দেশে নিউরোসার্জন আছেন ২০১ জন। তবে তাঁদের ৯৯ শতাংশ পেশা চর্চা করেন ঢাকা শহরে।
কনক কান্তি বড়ুয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য

অনুষ্ঠানের শুরুতে এক ভিডিও বার্তায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে আটজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরও বেশি। ১৯৮২ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৪০০ শতাংশ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশেও মস্তিষ্কে আঘাতজনিত আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগরায়ণ, যানবাহনের আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থানের খোঁজে অভিবাসন—এসব কারণে মস্তিষ্কে আঘাতজনিত আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউরোসার্জনসের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, সামান্য আঘাতে মস্তিষ্কের বড় ক্ষতি হতে পারে, তার প্রভাব পড়তে পারে শরীরের যেকোনো অংশে। তিনি বলেন, দেশে নিউরোসার্জন আছেন ২০১ জন। তবে তাঁদের ৯৯ শতাংশ পেশা চর্চা করেন ঢাকা শহরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, মস্তিষ্কের আঘাতজনিত সমস্যা মোকাবিলা করতে প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—এ তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার মতো মারাত্মক একটি বিষয়ে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, এটা বিপজ্জনক প্রবণতা। সড়ক দুর্ঘটনার চিকিৎসা বিষয়ে সরকারের নতুন নতুন উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাতটি বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার হাসপাতাল করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক মো. আবদুল গনি মোল্লাহ বলেন, মস্তিষ্কের আঘাতসহ নানা সমস্যা নিয়ে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার জটিল রোগী নিটোরে আসে। মস্তিষ্কের আঘাত পাওয়া রোগীর চিকিৎসায় আইসিইউ শয্যার খুব প্রয়োজন। কিন্তু নিটোরে তা নেই। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে উপযুক্ত সড়ক তৈরিতেও মনোযোগী হতে হবে।

আলোচনায় মোটরসাইকেল

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ দুর্ঘটনা বিষয়ে গবেষণা করে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম ফজলুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। মানুষ এখন রাস্তায় বেশি বের হচ্ছে। বাইসাইকেলের জায়গা দখল করছে মোটরসাইকেল, রিকশার জায়গা নিয়ে নিচ্ছে ইজিবাইক। তিনি বলেন, মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ডলার হওয়ার পর দুর্ঘটনা কমে আসার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট ২০০২ সাল থেকে দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণা করছে। এ বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের দুর্ঘটনা তারা পর্যালোচনা করেছে। পর্যালোচনার তথ্য তুলে ধরে ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, দুই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আড়াই হাজার। এর ৩৫ শতাংশ মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী। তিনি বলেন, জাপান সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়েছে মোটরসাইকেলের পরিমাণ কমিয়ে। দেশটি কম দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়েছে। অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩৫০ সিসির দ্রুতগতির মোটরসাইকেল আমদানির অনুমতি দিচ্ছে। বুয়েটের এই অধ্যাপক আরও বলেন, অনেকে মানসম্পন্ন হেলমেট পরেন না। পরেন প্লাস্টিকের বাটি। হেলমেট আমদানিকারক, বিক্রেতা সবারই সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। হেলমেটের মান যাচাইয়ে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগার থাকা দরকার।

গত বছর নভেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন সেভ দ্য চিলড্রেনের ক্রিটিক্যাল কেয়ার সার্ভাসের উপব্যবস্থাপক তুনাজ্জিনা শাহরিন। তিনি পেশায় চিকিৎসক। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পেরেছেন। রাজধানীতে দুর্ঘটনা না হয়ে যদি গ্রামে হতো, যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হতো, তাহলে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

গোলটেবিল বৈঠকের শুরুর দিকে বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউরোসার্জনসের সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নুল ইসলাম দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায়, ওপর থেকে পড়ে গিয়ে, পা পিছলে এবং আরও নানা কারণে মানুষ মাথায় আঘাত পায়। আঘাতের বিষয় স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করলে সচেতনতার কাজ অনেক দূর এগোবে। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরান–উল বাসেত বলেন, আঘাত বিষয়ে ২০১৬ সালে তিন লাখ মানুষের নমুনা নিয়ে জাতীয় জরিপ হয়েছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল, ৩০ শতাংশ আঘাত ঘটে মস্তিষ্কে।

তবে দুর্ঘটনায় বা আঘাতে মৃত্যুর সঠিক তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নেই। অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) স্বাস্থ্য তথ্য ইউনিটের প্রধান শাহ আলী আকবর আশরাফী বলেন, চার বছরে দুর্ঘটনায় তিন লাখের বেশি মানুষের আহত হওয়ার তথ্য এমআইএসে আছে। কিন্তু মৃত্যুর তথ্য আছে ৩৬ জনের।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অসিত চন্দ্র সরকার হাসপাতালে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ঢাকা মেডিকেলে জরুরি বিভাগে আসা রোগীর ৬০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার। নিউরোসার্জারি বিভাগে শয্যা আছে ৩০০। রোগী রাখতে হয় ৫০০ থেকে ৫৫০ জন। মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়, এটা লজ্জার। এসব রোগীরে জন্য পৃথক আইসিইউ নেই। আইসিইউর জন্য লাইন দিতে হয় অথবা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। অনেকে সেই খরচ বহন করতে পারেন না। এ পরিস্থিতিতে মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।

মাথায় আঘাত নিয়ে ভর্তি থাকা তিনজন রোগীর অবস্থা বর্ণনা করে বিএসএমএমইউর নিউরোসার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান আখলাক হোসেন খান বলেন, মস্তিষ্কের আঘাতের পর যেসব রোগী বেঁচে থাকে, তাদের অনেকের পরবর্তী জীবন কষ্টের হয়। তাদের পরিবার ও সমাজকে বয়ে বেড়াতে হয়। এর জন্য পরিবার ও দেশকে অনেক আর্থিক মূল্য দিতে হয়। সে জন্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের নিউরোট্রমা বিভাগের প্রধান মো. আবদুল্লাহ আলমগীর বলেন, প্রথম আলো ও অন্যান্য সংগঠন অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রচারণার ফলে মানুষকে সচেতন করার ফলে এ ধরনের অপরাধ অনেক কমেছে। তিনি বলেন, ওই ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার।

গোলটেবিল বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন