default-image

সারা বিশ্বে প্রতিবছর দেড় কোটি শিশু অপরিণত হয়ে জন্মায়। এর মধ্যে ১০ লাখ মারা যায়। আর বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮০০টি শিশু অপরিণত হয়ে জন্মায়। অপরিণত শিশুদের জটিলতাও অনেক থাকে। বাল্যবিবাহ কমানো, মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার মাধ্যমে অপরিণত শিশুর জন্মহার কমানো সম্ভব।

‘অপরিণত শিশুর জীবন বাঁচাতে, একসাথে করি কাজ আগামীর পথে’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন। বৈঠকের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরাম (বিএনএফ)। সহযোগিতায় ছিল সেভ দ্য চিলড্রেন, জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও প্রথম আলো

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নবজাতক বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সহিদুল্লা। সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্বে প্রতিবছর দেড় কোটি শিশু অপরিণত হয়ে জন্মায়। এর মধ্যে ১০ লাখ মারা যায়। প্রতি ১০টি শিশুর ১টি শিশু অপরিণত বলে মারা যায়। মোট জন্ম নেওয়া শিশুর ৩৫ শতাংশ মারা যায় অপরিণত বয়সে জন্ম ও জটিলতা নিয়ে। আর দেশে প্রতিবছর ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮০০ শিশু (১৯ শতাংশ) অপরিণত হয়ে জন্মায়। অপরিণত বলে জটিলতা নিয়ে পাঁচ বছরের নিচের মারা যায় ২৩ হাজার ৬০০টি শিশু। ১১ হাজার ২০০ অপরিণত শিশু নানান জটিলতা নিয়ে বেঁচে থাকে।

মোহাম্মদ সহিদুল্লা জানান, দেশে অপরিণত শিশুদের বাঁচাতে ক্যাঙারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) সেবা চালু আছে ১৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ২০২২ সালের মধ্যে ২৭০টি কেন্দ্রে এটি চালু হবে। এই সেবা দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চালুর জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (এমসিআরএএইচ) ও পরিচালক (মা ও শিশুস্বাস্থ্য) মোহাম্মদ শরিফ বলেন, অপরিণত শিশুর জন্মহার বাড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ। অপরিণত শিশুকে সুস্থ করতে কেএমসি সেবা দারুণ একটি উদ্যোগ। অপরিণত শিশুর জন্ম হলেই যে শিশুকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পাঠাতে হবে, তা কিন্তু নয়। এটা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (এমএনসিএএইচ) মো. শামসুল হক বলেন, অপরিণত শিশুর জন্মহার ঠেকাতে দুই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি হচ্ছে প্রতিরোধমূলক, আরেকটি জন্মপরবর্তী চিকিৎসাব্যবস্থা। এটি প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর্মী ও জনগণের মধ্যে আরও সচেতনতা তৈরি করা দরকার। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনবল সমস্যা। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের জন্য আনুষঙ্গিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।

অপুষ্টিতে আক্রান্ত মা অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর জন্ম দেন উল্লেখ করে বিএনএফের সভাপতি তাহমিনা বেগম বলেন, সবার আগে মায়ের পুষ্টির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব আছে।

ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক জিয়াউল মতিন বলেন, অপরিণত শিশু বা নবজাতকের সংখ্যা কত, সেই তথ্য ঠিকমতো আসছে না। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এ-সংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতি আছে। এই তথ্যের ঘাটতি কমাতে হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের `ইউএসএআইডি মামনি এমএনসিএসপি' প্রকল্পের চিফ অব পার্টি উম্মে সালমা জাহান মীনা বলেন, এক গবেষণায় দেখা গেছেঅপরিণত বয়সে বেঁচে থাকা কমিউনিটি পর্যায়ে ফলোআপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ। বাংলাদেশে কেএমসি সেবার ধারণা তুলনামূলক নতুন। বিদ্যমান কাঠামোতেই এই সেবা দেওয়া সম্ভব। চমৎকার গাইডলাইন, কর্মী ও সদিচ্ছা আছে প্রয়োজন শুধু বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ করা। তাহলেই নবজাতকের মৃত্যু রোধ করতে সফল হওয়া যাবে।

ইউএসএআইডির প্রজেক্ট ম্যানেজার স্পেশালিস্ট (মাতৃস্বাস্থ্য) ফারহানা আক্তার বলেন, অপরিণত শিশুর অন্যতম প্রধান জটিলতা রেটিনোপ্যাথি বা আরওপি। নবজাতক অপরিণত হলে চোখের রেটিনায় রক্ত সঞ্চালন না হলে রেটিনোপ্যাথি দেখা দিতে পারে। নবজাতকদের রেটিনার স্ক্রিনিং জরুরি। অপরিণত শিশুর জন্য অক্সিজেন জরুরি, তবে অক্সিজেনের মাত্রা সতর্কতার সঙ্গে দিতে হবে। নয়তো শিশুর চোখের সমস্যা হতে পারে।

অপরিণত শিশুর জন্মহার ঠেকাতে কৌশলগত আলোচনা ও পরিকল্পনা নেওয়া দরকার বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক শামস এল আরেফিন। তিনি বলেন, তবে এসব কার্যক্রম যথাসময়ে দ্রুত নিতে হবে। ৪ লাখের বেশি অপরিণত শিশুর জন্য কেবল ২৭০টি কেএমসি সেবা চালু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে—এটি পর্যাপ্ত নয়। কেএমসি সেবা কয়েক গুণ লাগবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (এনএনএইচপি ও আইএমসিআই) শরীফুল ইসলাম বলেন, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অপরিণত শিশুর সেবাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু দেখা যায়, কাজের সময় তাঁদের অন্য ওয়ার্ডে দায়িত্ব পড়ে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বেশ কিছু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মিডওয়াইভস নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নবজাতকদের সেবা ও পরিচর্যাসম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দিলে উপকার মিলবে।

নারীর গর্ভধারণের আগে শারীরিক সুস্থতা পরীক্ষা করা জরুরি উল্লেখ করে অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি সামিনা চৌধুরী বলেন, দেশে নবজাতকের সেবার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে সে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলাও করা সম্ভব। পাশাপাশি মানুষের সচেতনতাও জরুরি। দরকার গণমাধ্যমগুলোর সহযোগিতাও।

অপরিণত শিশুর জন্মহার কমাতে সরকারের ভূমিকা প্রধান উল্লেখ করে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার হেলথ টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট মোমেনা খাতুন বলেন, দাতা সংস্থাগুলোর প্রকল্প শেষ হয়ে যায়। তখন এসব উদ্যোগ সরকারের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। ২৭০টি কেএমসি সেবা চালুর লক্ষ্য কেবল একটি সংখ্যা। এই সেবা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।

বৈঠকে সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, অপরিণত শিশুর জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় কাজ প্রত্যেক শিশু যেন ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম না নেয়। এর জন্য মায়ের প্রতি বেশি যত্ন নিতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করলে অপরিণত শিশুর জন্মহার কমানো সম্ভব। গোলটেবিল সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0