বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অংশগ্রহণকারী

মুন্সি মো. সাদউল্লাহ

লাইন ডিরেক্টর, পিএমআর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

রাজিনারা বেগম

পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ অধিদপ্তর

রোবেদ আমিন

লাইন ডিরেক্টর, এনসিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

মাহফুজার রহমান

কান্ট্রি ডিরেক্টর, পিওর আর্থ বাংলাদেশ

শানজানা ভরদাজ

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান, ইউনিসেফ বাংলাদেশ

মাহবুবুর রহমান

প্রকল্প সমন্বয়ক, আইসিডিডিআর,বি

অরুণ মিত্র

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন

হাসানুল বান্না

আইনজীবী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)

সিদ্দীকা সুলতানা

নির্বাহী পরিচালক, ইএসডিও

মিনজুন কিম

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ

দিদারুল আলম

পরামর্শক, ইউনিসেফ বাংলাদেশ

সূচনা বক্তব্য

আব্দুল কাইয়ুম

সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো

সুপারিশ

■ সিসাদূষণের সব উৎস চিহ্নিত করা প্রয়োজন

■ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ের রঙে সিসাদূষণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুসরণ করতে হবে

■ সিসাযুক্ত যেকোনো উপকরণে অতিরিক্ত শুল্কারোপ করে সিসার আমদানি ও ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে

■ সিসার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরি করা দরকার

■ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে সিসাদূষণ রোধ করতে হবে

■ সিসাযুক্ত ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ কারখানাগুলো নিয়মিত নজরদারিতে নিয়ে আসা প্রয়োজন

■ সিসাদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি

■ মসলা, খাদ্যদ্রব্য, গয়না, খেলনা ও রান্নার সরঞ্জামে সিসার ব্যবহার বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন

■ রক্তে সিসা শনাক্তকরণ কার্যক্রম জাতীয় পর্যায়ে নেওয়া দরকার

■ এ–সংশ্লিষ্ট সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় জরুরি

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

সিসাদূষণের বিষয়টি আমাদের অনেকের জানা নেই। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে। সেটিও আমরা অনেকে জানি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ বিষয়টি নিয়ে সরব। কিন্তু অনেক দেশই এটা নিয়ে খুব বেশি তৎপর নয়। সিসা একটি বিষাক্ত পদার্থ। যা খাবার, পানীয় ও শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে। এটা শরীরে রক্তের সঙ্গে মিশে যকৃৎ, কিডনি, হাড়সহ সবকিছুই আক্রান্ত করে। এটা দেহের কোমল পেশিতন্ত্রগুলো আক্রান্ত করে। হাড়ের মধ্যে সিসা ঢুকলে তা ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত থেকে যায়। সিসাদূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। সিসাদূষণের ফলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ জন্য কর্তৃপক্ষ আইন করেছে। আইনগুলো কার্যকর করতে হবে। সিসার বিষাক্ত প্রভাব থেকে একেবারে মুক্ত হওয়া যায়। তবে কিছু পদক্ষেপ নিলে শরীরে সিসার ক্ষতিকর পরিমাণ কমানো যাবে। ভিটামিন সি, আয়রন ও ক্যালসিয়াম–সমৃদ্ধ খাবারের প্রতি মনোযোগী হলে আমরা এ থেকে অনেকটা রক্ষা পাব। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

default-image

দিদারুল আলম

সিসা একটি বিষাক্ত ভারী পদার্থ। যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সিসা খুব অল্প তাপে গলে যায় এবং বাষ্পীভূত হয়। ফলে এটাকে বিভিন্ন পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে গুণগত মান উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়। খাদ্য–পানীয়, শ্বাসপ্রশ্বাস ও চামড়া—এ তিনটি উপায়ে সিসা মানবদেহে প্রবেশ করে।

অতীতে সিসার ব্যবহার কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশে ও বৈশ্বিকভাবে সিসার ব্যবহার বাড়ছে। রক্তে এটি ছয় থেকে সাত সপ্তাহ অবস্থান করে। সিসা মূলত আমাদের হাড় ও দাঁতে জমা হয়। যেখানে এটি ২০ থেকে ৩০ বছর থাকতে পারে। সিসাদূষণ শিশুদের জন্য ক্ষতিকর— বিষয়টি প্রথম জানা যায় ১৯৬৭ সালে। ১৯৭৮ সালে এটি ব্যবহার বন্ধে আলোচনা

শুরু হয়। ডিজেল ও পেট্রলে সিসা যুক্ত থাকে। এ বছর বৈশ্বিকভাবে সিসাযুক্ত পেট্রলের ব৵বহার বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বে

প্রায় ৮০ কোটি শিশুর শরীরে পাঁচ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার হারে সিসা রয়েছে। বাংলাদেশে আনুমানিক সাড়ে তিন কোটি শিশুর শরীরে উচ্চমাত্রার সিসা রয়েছে। আমাদের দেশের শিশুরা খর্বাকৃতির হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে সিসাদূষণের সম্পর্ক থাকতে পারে।

সিসাদূষণে আক্রান্তের দিক থেকে বাংলাদেশ চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। সে জন্য এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সিসার উৎস কী? সিসাযুক্ত জ্বালানি, রং, ও পানি সরবরাহের পাইপ থেকে সিসাদূষণ ঘটতে পারে। ধনে, হলুদ, মরিচ—এ ধরনের মসলার মধ্যে সিসার উপাদান পাওয়া গেছে। কম দামের কিছু গয়না, সুরমা, কাজল, সিঁদুর ইত্যাদিতেও সিসা পাওয়া যাচ্ছে। পুরোনো ব্যাটারির সিসা বের করে পুনরায় ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। দেশে ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ সিসার একটি বড় উৎস।

শিশুদের ক্ষেত্রে সিসা প্রথমেই মস্তিষ্কে আক্রমণ করে। যা শিশুর শরীর, আচরণ, শ্রবণশক্তি ও শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। বয়স্ক লোকেরাও একই ভাবে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন আক্রান্ত থাকলে হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ, পরিপাক ও প্রজননতন্ত্রে আক্রমণ করে। ফলে মাথা ঘোরানো, গ্রন্থিতে ব্যথার

মতো লক্ষণ দেখা দেয়। শরীরে সিসার পরিমাণ বেড়ে গেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শিশুরা সিসাদূষণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীর শরীর থেকে শিশুর

ভ্রূণ সিসায় আক্রান্ত হতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের

পুষ্টির চাহিদা ঠিকমতো পূরণ হয় না। ফলে তারা সিসায় আক্রান্তের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সিসা ঝুঁকির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে তা রোধে পদক্ষেপ নিতে হবে। মসলা, খাদ্যদ্রব্য ও গয়নায় সিসার ব্যবহার বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

default-image

মিনজুন কিম

বর্তমানে বাংলাদেশে আমরা তিন বছর মেয়াদের একটি কর্মসূচি পরিচালনা করছি। এ কর্মসূচির নাম পিসিপি (প্রটেক্টটিং এভরি চাইল্ড পটেনশিয়াল)। এ কর্মসূচি নেটওয়ার্কের মধ্যে বাংলাদেশসহ চারটি দেশ রয়েছে। এ চারটি দেশের সঙ্গে আমরা নিয়মিত আমাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করি।

দেশের এ বৃহৎ সমস্যা মোকাবিলার জন্য তিন বছর অনেক কম সময়। তবু এই প্রচেষ্টার ভালো ফল পাওয়া যাবে। এখন এই কর্মসূচির দ্বিতীয় বছর চলছে। এ সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসূচির দ্বিতীয় বছরে অনেক উদ্দেশ৵ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আইসিডিডিআর,বির সহায়তায় আমরা স্বাস্থ্য খাতের একটি পরিস্থিতিগত মূল্যায়ন করব।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে০র সহায়তায় রক্তে সিসার অবস্থা তদারক করা হবে। কর্মসূচির শেষ বছরে সিসাদূষণের ওপর জোর দিয়ে পরিবেশগত স্বাস্থ্যের বিষয়টি মূল ধারায় নিয়ে আসতে কাজ করা হবে। দেশব্যাপী জনসচেতনতা তৈরির জন্য প্রচার চালানো হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা দাতাদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সহায়তা করব। সিসাদূষণের কারণে প্রতি বছর ৩১ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে, যা দেশের মোট মৃত্যুর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আমরা সিসাযুক্ত ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ কারখানাসহ সিসাদূষণের জন্য দায়ী অনেক উৎস চিহ্নিত করেছি। সিসাযুক্ত ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণে দেশে এক হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে।

এ ছাড়া সিসাদূষণের জন্য দায়ী অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত রয়েছে। যার মধ্যে কীটনাশক, জাহাজ ভাঙা শিল্প, কসমেটিক, রং, অ্যালুমিনিয়াম ও হলুদ অন্যতম। সিসাদূষণে বিষাক্ত জায়গাগুলোর সম্পূর্ণ তালিকা তৈরিতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নিচ্ছি। আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রক্তে সিসার পরিমাণ নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। জনসচেতনতা ও আচরণগত পরিবর্তনের জন্য আমরা প্রচারের কাজ চালাতে চাই। ২০১৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সিসাদূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ পালন করা হয়। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক সিসাদূষণ প্রতিরোধ সপ্তাহ পালন করা হয়। সিসাদূষণ প্রতিরোধে বহু খাতভিত্তিক কার্যক্রম শুরু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

default-image

সিদ্দীকা সুলতানা

২০০৮ সাল থেকে আমরা সিসাদূষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। পাশাপাশি এ বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে গেছি। সে সময় ইন্টারন্যাশনাল পলুটেনস অ্যালিমিনেশন নেটওয়ার্কের (আইপেন) মাধ্যমে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশ এই বিষয়ে কাজ শুরু করে। রঙে সিসার ব্যবহার বন্ধে এ প্রচার শুরু করা হয়। তখন থেকেই আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর, বিএসটিআই ও শিল্প মন্ত্রণালয়কে এখানে যুক্ত করার চেষ্টা করি। ২০০৮ সাল থেকে এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা একটি গবেষণা করি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারাস৴ অ্যাসোসিয়েশন অনেক সহযোগিতা করেছে। এখন পর্যন্ত ৪৪টি রং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিরাপদ সিসা ব্যবহারের সনদের জন্য বিএসটিআইয়ের কাছে আবেদন করেছে। ইতিমধ্যে তারা সনদ পেয়েছে। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া তারা রং উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারবে না। রং প্রস্তুতকারী এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর বিএসটিআইয়ের তদারকিতে থাকছে। এটা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে রঙের ক্ষেত্রে হওয়া দরকার। কারণ, এই রঙ রাস্তাঘাট, জাহাজশিল্প, খেলনা ও খেলার জায়গায় ব্যবহার করা হয়। সে জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ের রঙের ক্ষেত্রেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুসরণ করতে হবে। সব ধরনের রং সিসামুক্ত হতে হবে। নিরাপদ রং ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নীতিমালা ও বিস্তারিত আইন প্রয়োজন। যা এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। পেস্টিসাইড, হার্বেসাইড ও ফাঙ্গেসাইডে সিসা রয়েছে। যা আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশ পারসিসটেনস অর্গানিক পলুটেনসে ১২টি কীটনাশকের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখন বিশ্বব্যাপী ২৪টি কীটনাশকের কথা বলা হচ্ছে। এ বিষয়টির প্রতি সরকারের নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয়ে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব নয়।

default-image

হাসানুল বান্না

পরিবেশের অন্যান্য দূষণ আমরা সহজে চিহ্নিত করতে পারি। যেমন পানিদূষণে স্বাদ, গন্ধ ও রঙের পরিবর্তন দেখা যায়। বায়ুদূষণে চোখ ঝাপসা বা নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিন্তু সিসাদূষণ একেবারে নীরবে ঘটে। এটি খালি চোখে চিহ্নিত করা যায় না। সব ধরনের দূষণে সিসা একটি অনুঘটক। পানি, বায়ু ও মাটিদূষণেও সিসা পাওয়া যায়। এটি নিয়ন্ত্রণে ২০০৬ সালে প্রথম পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ–সংক্রান্ত আইন আছে। কিন্তু সব বিষয় আইনের আওতাভুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে সিসাযুক্ত রং ব্যবহারে বিধিনিষেধ দিয়ে আইন আছে।

প্রতিটি দূষণের সঙ্গে সিসার সম্পৃক্ততা আছে। তাই সংশ্লিষ্ট সব আইনে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সিসা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এ–সংক্রান্ত নীতিমালায় ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার কথা বলা আছে। আমাদের দেশে এগুলো বাস্তবায়ন একটু কঠিন। সম্প্রতি পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে দুটি সিসা কারখানা বন্ধের খবর এসেছে।

দেশের পরিবেশগত সব সমস্যা নিয়ন্ত্রণের ভার পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর। এককভাবে তাদের পক্ষে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরে লোকবল সংকট ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয় রয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে আন্তমন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় খুবই জরুরি। সিসাদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক হয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা দরকার। এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিসেফের একটি প্রচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে সমাধানের আরও পথ পাওয়া যাবে।

default-image

অরুণ মিত্র

এসডো ও আমরা একসঙ্গে সিসা নিয়ে কাজ করেছি। আমরা বিএসটিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রঙে সিসা ব্যবহারের আদর্শ মান তৈরি করেছি। এ মান অনুযায়ী রঙে সিসার পরিমাণ ৯০ পিপিএম। যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। যেমন নেপাল ও শ্রীলঙ্কা রঙে সিসার পরিমাণ এক হাজার পিপিএম নির্ধারণ করেছে। আমরা নির্ধারণ করা এ মান সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। এখন রং প্রস্তুতকারী ৪৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের সনদপ্রাপ্ত। সে জন্য বলা যায়, আমরা রঙের ক্ষেত্রে শতভাগ সিসামুক্ত করেছি। রঙে দুই ধরনের সিসা ব্যবহার করা হয়। অ্যালুনিয়ামের পণ্য সিসামুক্ত করতে এখনও কোনো আইন করা হয়নি। এখন গ্যালভানাইজড লোহার পাইপের পরিবর্তে প্লাস্টিকের পাইপ ব্যবহৃত হয়। গ্যালভানাইজড লোহার পাইপের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। চকচকে অ্যালুমিনিয়াম পণ্য হাতে ঘষা দিলে কালো দাগ পড়ে। এটা মূলত সিসা।

শিশুদের ব্যবহারের লাল ও হলুদ রঙের পেনসিলেও প্রচুর সিসা রয়েছে। আমাদের দিক থেকে আমরা রঙে সিসার ব্যবহার বন্ধ করতে পেরেছি। অন্যান্য জায়গায়ও সিসাদূষণ বন্ধে নজর দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্কারোপ করা যেতে পারে। সিসামুক্ত রং তৈরির উপকরণে পাঁচ গুণ বেশি খরচ হয়। তাই সিসামুক্ত রঙের উপকরণের ওপর শুল্ক কমানো দরকার। সিসাযুক্ত যেকোনো উপকরণে অতিরিক্ত শুল্কারোপ করা হলে সিসার আমদানি ও ব্যবহারে সবাই নিরুৎসাহিত হবে। খাদ্য অনুষঙ্গ উপকরণ সিসামুক্ত রাখতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা দরকার। কারণ, এগুলো সরাসরি শ্বাসপ্রশ্বাসে আসে। আমরা এখন সিসাযুক্ত উপকরণের বিকল্প উপকরণ ব্যবহার করি।

default-image

মাহবুবুর রহমান

শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সিসার ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, সিসাজনিত শুধু বুদ্ধিমত্তা ঘাটতির ফলে মানবসম্পদের নিম্নমুখী উৎপাদনশীলতার কারণে দেশে বছরে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এই পরিমাণ বাংলাদেশের গড় অভ্যন্তরীণ সম্পদের (জিডিপি) ৬ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করার ক্ষেত্রে সিসার ভূমিকা রয়েছে।

গবেষকদের মতে, মানবদেহ ও রক্তে সিসার নিরাপদ মাত্রা বলে কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রে সিসার প্রচলিত স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম। ২০১০ সালে চাঁদপুরে একটি গবেষণা করা হয়, সেখানে দেখা গেছে দেড় বছর বয়সের শিশুদের প্রস্রাবে সিসার পরিমাণ ৬ মাইক্রোগ্রাম/লিটারের বেশি। ২০০৯ সালে দিনাজপুরের একটি গবেষণায় স্কুলগামী ১৪ শতাংশ শিশুর রক্তে ১০ মাইক্রোগ্রাম/ ডেসিলিটারের বেশি পরিমাণ সিসা পাওয়া গেছে। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলায় আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত (২০১৬-২০১৮) এক গবেষণায় গর্ভবতী নারীদের রক্তে সিসার পরিমাণ দেখা হয়। এ গবেষণায় পরীক্ষিত নমুনায় ৩১ শতাংশ গর্ভবতীর রক্তে সিসার পরিমাণ ৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটারের বেশি পাওয়া যায়। উল্লিখিত গবেষণা অঞ্চলে সিসা পুনঃচক্রায়ণ উপস্থিতি পাওয়া যায়নি , গ্যাসোলিনে সিসা নেই বা রঙের ব্যবহার কম। তাহলে সিসা কোথা থেকে আসে? সিসার পরিমাণ বেশি পাওয়া পরিবারগুলোর খাবার, মসলা, ওষুধ ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র যাচাই করি। সেখানে তিনটি জিনিসে সিসার উপস্থিতি পাওয়া যায়—সিসা দিয়ে ঝালাই করা টিন, গর্ভবতী নারীদের কারও কারও পোড়ামাটি খাওয়ার অভ্যাস ও রান্নায় ব্যবহৃত হলুদ। আমরা আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য গর্ভবতী মায়েদের রক্ত এবং প্রাপ্ত উৎসগুলোর আইসোটোপিক পরীক্ষা করি। সিসার আইসোটোপের অনুপাতসমূহ সিসার বয়স ও এর উৎস নির্দেশ করতে পারে। গর্ভবতী নারীদের রক্তে প্রাপ্ত সিসার ধরনের সঙ্গে আমরা হলুদে থাকা সিসার মিল খুঁজে পাই, যা নিশ্চিত করে গর্ভবতী নারীদের শরীরে উচ্চ মাত্রায় সিসার অবস্থানের মূল কারণ হলো হলুদ।

এখন প্রশ্ন হলো, হলুদে সিসা এল কীভাবে? বাংলাদেশে ৯টি জেলায় সবচেয়ে বেশি হলুদ উৎপাদিত হয়। এসব জেলা থেকে কাঁচা, শুকনা, গুঁড়া ও প্যাকেটজাত হলুদ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। উপরিউক্ত গবেষণাটিতে বাংলাদেশের হলুদ উৎপাদনকারী প্রধান ৯টি জেলার মধ্যে ৭টি জেলার হলুদে উচ্চ মাত্রার সিসার উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। এসব হলুদের নমুনায় ২০ শতাংশে সিসার পরিমাণ বিএসটিআই অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

পাইকারি হলুদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে বিগত ৩০ বছর যাবৎ শুকনা হলুদে হলুদ রঞ্জক পদার্থ মেশানোর কাজটি হয়ে আসছে এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। ভোক্তাদের উজ্জ্বল রঙের হলুদের প্রতি আকর্ষণ বা দুর্বলতা এই কার্যক্রমের একটা প্রধান কারণ। জনস্বাস্থ্যের এই প্রধান সমস্যাটি সমাধানকল্পে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ একসঙ্গে কাজ করে হলুদে সিসাদূষণ অনেকটা কমিয়ে এনেছে। বাজারে প্রচলিত ভালো প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত হলুদে খুব একটা সিসা পাওয়া যায়নি। এখন প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি এবং সিসাদূষণের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা। সিসাদূষণ–সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে।

default-image

মাহফুজার রহমান

আমরা আগে বলতাম চকচক করলেই সোনা হয় না। এখন বলি চকচক করলেই ভালো হলুদ হয় না। অধ্যাপক নায়লা খানের ক্লিনিকে অনেক প্রতিবন্ধী ও কম মনোযোগী শিশু আসত। তখন তিনি এসব শিশুর রক্ত পরীক্ষা করে মাত্রাতিরিক্ত সিসা পান। তিনি এ তথ্যগুলো সংগ্রহ ও প্রকাশ করেন। তখন বাংলাদেশে সিসাযুক্ত পেট্রলের ব৵বহার ছিল। তিনি এ সিসাযুক্ত পেট্রল বন্ধে সচেতনতা তৈরি করেন। ফলে ১৯৯৯ সালে সরকার সিসাযুক্ত পেট্রলের ব৵বহার বন্ধ করে দেয়। তখন হঠাৎ দেশের বায়ুর মান ভালো হয়ে যায়। বাংলাদেশে অনেক কাজে ভালো সমন্বয় নেই। বাংলাদেশে সিসাদূষণ বন্ধে বহু খাত তৈরি ও মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করে অগ্রসর হতে হবে। আইসিডিডিআর,বি বাংলাদেশে কিছু গবেষণা করছে। এসব গবেষণা আরও বিস্তৃতভাবে করতে হবে এবং এর ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নে বিজ্ঞানীদের সরকারের কাছে সুপরিশ করতে হবে। সিসাদূষণের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। চিহ্নিত জায়গাগুলো বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়, ভালো সমাধানের জন৵ কাজ করতে হবে। বিশ্বজুড়ে ৮০ কোটি শিশুর রক্তে মাত্রাতিরিক্ত সিসা রয়েছে। বাংলাদেশে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি শিশুর রক্তে উচ্চ মাত্রার সিসা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে এখনই নজর না দিলে ২০ বছর পর আমাদের দেশ থেকে ‘আইনস্টাইন’ তৈরি হবে না। এ জন্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ খাত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হবে এবং একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িত কর্মীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষা—বিএলএল থেকে প্রাপ্ত তথ্য সরকারের তথ্যকেন্দ্র ডিএইচআইএসটুতে (DHIS2) অন্তর্ভুক্ত করে নজরদারিতে নিয়ে আসতে হবে। সিসাদূষণ নিয়ে আমরা তেমন কিছু জানি না। তাই স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যেন তাঁরা এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে পারেন। সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করা জরুরি। তাই বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদেরও কাজ করতে হবে।

default-image

শানজানা ভরদাজ

আজকের এ গোলটেবিল বৈঠক খুবই আশা জাগানিয়া। সিসাদূষণ মোকাবিলায় এখনই নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে এ বিষয়ে ইতিমধ্যে অনেক কাজ শুরু হয়েছে। আমাদেরও অনেক কাজ করতে হবে। সিসাদূষণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। প্রতিমুহূর্তে কোথাও না কোথাও শিশু, নারী, পরিবার বা কমিউনিটি সিসাদূষণে আক্রান্ত হচ্ছে। সে জন্য এ–সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। এ বিষয়টি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার দিক থেকে বাংলাদেশ নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। এখন শিশুমৃত্যুর অন্য কারণগুলোও চিহ্নিত করা জরুরি। সিসা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মানসিক, শারীরিক ও বুদ্ধির বিকাশে অপরিমেয় ক্ষতি করতে পারে। তবে এটা সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য।

ইউনিসেফ স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুস্থ শিশুর জন্য গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছে। যা সিসা, বায়ু, পানিদূষণসহ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। জনসচেতনতা তৈরিতেও আমরা কাজ করছি। এ কাজগুলো জেলা, উপজেলা ও কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। যেন বিষয়টি সম্পর্কে সব পর্যায়ের মানুষ জানতে পারেন। সচেতনতার সঙ্গে উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা নেওয়াও অত্যন্ত জরুরি। আমরা সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলছি। কিন্তু এটা বলার চেয়ে করা অনেক বেশি কঠিন। আমাদের শিশুদের জন্য সিসাদূষণমুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারি–বেসরকারি সবার সমন্বিত উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতে৵ক শিশু যেন তার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ কাজে লাগাতে পারে, সে জন্য ইউনিসেফ সবার সঙ্গে কাজ করবে।

default-image

রোবেদ আমিন

সিসাদূষণ নিয়ে ভাবনা শুরু করতে হবে। কারণ, এ সমস্যা সম্পর্কে আমরা খুব বেশি জানি না। মানব শরীরে সিসার কোনো জৈবিক কাজ আছে কি না, তা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কেউ বলতে পারেননি। সে জন্য শরীরে সিসার আদর্শ মাত্রা শূন্য হওয়া উচিত। সিসার উৎসের কোনো শেষ নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই সিসা রয়েছে। ফলে শিশুরা এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী অনেক শিশু রয়েছে। এর সঙ্গে রক্তে সিসার মাত্রার সম্পর্ক যাচাই করা হয়েছে কি না? মানব শরীরে সিসাদূষণ নিয়ে বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য গবেষণা নেই। চীনে এ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। চালে কি সিসা আছে? আমরা সবাই কীটনাশক ব্যবহার করি। এগুলো সিসাযুক্ত কি না? সিসাদূষণের জন্য দায়ী সব উৎস চিহ্নিত করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রার একটি হলো ২০৩০ সালের মধ্যে রাসায়নিক বর্জ্য কমানো। সিসাদূষণ একটি বড় সমস্যা। সিসাদূষণের একটি বড় উৎস হলো ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ। আমরা স্কুল ও প্রি–স্কুলের শিশুদের ক্ষেত্রে সিসাদূষণ ব্যাপক পরিসরে শনাক্ত করতে পারি। সচেতনতা তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ জন্য স্কুলে গিয়ে শিশুদের এসব বিষয়ে জানাতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের এসব বিষয়ে জানানোও অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সিসাদূষণের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। আমাদের দেশে সিসাদূষণ ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এ ছাড়া শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

default-image

রাজিনারা বেগম

আমাদের পুরো শরীরই সিসার বিষাক্ত প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে। শিশুরা এ ক্ষেত্রে আরও বেশি নাজুক। সিসাদূষণের ক্ষেত্রে শিশুরা বয়স্কদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি নাজুক। সিসাদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে। সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। বিশ্বজুড়ে সিসাযুক্ত ব্যাটারি থেকে ৮০ শতাংশের বেশি সিসাদূষণ ঘটে বলে জানা গেছে। সরকার এ লক্ষ্যে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। যদিও এর অনেক উৎস আজকের আলোচনায় এসেছে। ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ প্রক্রিয়া নিয়মের মধ্যে আনা হবে। ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ–সংশ্লিষ্ট অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যক্তিদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আমদানির আগেই পুনঃচক্রায়ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে। আমদানির পর ব্যাটারির মেয়াদ শেষ হলে সেগুলো পুনঃচক্রায়ণ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে। পুনঃচক্রায়ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি আমদানির অনুমতি পাওয়ার পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পরিপত্রে বলা বিষয়গুলো কেউ অমান্য করলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ–সংশ্লিষ্টদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসা গেলে সিসাদূষণের একটি বড় অংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। পদ্ধতি মেনে পুনঃচক্রায়ণ হলে দূষণের পরিমাণ কমে আসবে। বাংলাদেশে এখনও অনেক শিশু শ্রমিক রয়েছে। অনেক শিশু শ্রমিক এ ব্যাটারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করে। এসব শিশু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে। গত জুনে ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-ওয়েস্ট) বিধিমালা জারি করা হয়েছে। সেখানে সিসাযুক্ত ব্যাটারিসহ এ ধরনের উপকরণের ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এসেছে। এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর আরও কাজ করবে। দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যাটারি পুনঃচক্রায়ণ অনেক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও বন্ধ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য—এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়। এগুলোকে নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসাই আমাদের উদ্দেশ্য। এ জন্য আমরা সবার সহযোগিতা চাই। সবার সহযোগিতা পেলে আমরা সিসাদূষণমুক্ত বাংলাদেশ পাব।

default-image

মুন্সি মো. সাদউল্লাহ

সিসাদূষণ কীভাবে হয় তা আলোচনায় এসেছে। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ছয় বছরের কম বয়সী শিশুরা সিসাদূষণে বেশি ঝুঁকিতে আছে। সিসাদূষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। সিসাদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে অনেকেই আগে থেকে সচেতন ছিলেন না। গত কয়েক বছর ধরে এসব বিষয়ে কাজ হচ্ছে। পেট্রল ও রং সিসামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখন এগুলো তদারকি করা প্রয়োজন। আমাদের কিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প রয়েছে। যেগুলো আমরা এখনও নিবন্ধন করতে পারিনি। প্রথমেই আমাদের এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা দরকার। এ জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হবে। জনসচেতনতা তৈরিতে বহুল প্রচারিত গণমাধ্যমগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

আমাদের ব্যবহৃত কোন জিনিসগুলোর মধ্যে সিসা আছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এ ছাড়া কত শতাংশ শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীর শরীরে সিসার মাত্রা বেশি৷ সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা বলে কিছু নেই। অর্থাৎ সিসা আমাদের রক্তে থাকতে পারবে না। বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সিসাদূষণের কারণে ঘটে। প্রতিবছর প্রায় ৩১ হাজার মানুষ সিসাদূষণে মারা যান। যা দেশে এ পর্যন্ত কোভিডে মৃত্যুসংখ্যার চেয়ে বেশি। অথচ সিসাদূষণ নিয়ে কোভিডের মতো সচেতনতা এখনো তৈরি হয়নি। এ জন্য প্রথমেই সচেতনতা তৈরি জরুরি। এ বিষয়ে আইন তৈরি করতে হলে আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠক দরকার। আমরা আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের যুক্ত করে এ বিষয়ে সচেতন করি। যেন বিষয়গুলো নিয়ে তারা উঠান বৈঠক করেন৷ বৃহৎ পরিসরে শনাক্তকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য ইউনিসেফের সঙ্গে পরিকল্পনা করেছি। অল্প সময়ের মধ্যে এ কাজগুলো শুরু হবে।

ফিরোজ চৌধুরী

আজকের আলোচনায় সচেতনতার কথা খুব গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। সরকারি–বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের কথা অনেকেই বলেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন