default-image

গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী

নাছিমা বেগম

চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

ফজলে হোসেন বাদশা এমপি

সদস্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

শ্যাম সুন্দর সিকদার

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)

সৈয়দ গোলাম ফারুক

মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর

সৈয়দা তাসমিনা আহমেদ

উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান), বাংলাদেশ টেলিভিশন

টোমু হোজুমি

কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ

ইয়াসির আজমান

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), গ্রামীণফোন

মাহ্‌ফুজা লিজা, বিপিএম

অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার, ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস ডিভিশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

চৌধুরী মোহাম্মদ মোহাইমেন

সমন্বয়ক, চাইল্ড হেল্প লাইন, সমাজসেবা অধিদপ্তর

হাসিনা মোস্তাফিজ

সিনিয়র শিক্ষক, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বিআইএসসি)

বীথি আক্তার

কিশোরী প্রতিনিধি, বরিশাল

এম হাফিজুর রহমান খান

লিড স্পেশালিস্ট, করপোরেট রেসপনসিবিলিটি, গ্রামীণফোন

শাবনাজ জাহেরীন

শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সিনিয়র সাংবাদিক

আলোচনা

ফিরোজ চৌধুরী

ইউনিসেফ ভার্চু্যয়াল সংলাপে সবাইকে স্বাগত জানাই। করোনাকালে এক বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেটের উপযোগিতা আরও বেড়েছে। এখন এ বিষয়ে আলোচনার সূচনা করবেন শাবনাজ জাহেরীন।

বিজ্ঞাপন
default-image

শাবনাজ জাহেরীন

শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার জন্য ইউনিসেফ, টেলিনর ও গ্রামীণফোন ২০১৮ সাল থেকে একসঙ্গে কাজ করছে। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আমরা প্রায় ১০ লাখ শিশুর কাছে সরাসরি পৌঁছাতে পেরেছি। ৫০০টি স্কুলে আমাদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছিল।

তিন বছর ধরে ইউনিসেফ ও গ্রামীণফোন একত্রে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে। আমরা গত ডিসেম্বরে এটা নিয়ে একটা ভার্চ্যুয়াল সংলাপের আয়োজন করেছিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে কতগুলো মতামত পেয়েছি। এসব মতামত কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে জন্য সম্মানিত আলোচকদের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা আশা করছি। তাহলে একটা ভালো কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব। শিশুদের অনলাইন কার্যক্রমের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত থাকে, সে জন্য আমরা এই দিকনির্দেশনা আশা করছি।

আমরা সবাই জানি, তথ্যপ্রযুক্তি বা ইন্টারনেট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, কেনাকাটা—সবকিছুতে এখন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। একটা দীর্ঘমেয়াদি মহামারির কারণে অনলাইন–নির্ভরতা বেড়েছে। গত এক বছরে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। এর একটা বড় অংশ হচ্ছে শিশু। এদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটো বিষয় নিশ্চিত করতে চাই। এক. প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা যেন ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। তাদের কাছে যেন ইন্টারনেট সেবা পৌঁছায়। দুই. শিশুরা যেন নিরাপত্তার সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে মা–বাবা, শিক্ষক, অভিভাবক—সবার দায়িত্ব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গত ডিসেম্বর মাসের ভার্চ্যুয়াল সংলাপ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ পেয়েছি। এবার আশা করছি, ইন্টারনেট সেবাদাতা সংস্থা, সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবাই যেন নিরাপদ ইন্টারনেট সেবা প্রদানে সহযোগিতা করে।

করোনা মহামারির জন্য ২০২০ সালে কিছুদিন আমাদের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কিন্তু আপনারা জেনে খুশি হবেন, ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আমরা প্রায় দুই কোটি শিশুর কাছে রেডিও, টেলিভিশন ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গিয়েছি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এর আগের আলোচনার অন্যতম সুপারিশ ছিল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাঠক্রমে যেন অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়। এ বিষয়ে ইউনিসেফ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, তাদের মাধ্যমে আমাদের কাজগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে। আমাদের কার্যক্রমে পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতা পেয়েছি। এ ক্ষেত্রে অনেক নাগরিক সংগঠনও এগিয়ে এসেছে।

এ কাজ যেন আমরা আরও বেগবান করতে পারি, প্রত্যেক শিশুকে যেন ইন্টারনেট সেবার আওতায় আনতে পারি এবং ইন্টারনেট সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি, সেটাই আমাদের উদ্দেশ্য। সবাই যেন এ লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে পারি। ইউনিসেফ ও গ্রামীণফোন থেকে অনলাইন-অফলাইনে ব্যবহার করার জন্য মডিউল করেছি। শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে মা–বাবা, শিক্ষক, অভিভাবক—সবার দায়িত্ব রয়েছে।

default-image

বীথি আক্তার

করোনা মহামারিতে আমরা স্কুলে যেতে পারছি না। বাড়িতে থেকে অনলাইনে পড়াশোনা করছি। অনলাইনে আমাদের খুব বেশি অসুবিধা হচ্ছে না। ভালোই বুঝতে পারছি।

কিন্তু আমাদের একটা বড় সমস্যা হলো, সব সময় ইন্টারনেট স্পিড ভালো থাকে না। অনেকে আবার ঠিকভাবে ফোন চালাতে পারে না। অনলাইনে সব সময় সবকিছু ভালোভাবে বোঝা যায় না। একটা কিছু বুঝতে না পারলে শিক্ষককে প্রশ্ন করা যায় না। এমন অনেক সমস্যা আমাদের রয়েছে।

default-image

হাসিনা মোস্তাফিজ

গত বছর থেকে অনলাইনে আমরা ক্লাস নিচ্ছি। আরও হয়তো নিতে হবে। শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শসেবা জরুরি। সেটা অনলাইনেও হতে পারে। শিশুদের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা দরকার, অনেক অভিভাবক হয়তো সেটা করতে পারছেন না। কার্যকর সময় দিতে পারছেন না। শিশুরা কীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, সেটা আমাদের দেখা প্রয়োজন।

শিশুদের তথ্যপ্রযুক্তি বইতে সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে শুধু সংজ্ঞা আছে, বিস্তারিত নেই। এ কারণে শিশুরা অনেক কিছু বুঝতে পারে না। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক শিশু বিষণ্ন থাকে। অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার জন্য শিক্ষকদের আরও বেশি প্রশিক্ষণ দরকার।

default-image

এম হাফিজুর রহমান খান

২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম আলোর অনলাইনে আমাদের একটা জরিপ হয়। ২ হাজার ৩৮১ জন অভিভাবক এ জরিপে অংশ নেন। জরিপ থেকে আমরা ধারণা নিতে চেয়েছিলাম, অভিভাবকেরা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তায় কী ধরনের ভূমিকা রেখেছেন। মা–বাবাসহ অভিভাবকেরা শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন। আমরা চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে এ বিষয়ে জানতে চেষ্টা করেছি।

আমাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতটুকু ধারণা আছে? এ প্রশ্নের উত্তরে দেখেছি, ৩৪ শতাংশ অভিভবক বলেছেন, পড়ালেখার জন্য তাঁদের সন্তানেরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আর সামাজিক মাধ্যম, গেমস ও চ্যাটিংয়ের জন্য যথাক্রমে ২৫, ২৩ ও ১৮ শতাংশ সময় ব্যবহার করে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ইন্টারনেটে তাঁদের সন্তানদের অনলাইনে যে বন্ধু আছে, তাদের ব্যক্তিগতভাবে চেনেন কি না? প্রায় ৭০ শতাংশ অভিভাবক বলেছেন, চেনেন না।

তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, ইন্টারনেটে কী ধরনের তথ্য তাঁদের সন্তানেরা আদান-প্রদান করে থাকে? প্রায় ৬৭ শতাংশ অভিভাবক বলেছেন, তাঁরা এটা জানেন না।

আমাদের শেষ প্রশ্ন ছিল, ইন্টারনেটে কোনো সমস্যা দেখা দিলে অভিভাবকদের জানানোর জন্য সন্তানদের উদ্বুদ্ধ করেন কি না? একটা আশার বিষয় হলো, প্রায় ৭৯ শতাংশ অভিভাবক এ ব্যাপারে সন্তানদের উৎসাহিত করে থাকেন।

এ জরিপ থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের অভিভাবকেরা জানেন, তাঁদের সন্তানেরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। কিন্তু ইন্টারনেটে কী ব্যবহার করেন, এ বিষয়ে তাঁদের স্বচ্ছ ধারণা নেই। ইন্টারনেটের অপার সম্ভাবনার পাশাপাশি এর অনেক ঝুঁকিও রয়েছে। তাই এর ব্যবহার সম্পর্কে অভিভাবকদের অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। সন্তানেরা যেন নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন, এ বিষয়ে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

চৌধুরী মোহাম্মদ মোহাইমেন

অনেকের কাছে ইন্টারনেট একটা নতুন বিষয়। অধিকাংশ শিশু ও অভিভাবক এর ব্যবহারবিধি জানেন না। ১০৯৮ থেকে আমরা শিশু ও অভিভাবকদের ২৪ ঘণ্টা টোল িফ্র সেবা দিয়ে থাকি। বাবা-মায়েরা যখন ফোন করছেন, তখন নিরাপদ ইন্টারনেট বিষয়ে সচেতন করছি।

শিশুরা যখন অনলাইনে থাকে, তখন বিভিন্নজন তাদের বিরক্ত করছে। তারা বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখানো হয়। অনেক সময় বন্ধুত্বের জন্য তারা এমন কিছু শেয়ার করে, যে জন্য পরবর্তী সময়ে বিপদে পড়ে। অনেক শিশু জানে না, পাসওয়ার্ড তার একান্ত ব্যক্তিগত। অনেক সময় তারা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করে দেয়।

কারও যদি আইনগত সাহায্যের প্রয়োজন হয়, সে ব্যাপারে সহযোগিতা দিয়ে থাকি। আমরা নিয়মিত কিছু টিপস দিয়ে থাকি, যেটা ব্যবহার করলে তারা নিরাপদ থাকতে পারে। আমরা সব সময় শিশু ও অভিভাবকদের জন্য প্রস্তুত আছি। যেকেউ যেকোনো সময় ১০৯৮ নম্বরে ফোন করে সেবা নিতে পারে।

default-image

ফজলে হোসেন বাদশা

অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে বছরব্যাপী আলোচনা চলছে। শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত রাখার জন্য বিদ্যুৎ ও অনলাইন নিরাপত্তা দুটিই জরুরি। বরিশাল থেকে বীথি আক্তার আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার সংযোগ চলে গেল, বিদ্যুৎ চলে গেল। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ বিষয়ে একটা নীতিমালা তৈরি করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন। করোনা মহামারির কারণে যেসব শিশুশিক্ষার্থী স্কুলে যেতে পারছে না, তারা ইন্টারনেট সেবা কতটুকু পাচ্ছে, আর ইন্টারনেট ব্যবহারের সক্ষমতা তাদের কতটুকু আছে, সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন।

অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবার তাদের সন্তানদের পড়ালেখার জন্য ইন্টারনেট ব্যয় বহন করতে পারে না। তাদের জন্য নামমাত্র বা বিনা মূল্যে কীভাবে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া যায়, তা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের একটা স্মার্টফোন কেনার মতো সামর্থ্য নেই। আইসিটি বিভাগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে একটা সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে বলে মনে করি।

গতবার বাজেটে ইন্টারনেটের মূল্য বাড়ানোর সময় আমি জাতীয় সংসদে বলেছিলাম, একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ইন্টারনেটের জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ব্যয় করতে পারে না। খুব কম খরচে শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট দেওয়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটা ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

করোনার সময় ইউরোপেও পড়ালেখা বন্ধ ছিল। কিন্তু পরে তারা এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছে। তাদের কাছ থেকে এই অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতে পারে। আমাদের ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ইন্টারনেট যুক্ত হতে যাচ্ছে। আমাদের স্কুল বন্ধ হওয়া, খোলা—এসব বিষয় নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে।

default-image

মাহ্ফুজা লিজা

করোনা মহামারির জন্য অনলাইন ক্লাসসহ বিভিন্ন কারণে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে। তারা সাইবার অপরাধের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে সাইবার অপরাধ বিষয়ে দায়ের করা প্রায় ছয় হাজার মামলার বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইডি হ্যাকিং ও ফেক আইডি তৈরি, সাইবার বুলিং, হ্যারাজমেন্ট, ব্ল্যাকমেলিং ইত্যাদি অপরাধ বেশি ঘটছে।

ভিকটিমদের ৬৫ শতাংশই নারী। অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর। অর্থাৎ ১৫-১৮ বছর বয়সী শিশুরা এ তালিকায় রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীও কিন্তু শিশু। তারা অপরাধের পরিণতি বা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে না জেনেই হয়তো এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব শিশুকে কাউন্সেলিং বা পরামর্শসেবা দিয়ে সাইবার অপরাধ থেকে বিরত রাখা জরুরি।

তাই ডিএমপি রি-অ্যাকটিভ ও প্রো-অ্যাকটিভ—দুভাবেই কাজ করছে। যখন কোনো সাইবার অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন ভিকটিমকে প্রতিকার প্রদানের উদ্দেশ্যে অপরাধীর বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে মামলার তদন্তকাজ সম্পন্ন করছে। একই সঙ্গে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ইন্টারনেটে ঝুঁকি এড়ানো যায়, সেই জরুরি বার্তাসমূহ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সম্মানিত নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ওয়েব পেজগুলোতে বাস্তব ঘটনাকে উপজীব্য করে নির্মিত সচেতনতামূলক বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ, তথ্যসমৃদ্ধ লিফলেটের মাধ্যমে এসব সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে।

সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশ পুলিশের কয়েকটি ইউনিট কাজ করছে। ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে একটি হেল্প ডেস্ক আছে, যা সার্বক্ষণিক সেবা প্রদান করে থাকে, যে কেউ এখানে প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য সরাসরি আসতে পারেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলা এই ডিভিশন তদন্ত করে থাকে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সও দিয়ে থাকে। এ ছাড়া রয়েছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। এর অত্যাধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব দ্রুততার সঙ্গে মামলা নিষ্পত্তিতে সহায়ক হচ্ছে। সম্প্রতি ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অধীনে একটি ফেসবুক পেজ চালু করা হয়েছে, যেখানে সব সেবাদাতাই নারী। তাই নারীরা সহজেই গোপনীয়তা রক্ষা করে স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।

default-image

সৈয়দ গোলাম ফারুক

প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার ব্যাপারটি করোনা অতিমারির পরেও থেকে যাবে। এখনো কিছু শিক্ষাথী অনলাইন সেবার ক্ষেত্রে বাইরে রয়েছে, এটা সত্যি। কিন্তু সরকার এ ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে। অচিরেই এই বৈষম্য কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

কোভিড-১৯ যেমন আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করেছে, তেমনি কিছু সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আমি বলব, শিক্ষার্থীদের সফট স্কিলস বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্ধভাবে না পড়ে তারা যেন যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি–বিবেচনা দিয়ে শিখতে পারে, আমাদের সেদিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই। আমি মনে করি, প্রকল্পভিত্তিক কাজে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার সময় এসেছে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে হাতেকলমে কাজ করতে করতে শিশুরা শিখবে, দক্ষ হয়ে উঠবে। শিশুদের অনলাইনে দক্ষতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু পাঠ্যসূচিতে অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলেই হবে না, পাশাপাশি আচরণ ও মূল্যবোধের শিক্ষাও প্রয়োজন।

default-image

শ্যাম সুন্দর সিকদার

নিরাপদ ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে হলে ইন্টারনেট সেবা প্রদান–সংক্রান্ত নেটওয়ার্কিং বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে সেবা দিতে গেলে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটা ভাবতে হবে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি মুঠোফোন ব্যবহারকারী, তাদের মধ্যে প্রায় ১১ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং প্রায় ২ কোটি ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারী রয়েছে।

