বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মবিন খান বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস পুরোনো রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন। কারণ, পৃথিবীতে অনেক দরিদ্র দেশ রয়েছে। এরপরও সবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানে হেপাটাইটিসের ইতিহাস তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বতর্মানে হেপাটাইটিস এম বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাস রয়েছে। এ ছাড়া আরও হেপাটাইটিস ভাইরাস রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। লিভার সেলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের উপস্থিতি ছাড়া হেপাটাইটিস ডি ভাইরাস জন্মাতে পারে না। তবে হেপাটাইটিস ডি ভাইরাসের সাহায্যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব এবং বারডেম জেনারেল হাসপাতালের চিফ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রথমত, একজন চিকিৎসক শুধু ব্যবস্থাপত্র লিখেই দায়িত্ব শেষ করবেন না। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে রোগীর পরিবার ও আত্মীয়দেরও জানাতে হবে। ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ জানে না হেপাটাইটিস কী। হেপাটাইটিস নির্মূলে তৃণমূলে কাজ করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এই ভাইরাসজনিত রোগ নির্মূলে কাজ করতে হবে।

হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও বিএসএমএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম বলেন, ‘আমাদের দেশের এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস–বি কিংবা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। আমরা যদি এদের রোগ নির্ণয় না করি বা চিকিৎসা না দিই, তাহলে আগামী ১৫ বছর পর লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের বিশাল ভার বহন করতে হবে। অথচ আমাদের দেশে এখনো লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের সুযোগ সেভাবে নেই। হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস নির্ণয় করতে প্রতিজনে মাত্র ৫০ টাকা করে খরচ হয়।’

বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, গর্ভকালীন মা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। মায়ের অ্যাকিউট ইনফেকশন হলে এটা কখনো কখনো মারাত্মক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। গর্ভস্থ শিশুটি মারা যেতে পারে, অন্তঃসত্ত্বা মা–ও মারা যেতে পারেন। মা ও শিশু উভয়েরই টিকা নিয়ে নেওয়া হলো মূল কাজ।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে সম্পর্কে আলোচনা করেন হেপাটোলজি সোসাইটি বাংলাদেশের বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক এবং বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. গোলাম আযম। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে আটটি বিভিন্ন রোগবিষয়ক দিবস পালন করা হয়, যেগুলোর মধ্যে চারটি দিবসই সংক্রামক ব্যাধিসংক্রান্ত। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বা লিভার প্রদাহ প্রধানত ভাইরাসের মাধ্যমেই হয়। সারা বিশ্বে ১৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিসজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন।

লিভার ব্যাধি বিশেষজ্ঞ মো. মোতাহার হোসেন বলেন, হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হবে। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হলেই সাধারণত রোগীকে কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না। তবে ছয় মাস পরেও ভাইরাসটি দেহে থেকে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে তখন ওষধ দেওয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাস বহনকারী রোগীদেরও সারা জীবনে কোনো সমস্যা না–ও হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাস বহনকারী রোগীদের অন্তত ছয় মাস পরপর পরীক্ষা করে জেনে নিতে হয় তার অবস্থার কোনো পরবর্তন হলো কি না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাহেরুল হক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস রোগ নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কৌশলগত পরিকল্পনা নিতে হবে এবং তদারকি করতে হবে। টিকা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ পাওয়া বাজেটের ন্যায়সংগত খরচ কিন্তু সব সময়ই প্রশ্নের মুখে।

বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা জাতীয় টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা হলেও এখন পর্যন্ত জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকা কার্যক্রম শুরু করার কারণে বাচ্চাদের এই ভাইরাসে আক্রান্তের হার কমেছে। বাংলাদেশে ইপিআই কার্যক্রমের মাধ্যমে করোনার মধ্যেও টিকা কার্যক্রম চালু রাখতে হবে।

বিএসএমএমইউর লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম এলিন পরিসংখ্যা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। পুরুষেরা নারীদের তুলনায় বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত। এদের মধ্য শিশু রয়েছে ৪ লাখ। আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা ৫৭ লাখ এবং নারীর সংখ্যা ২৮ লাখ। ১৮ লাখ প্রজনন সক্ষম নারী হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। আক্রান্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। চাকরিপ্রার্থী ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সের নাগরিকদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষ বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত। বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্তের হার শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ।

বিএসএমএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, হেপাটাইটিস ভাইরাস সাধারণত অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত মা, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, অনিরাপদ আকুপাংচার, টুথব্রাশ, সেভিং যন্ত্রপাতি, সমকামিতা ও অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্কের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ভাইরাস ছড়ায়। তবে করমর্দন, কোলাকুলি, জামাকাপড় বা চামচ, থালা–বাসনের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস ছড়ায় না।

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত মুখে খাওয়ার ওষুধ ও ইনজেকশন শুল্কমুক্ত। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের ভ্যাকসিনও শুল্কমুক্ত। কিন্তু হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের মুখে খাওয়া ওষুধের ওপর প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ শুল্ক প্রত্যাহার করলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যায় অনেক সাশ্রয় হবে। তাই এ শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন