গোলটেবিল বৈঠক
নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা: ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিতে করণীয়
সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (সিএসডব্লিউসি) ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা: ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিতে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২ মার্চ ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
অংশগ্রহণকারী:
তাপতুন নাসরীন, ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ;
সারা হোসেন, অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট;
কাজী মাহফুজুল হক সুপন, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
নাহরিন ইসলাম খান, অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়;
বি এম মইনুল হোসেন, অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
শারমিন খান, লিগ্যাল কনসালট্যান্ট, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট-ফর-প্রফিট–ল;
আফরোজা সোমা, সহকারী অধ্যাপক, মিডিয়া অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, এআইইউবি;
কানিজ ফাতেমা, সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি;
প্রিয়া আহসান চৌধুরী, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট;
তৃষিয়া নাশতারান, প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক, মেয়ে নেটওয়ার্ক;
শারমিন আক্তার দোলন, কর্মসূচি সহসমন্বয়কারী, ডব্লিউডিডিএফ;
হেমা চাকমা, কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু);
লাবণ্য প্রজ্ঞা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
মাহবুবা আক্তার, পরিচালক (অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন), ব্লাস্ট;
মনীষা বিশ্বাস, ফোকাল পারসন, সিএসডব্লিউসি প্ল্যাটফর্ম;
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো
আলোচনা:
তাপতুন নাসরীন
ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ
নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধ শুধু রাষ্ট্র বা পুলিশের বিষয় নয়; ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ—সবার দায় আছে। পুলিশ আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই কাজ করে, এখানে আবেগ নয়, প্রমাণই মুখ্য। তাই আইনের সীমাবদ্ধতা ও করণীয়—দুটিই স্পষ্ট করা জরুরি।
অনলাইনে ডক্সিং, ইমপারসোনেশন, আইডি হ্যাকিং, সাইবার বুলিং, আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো ও মোবাইল হ্যারাসমেন্ট এখন বড় সমস্যা। কারও ছবি, ফোন নম্বর বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে হয়রানি করা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আক্রমণের মাত্রা যে কতটা বাড়ে, নারী ও পুলিশ—এই দুই পরিচয়ের কারণে সেটি আমি নিজেও অনুভব করি।
প্রতিরোধে পরিবার থেকেই সচেতনতা দরকার। আমরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করি, যা অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। নিজের ঘরের দরজা-জানালার মতো ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেসিও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বিষয়টির সংবেদনশীলতা অনুধাবন করে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন নামে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে, যা পুরোপুরি নারী কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত। এখানে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা আইনি পরামর্শ ও সহায়তা পান। যখন কেউ আমাদের কাছে আসেন, আমরা তাঁকে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন বা এভিডেন্স তৈরিতে সাহায্য করি, যেমন স্ক্রিনশট বা ইউআরএল সংগ্রহ করা। এই ইউনিটটি ভুক্তভোগী ও থানার মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করে। গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য সরাসরি আমাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ রয়েছে। এভিডেন্স ছাড়া আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো কিছু প্রমাণ করা কঠিন। তবে বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত মামলা চালাতে চান না।
আইন প্রণয়নে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো জরুরি। গবেষক, অ্যাকটিভিস্ট ও পুলিশের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনতে পারলে অনলাইন সহিংসতা কমানো সম্ভব।
সারা হোসেন
অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট
যে গতিতে নতুন নতুন সাইবার অপরাধ তৈরি হচ্ছে, আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নীতি ও আইন প্রণয়নে আমাদের আরও দ্রুত ও সময়োপযোগী হতে হবে—এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জরুরি। সাইবার সাপোর্ট ইউনিট একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও সেটি যথেষ্ট নয়। তাদের বিশেষজ্ঞ সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রথম সারির সহায়তা, কাউন্সেলিং ও নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গেও লড়তে হচ্ছে। ফলে বোঝা বাড়ছে। এই জায়গায় সমন্বয় ও দায়িত্ব বণ্টন দরকার।
আমাদের জনযোগাযোগ বাড়াতে হবে তিনটি পক্ষের সঙ্গে—সাধারণ ব্যবহারকারী, সম্ভাব্য ও প্রকৃত ভুক্তভোগী এবং অপরাধী। কোন আচরণ অপরাধ, কোথায় সহায়তা মিলবে—এসব স্পষ্ট তথ্য প্রচার জরুরি। একই সঙ্গে এটাও বোঝাতে হবে যে সব বিষয় ফৌজদারি আদালতে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; অনেক ক্ষেত্রে বক্তব্য, প্রযুক্তিগত সমাধান বা সামাজিক প্রতিক্রিয়াই কার্যকর হতে পারে। সাজার হার কম—এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে যেখানে আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন, সেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; আর যেখানে বিকল্প সমাধান সম্ভব, সেখানে ভুক্তভোগীর সুরক্ষা অগ্রাধিকার পাবে।
প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি—পুলিশ, বিচার বিভাগ, সেবাদানকারী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজ—সবার জন্য। প্রমাণ সংরক্ষণে দক্ষতা না থাকলে মামলা ঝুলে থাকে। এ বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য একটাই—বাক্স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে বিদ্বেষ ও সহিংসতা রোধ করা। দুটি অধিকার একসঙ্গে রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।
কাজী মাহফুজুল হক সুপন
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নারীর বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সাইবার সহিংসতা এক জিনিস নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌন প্রকৃতির, মানহানিকর ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনকারী অপরাধগুলোকে ‘সহিংসতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সাইবারজগতে সহিংসতার এই বাস্তবতাকে আলাদা করে স্বীকার করেনি। আমাদের কোনো আইনে নারী বা শিশুর বিরুদ্ধে সাইবার সহিংসতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান নেই—এটাই বড় সমস্যা।
আমাদের আইন ও অধ্যাদেশগুলোতে বহু সাইবার অপরাধ সংজ্ঞায়িত হয়নি। আইন প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ না হলে ভবিষ্যতের অপরাধ ধরা যায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও আমাদের কোনো আইনে কথা নেই। ফলে অনেক অপরাধকে আমরা অপরাধ হিসেবেই ধরতে পারছি না।
তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও উপস্থাপনায় প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের ঘাটতি প্রকট। প্রমাণ আদালতে টেকসই না হলে বিচার হয় না। অনলাইন সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে, পুলিশের সদস্যরা জানেন না তদন্তের জন্য কীভাবে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সচেতনতাও বাড়াতে হবে।
অনলাইনে কনটেন্ট সরাতে সময় লাগে, আর একবার কিছু ছড়িয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ কঠিন। পারস্পরিক আইনগত সহায়তা আইন ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে আইন সংশোধন ও প্রমাণব্যবস্থাকে কার্যকর করা প্রয়োজন।
নাহরিন ইসলাম খান
অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমরা বলি যে নারীরা সচেতন হোক, নিজেদের সচেতন হতে হবে। এই বয়ানের বাইরে আমাদের যেতে হবে। আমি মনে করি, রাষ্ট্র এবং সরকারই সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ নিতে পারে। আমি না হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রতিবাদ করতে পারি বা টেলিভিশনে কথা বলতে পারি। কিন্তু যে পোশাকশ্রমিক মেয়েটি নিজেও জানে না সচেতনতা কী, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি সরকারের নয়? অবশ্যই সেটা সরকারের দায়িত্ব।
আমি ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুব সীমিত ব্যবহার করি। ব্যক্তিগত ছবি দিই না, বন্ধুর সংখ্যাও কম। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি। তবু আমি ক্লান্ত হই—কারণ আমার বক্তব্যের প্রতিদান হিসেবে আমি পাই হুমকি, মামলা, অপমান।
নারী যে অবমাননার শিকার হচ্ছে এটা যে রাজনীতির বাইরে, তা আমরা কবে বুঝব? আমি এই সরকারকে সবচেয়ে নারীবান্ধব সরকার হিসেবে দেখতে চাই। নারীর কথাকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দিতে হবে—মন্ত্রিসভা, অধিদপ্তর, নীতিনির্ধারণে। সরকারের কাছে মহিলা অধিদপ্তর সব সময় একটি দ্বিতীয় স্তরের বা কম ক্ষমতাবান অধিদপ্তর হয়ে থাকে। আমি চাই এই সরকারের হাত দিয়েই মহিলা অধিদপ্তর সবচেয়ে শক্তিশালী হবে। আপনাকে এই রাজনীতি মোকাবিলা করতে হবে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দিয়ে।
একটি মন্তব্য একজন নারীর ঘুম কেড়ে নেয়। তাই নারীর কথা নারীর মুখেই আসুক। আমি ভালো মেয়ে বা ভালো মা হওয়ার রাজনীতির বাইরে মানুষ হয়ে শান্তিতে বাঁচতে চাই।
বি এম মইনুল হোসেন
অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাইবার অপরাধের মাত্রা এত দ্রুত বাড়ছে যে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শব্দ আমাদের সামনে আসছে—সেক্সটিং, রিভেঞ্জ পর্ন, ট্রলিং, ডক্সিং, অ্যাস্ট্রোটার্ফিং। বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতার ধরন পাল্টে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা প্রতিরোধে পিছিয়ে কেন? ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সিআইডির সাইবার ইউনিটে ৪৩ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যার তুলনায় নিষ্পত্তি খুবই কম। দেশে কোটি কোটি মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী; কিন্তু জনবল ও সক্ষমতা সীমিত। প্রতিদিন শত শত অভিযোগ সামলানো বাস্তবে কঠিন। আমরা সব সময় রাষ্ট্র বা পুলিশকে দায়ী করি। কিন্তু প্রথম সহায়তা নিজেকেই করতে হবে। আমি এখানে চার পক্ষ দেখি—রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ ও ব্যক্তি। রাষ্ট্রকে শুধু আইন করলেই চলবে না, প্রমাণের সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীবান্ধব প্রটোকল নিশ্চিত করতে হবে। থানায় বা সাইবার ইউনিটে গিয়ে আবারও হয়রানির শিকার হওয়া চলতে পারে না। প্রযুক্তিগত অপরাধ, ডিপফেক—এসব শুধু পুলিশ দিয়ে ঠেকানো যাবে না। ভুক্তভোগীর পাশে পরিবারকেও থাকতে হবে।
এ জন্য গণসচেতনতা জরুরি। আগে যেমন রাতকানা রোগ বা পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রচার হতো, এখন সাইবার সহিংসতা নিয়েও তা দরকার। কারও ওপর আক্রমণ হলে হাসাহাসি নয়, মানসিক সমর্থন দিতে হবে। মূল্যবোধের শিক্ষা ও ইতিবাচক মানসিকতা ছাড়া ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
শারমিন খান
লিগ্যাল কনসালট্যান্ট, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট-ফর-প্রফিট–ল
আইন তৈরি ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্টদের প্রযুক্তি ও সাইবার সচেতনতা থাকা জরুরি। শুধু এ কারণে ভুক্তভোগীরা অতিরিক্ত হয়রানির শিকার হন।
আমরা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট-ফর-প্রফিট–ল (আইসিএনএল) থেকে ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সি ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরিকল্পনা করেছিলাম, যেখানে বিচারক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পাবেন। তবে সরকারি পরিবর্তন ও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে তা কার্যকর হয়নি। প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও প্রটোকল প্রণয়ন ছাড়া ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা সরকারি অংশীজনদের জন্য নারীদের বিরুদ্ধে সাইবারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছি। আমাদের কর্মপরিকল্পনায় সব মন্ত্রণালয়, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইসিএনএল এবং বিজিএফের সহযোগিতায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সাইবার সিকিউরিটি প্রশিক্ষণ এবং হটলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নির্বাচনের আগে একটি সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি লক্ষ করেছি যে ঢাকার বাইরে সাইবার অপরাধ–সংক্রান্ত সেবাগুলো তেমন কার্যকর নয়। অথচ সাইবার অপরাধ সব জায়গাতেই ঘটছে। তাই রাষ্ট্র ও সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হয়। এমন ব্যবস্থা ছাড়া শুধু আইন বা প্রযুক্তি পর্যায়ে সমাধান অসম্পূর্ণ থাকবে।
আফরোজা সোমা
সহকারী অধ্যাপক, মিডিয়া অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, এআইইউবি
নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে তিনটি স্তরের পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথম স্তর হলো আইনি শক্তি। আইনের ফাঁকফোকর সংস্কার করা, কার্যকর প্রটোকল প্রণয়ন এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
দ্বিতীয় স্তর হলো সংগঠন ও সাংগঠনিক শক্তি। দেশে বিভিন্ন সংগঠন একত্র হয়ে নারীর ও শিশুর প্রতি সাইবার সহিংসতা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। সংগঠনগুলো সরকারকে চাপ দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারে। আইনি সহায়তা এবং সমবেত উদ্যোগ সমাজে সচেতনতা বাড়ায়।
তৃতীয় স্তর হলো সামাজিক সচেতনতা। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে নারীর অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যথাযথভাবে স্বীকৃত নয়। নারীর ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্যকে প্রমাণহীনভাবে প্রকাশ করা অনলাইন সহিংসতার এক দৃষ্টান্ত। মিডিয়ার মাধ্যমে ঘটিত ন্যূনতম ঘটনা সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অতএব, রাষ্ট্রকে কার্যকর আইনি কাঠামো ও প্রটোকল নিশ্চিত করতে হবে, সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং সমাজে নৈতিক ও জেন্ডার সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
মিডিয়া, পরিবার ও নাগরিকদেরও এই সচেতনতায় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। শুধু আইনের মাধ্যমে নয়, সামাজিক ও সাংগঠনিক সমর্থনের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা সম্ভব।
কানিজ ফাতেমা
সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ উইমেন ইন টেকনোলজি
আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ৯৯ শতাংশ পরিবারে মোবাইল ব্যবহার করে, তার মধ্যে ৭২ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। তবু নারীর ৭৮ শতাংশ প্রযুক্তিগত হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যার মধ্যে ৮৮ শতাংশ আইনি পদক্ষেপে যান না।
এ পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায় যে শুধু প্রযুক্তি প্রচার বা আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র ও সমাজকে সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের জনসংখ্যার বিস্তৃত প্রযুক্তি ব্যবহারকে কাজে লাগিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যেমন আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জাতীয় প্রচারণা কার্যকর হয়েছে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, তাদের মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যথাযথ আইনি কাঠামো ও প্রটোকল থাকা জরুরি।
প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধের মনস্তত্ত্ব বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন মূল কারণগুলো নিয়ে কথা বলছি, প্রতিকারে যাওয়ার আগে আমাদের তো আসলে একটু দেখার দরকার আছে যে অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তারা কী কারণে এই অপরাধ করছে বা তাদের মনস্তত্ত্বটা কেমন। সব ক্ষেত্রেই কি তারা সচেতনভাবে এই কাজগুলো করছে? এটি একটি অপরাধ বা এই অপরাধের বিস্তার কতটা হতে পারে অথবা যার সঙ্গে এই অপরাধটি হচ্ছে তার জীবনে এটি কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে—সেটা কি তারা বুঝে করছে? অপরাধ কেন হচ্ছে বা কারা করছে—সেই জায়গাটা বন্ধ করার জন্য কাজ করার সুযোগ আছে কি না, তা দেখা জরুরি। তাই আইনি ব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তার পাশাপাশি অপরাধের কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
প্রিয়া আহসান চৌধুরী
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সংবিধান আমাদের গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করেছে, যা অনলাইনসহ সব ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে এই অধিকার প্রায়ই লঙ্ঘিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ফোন নম্বর বা ঠিকানা প্রায়ই অনুমতি ছাড়াই প্রকাশ করা হয়। অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে কিছু আইন থাকলেও অপরাধীদের প্রতিহত করতে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস জুগিয়েছে। সাম্প্রতিক সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা এখনো অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে ভুক্তভোগীর ওপর প্রমাণের দায়ভার চাপানো, ফরেনসিক প্রমাণের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ও সামাজিক হয়রানির ভয়—এসব কারণ তাঁদের অভিযোগ করার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থার কারণে নেতিবাচক কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু ইতিবাচক বা সচেতনমূলক কনটেন্ট তেমনভাবে প্রচার পায় না। তাই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে কীভাবে দায়বদ্ধ করা যায়, তা দেখতে হবে। তবে তা করতে গিয়ে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করা যাবে না। যুক্তরাজ্যের নতুন আইনের মতো প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অননুমতিপ্রাপ্ত অন্তরঙ্গ ছবি সরানোর ব্যবস্থা বাংলাদেশে কীভাবে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন না করে গ্রহণ করা যেতে পারে, তা আমরা দেখতে পারি।
অনলাইন সহিংসতা–সম্পর্কিত সহায়তার জন্য পুলিশের সংশ্লিষ্ট তিনটি সেলের মধ্যে সমন্বয় জরুরি, যাতে ভুক্তভোগীদের জিডি বা অন্যান্য প্রক্রিয়ায় সহায়তা পেতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরতে না হয়। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, যাতে তাঁরা সহজে অভিযোগ দায়ের করতে উৎসাহিত হন। এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলোই অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার ও প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে পারে।
তৃষিয়া নাশতারান
প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠক, মেয়ে নেটওয়ার্ক
মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, সাইবার সহিংসতার ক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন অনলাইন কনটেন্ট নামিয়ে নেওয়াই সমাধান। বাস্তবে একবার কিছু ইন্টারনেটে আপলোড হলে তা পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না; স্ক্রিনশট, রিপোস্ট বা অন্য প্ল্যাটফর্মে কপি হয়ে তা থেকেই যায়। তাই কনটেন্ট অপসারণ প্রয়োজন হলেও এটিকে প্রধান সমাধান ভাবা ঠিক নয়।
নারীর অনলাইন নিরাপত্তা আলোচনায় প্রায়ই ভুক্তভোগী ব্যক্তিকেই দায়ী করা হয়, কেন ছবি পাবলিক ছিল, কেন এমন লিখেছেন ইত্যাদি প্রশ্ন দিয়ে। এতে আসল দায় নারীর ওপরই চাপানো হয়। অথচ সক্ষমতা ও জনবল কম হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, ভুক্তভোগীর নয়।
সব নারী প্রতিনিধি বা কিছু নারী পুলিশ কর্মকর্তাও সব সময় নারীর সমস্যাকে সঠিকভাবে বোঝেন না, কারণ, সবাই পুরষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর অংশ। তাই নারী বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অভিযোগ কীভাবে গ্রহণ ও পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে সবারই বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
সাইবার সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রকে দ্রুত দুটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও নীতিমালা হালনাগাদ করা। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই নারীর অনলাইন নিরাপত্তা জোরদারে আইন, নীতি ও প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই আরও দায়বদ্ধতা প্রয়োজন।
শারমিন আক্তার দোলন
কর্মসূচি সহসমন্বয়কারী, ডব্লিউডিডিএফ
প্রতিবন্ধী নারীরা সাইবার সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্বিগুণ ঝুঁকির মুখোমুখি হন। তাঁদের অনলাইন উপস্থিতিই প্রায়ই ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবার জানলে শাস্তির ভয় আর কেউ যদি হ্যারাসমেন্টের শিকার হন, বিচার চাওয়ার পথও বন্ধ থাকে। অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা, অনলাইনে প্রকাশ এবং ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দকে অপমান হিসেবে ব্যবহার—সবই তাঁদের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে আঘাত করে।
প্রতিবন্ধী নারীরা আইনি সহায়তা, নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। তাই ডিজিটাল সিকিউরিটি প্রশিক্ষণ সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা এবং তা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদা অনুযায়ী অ্যাকসেসযোগ্য করা জরুরি। প্রশিক্ষণ প্রণয়নে প্রতিবন্ধী সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়।
জাতীয় পর্যায়ে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সাইবার সহায়তা সেল গঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নাগরিকত্ব শেখানো অপরিহার্য। সিভিল সোসাইটি, সরকার ও প্রযুক্তি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, বিশেষ করে নীতিমালা প্রণয়নে প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে।
নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ, মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
হেমা চাকমা
কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল থাকলেও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নেই। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে এমন সেল স্থাপন করা উচিত এবং একজন প্রতিনিধি থাকা প্রয়োজন, যাতে ভুক্তভোগী সহজে সাহায্য পেতে পারে।
নির্বাচনের পর নারী শিক্ষার্থীদের ওপর সাইবার সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। একাধিক ঘটনা প্রমাণ করে, নারীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য অনলাইন জিডি ও অভিযোগের ফলোআপ নিশ্চিত করতে হবে।
নারী ও আদিবাসী নারীসহ সবার জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। প্রশিক্ষণে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রক ও সামাজিক নীতি দ্রুত হালনাগাদ করতে হবে।
অপরাধের ফলোআপ নিশ্চিত না হলে সাইবার সহিংসতা কমবে না। সুনির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক প্রভাব ফেলতে পারে এবং অপরাধের প্রবণতা কমাতে সাহায্য করবে।
নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
লাবণ্য প্রজ্ঞা
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনলাইন হ্যারাসমেন্টের শিকার নারীদের অনেকেই জানেন না, কীভাবে আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে। বারবার বলা হয়, ‘নিজেকে সচেতন রাখো’, কিন্তু রাষ্ট্রের দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। অভিযোগ নেওয়া, ফলোআপ করা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি—এগুলো রাষ্ট্রের কর্তব্য। সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর নীতি ও প্রশিক্ষণও জরুরি।
ক্লাস সিক্স ও সেভেনের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে এআই, অনলাইন ঝুঁকি ও নিরাপদ ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এর ফলে ছোটবেলা থেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে এবং ভবিষ্যতে নিজে নিরাপদ থাকবে ও অন্যকে সহায়তা করতে পারবে।
কিছু মিডিয়ার আচরণও সমস্যা বাড়াচ্ছে। ক্লিকবেট শিরোনামে নারীদের ছবি ব্যবহার করে অনেক মিডিয়া ভিউ বাড়াচ্ছে। এটি শুধু ভুক্তভোগীকে আঘাত করছে না, সমাজের মনোভাবকেও প্রভাবিত করছে। নারীর অনলাইন নিরাপত্তা ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার।
আমার সুপারিশ হলো, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সাপোর্ট সেল থাকা, প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং আইন ও নীতি দ্রুত কার্যকর করা।
মাহবুবা আক্তার
পরিচালক (অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন), ব্লাস্ট
সিএসডব্লিউসি প্ল্যাটফর্মের শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল নারীদের অনলাইন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া। আমরা দেখেছি যে শুধু আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ যথেষ্ট নয়। অনলাইন সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা প্রায়ই জানেন না কোথায় অভিযোগ করবেন, কীভাবে পদক্ষেপ নেবেন। তাই ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে এমন সেবা পৌঁছে দেওয়াও সমানভাবে জরুরি।
গণমাধ্যম ও পুলিশের সাইবার শাখা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আমরা সেবার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করি। অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁদের জানানো ও সহায়তা প্রদান—এগুলো আমাদের মূল লক্ষ্য।
আমরা লক্ষ করেছি সমন্বিত কাজের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিভিন্ন সংস্থা একত্র হয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও আইনি সহায়তা দিতে পারে। এ জন্য সমন্বিত নীতি ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
মনীষা বিশ্বাস
ফোকাল পারসন, সিএসডব্লিউসি প্ল্যাটফর্ম
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সিএসডব্লিউসি প্ল্যাটফর্মে ৭১ জন ভুক্তভোগী অনলাইন সহিংসতার জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৬২টি সাইবার অপরাধ ও ৯টি পর্নোগ্রাফি–সম্পর্কিত। ৫৬টি ঘটনা ঢাকায়, বাকিগুলো ঢাকার বাইরে ঘটেছে।
আমরা দেখেছি, ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা পরিবার ও সমাজে মর্যাদাহানি ও গোপনীয়তা হারানোর ভয়, প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতার অভাব ও জটিল বিচার প্রক্রিয়ার কারণে অভিযোগ জানাতে অনীহা প্রকাশ করেন।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত দায়িত্ব অপরিহার্য।
স্কুলভিত্তিক নিরাপদ ইন্টারনেট শিক্ষাদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সরকারি–বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এবং অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ জরুরি। এ ছাড়া সহিংস কনটেন্ট অপসারণের জন্য বিশেষ উইং, প্রতিটি বিভাগীয় শহর ও থানায় সাইবার সেল গঠন, কেন্দ্রীয়ভাবে মামলার তদারকি ও সংবেদনশীল লিংক ব্লকের ক্ষেত্রে বিটিআরসির সক্রিয় ভূমিকা পালন করা জরুরি।
সুপারিশ
সাইবার সহিংসতাকে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করে সময়োপযোগী আইন ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তার জন্য পুলিশ, সাইবার ইউনিট ও সেবাদানকারী সংস্থার সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
স্কুল থেকে শুরু করে সব স্তরে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা এবং জাতীয় পর্যায়ে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে জবাবদিহির আওতায় এনে সহিংস কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।