চরগুলো গবাদিপশু লালন-পালনের উর্বর ক্ষেত্র উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চরে প্রাণিসম্পদ বিভাগের সেবা বাড়াতে হবে। প্রতিবছর বাজেটে চরের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয় না। তাই কোনো সমন্বয়ের অভাব আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে চরের মানুষ যাতে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাবিষয়ক পরামর্শ পান, সে জন্য সেখানে ডিজিটাল সেবার মান বাড়াতে হবে।

চরের মানুষের মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা আছে বলে উল্লেখ করেন ফ্রেন্ডশিপের নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, গ্রামের সঙ্গে চরের পার্থক্য রয়েছে। চরগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ দূরে। তাই তাঁদের মৌলিক অধিকার ও চাহিদার সুযোগ করে দিতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করা গেলে তাঁরাই তাঁদের মতো জীবন সাজিয়ে নিতে পারবেন। তিনি বলেন, চরের ছেলেমেয়েরা এখন শুধু নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, বড় প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করছেন। তাঁরা অক্সফোর্ডেও পড়তে যাচ্ছেন। তাঁদের অবহেলা করার সুযোগ নেই।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট চরের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশনসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কীভাবে তাঁদের এসব চাহিদার জোগান দিতে পারব।’

শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও ভাবতে হবে জানিয়ে সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের এদেশীয় পরিচালক অনো ভ্যান ম্যানেন বলেন, চরের শিশুদের জন্য কাজ করার সময় এসেছে। কারণ, শিশুরা সব সময় তাঁদের অধিকার ও সুবিধাপ্রাপ্তির দাবি রাখে।

অনুষ্ঠানে মূল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হলেও জাতীয় দারিদ্র্য হারের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার পার্থক্য রয়েছে। বন্যা ও নদীভাঙন চরের একটি বড় সমস্যা। এ কারণে চরের মানুষের দারিদ্র্য মূল ভূখণ্ডের মানুষের চেয়ে বেশি। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যৌতুক ও বাল্যবিবাহ বেশি। সেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার ও এনজিওগুলোকে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে কাজ করতে হবে।

ফ্রেন্ডশিপের চরের প্রতিনিধি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার নূরী চৌধুরী চরের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশনসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বন্যায় কলাগাছের ভেলায় চড়ে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারলেও গরু–ছাগল নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয় না। এ সময় বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও শিশুরা বেশি বিপদে পড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে কিশোরীদের নিরাপত্তা থাকে না। খরা এবং অত্যধিক তাপমাত্রাও এখন চরের বড় দুর্যোগ।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল গফুর বলেন, তাঁর ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে আটটি দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গাধর নদবেষ্টিত। চরগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। সেখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় করে সেগুলোর ভবনকে বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। চরগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডে যাতায়াতের জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালু করলে শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা সুবিধা পাবে।

চরে কৃষি ও গবাদিপশুর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) এম৪সি প্রকল্পের পরিচালক মো. আবদুল মজিদ বলেন, চর জীবিকায়ন কর্মসূচির (সিএলপি) মতো তাঁদের এ প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের আয় বাড়াতে বহুমাত্রিক কাজ চলছে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার চরে ভুট্টা চাষে বিপ্লব হয়েছে। আগে যেখানে বিঘাপ্রতি ১০ মণ উৎপাদন হতো, এখন সেখানে ৩০ থেকে ৪০ মণ উৎপাদন হচ্ছে। চরের প্রতিটি বাড়িতে একটি করে হলেও গরু আছে। গরুর জাত উন্নয়ন করা গেলে প্রাণিসম্পদেও সম্ভাবনা রয়েছে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, চরের মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। তাই বাইরে থেকে কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। চরাঞ্চলে লিঙ্গবৈষম্য চরমভাবে বিদ্যমান উল্লেখ করে তা দূর করতে কাজ করার আহ্বান জানান ফ্রেন্ডশিপের ঊর্ধ্বতন পরিচালক আয়েশা তাসিন খান।

জাতীয় চর জোটের সদস্যসচিব জাহিদ রহমান বলেন, চরগুলো থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে প্রভাবশালীরা নিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে চরে ভাঙন বেশি হচ্ছে। এটি বন্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। চরাঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের (সিপিজে) পরিচালক শাহরিয়ার সাদাত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন, আরডিআরএস বাংলাদেশের প্রশাসনিক প্রধান মো. নজরুল গনি বক্তৃতা করেন।

বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন