রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, দীর্ঘদিন বাঁচুন

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

এ এ সাফি মজুমদার

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটি। সাবেক পরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

সৈয়দ আলী আহসান

চেয়ারম্যান, হৃদ্‌রোগ বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)

মীর জামাল উদ্দিন

পরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী

বিভাগীয় প্রধান, হৃদ্‌রোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

আফজালুর রহমান

সাবেক পরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

এন এ এম মোমেনুজ্জামান

চিফ কনসালট্যান্ট, হৃদ্‌রোগ বিভাগ, ইউনাইটেড হাসপাতাল

সাবিনা হাশেম

ইউনিট প্রধান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

ফাতেমা বেগম

কনসালট্যান্ট, হৃদ্‌রোগ বিভাগ, ইউনাইটেড হাসপাতাল

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালক

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

বিজ্ঞাপন

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

রক্তচাপ যদি আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের অনেক অসুখ কমে যাবে। আগে মনে করা হতো বয়স্ক মানুষের এটা হয়। কিন্তু না, ৩০ বছরের পর থেকেই মাঝেমধ্যে রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চর্বিজাতীয় খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়া, লবণ কম খাওয়া, ধূমপান না করা ইত্যাদি জরুরি। নিয়মিত হাঁটাচলা করা খুবই প্রয়োজন। এসব বিষয় নিয়ে আজ বিশেষজ্ঞ চিকিৎকেরা আলোচনা করবেন। আজকের ভার্চু্যয়াল গোলটেবিল বৈঠকে আটজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। তাঁরা এ বিষয়ে আমাদের বুঝিয়ে বলবেন। এটা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।

এ এ সাফি মজুমদার

default-image

অন্যান্য বছর ১৭ মে উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হতো। এ বছর করোনা মহামারির জন্য নির্ধারিত সময়ের পরে এসে ১৭ অক্টোবর দিবসটি ঠিক করা হচ্ছে। ভাবা হয়েছিল যে মহামারিমুক্ত পরিবেশে দিবসটি পালন করা যাবে। কিন্তু নিয়তি হলো, এই মহামারির মধ্যেই এটা পালন করতে হচ্ছে। এবারের স্লোগান হলো ‘রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, দীর্ঘদিন বাঁচুন’। অর্থাৎ আমাদের যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তাহলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করে আমরা ভালো থাকতে পারি।

উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ, মাথা থেকে শুরু করে পায়ের রক্তনালি পর্যন্ত এটা খারাপ প্রভাব ফেলে। চোখের জ্যোতি কমে যেতে পারে। কিডনি নষ্ট হতে পারে। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের এত সব ক্ষতি করছে।

অথচ সঠিক যন্ত্র দিয়ে খুব সহজেই উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় করা যায়। ৩০ বছরের বেশি বয়স হলে বছরে একবার-দুবার উচ্চ রক্তচাপ মাপা জরুরি। কোনো চাকরিতে যোগদানের আগে উচ্চ রক্তচাপ মাপা প্রয়োজন।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রতিবছর স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। সেখানে উচ্চ রক্তচাপ মাপা হয়। যেকোনো রোগে চিকিৎসকের কাছে রোগী এলে তাঁর রক্তচাপ ঠিক আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করা হয়। শুধু উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সাধারণত কোনো রোগী আসেন না। অনেক সময় মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা—এসব কারণে রোগী এসে থাকেন।

অনেকে এমন সময় আসেন যে ইতিমধ্যে তাঁর শরীরের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তখন তাঁর চিকিৎসা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক সময়ে অনেক সহজেই চিকিৎসা করা যেত।

উচ্চ রক্তচাপের এখন অনেক নিরাপদ ওষুধ আছে। ৩০ থেকে ৪০ বছর আগে এত ভালো ওষুধ ছিল না। এসব ওষুধ দিয়ে আমরা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি।

আবার আমাদের জীবনযাত্রার প্রণালিতে পরিবর্তন আনতে পারি, ব্যায়াম করতে পারি। আমার জিমে তো ব্যায়াম করতেই পারি।
কিন্তু সাধারণ জীবনযাত্রার মধ্যে ব্যায়ামটা নিয়ে আসা জরুরি।

এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য যানবাহন ব্যবহার না করে যদি হেঁটে যাওয়া যায়, তাহলে সেটাই ভালো। আমরা লিফটে না উঠে যদি সিঁড়ি দিয়ে নামি, তাহলে তা–ও ব্যায়ামের কাজ করে।

আমাদের দেশে লবণ খাওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে। আমরা যে শুধু দেখে লবণ খাই, তা নয়। অনেকে অদেখা লবণও খেয়ে থাকি। যেমন আমাদের অনেক খাবারে স্বাভাবিকভাবে লবণ বেশি হয়ে থাকে। কোনো কোনো খাবারে স্বাদ বাড়ানোর জন্য লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

মোট কথা হলো, সবাইকে এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এখানে চিকিৎসক সমাজের ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে।

প্রতি চারজনে বা অবস্থাভেদে পাঁচজনে একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগী। সবার মধ্যে এই তথ্য ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে সবাইকে সচেতন করতে হবে।

সঠিকভাবে উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয়ের বিষয়টিও জরুরি। চিকিৎসাশাস্ত্রে একটা ছবি আছে, যেখানে ব্রেন, হার্ট, কিডনি, ফুসফুস ও পায়ের রক্তনালির ছবি আছে। অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরকে আক্রান্ত করে। উচ্চ রক্তচাপের রোগী যদি কোভিডে আক্রান্ত হন, তাহলেও ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের সচেতনতা শুধু একটা দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সারা বছর ধরে এ আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

এন এ এম মোমেনুজ্জামান

default-image

উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উচ্চ রক্তচাপ একটা নীরব ঘাতক। উচ্চ রক্তচাপের কারণে সাধারণত মানুষ চিকিৎসকের কাছে আসেন না। অন্য কোনো রোগের জন্য চিকিৎসকের কাছে এলে তিনি উচ্চ রক্তচাপ মেপে দেখেন। সেভাবে চিকিৎসা করেন। উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের গভীর সম্পর্ক কেন? সাধারণত যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, ডায়াবেটিস আছে, কিডনিতে সমস্যা আছে, তাঁদেরই হার্টে সমস্যা হয়।

উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত মানুষের মধ্যম ও বড় রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটাকে বলে শেয়ার স্ট্রেচ। রক্তচাপ বলতে রক্ত চলাচলের প্যারালাল ফোর্সকে বোঝায়। শেয়ার স্ট্রেচের জন্য রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। রক্তনালির কিছু ক্ষেত্রে ইনজুরি হয়। এ থেকে একসময় রক্তনালিতে ব্লক তৈরি হয়, যাকে আমরা হৃদ্‌রোগ বলি।

এটা বিভিন্নভাবে হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে রোগীর হৃদ্‌রোগ আছে। তিনি অনেকটা স্বাভাবিক আছেন। চলাফেরা করছেন। কিন্তু জোরে হাঁটলে বুকে ব্যথা হয়। এটা হলো ক্রনিক হার্ট ডিজিজ। অ্যাকিউট হার্ট ডিজিজ হলো হঠাৎ বুকে ব্যথা হয়, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়। এই মাত্রায় হলো যে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থেকে এভাবে হৃদ্‌রোগ হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে আরও কিছু রোগ, যেমন ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস, অবসাদ ইত্যাদি থাকলে ইসকেমিক হৃদ্‌রোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে হার্ট অ্যাটাক কমে যাবে।

একজন রোগীর উচ্চ রক্তচাপ আছে, হাঁটতে গেলে বুকে ব্যথা করে। হাঁপিয়ে যান। এর আবার বিভিন্ন মাত্রা আছে। কেউ অল্প হাঁটলে হাঁপিয়ে যান আবার কেউ বেশি হাঁটলে হাঁপিয়ে যান। অথবা বসে থাকলে হাঁপিয়ে যান। এর চিকিৎসা করা খুব সহজ।

ইসিজি, সিটি এনজিওগ্রাম করে দেখা যায় ব্লক আছে কি না। চূড়ান্তভাবে এনজিও গ্রাম করে দেখা যায় ব্লক আছে কি না।

কিছু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা আছে। যেমন সুগার কেমন আছে, কিডনির কার্যক্ষমতা কেমন আছে। বুকের এক্স-রে করা যেতে পারে। ইউরিনে আরবিসি আছে কি না ইত্যাদি। এসব রোধ করার বড় উপায় হলো জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। সবুজ শাকসবজি বেশি খাওয়া। লবণ এড়িয়ে চলা। চর্বিজাতীয় খাবার কম খাওয়া। ফলমূল বেশি খাওয়া ইত্যাদি।

নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ধূমপান বন্ধ করতে হবে। অ্যালকোহলের প্রবণতা থাকলে বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। অনেকে প্রেশার বেড়ে গেলে ওষুধ খান। কমে গেলে ছেড়ে দেন। এটা ব্রেন স্ট্রোকের বড় কারণ হতে পারে। নিয়মিত চেকআপ করা অত্যন্ত জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপের রোগী একসময় হার্ট ফেইলিওরের দিকে চলে যান। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হার্ট ফেইলিওরের রোগী হলেন তাঁরা, যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপ আছে। হার্ট ফেইলিওর রোগীর ৯০ শতাংশ দেখা গেছে অতীতে উচ্চ রক্তচাপ ছিল। তাহলে হার্ট ফেইলিওরের অন্যতম কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ। এ ক্ষেত্রে ৭০ বছরের বেশি বয়সের মানুষের হার্ট ফেইলিওরের মাত্রা কিছুটা বেশি।

দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপের জন্য হার্টের মাংসপেশিতে পরিবর্তন আসে। মাংসপেশি ফুলে যায়। ভেতরে ফাইব্রোসিস হয়। অবশ হতে পারে। তাঁদের অনেক সময় কিডনিরও সমস্যা থাকে। সবকিছু মিলিয়ে উচ্চ রক্তচাপ রোগীর হার্ট ফেইলিওরের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

উচ্চ রক্তচাপের রোগীর যদি হার্ট ফেইলিওর হয়, তাহলে তাঁদের বেশি কিছু পরীক্ষার দরকার হয় না। এক্স-রে, ইসিজি, ইকো, ক্রিয়েটিনাইন নাইন, ইলেকট্রোলাইট ইত্যাদি পরীক্ষা করাতে হয়।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ৫০ ভাগ মৃত্যুর আশঙ্কা কমে যায়। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পারলে হার্ট ফেইলিওরের আশঙ্কা কমে যায়।

উচ্চ রক্তচাপ হলো জীবনব্যাপী রোগ। তাই প্রতিদিন ওষুধ খেতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপসহ হার্ট ফেইলিওরের রোগীকে প্রতিদিন ওজন মাপতে হবে। ওজন বাড়লে শরীরে পানি জমে। তাঁকে লবণ ও পানি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ওজন বেশি থাকলে ওজন কমাতে হবে। ভ্যাকসিনেশন দেওয়া না থাকলে সেটা দিতে হবে।

একটা সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপসহ হার্ট ফেইলিওরের রোগীকে আমরা একটু ভালো জীবন দিতে পারি।

আফজালুর রহমান

default-image

উচ্চ রক্তচাপ কতটা মারাত্মক, সেটা ভাবতে হবে। যাঁদের স্ট্রোক হয়, তাঁদের প্রায় ৫৪ শতাংশের মৃত্যু হয় উচ্চ রক্তচাপের জন্য। উচ্চ রক্তচাপ অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ। হৃদ্‌রোগে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার প্রায় ৫০ ভাগের মৃত্যু হয় উচ্চ রক্তচাপের জন্য। আবার ৪৭ শতাংশ মানুষের হৃদ্‌রোগ হয় উচ্চ রক্তচাপের জন্য।

যদি ২০১৫ সালের বিভিন্ন তথ্য, প্রতিবেদন, গবেষণা দেখি, তাহলে দেখা যাবে, পুরুষের চারজনে একজন ও নারীদের মধ্যে পাঁচজনে একজন রক্তচাপের রোগী পাওয়া যাবে। মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা একেক দেশে একেক রকম। আফ্রিকাতে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ২৭ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আর আমেরিকায় ১৮ শতাংশের।

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা বাড়তে থাকে। বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করলে সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ বাড়বে। বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্ক মোট যত মানুষের মৃত্যুর হয়, তার ১৩ শতাংশের মৃত্যুর কারণ উচ্চ রক্তচাপ।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চ রক্তচাপের রোগীর আগে ছিল ২৩ শতাংশ। এখন এটা ১৮ শতাংশ। গড়ে বলা যায় যে আমাদের দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা ২০ শতাংশ।

আমাদের দেশে গ্রাম থেকে শহরে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা বেশি। গ্রামীণ নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা কম। একটা মজার বিষয় হলো, শহরে বয়স বাড়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু গ্রামে এটা কমতে থাকে। গ্রামে যত উচ্চ রক্তচাপের রোগী আছেন, তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ চিকিৎসাই করেন না। আর দুই-তৃতীয়াংশের উচ্চ রক্তচাপের ক্ষতি সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই আলোচনা অত্যন্ত সময়োপযোগী।

সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সচেতন হতে হবে। বয়স ১৮ বছর অতিক্রম করলে প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না, সেটা অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ যদি থাকে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রথমে অত্যন্ত জরুরি হলো সঠিক রক্তচাপ নির্ণয় করা। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের রোগীরা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিনই তাঁদের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে।

সৈয়দ আলী আহসান

default-image

আজকের আলোচনার শিরোনামটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, দীর্ঘদিন বাঁচুন’। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করলে আমরা সুস্থ থাকব এবং অনেকগুলো রোগে আক্রান্ত হব না। হয়তো স্ট্রোক হয়ে শরীরের কোনো অংশ অবশ হলো। তারপরও অনেক দিন বাঁচা যায়। কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা কতটা ভালো? সত্যিকার অর্থে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা খুবই প্রয়োজন। তাহলে আমরা অনেকগুলো অর্গানের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাব।

উচ্চ রক্তচাপের বিভিন্ন ধরন আছে। খুব বেশি মাত্রায় উচ্চ রক্তচাপ হলে তাঁদের ওষুধ খাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। অনেকে মনে করেন, ওষুধ খেলে সারা জীবন খেতে হয়। এ জন্য ওষুধ খেতে চান না। কিন্তু দুই বছর নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তখন ওষুধ পরিমাণে কমানো যেতে পারে। একসময় হয়তো ওষুধ খাওয়া না-ও লাগতে পারে।

যাঁদের উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা কম, তাঁদের খাবারের অভ্যাস পরিবর্তন করতে বলি। শারীরিক ব্যায়াম করতে বলি। এখন মানুষ গাড়িতে চড়েন, লিফটে চড়েন। এ অভ্যাস পরিবর্তন করা প্রয়োজন। অন্তত চারতলা পর্যন্ত হেঁটে ওঠা উচিত। আমি নিজে লিফটে না চড়ে হেঁটে উঠি। এটা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। খাদ্যতালিকায় লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো উচ্চ রক্তচাপ হলে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া। আমরা যদি খাবার একটু বেছে খাই, হাঁটাচলা করি, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখি, তাহলে দেখা যাবে উচ্চ রক্তচাপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁরা যদি নিয়মিত ওষুধ খান, তাহলে অন্য অনেক রোগ থেকে ভালো থাকবেন। দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারবেন।

আজকের এই দিনে সবাইকে অনুরোধ করব, যাঁদের বয়স ৩০ বছরের বেশি, তাঁরা সবাই একবার রক্তচাপ মাপুন। মানসিকভাবে শান্তিতে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। আমার কাছে এমন অনেক রোগী আসেন, যাঁদের অনেক কিছু থাকার পরও টেনশন করে রক্তচাপ বাড়িয়ে ফেলেন। পরে তাঁদের শান্ত করলে দেখা যায় রক্তচাপ ঠিক হয়ে যায়। সব সময় টেনশনমুক্ত হাসি-খুশি থাকা অত্যন্ত জরুরি।

মীর জামাল উদ্দিন

default-image

উচ্চ রক্তচাপ একটা বড় ধরনের সমস্যা। এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের গাইডলাইন আছে। আমাদের এটা মেনে চলতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে গাইডলাইন মেনে চলতে হবে। আমরা দেখি যে ১০০ জন উচ্চ রক্তচাপ রোগীর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ জনের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই। এ সমস্যা শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিদেশেও একই অবস্থা।

উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মৃত্যুর প্রধান দুটি কারণ হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেন স্ট্রোক। উচ্চ রক্তচাপ এই দুটি রোগেরও অন্যতম কারণ। উচ্চ রক্তচাপের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়, যা ২০১০ সালে ছিল প্রায় ১৪ লাখ।

উচ্চ রক্তচাপের ৯০-৯৫ শতাংশ কারণ রোগীর পারিবারিক ইতিহাস, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা, পরিবেশ, খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চর্বিযুক্ত খাবার, মদ্যপান, ধূমপান ইত্যাদি। আর বাকি ৫-১০ শতাংশ কারণ হলো কিডনির রোগ, হরমোনের সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চমাত্রায় রক্তে চর্বি জমে যাওয়া এবং কিছু মেডিসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

বড় একটি অংশের উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত উপসর্গহীন থাকে, এটা মূলত রুটিন ব্লাড প্রেশার চেক করার সময় ধরা পড়ে। এ ছাড়া বুকে ব্যথা, শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মাথা ঝিম ঝিম করা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি বড় ধরনের উপসর্গ।

আমাদের কাছে সত্যিকার কোনো তথ্য নেই উচ্চ রক্তচাপ রোগীর সংখ্যা কত। আবার তাঁদের মধ্যে কতজন রোগীর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে। দেশের তথ্যানুসারে ২০ থেকে ২২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। কতজন মানুষ উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতন সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সচেতনতা চিকিৎসার জন্য খুব জরুরি। চিকিৎসার জন্য ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি অব হাইপার টেনশন গাইডলাইনসহ বিভিন্ন গাইডলাইন আছে। প্রাথমিক, মারাত্মক সব ধরনের হাইপার টেনশনের ওষুধ আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত ওষুধ খাওয়া। কোনো অবস্থাতে ওষুধ বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। ওষুধ বাদ দিলে অবস্থা খারাপের দিকে যাবে। তাই সবাইকে বলব, যাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক, তাঁরা যেন বছরে অন্তত এক–দুবার উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করেন। উচ্চ রক্তচাপ হলে নিয়মিত ওষুধ খান এবং পরিকল্পিত জীবন যাপন করেন। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করুন, নিয়মিত ওষুধ খান, স্বস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করুন, সুস্থ থাকুন।

বিজ্ঞাপন

আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী

default-image

একজন সুস্থ-সবল মানুষ হঠাৎ স্ট্রোক করলে প্যারালাইজড হয়ে সারা জীবন বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। জীবনভর বিছানায় পড়ে থাকেন। এটা তো আসলে বাঁচা নয়, একধরনের জীবন্মৃত অবস্থা।

উচ্চ রক্তচাপ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে স্ট্রোকের আশঙ্কা প্রায় ৫০ ভাগ কমানো যায়। সঙ্গে যদি ধূমপান বন্ধ থাকে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে স্ট্রোকের মাত্রা আরও কমে আসে।

রক্তচাপ বেশি থাকলে কোনো উপসর্গ তৈরি করে না। কেউ কোনো কারণে চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি হয়তো দেখলেন রক্তচাপ ওপরে ১৬০, নিচে ১০০। রোগীকে ওষুধ খেতে বললেন। রোগী ওষুধ খাওয়া শুরু করলেন। কয়েক দিন পর দেখলেন রক্তচাপ ১২০/৮০। মনে করলেন উচ্চ রক্তচাপ ঠিক হয়ে গেছে। ওষুধ বন্ধ করে দিলেন। এতে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ হয়, তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ রোগী ভালো হতে পারেন। অন্যরা হন না। এ ক্ষেত্রে প্রায় ২০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়। এ জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিয়মিত ওষুধ খাওয়া। কারও স্ট্রোক হলে ওই সময় প্রেশার অনেক বেশি থাকে। তাৎক্ষণিক এই প্রেশার কমানো যাবে না। তাহলে স্ট্রোক আরও গভীর হবে। প্রেশার কমানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ আবার স্ট্রোক হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে না কমানোটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় রোগীর লোকজন তাগাদা দেন রোগীর প্রেশার ১৬০/১০০ কিন্তু চিকিৎসা করছেন না কেন? কিন্তু এ সময় প্রেশারের চিকিৎসা করা যাবে না। চার থেকে পাঁচ দিন পর চিকিৎসা শুরু করতে হবে। স্ট্রোকের সময় বেশি রক্তচাপ ব্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে অক্সিজেন ও নিউট্রিশন পেঁৗছানোর দেহের একটা প্রচেষ্ট মাত্র। অনেক সময় ৪০ বা ৪৫ বছরের একজন ব্যক্তির রক্তক্ষরণ হয়। এমন একজন মানুষ যদি স্ট্রোকে পঙ্গু হন, তাহলে তাঁর শুধু নিজের ক্ষতি হয় না, পরিবারেরও বড় রকমের ক্ষতি হয়। তাঁর ছেলেমেয়েদের মানুষ করা, সংসার—সবকিছু বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে।

আমি রোগীদের বলি, শরীরটা তো ফ্রি পেয়েছেন, এ জন্য চেকআপ করেন না। নিজে একটা গাড়ি কিনলে তো কোনো ঝামেলা না থাকলেও বছরে দু-তিনবার সার্ভিসিং করান, যেন আপনার বিনিয়োগ ঠিক থাকে।

আপনার শরীর কিন্তু বিশাল বিনিয়োগ। একে ঠিক রাখতে হলে নিয়মিত রক্তচাপ মেপে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হেব। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত ওষুধ খান। নিয়ম মেনে খাবার খান। নিয়ম মেনে হাঁটাচলা করুন। শুধু দীর্ঘায়ু নয়, আপনি সুস্থভাবে দীর্ঘ জীবন লাভ করুন।

উচ্চ রক্তচাপ এমন একটা রোগ, যেটা আমি ঘরে বসেই পরীক্ষা করতে পারি। মানুষ মনে করেন, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ একবার শুরু করলে সারা জীবন খেতে হয়। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় রোগ হলো ক্ষুধা। ক্ষুধা লাগলে আমাদের খারাপ লাগে।

অনেক সময় মাথা ঘুরে পড়ে যাই। ক্ষুধা লাগলে না খেলে আমরা অসুস্থ হব। এক অর্থে ক্ষুধাও একটা রোগ। ক্ষুধা লাগে বলে আমরা প্রতিদিন খাই। তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিদিনই ওষুধ খেতে হবে। ওষুধ খেলেই তিনি রোগী নন।

কোনো কোনো সময় শরীরে কিছু উপাদানের ঘাটতি থাকে, ওষুধের মাধ্যমে সেটা পূরণ হয়। সব অবস্থায় নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ ভাবতে হবে।

সাবিনা হাশেম

default-image

এ বছর উচ্চ রক্তচাপের স্লোগান হলো ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, দীর্ঘদিন বাঁচুন’। যাঁদের বয়স ১৮ বছরের বেশি, তাঁদের পরীক্ষা করে দেখতে হবে উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না। থাকলে সেটা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। জাতিসংঘের স্লোগান হলো ২০২৫ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে আনা।

বিশ্বে ৮০ কোটির বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে ও ২০০ কোটির বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের গত মার্চের তথ্য অনুসারে আমাদের দেশে ৮ শতাংশের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর পরিমাণ ২ দশমিক ১ থেকে ৩২ শতাংশ। গড়ে ১৭ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে নারীদের থেকে পুরুষের সংখ্যা বেশি।

যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁদের ১৫ থেকে ৩০ শতাংশের ডায়াবেটিস আছে। আবার ডায়াবেটিস যাঁদের আছে, তাঁদের ৩৪ থেকে ৭৫ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ আছে। এখন প্রশ্ন হলো, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মধ্যে কেন এত সহসম্পর্ক।

এর কারণ হলো, যে যে কারণে ডায়াবেটিস হয়, ঠিক প্রায় একই কারণে উচ্চ রক্তচাপ হয়। এসব রোগীর ঝুঁকিও প্রায় এক। আবার দেখা যায়, উচ্চ রক্তচাপ যাঁদের থাকে, তাঁদের কিডনি রোগ বেশি হয়। কিডনি বিকল হলে তাঁদের আবার উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়।

আমাদের দেশে টাইপ-১ আর টাইপ-২—এই দুই ধরনের ডায়াবেটিস আছে। ডায়াবেটিসের ৯০ শতাংশই টাইপ–২। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের টাইপ–২ ডায়াবেটিস হয়। আর অল্প বয়সীদের হয় টাইপ–১। টাইপ–২ ডায়াবেটিস পরীক্ষার সময় দেখা যায় যে টাইপ–২ ডায়াবেটিস রোগীর ২৮ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ আছে।

আগেই বলেছি, এ দুটো রোগের কারণ প্রায় একই। যেমন বয়স, ওজন, পরিবারে এসব রোগের ইতিহাস, কোলেস্টেরল, ধূমপান ও চাপ—এগুলোই এ দুটো রোগের উপসর্গ। এসব রোগের জটিলতাও প্রায় একই রকম। ডায়াবেটিসের রোগীদের রক্তচাপ ১৪০/৯০–এর ওপরে থাকলে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ সেবন করতে হবে।

আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিলে ২০২০ সালে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের একটা পরামর্শ দিয়েছে। তারা কিছু ওষুধের গাইডলাইনও দিয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগও পাশাপাশি অবস্থান করে।

উচ্চ রক্তচাপ থেকে কিডনি রোগ হয়। আবার প্রাথমিক কিডনি ডিজিজ থেকেও উচ্চ রক্তচাপ হয়। ক্রনিক কিডনি রোগের ক্ষেত্রে কিছু পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হয়। আরও কিছু পরীক্ষা আছে, যেটা করা ভালো।

কিডনির ক্ষেত্রে ইউরিনে অ্যালবোমিনের পরিমাণ ২৪ ঘণ্টায় যদি ৩০ মিলিগ্রাম পার কেজির নিচে হয় আর বিপি যদি ১৪০/৯০ হয়, তাঁকে নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেতে হবে। যাঁদের ডায়াবেটিস নেই, তাঁদেরও অ্যালবোমিনের পরিমাণ যদি ৩০ মিলিগ্রাম পার কেজি ও রক্তচাপ ১৩০/৮০ হয়, তাঁদেরও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেতে হবে।

সিওপিডি হলো ফুসফুসজনিত সমস্যা। যাঁদের এ সমস্যা আছে, তাঁদের যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে এবং তা যদি ১৪০/৯০ মিমি এইচজির বেশি থাকে, তাঁরা নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খাবেন।

কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে লবণ, পানিসহ কিছু আমিষজাতীয় খাবারের বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকে। এভাবে দেখা যায় যে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে ডায়াবেটিস, কিডনি ও ফুসফুসের সম্পর্ক রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সুস্থ জীবন যাপন করতে হলে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যেতে হবে।

ফাতেমা বেগম

default-image

একজন নারীর আগে থেকে উচ্চ রক্তচাপ থাকতে পারে। আবার গর্ভধারণের জন্যও উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। কোনো নারীর গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ আগে যদি উচ্চ রক্তচাপ দেখা যায়, তাহলে ধরে নেওয়া হয়, তাঁর আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ ছিল। আর গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহের মধ্যে যদি কারও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়, তাহলে বুঝতে হবে গর্ভধারণের জন্য তাঁর উচ্চ রক্তচাপ হয়েছে।

একজন গর্ভবতী নারীর যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তাহলে সেটা অত্যন্ত সচেতনভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, যেকোনো জটিলতা হলে ওই গর্ভবতী নারী ও তাঁর সন্তান দুজনেরই সমস্যা হতে পারে। গর্ভবতী নারীর স্ট্রোক, শ্বাসকষ্টসহ আরও নানা সমস্যা হতে পারে। সন্তান অপরিণত হতে পারে।

দুভাবে উচ্চ রক্তচাপ কমানো যায়। একটা সাধারণ পদ্ধতি, আরেকটা ওষুধের মাধ্যমে। সাধারণ পদ্ধতি হলো লবণ কম খাওয়া, ব্যায়াম করা, চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

গর্ভকালীন সব ওষুধ খাওয়া যায় না। এ জন্য এ সময় উচ্চ রক্তচাপ হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যে ওষুধ মা ও সন্তান দুজনের কোনো ক্ষতি করবে না, সে ওষুধ খেতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ১৩০/৮০-এর নিচে আনতে হবে। ওষুধে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না, সন্তানের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, এ জন্য নিয়মিত চেকআপে থাকতে হবে।

গর্ভকালীন যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তাহলে একলামশিয়া হতে পারে। এ জন্য ব্রেন, কিডনি, চোখের ক্ষতি হতে পারে।

এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মা ও শিশু দুজনেরই মৃত্যু হতে পারে। গর্ভবতী মায়ের পা ফোলা, শ্বাসকষ্ট, চোখে কম দেখা ও ব্রেনে সমস্যা অনুভূত হলে সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ কমানোর একটা বড় উপায় হলো চাপ কমানো। বাগান করা, গান শোনা, খেলাধুলা করা, হাসি-আড্ডার মধ্যে থাকা ইত্যাদি।

ফিরোজ চৌধুরী

উচ্চ রক্তচাপের ক্ষতিকর দিক ও প্রতিকারের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ যেমন হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি ডায়াবেটিস, কিডনি, স্ট্রোক ও গর্ভবতী মায়ের ঝুঁকি বাড়ায়। উচ্চ রক্তচাপের বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করা দরকার।

আজকের এই ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আলোচনায় সুপারিশ

  • ৩০ বছরের বেশি বয়স হলে বছরে একবার-দুবার উচ্চ রক্তচাপ মাপা জরুরি

  • উচ্চ রক্তচাপের বিষয়টি শুধু একটা দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর এ আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে

  • উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে িনয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। ধূমপান ও অ্যালকোহলের প্রবণতা থাকলে অবশ্যই ছেড়ে দিতে হবে। লবণ ও চর্বিজাতীয় খাবার না খাওয়া উচিত

  • উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের রোগীরা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিনই ওষুধ খেতে হবে

  • অনেকে টেনশন করে রক্তচাপ বাড়িয়ে ফেলেন। টেনশনমুক্ত হাসি-খুশি থাকা অত্যন্ত জরুরি

  • উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে স্ট্রোকের আশঙ্কা প্রায় ৫০ ভাগ কমানো যায়

  • উচ্চ রক্তচাপ কমানোর একটা বড় উপায় হলো চাপ কমানো। বাগান করা, গান শোনা, খেলাধুলা, হাসি-আড্ডা ইত্যাদির মাধ্যমে চাপ কমানো যায়

মন্তব্য পড়ুন 0