দেশে ফোর–জি সেবা অনেক দূর এগিয়েছে। তারপরও ইন্টারনেট সেবা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। আমাদের ব্যবহারকারীদের স্মার্টফোনের অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশে এখন ১২টির বেশি কোম্পানি মুঠোফোন উৎপাদন করছে। নিম্ন আয়ের মানুষদের কী করে অল্প মূল্যে স্মার্টফোন দেওয়া যায়, আমরা সেটা চিন্তা করছি। ইন্টারনেট স্পিড কমের অভিযোগ শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে ফোন কোম্পানিগুলো কাজ করছে। বরিশাল থেকে যে মেয়েটি কথা বলছিল, তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। আমরা চেষ্টা করছি, প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যেন ঠিকভাবে ইন্টারনেট পৌঁছানো যায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রকল্প চলমান আছে। আশা করছি, এক বছরের মধ্যে অনেকাংশে ঠিক হয়ে যাবে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ৩১ দ্বীপে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

আমাদের শিশুদের বন্ধু ও আত্মীয়রা ইন্টারনেট ব্যবহারে কতটুকু সচেতন, সেটা দেখতে হবে। আমাদের অধিকাংশ অভিভাবক তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ নয়। বয়স্ক শিক্ষকদের মধ্যে এখনো অনেকে প্রযুক্তির মধ্যে ঢুকতেই পারেননি। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ও মোবাইল ফোন অপরারেটররা- তারাও কিন্তু বড় স্টেকহোল্ডার। এসব ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের যে দায়িত্ব আছে, তারা সেটা পালন করছে বলে মনে হয় না। গ্রামীণফোন কিছুটা এগিয়ে এসেছে। প্যানডেমিকের মধ্যে ছেলেমেয়েদের সচেতনতামূলক ভিডিও দেখিয়েছে। অনলাইনে মিটিং করেছে। অন্য মোবাইল ফোন কোম্পনিগুলো করছে কিনা আমার জানা নাই। সবাই এই প্যানডেমিকে এ ধরনের কাজে এগিয়ে এলে ভালো হতো।

সরকারের দিক থেকে বিটিআরসি, পুলিশ বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা রয়েছে। আমরা একটি উদ্যোগের মাধ্যমে ২২ হাজার পর্নোগ্রাফি বন্ধ করেছি। আমাদের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম, ফেসবুক, ইউটিউবসহ সবার কিছু না কিছু সচেতনতামূলক ভূমিকা রাখা উচিত। ফেসবুক, ইউটিউব এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ভারত ও অস্ট্রেলিয়া এটা নিয়ে আইন করেছে। আমরাও সেটা করার চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতেও আমরা নিরাপদ ইন্টারনেটের বিষয়ে কাজ করে যাব।

নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা খুবই জরুরি। পাঠ্যপুস্তকে ইন্টারনেট সচেতনতার কথা সেভাবে নেই। এটা রিভিউ করা দরকার। ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা বিষয়ে আমার লেখা একটা বই ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে। এ বইয়ে শিশু ও অভিভাবকদের উপযোগী ইন্টারনেট বিষয়ে যাবতীয় তথ্য আছে। আমাদের একটা আইএসপি গাইডলাইন আছে। সে অনুযায়ী আমরা টেলিভিশনের স্ক্রলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সতর্কতামূলক কাজ করেছি।

default-image

ইয়াসির আজমান

আমাদের জন্য খুবই আনন্দের বিষয় যে এ রকম একটা ইস্যুতে আজ আলোচনা করতে পারছি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম থ্রি–জি এসেছিল। ২০১৪ সাল থেকে গ্রামীণফোন ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু তখন এ বার্তাটা পৌঁছানো এত সহজ ছিল না। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ফোর-জি এল। তখন আমরা ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ শুরু করলাম। প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থীর অনলাইন নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে পেরেছি।

২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে জ্ঞান ও প্রযু্ক্তিভিত্তিক। আমাদের সন্তানদের সুরক্ষিত স্কুল ও বাড়িতে রেখে নিরাপদ বোধ করতে পারছি না। শুধু দেশ নয়, পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে যে কেউ মোবাইলে ঢুকে যেতে পারে। আমার তিনটি সন্তান স্কুলে যায়। এ থেকে বুঝেছি, অনলাইন নিরাপত্তা কতটা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কতটা অসহায়। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় এটা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করবে বলে জেনেছি। বিটিআরসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। এসবই আশাব্যঞ্জক। তবে কাজগুলো বিচ্ছিন্নভাবে না হয়ে যদি সমন্বিতভাবে হয়, তাহলে আরও বেশি ফলপ্রসূ হবে।

নেটওয়ার্কে কিছু সমস্যা হলেও বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কিশোরী বীথি আক্তার আমাদের সঙ্গে সংযু্ক্ত ছিল। এটাই আশার কথা। এসব শিশুকে অনলাইন নিরাপত্তা দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিশুও আরেকজন শিশুর বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে পরিবার, স্কুল থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব রয়েছে। এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুধু সচেতন হলেই হবে না। একই সঙ্গে আমাদের এখানে নীতিমালা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা ও সঠিক দিকনির্দেশনার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছি। এখন সমন্বিতভাবে সবাই কাজ করলে আমাদের শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা দিতে পারব বলে আশা করি।

বিজ্ঞাপন
default-image

নাছিমা বেগম

বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেছেন, ফেসবুক ও ইউটিউবকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। ফেসবুক বা ইউটিউবে একটা ছবি ছেড়ে দিয়ে একজনের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে। সরকারকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।

সন্তানদের জন্য বাবা-মায়ের গাইডলাইন অত্যন্ত জরুরি। সন্তানেরা রাত জেগে কী করে, কোথায় যায়, তার বন্ধুবান্ধব কারা, এটা বাবা-মায়ের একটু হলেও খবর নিতে হবে। আমাদের সময় বই পড়ার সংস্কৃতি ছিল। আমাদের অভিভাবকেরা আমাদের হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন। এখন প্রায় সবাই রাত-দিন মোবাইল ব্যবহার করে। অনেক সময় মোবাইলের বিভিন্ন অনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে যু্ক্ত হয়ে যায়। তাই সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন খারাপ বিষয় থেকে সন্তানদের রক্ষা করার জন্য গুড প্যারেন্টিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।

কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে, মাদক নিচ্ছে, মোবাইলের অপব্যবহার করছে, পর্নোগ্রাফিতে ঢুকছে। গুড প্যারেন্টিংয়ের অভাবে এসব হচ্ছে। আজকের শিশু ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। তাদের নৈতিক ও মানবিক করে গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে নির্মিত হবে না।

ভবিষ্যতের ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য ইন্টারনেট আমাদের লাগবেই। এর কোনো বিকল্প নেই। তাই যেকোনো মূল্যে আমাদের একে নিরাপদ করতে হবে। লাইভ করতে গেলে মাঝ্যেমধ্যেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নেটওয়ার্ক আরও উন্নত করতে হবে।

নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা মানবাধিকার সুরক্ষা ক্লাব করতে চাই। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গোলাম ফারুক এটা জানেন। আমরা এ ব্যাপারে তাঁরও সার্বিক সহযোগিতা চাই। শিশুদের নিয়ে আমাদের কমিটি আছে। আমাদের দিক থেকে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তর জন্য গঠনমূলক পরামর্শ সরকারকে দেব। এ ক্ষেত্রে আজকের আলোচনাও আমাদের কাজে লাগবে। মানবাধিকার কমিশনের দরজা সবার জন্য খোলা। আপনারা ন্যায়সংগত যেকোনো বিষয় নিয়ে আমাদের কাছে আসতে পারেন।

default-image

সৈয়দা তাসমিনা আহমেদ

আমরা অনলাইনের যুগে প্রবেশ করেছি। আমাদের অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন, সন্তানদের একটা কম্পিউটার বা মোবাইল দিলেই তারা লেখাপড়া শিখে ফেলবে। কিন্তু তারা জানে না যে এসব ডিভাইস তাদের জন্য কী সমস্যা নিয়ে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে তাদের তদারক করা প্রয়োজন, তারা সেটা হয়তো অনেকেই জানে না।

আবার অনেকে তাঁদের সন্তানদের বেবি সিটার হিসেবে অনেক ডিভাইস দিচ্ছেন। কারণ, সন্তানকে সময় দেওয়ার সময় তঁাদের নেই। এটা থেকেই যে সন্তানেরা ধীরে ধীরে বিপদের দিকে চলে যেতে পারে, এ ধারণা তাদের মধ্যে নেই। আমি মনে করি, সবার আগে বাবা-মাকে বিষয়গুলো নিয়ে বেশি সচেতন হতে হবে।

শুধু আইন দিয়ে এ সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করা যাবে না। এটা একটা সামাজিক সমস্যা। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান টিভিসি তৈরি করে দিলে আমরা তা বিটিভিতে প্রচার করব। অনলাইন অপরাধ নিয়ে বিটিভির নিজস্ব উদ্যোগ রয়েছে। যদিও এটা খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু আমি মনে করি, অনলাইন অপরাধের বিষয়টি নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করা উচিত।

default-image

টুমো হাজুমি

ইউনিসেফের পক্ষ থেকে সম্মানিত আলোচকদের ধন্যবাদ। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগ শিশুসহ সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদেরও যদি ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পারি, তাহলে তারাও তাদের জীবন বদলের সুযোগ পাবে। এটা তাদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ ও মতামত নাগরিক সমাজে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।

একই সঙ্গে ইন্টারনেট সেবার অনেক ঝুঁকিও রয়েছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলোর একটা জরিপ থেকে দেখতে পাই, ৭৯ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার। তাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ নারী। শিশুরা সাইবার ‍বুলিংসহ বিভিন্ন অনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। শিক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে শিশুদের অনেক সময় অনলাইনে ব্যয় করতে হয়। তাই তাদের অনলাইন নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি।

নিরাপদ অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারবে। কিন্তু সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানি ও সহিংসতা মানসিকভাবে তাদের বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। শিশুদের এ ধরনের বিপদ থেকে রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপে নিতে হবে। যেন শিশুরা অনলাইন শিক্ষার অপার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।

ইউনিসেফ গ্রামীণফোন ও টেলিনরের সহযোগিতায় তিন বছর ধরে বাংলাদেশে নিরাপদ অনলাইন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কাজ করছে। আমরা প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে সরাসরি পৌঁছেছি। ১ হাজার ৬০০ কিশোর-কিশোরী ক্লাব করেছি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাহায্যে শিশু, অভিভাবক, শিক্ষকসহ প্রায় ২০ লাখ মানুষকে সেবা দিয়েছি। এ জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার এবং মহিলা ও শিশু অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে, যারা অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করি, পাঠ্যপুস্তকে অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি যথোপযুক্তভাবে আসবে। এর সঙ্গে ফলপ্রসূভাবে আইনি পদক্ষেপ যুক্ত হলে নিরাপদ অনলাইনের বিষয়টি নিশ্চিত হবে।

গত বছর করোনা মহামারির পর থেকে অনলাইন ও অফলাইনে শিশুরা অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এদের অধিকাংশের বয়স ১৪ বছরের মধ্যে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দিক থেকেও শিশুদের জন্য নিরাপত্তার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও কর্মকৌশলে শিশুদের সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে থাকা প্রয়োজন।

ফিরোজ চৌধুরী

কোভিডকালে আমরা বেশি মাত্রায় ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি। এ সময়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ও নিরাপদ সামাজিক মাধ্যম নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আজকের ভার্চু্যয়াল সংলাপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে এসেছে। আশা করি, নীতিনির্ধারকেরা তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। এই সংলাপে অংশ নেওয়ার জন্য সম্মানিত আলোচকদের অনেক ধন্যবাদ।

সুপারিশ

শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরাও যেন নিরাপত্তার সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য ও পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়, যেটা তাদের পরে সমস্যা তৈরি করবে।

সন্তানেরা ইন্টারনেটে কী ব্যবহার করে, এ বিষয়ে অভিভাবকদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি।

নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষা ক্লাব গঠন করা যেতে পারে।

পাঠ্যপুস্তকে সহজ ভাষায় শিশু–কিশোরদের উপযোগী করে অনলাইনে নিরাপদ থাকার বিষয়টি উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট সেবা কতটুকু পাচ্ছে, আর ইন্টারনেট ব্যবহারের সক্ষমতা তাদের কতটুকু আছে, সে বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন