অনুযায়ী কাজও চলছিল। তবে করোনা মহামারির সময়ে এ কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। বিবাহ নিবন্ধন করে বাল্যবিবাহ হওয়ার সুযোগ নেই। যেসব বিয়ের নিবন্ধন হয় না, সেগুলো বাল্যবিবাহ হয়।

আমাদের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন সনদের নম্বর ভিন্ন হয়। এ তিনটি নম্বরের সমন্বয়ে একটি নম্বর হলে সমস্যাগুলো অনেক কমে আসত। এ তিনটির সমন্বয় থাকলে বিবাহ নিবন্ধনে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ ও পাসপোর্ট ব্যবহারে কোনো সমস্যা হতো না। কোভিড-১৯-এর টিকা নিতে হলে সুরক্ষা ওয়েবসাইটে একটি ফরম পূরণ করতে হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ওয়েবসাইট থেকে অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সে ফরম নিয়ে টিকা দিতে হয়। ঠিক একইভাবে কন্যা ও বরের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন দিয়ে অনুমতি নেওয়ার একটি ওয়েবসাইট করা প্রয়োজন। বর-কনের সব তথ্য ঠিক থাকলে ওয়েবসাইট থেকে একটি অনুমতিপত্র দেওয়া হবে, যা দিয়ে যেকোনো কাজি অফিসে বিবাহ নিবন্ধন করা যাবে। ফলে বাল্যবিবাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।

প্রতিদিন কতসংখ্যক বিয়ে হয়, সে তথ্য সংগ্রহের একটা অনলাইন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পরপর তার জন্য একটি অদ্বিতীয় শনাক্তকরণ নম্বর রাখতে হবে। সেটিই হবে তার জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর।

default-image

তপন কুমার কর্মকার

উন্নয়নের সাময়িক কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি ফল থাকে না। সে কারণে আরডিআরএস টেকসইভাবে জনসম্পৃক্ত সংগঠন গঠন করে। যেন প্রকল্প না থাকলেও এসব কার্যক্রম চলতে পারে। সে জন্য রংপুর বিভাগে ৪০০ ইউনিয়নে ইউনিয়ন ফেডারেশন করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ইউনিয়ন ফেডারেশন করা আছে। এ ফেডারেশনগুলো আরডিআরএসের কোনো সংগঠন নয়। এগুলো স্বনিবন্ধিত সংগঠন, যেন তারা নিজেরাই সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তারা আরডিআরএসের সহায়তার বাইরে নিজেরাও তহবিল সংগ্রহ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা পালন করে। জনগণের সম্পৃক্ততা থাকলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। প্রকল্পভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

কুড়িগ্রামে বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত সবার সম্পৃক্ততা বড় ভূমিকা পালন করেছে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার শূন্যে নিয়ে আসার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কুড়িগ্রাম সরকারি প্রশাসনের ভূমিকা প্রশংসনীয়। সারা দেশে সরকারি প্রশাসনের এ ভূমিকা রাখা উচিত। কুড়িগ্রামে যে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে, সেটাকে মডেল হিসেবে নেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনের ভূমিকা ও জনসম্পৃক্ততা—এ দুটো নিশ্চিত করা গেলে বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনা সম্ভব। কোভিডকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা বাল্যবিবাহের বড় কারণ হিসেবে এসেছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলো করোনাকালে অনেক ব্যাহত হয়েছে। ২০২২ সালের পর কুড়িগ্রামে বিল্ডিং বেটার ফিউচার ফর গার্লস প্রকল্পটি থাকবে না। কিন্তু যে সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে, তাতে এ প্রকল্প না থাকলেও বাল্যবিবাহ কমে আসবে।

default-image

মোখলেসুর রহমান

বাল্যবিবাহ নিয়ে সরাসরি কাজ করার জায়গায় পুলিশের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। আইন প্রয়োগ ছাড়া সরাসরি কাজ করার ক্ষেত্রে নানান প্রতিবন্ধকতা আছে। বাল্যবিবাহ নিয়ে আমার কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি একটা প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষকে শত বছরের মূল্যবোধ থেকে বের করে আনা অত্যন্ত জটিল কাজ। আমার মা, নানি বা পূর্ববর্তী সবারই বাল্যবিবাহ হয়েছে। এ দীর্ঘদিনের চর্চা থেকে মানুষকে বের করা খুব কঠিন। সমাজ ও প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। কী উপায়ে এ পরিবর্তন নিয়ে আসব, তা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যেকোনো সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে আইন থাকলে প্রথমেই আইন প্রয়োগ করতে হবে। আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি বিষয়। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আইনে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত আছে। কিন্তু তবু নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এ রকম কেন হয়? এর সঙ্গে আর্থসামাজিক অবস্থা জড়িত।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। সবকিছু ধীরে ধীরে ভালোর দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু কোন বিষয়গুলোতে আমরা অগ্রাধিকার দেব? বাল্যবিবাহ সে অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে কি না? না থাকলে বাল্যবিবাহকে অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসতে হবে। কারণ, এটা জাতিগঠন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলে কাজগুলো অনেক এগিয়ে যাবে। মেয়েদের ১৮ বছর বয়সের আগপর্যন্ত বৃত্তি দেওয়া যেতে পারে। তাহলে তা বাল্যবিবাহ রোধের ক্ষেত্রে একটা বাধা হিসেবে কাজ করবে।

default-image

কাশফিয়া ফিরোজ

আইন, বিধিমালা ও কর্মপরিকল্পনা থাকলেই হবে না। সেটা কত দূর কাজ করছে ও সমস্যাগুলো কী, তা মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে হবে। সে জায়গায় প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একটা বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য আমরা সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছি। আগামী ১০ বছরের জন্য আমাদের নতুন কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। কৌশল নির্ধারণে পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটা বড় অংশীদার ছিল তরুণেরা। তরুণদের থেকে সহিংসতার ভয়ের বিষয়টি এসেছে। সহিংসতা ভয় কেন তরুণ-তরুণীদের সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে, সে বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এ জন্য আমরা একটা জাতীয় জরিপ করি। যেখানে বাবা, মা, ছেলে ও মেয়ে—এ চারটি শ্রেণিতে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল।

জরিপে এসেছে, আইনের কথা প্রত্যেকেই জানে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অভিভাবকেরা ১৮ বছর বয়স হওয়ার অপেক্ষা করেন এবং ১৮ বছরেই বিয়ে দেন। ১৮ বছরের নিচে সবচেয়ে বেশি বিয়ে হচ্ছে ১৬ বছর বয়সে। আইন জানা সত্ত্বেও সামাজিক অনুশাসনের ভয়, বাসায় কিশোরী মেয়েকে একা রেখে যাওয়ার ভয়, পারিবারিক সুনাম হারানোর ভয়, যৌন হয়রানি, ধর্ষণের ভয়, জোর করে বিয়ে দেওয়ার ভয় ও যৌতুকের ভয়ের কারণে বাল্যবিবাহ হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণ না হলে কখনোই সমতা আনা সম্ভব নয়। এ জন্য যথার্থ আইন ও নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। আইনের যথাযথ প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তমন্ত্রণালয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় খুবই জরুরি। বাল্যবিবাহ বন্ধে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

default-image

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু অগ্রগতি হচ্ছে না। অগ্রগতি হলে করোনা মহামারির সময়ে এত বাল্যবিবাহ হতো না। বিশ্বে ১৫ বছরের কিশোরী বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ স্থানে আছে। এ জায়গায় এত দিন থাকা আমাদের প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপের ঘাটতি নির্দেশ করে। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আবার তারাই ক্ষেত্রবিশেষে বিয়ের বয়স ১৬তে আনার একটা কৌশল অবলম্বন করেছে। আমাদের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদ প্রতিনিধিরা বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের দুটো বড় কারণ উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো বাল্যবিবাহ রোধে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিষ্ক্রিয়তা ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তার অভাব।

সাধারণ মানুষের ক্ষমতাহীনতা বাল্যবিবাহের একটি বড় কারণ। ক্ষমতাহীন মানুষ তার মেয়েকে বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হয়। তিনি মূলত কন্যাকে বিয়ে দেন না, অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করেন। এ মুহূর্তে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অনেক বেশি শক্তিশালী এবং প্রান্তিক পর্যায়েও এটা পৌঁছে গেছে। এসব প্ল্যাটফর্মে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের পক্ষে নিরন্তর প্রচারণা চলছে। এর বিপরীতে সে রকম শক্তিশালী প্রচারণা নেই। এর বিপক্ষে সরকারের সচেষ্ট হতে হবে। প্রচারণার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের নানান উদ্যোগও আছে। কিন্তু এটা কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়।

default-image

পাওলা কাস্ট্রো নেইদারস্টাম

সুইডেন বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার ও জেন্ডারভিত্তিক সমতার শক্তিশালী প্রবর্তক। এ বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমাদের এ রকম প্রতিশ্রুতি আছে। আগামী বছর সুইডেন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ৫০ বছর পূর্তি। জেন্ডারভিত্তিক সমতা অর্জন সুইডিশ সরকারের মূল লক্ষ্য। বাল্যবিবাহ মেয়েদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। ২০১৪ সাল থেকে সুইডেনের একটা স্পষ্ট নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। যেখানে জেন্ডারভিত্তিক সমতা অর্জন করা সুইডেনের বৃহত্তর লক্ষ্য; যা শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

বাল্যবিবাহ বন্ধের ক্ষেত্রে সুইডেনের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ ১৯২টি দেশ এসজিডি-৫-এর আওতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসজিডি-৫ অন্যান্য টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাল্যবিবাহে জেন্ডারভিত্তিক অসমতা ও মেয়েদের প্রতি অসমতা ও সহিংসতার একটি রূপ, যা নারী ও শিশুদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। বাল্যবিবাহ কোনোভাবেই শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। বাল্যবিবাহ শিশুদের শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করে, যা তাদের জীবিকা এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও প্রভাব ফেলে। নির্দিষ্ট বয়সের আগে সন্তান ধারণ নারীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধ একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনকানুন যেমন থাকা জরুরি, একই সঙ্গে এসব আইনকানুন প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা প্রদান ও ঝুঁকিতে থাকা মেয়েশিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের আরও বৈঠককে আমি স্বাগত জানাই।

default-image

মেহের আফরোজ চুমকি

কুড়িগ্রামে বাল্যবিবাহ রোধে ‘বিল্ডিং বেটার ফিউচার ফর গার্লস’ প্রকল্প ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এ প্রকল্পে বাবাদের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ধর্মীয় নেতাদের যুক্ত করলে আরও ভালো হতো। বাল্যবিবাহ বন্ধে আমাদের আইন হয়েছে। এ আইনের ফাঁকফোকরের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। অনেক আলোচনার ভিত্তিতে এ আইন করা হয়েছে। কোথায় সাহায্য পাবেন, তা যুব প্রতিনিধিরা জানতে চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্কুল সভাপতির কাছে যেতে হবে।

এ ছাড়া আমাদের অনেক হেল্পলাইন আছে। ‘এতসংখ্যক বাল্যবিবাহ হচ্ছে’ বলার পরিবর্তে ‘এতজন ছেলে বাল্যবিবাহ করছে’ বলতে হবে। বাংলাদেশে একসময় কোনো হেল্পলাইন ছিল না। অনেকগুলো জাতীয় হেল্পলাইন রয়েছে। বাল্যবিবাহের কারণে অনেক নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাল্যবিবাহ বন্ধে পুলিশ ভূমিকা রাখতে পারে। নানান রকম শঙ্কা ও ভয়ের কথা এসেছে। দেশে অনেক গণমাধ্যম রয়েছে, তাদের আরো ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

বাল্যবিবাহ রোধে সরকারের সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। একটা দেশ এগিয়ে যেতে সময় লাগে। দেশে দীর্ঘদিন অনেক সমস্যা ছিল। এখন দেশ অনেক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সবাইকে সমষ্টিগতভাবে কাজ করতে হবে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনতে হলে বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি। পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে একটা সময় আমরা অনেক আন্দোলন করেছি। এখন সে রকম আন্দোলন নেই। তবু মানুষ এ বিষয়ে এখন যথেষ্ট সচেতন। তথ্যভান্ডার তৈরির বিষয়ে আমরা জোরালো গুরুত্ব দিচ্ছি। বাল্যবিবাহ রোধে একটা জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের একার পক্ষে সব সমাধান করা সম্ভব নয়। সে জন্য সবাইকে সমষ্টিগতভাবে সহায়তা করতে হবে।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন