হেপাটাইটিস: প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দরকার সামাজিক অংশগ্রহণ

হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ  ও প্রথম আলোর আয়োজনে  ‘হেপাটাইটিস: প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দরকার সামাজিক অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। ২১ জুলাই ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

অংশগ্রহণকারী:

অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অধ্যাপক  ডা. মো. শাহিনুল আলম, সভাপতি, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ; চেয়ারম্যান, হেপাটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক  ডা. মো. গোলাম আযম, সাধারণ সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা বাংলাদেশ; বিভাগীয় প্রধান, লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, বারডেম

অধ্যাপক  ডা. ফিরোজা বেগম, সভাপতি, অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)

অধ্যাপক  ডা. মো. রোকনুজ্জামান, চেয়ারম্যান, পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, বিভাগীয় প্রধান, লিভার বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, লিভার কেয়ার সোসাইটি, চট্টগ্রাম

ডা. এস কে এম নাজমুল হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা বাংলাদেশ; সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন, বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ; সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ডা. মোহাম্মদ কামরুল আনাম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ; সহকারী অধ্যাপক (হেপাটোলজি), জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা

ডা. তানভীর আহমাদ, মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ; সহকারী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।

অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম

অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অন্য যেকোনো রোগের মতো হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রেও শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদের মূল গুরুত্ব দিতে হবে প্রতিরোধে। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। কোন আচরণ বা অভ্যাস এড়িয়ে চললে হেপাটাইটিস থেকে দূরে থাকা সম্ভব, আক্রান্ত হলে কী করতে হবে, কখন টিকা নিতে হবে এবং কী ধরনের সতর্কতা মেনে চলতে হবে—এসব বিষয়ে মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে রক্ত গ্রহণ, সুচ ব্যবহারের মতো যেসব কারণে সংক্রমণ ছড়াতে পারে, সেসব বিষয়ে নিরাপদ আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি টিকাদানও হেপাটাইটিস প্রতিরোধের একটি কার্যকর উপায়।

জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি পর্যায়ে হেপাটাইটিস প্রতিরোধবিষয়ক বার্তা পৌঁছে দিতে গণমাধ্যম আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে হেপাটোলজি সোসাইটি ও ওজিএসবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারেন। তাঁদের সম্পৃক্ততা এই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।

সরকার হেপাটাইটিস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে অনেক মা হেপাটাইটিসের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসেছেন। এখন আমাদের লক্ষ্য, মায়ের কাছ থেকে নবজাতকের মধ্যে সংক্রমণ বা ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন প্রতিরোধ করা। সে জন্য জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বার্থ ডোজ দেওয়ার বিষয়টি কার্যকরভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন সরবরাহকারী গ্যাভিসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে একটি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবু আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।

অন্যান্য ইপিআই টিকার মতো হেপাটাইটিস প্রতিরোধেও ধারাবাহিকভাবে এগোতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রহণযোগ্য অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি। তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হেপাটাইটিসের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় আরও ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে।

অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম

সভাপতি, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ; চেয়ারম্যান, হেপাটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

পৃথিবীতে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের ৯০ শতাংশই জানেন না যে তাঁরা এই ভাইরাস বহন করছেন। তাই ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি নির্মূলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মানুষের না-জানা। এই বাধা ভাঙতে পারলেই প্রতিরোধ অনেক সহজ হবে।

বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। তবে আমাদের অর্জনও কম নয়। ইপিআইয়ের আওতায় হেপাটাইটিস বি টিকার কাভারেজ ৯০ শতাংশের বেশি। হেপাটাইটিস বি ও সি—দুই ভাইরাসের চিকিৎসার সব ধরনের ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্বের তুলনায় সর্বনিম্ন মূল্যে পাওয়া যায়। এসব অর্জন আমাদের আশাবাদী করে যে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

এখন প্রয়োজন কোথায় আমরা পিছিয়ে আছি, তা চিহ্নিত করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে মিসর ও তাইওয়ান দেখিয়েছে যে স্ক্রিনিং, শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, টিকাদান ও নজরদারি একসঙ্গে চালানো গেলে হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমাদেরও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে মায়ের কাছ থেকে শিশুর সংক্রমণ রোধে জন্মের পরপরই হেপাটাইটিস বি টিকার বার্থ ডোজ চালু করা জরুরি।

একই সঙ্গে ডায়ালাইসিস সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ ও ইনজেকটেবল মাদক ব্যবহারকারীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। আক্রান্ত পরিবার ও সন্তান ধারণক্ষম নারীদের শনাক্ত করে চিকিৎসা ও টিকাদান নিশ্চিত করতে পারলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

প্রতিবছর বাংলাদেশে ২১ হাজারের বেশি মানুষ লিভারজনিত রোগে মারা যান। এ ছাড়া এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাসজনিত তীব্র ভাইরাল হেপাটাইটিস বা জন্ডিস ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। মৃত্যুহার কম হলেও কর্মক্ষম মানুষের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি ও খাদ্যনিরাপত্তার ঘাটতি এ সংক্রমণের বড় কারণ।

হেপাটাইটিস এ টিকার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সম্প্রতি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এ ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা ও সচেতনতা জরুরি।

অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম

সাধারণ সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা বাংলাদেশ; বিভাগীয় প্রধান, লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, বারডেম

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৮ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। একসময় এ সংখ্যা ছিল ৩৫ কোটি। অর্থাৎ বৈশ্বিকভাবে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে এবং বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। আমরা এখন ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্যে কাজ করছি। তবে এখনো প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি–জনিত লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার ও লিভার ফেইলিউরে মারা যান।

হেপাটাইটিস বলতে আমরা শুধু ভাইরাসজনিত রোগ বুঝি না। ফ্যাটি লিভারজনিত স্টিয়াটো হেপাটাইটিস, অ্যালকোহলজনিত হেপাটাইটিস, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াজনিত হেপাটাইটিস এবং অটোইমিউন হেপাটাইটিসও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ও বৈশ্বিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাবে বলে আমি মনে করি।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের ইতিহাসও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ নাগরিক চার্লস গোর হেপাটাইটিস সি শনাক্ত হওয়ার পর তিনি রোগীদের নিয়ে একটি ট্রাস্ট গড়ে সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেন। সেই উদ্যোগ থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হেপাটাইটিস সচেতনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হয়। পরে বিভিন্ন রোগী সংগঠনের উদ্যোগে ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স গঠিত হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধির এ ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই ২০১০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হেপাটাইটিস বি ও সিকে অন্তর্ভুক্ত করে ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ঘোষণা করে। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও এর টিকা আবিষ্কারক অধ্যাপক বারুচ স্যামুয়েল ব্লামবার্গের জন্মদিন স্মরণেই দিনটি নির্ধারণ করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৬ সালে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। কার্যকর টিকা, নিরাময়যোগ্য ওষুধ এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থাকায় এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি। তাই এবারের প্রতিপাদ্য ‘হেপাটাইটিস: প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দরকার সামাজিক অংশগ্রহণ’ এবং বৈশ্বিক আহ্বান ‘লেটস ব্রেক ইট ডাউন’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—হেপাটাইটিস নির্মূলে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতেই হবে। সরকার, চিকিৎসক, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণই এ লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম

সভাপতি, অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)

বিভিন্ন ভাইরাস দিয়ে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলেও হেপাটাইটিস বি ও সি সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ, এ দুটি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণ হতে পারে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস বি নির্মূলের যে বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। ফলে আগামী কয়েক প্রজন্মেও আমাদের হেপাটাইটিস বি–আক্রান্ত রোগী দেখতে হবে।

হেপাটাইটিস বি মূলত দুইভাবে ছড়ায়। একটি হলো মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে বা ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন, অন্যটি সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে রক্ত, শরীরের তরল, অস্ত্রোপচার বা ডেন্টাল যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না হলে এবং যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে।

এ কারণে গর্ভাবস্থার প্রথম অ্যান্টিনেটাল ভিজিটেই হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। মা পজিটিভ হলে তাঁর ভাইরাল লোড এবং সঙ্গী আক্রান্ত কি না, তা দেখতে হবে। সঙ্গী আক্রান্ত না হলে তাঁকে ০, ১ ও ৬ মাসের তিন ডোজ টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিতে হবে। আবার মায়ের ভাইরাল লোড বেশি থাকলে ২৮ সপ্তাহের পর থেকে অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা শুরু করে প্রসবের পরও কিছুদিন চালিয়ে যেতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মায়ের কাছ থেকে শিশুর সংক্রমণ প্রতিরোধ। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, সম্ভব হলে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই নবজাতককে হেপাটাইটিস বি টিকা এবং একই সঙ্গে হেপাটাইটিস বি ইমিউনোগ্লোবুলিন দিতে হবে। এরপর ০, ১ ও ৬ মাসের পূর্ণ টিকাদান সম্পন্ন করতে হবে এবং টিকা শেষ হওয়ার দুই মাস পর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. মো. রোকনুজ্জামান

চেয়ারম্যান, পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

হেপাটাইটিস প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যশিক্ষা। হেপাটাইটিস এ এবং ই দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়, আর বি ও সি রক্তের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। অনেকেই মনে করেন এ এবং ই ভাইরাস তেমন গুরুতর নয়। কিন্তু এগুলো থেকেও লিভার ফেইলিউর হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস ই মারাত্মক হতে পারে। তাই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

এই স্বাস্থ্যশিক্ষা শুধু স্কুলে নয়, মাদ্রাসা, মসজিদ এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমেও ছড়িয়ে দিতে হবে। শিক্ষক, ইমাম ও গণমাধ্যম—সবারই এখানে বড় ভূমিকা আছে। সামাজিক অংশগ্রহণ ছাড়া হেপাটাইটিস প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

আজ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যে হেপাটাইটিস বির বোঝা আমরা দেখছি, তার বড় অংশের সংক্রমণ ঘটেছে শৈশবে। মায়ের হেপাটাইটিস বি থাকলে নবজাতকের প্রায় ৯০ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, অথচ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি অনেক কম। তাই শিশুকালেই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা। আমার মনে হয়, যে নারীই চিকিৎসকের কাছে আসবেন—গর্ভাবস্থায় হোক, প্রসবের সময় হোক বা অন্য যেকোনো কারণে—তাঁর হেপাটাইটিস বি স্ক্রিনিং অবশ্যই করা উচিত।

বাংলাদেশে ২০০৫ সাল থেকে হেপাটাইটিস বি টিকাদান কর্মসূচি চালু হওয়ার পর শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটি টিকারই সাফল্য। তবে জন্মের পরপরই বার্থ ডোজ চালু করা গেলে এর কার্যকারিতা আরও বাড়বে।

এ ছাড়া নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, ডেন্টাল ও অস্ত্রোপচারে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং রক্তদানের আগে কার্যকর স্ক্রিনিং নিশ্চিত করাও জরুরি।

অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ

বিভাগীয় প্রধান, লিভার বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ;

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, লিভার কেয়ার সোসাইটি, চট্টগ্রাম

প্রতিবছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অথচ হেপাটাইটিস বি ও সি–তে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের শুরুতে কোনো লক্ষণ থাকে না। এই রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হলো স্ক্রিনিং। রক্ত পরীক্ষা করে যদি শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা যায়, তাহলে রোগী চিকিৎসার আওতায় আসবেন, অন্যের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানো কমবে, পরিবার ও সমাজ উপকৃত হবে এবং লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মতো জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। অথচ আমরা ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, কিডনি বা হৃদ্‌রোগের পরীক্ষা করাই, কিন্তু হেপাটাইটিস আছে কি না, সেটি অনেকেই পরীক্ষা করি না।

বিশেষ করে ২০০৩ সালের আগে জন্ম নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা খুবই জরুরি। কারণ, তাঁরা ইপিআই কর্মসূচির হেপাটাইটিস বি টিকার সুবিধা পাননি। আমাদের সংগঠন চট্টগ্রামে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে স্ক্রিনিং করে দেখেছে, সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হওয়া অনেক মানুষের শরীরেও হেপাটাইটিস বি ভাইরাস রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সুযোগ থাকলে সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্ক্রিনিং করা উচিত। প্রথম প্রসূতি পরীক্ষাতেই যদি হেপাটাইটিস বি ও সি স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে মা থেকে সন্তানের সংক্রমণের বড় একটি ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে কম খরচে এ পরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। মানুষ সচেতন হলে হেপাটাইটিসজনিত দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী জটিলতা থেকে অনেক মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

ডা. এস কে এম নাজমুল হাসান

সাংগঠনিক সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা বাংলাদেশ;

সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা প্রতিদিনই এমন অনেক রোগী দেখি, যাঁরা গুরুতর লিভার রোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, তাঁরা জানতেনই না যে দীর্ঘদিন ধরে হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। মানুষ জটিলতা নিয়ে আসে মূলত সচেতনতার অভাবে। আর এই সচেতনতা তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো গণমাধ্যম।

হেপাটাইটিস নির্মূলে গণমাধ্যমের দায়িত্ব পাঁচটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের কাছে সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। হেপাটাইটিস কীভাবে ছড়ায়, কখন পরীক্ষা করতে হবে, কখন চিকিৎসা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে ভুল ধারণা দূর করতে গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিরোধমূলক আচরণকে জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। হেপাটাইটিস বি–এর কার্যকর টিকা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ এবং সেলুনে একবার ব্যবহারযোগ্য ব্লেড ব্যবহারের মতো নিয়মিত স্বাস্থ্যবার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। স্ক্রিনিংয়ে উৎসাহিত করতে হবে। যেহেতু দীর্ঘদিন রোগের কোনো লক্ষণ না–ও থাকতে পারে, তাই অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা না করে ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে রোগ দ্রুত শনাক্ত হবে, চিকিৎসা সহজ হবে এবং ব্যয়ও কমবে।

হেপাটাইটিসে আক্রান্ত মানুষের প্রতি ভয় ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হবে। জনস্বাস্থ্য নীতিতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে হবে। স্ক্রিনিং সম্প্রসারণ, টিকাদান বৃদ্ধি, আধুনিক চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন

বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ

সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

সব হেপাটাইটিস ভাইরাস এক ধরনের নয়। কিছু ভাইরাস স্বল্পমেয়াদি লিভারের প্রদাহ সৃষ্টি করে, আবার কিছু ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণ হতে পারে। এর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। এটি সব বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে এবং ক্রনিক হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের বড় একটি অংশের জন্য দায়ী।

বাংলাদেশ ২০০৩ সালে ইপিআই কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি–এর টিকা অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমতে শুরু করেছে। ১৯৮৪ সালে যেখানে আক্রান্তের হার ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৮ সালের দেশব্যাপী গবেষণায় সেটি ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। তারপরও দেশের প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় বেশি, শহরাঞ্চলে আক্রান্তের হার বেশি। প্রায় ১৫ লাখ পরিবারে একজন বা একাধিক সদস্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত।

বর্তমানে কর্মক্ষম ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ২৫ লাখ মানুষের শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস রয়েছে। কিন্তু যাঁদের শুধু এইচবিএসএজি পজিটিভ, তাঁদের অনেককে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই চাকরির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। আমরা হেপাটোলজি সোসাইটির পক্ষ থেকে সব সময় বলে আসছি, এইচবিএসএজি পজিটিভ মানেই কেউ চাকরির অযোগ্য নন। এই ভুল ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। এ বছরের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘হেপাটাইটিস: লেটস ব্রেক ইট ডাউন’। হেপাটাইটিস নিয়ে মানুষের ভয়, ভ্রান্ত ধারণা, সামাজিক কলঙ্ক ও তথ্যের ঘাটতি ভেঙে দিতে হবে।

ডা. মোহাম্মদ কামরুল আনাম

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ

সহকারী অধ্যাপক (হেপাটোলজি), জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল হেপাটাইটিস রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ক্রনিক হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, হেপাটাইটিস বি ও সির কারণে ১৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এ রোগে মৃত্যুর ৬৯ শতাংশ মাত্র ১০টি দেশে ঘটে, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকেন এবং নিজের অজান্তেই পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন। পরিবারের অসংক্রমিত সদস্যদের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পরবর্তী সময় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে মা থেকে নবজাতক এবং যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে সংক্রমণের কারণে পরিবারভিত্তিক সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। এ কারণেই পরিবারের সদস্যদের স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব অঞ্চলে হেপাটাইটিস বি–এর প্রাদুর্ভাব ২ শতাংশ বা তার বেশি, সেখানে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে অন্তত একবার স্ক্রিনিং করা উচিত। টিকাদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সব নবজাতককে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এবং এইচবিএসএজি পজিটিভ মায়ের নবজাতককে ১২ ঘণ্টার মধ্যে, সম্ভব হলে ইমিউনোগ্লোবুলিনসহ টিকা দিতে হবে।

একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সব অসংক্রমিত সদস্য ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে টিকার আওতায় আনতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পর অ্যান্টিবডি পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে পুনরায় টিকা বা বুস্টার ডোজ দেওয়ারও সুপারিশ রয়েছে।

ডা. তানভীর আহমাদ

মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক, হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা, বাংলাদেশ;

সহকারী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অর্জন সম্ভব নয়। সরকার, চিকিৎসকসমাজ, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এই যৌথ উদ্যোগে হেপাটোলজি সোসাইটি, ঢাকা বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও পেশাগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। আমাদের বিশ্বাস, সচেতনতাই অজ্ঞতার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিষেধক, আর জ্ঞানই নির্মূলের প্রথম পদক্ষেপ।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে আমরা প্রতিবছর র‍্যালি, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, টেলিভিশন টকশো, সংবাদপত্রে নিবন্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করি। আমাদের মূল বার্তা খুবই স্পষ্ট—হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য।

শুধু জনসচেতনতা নয়, চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও আমরা সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। গবেষণাও আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। ভাইরাল হেপাটাইটিসের প্রকৃত চিত্র, রোগের বোঝা, চিকিৎসার ফলাফল ও প্রতিরোধ কৌশল নিয়ে পরিচালিত গবেষণা জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিয়ে আসছি।

সুপারিশ

  • হেপাটাইটিস বি ও সি সম্পর্কে বছরব্যাপী জাতীয় জনসচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করা।

  • প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তত একবার হেপাটাইটিস বি ও সি স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা।

  • গর্ভবতী নারীর জন্য হেপাটাইটিস বি স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

  • ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতকের জন্মের ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা ও প্রয়োজনে ইমিউনোগ্লোবুলিন নিশ্চিত করতে হবে।

  • এইচবিএসএজি পজিটিভ ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্যমূলক চাকরির নীতি বন্ধ করতে হবে।

  • চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জাতীয় গাইডলাইন বাস্তবায়ন জোরদার করা।

  • হেপাটাইটিসবিষয়ক গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।

  • নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬

  • প্রতিবছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন করা হয়।

  • ২০১০ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে ২৮ জুলাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

  • হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের আবিষ্কারক এবং এর টিকার উদ্ভাবক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ড.বারুচ স্যামুয়েল ব্লামবার্গ–এর জন্মদিন উপলক্ষে দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

  • বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি বা সি–তে আক্রান্ত।

  • ভাইরাল হেপাটাইটিসজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশই হেপাটাইটিস বি ও সি–এর কারণে ঘটে।

  • ২০০৩ সালের আগে জন্ম নেওয়া অনেক প্রাপ্তবয়স্ক এখনো টিকার বাইরে থাকায় তারা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।