কুমিল্লা অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
এফসিডিও-এর সহযোগিতায় ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘কুমিল্লা অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় কুমিল্লার বুরো বাংলাদেশ ট্রেইনিং সেন্টারে।
মো. ইউসুফ মোল্লা
প্রশাসক, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে দেশে কিছু করতে না পেরে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে কিছু অসাধু এজেন্সি তাঁদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে সর্বস্ব নিয়ে নেয়, অথচ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁদের বিদেশে পাঠায় না। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নিয়ে টাকা জোগাড় করেন, কিন্তু প্রতারিত হন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা বিদেশে যান, তাঁদের অনেকেই প্রত্যাশিত কাজ বা বেতন পান না, নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হন।
আমরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে এ ধরনের বহু অভিযোগ পাই এবং ওই মধ্যস্থতাকারীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হয়, যাতে তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় বা টাকা ফেরত দেয়। এই সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অদক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আরও বেশি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। বর্তমানে কিছু প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকলেও সেখানে নানা অসংগতি রয়েছে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও সঠিক সনদ দেওয়া হয় না, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা হয় না। এসব বিষয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকার বিভিন্ন সেক্টরে উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। আগে যেখানে বছরে প্রায় ১০ লাখ কর্মী বিদেশে যেতেন, এখন ২০ লাখের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিদেশফেরত প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের জন্য আমি কিছু ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছি, যাতে তাঁরা কোনো জামানত ছাড়াই ৫ থেকে ১০ বা ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন। তাঁরা নিজেদের ব্যবসার প্রস্তাব দিলে সহজ শর্তে, সুদমুক্তভাবে এই ঋণ দেওয়া হবে। এমনকি কিস্তিও হবে সহজভাবে পরিশোধযোগ্য। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে এবং সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
মো. সাইফুল ইসলাম
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা জেলা প্রশাসন
কুমিল্লা অঞ্চল থেকে বিদেশগামী বা প্রবাসী মানুষদের ঘিরে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আজ একজন প্রবাসফেরত ব্যক্তির কষ্টের কথা জানা গেল। এ রকম অসংখ্য অভিজ্ঞতা অজানাই থেকে যায়। আরও বেশি মানুষের অভিজ্ঞতা জানা গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতো। বিশেষ করে বিদেশে যেতে একজন মানুষের প্রকৃত খরচ কত, নানা জটিলতার কারণে তা অনেক সময় প্রকাশ পায় না।
আজকের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত আছেন। এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত এলে তা অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং এই ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে প্রতারণার সুযোগ কমে আসবে।
অভিবাসনপ্রত্যাশী ও প্রবাসীরা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকার এখনো এই সেবা পুরোপুরি চালু করতে না পারায় অনেকে দালালের শরণাপন্ন হন। দালালেরা একজন মানুষকে কেন্দ্র করে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। একজন মানুষের লক্ষ্য থাকে শুধু বিদেশে যাওয়া; কীভাবে বা কত খরচে যাচ্ছেন, তা অনেক সময় তিনি জানেন না। দ্রুত সাফল্য পাওয়ার মানসিকতাই এখানে বড় সমস্যা। এ মানসিকতা থেকে বের হয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলে দালালনির্ভরতা কমানো সম্ভব।
বিএমইটি ও টিটিসি প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন কার্যক্রম চালালেও নিবন্ধনের পর ধাপে ধাপে কী হচ্ছে, তা সব সময় জানা যায় না। এ জায়গায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রবাসীদের নানা অভিযোগ আসে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ আত্মসাৎ ও পারিবারিক জটিলতা। প্রবাসে থাকা ব্যক্তি তাঁর পরিবার ও সম্পদ রক্ষা করতে পারেন না। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।
সাইফুল মালিক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল), বাংলাদেশ পুলিশ, কুমিল্লা
প্রবাসীদের নানা সমস্যার পেছনে বড় কারণ অজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব। অনেকেই পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রস্তুতি ছাড়াই বিদেশে গিয়ে জটিলতায় পড়ছেন। এ বিষয়ে প্রচার বাড়ানো এবং নীতিনির্ধারণে তৃণমূলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সমস্যাগুলো অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিদেশগামীদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। নিবন্ধনের পর প্রশিক্ষণ, চুক্তিপত্র ও ব্যাংক হিসাব যাচাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া উচিত।
অনেকে বৈধ চুক্তি ছাড়া দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে পরে অবৈধ হয়ে পড়ছেন। ন্যায্য কাজ বা বেতন না পাওয়া, এমনকি আটকে রাখার মতো অভিযোগও ওঠে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়। তাই সরকারি চ্যানেল, যেমন বোয়েসেলের মাধ্যমে বিদেশে যেতে উৎসাহিত করা জরুরি; এ পথে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের অবস্থা তুলনামূলক ভালো।
দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকলেও মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ড্রাইভিং ও কম্পিউটার দক্ষতা বাড়ানো গেলে প্রবাসে কর্মসংস্থান ও আয়—দুটোই বৃদ্ধি পাবে।
প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের ঋণ আরও সহজ ও সুদের হার কমানো প্রয়োজন। কারণ, প্রবাসীরা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাঁদের জন্য সহায়ক পরিবেশ জরুরি।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে কিছু অভিযোগ থাকলেও যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এটি পাচ্ছেন। নির্ধারিত সময়ের বেশি লাগলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে। বিদেশ যাওয়ার আগে কাগজপত্র যাচাই নিশ্চিত করা এবং বিপদে দূতাবাস-কনস্যুলেটের সেবার মান আরও উন্নত করা জরুরি।
মো. আতিকুর রহমান
সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়
কুমিল্লায় জেলা অভিবাসন সমন্বয় কমিটি ও জনশক্তি-সংক্রান্ত সভাগুলো নিয়মিতভাবে হয়, যেখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, এনজিও ও অংশীজন অংশ নেয়। এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেবাগুলো এক জায়গায় আনার সুযোগ নেই; নিজস্ব ভবন, যানবাহন ও পর্যাপ্ত প্রচার বাজেটের ঘাটতি মাঠপর্যায়ের কাজকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রবাসী কর্মী, বিশেষ করে নারী কর্মীদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং সেবা নেই বললেই চলে। জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ কাউন্সেলরের মাধ্যমে এ সেবা চালু করা প্রয়োজন।
এজেন্সিগুলোর ক্ষেত্রে নীতিমালা পুরোপুরি মানা হয় না এবং আইন-বিধি ও তা বাস্তবায়নেও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আংশিক সমন্বয় থাকলেও একটি অভিন্ন ডেটাবেজের অভাব রয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ সেন্টার, টিটিসি বা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আলাদা আলাদা ডেটাবেজ থাকলেও সেগুলো একীভূত নয়। একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেজ থাকলে কার্যক্রম আরও কার্যকর হতো।
প্রচার-প্রচারণায় সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। পাশাপাশি জনবল ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। প্রবাসীকল্যাণ সেন্টার, জেলা জনশক্তি অফিস ও প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক একই স্থানে থাকলে সেবা গ্রহণ আরও সহজ হবে।
এজেন্সিগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে তারা অদক্ষ বা অশিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে, যা একটি বড় সমস্যা।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি একীভূত জাতীয় অভিবাসন ডেটাবেজ গঠন করা জরুরি। ইউনিয়ন পর্যায়ের অভিবাসন কমিটিগুলো সক্রিয় করে মাসিক সমন্বয় সভা বাধ্যতামূলক করা গেলে কার্যক্রম আরও ফলপ্রসূ হবে।
ক্যাথরিন সিসিল
চিফ অব পার্টি, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল
রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—সবার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি। নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক অভিবাসন ব্যবস্থায় সমন্বয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আপনারা যে সুপারিশগুলো দিয়েছেন, তা অত্যন্ত গঠনমূলক। এগুলো আমরা গ্রহণ করেছি। কিছু প্রস্তাব এই সভার মধ্যেই বাস্তবায়নযোগ্য, আবার কিছু ক্ষেত্রে বাইরের অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য এসব অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় (সিনারজি) তৈরি করা, যাতে অভিবাসনপ্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর হয়।
অভিবাসনপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ, কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ করতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতার কারণে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে অংশীজনদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই। এর ফলে অভিবাসনপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ, কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ করা সম্ভব হবে।
আমরা এমএএফ (মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম) ও জিএমসির (গ্রিভেন্স ম্যানেজমেন্ট কমিটি) মতো সফল উদ্যোগগুলোর অভিজ্ঞতা বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে দিতে এবং এগুলোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চাই। অভিবাসী কর্মীরা আমাদেরই ভাইবোন, এই ব্যবস্থাটিকে আরও মানবিক করে তুলতে হবে। তাঁদের যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো কীভাবে সহজ করা যায়, সে বিষয়েই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।
আজকের আলোচনায় যে সুপারিশগুলো এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে অভিবাসনব্যবস্থাকে আরও সহজ, কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ করা সম্ভব হবে।
বদরুল হুদা
সভাপতি, মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ), কুমিল্লা
মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ) রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি ফোরাম, যারা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে সরাসরি ও নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। এই যোগাযোগের মাধ্যমে অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য ও সচেতনতা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
অভিবাসী কর্মীদের সংগ্রাম, ত্যাগ ও কষ্টের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি—তাই তাঁদের বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিদেশে অভিবাসীদের জন্য দূতাবাসই প্রধান ভরসাস্থল। দূতাবাসের কর্মকর্তা, বিশেষ করে লেবার অ্যাটাচিদের দায়িত্বশীল ও আন্তরিক ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে সেবার মান বাড়বে এবং ভোগান্তি কমবে। প্রবাসে কেউ মারা গেলে বা নিখোঁজ হলে পরিবারের কাছে তথ্য না পৌঁছানো একটি বড় মানবিক সংকট। এ সমস্যা মোকাবিলায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু এবং মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
বর্তমানে অনেক মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সেই তুলনায় রেমিট্যান্স বা আয় কম আসছে। এর সমাধান হিসেবে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপর জোর দিতে হবে; কারণ, দক্ষ কর্মী গেলে কর্মসংস্থান ভালো এবং আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
যাঁরা বিদেশে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত তথ্য ও দক্ষতা অর্জন করেন না, তাঁরা সহজেই প্রতারণার শিকার হন। বিদেশে যাওয়ার আগে কী কী কাজ করলে প্রতারিত হতে হবে না—এই বিষয়গুলো যদি কারও পুরোপুরি জানা না থাকে বা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকে, তবে তাঁর বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে ‘অবৈধ অভিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়। কেউ বিমানে বৈধভাবে বিদেশে গেলেও যদি তাঁর কাগজপত্র না থাকে, তাঁকে কীভাবে অবৈধ বলা যায়—বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন।
কামরুজ্জামান
অধ্যক্ষ, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কুমিল্লা
বিদেশে যাওয়ার জন্য আলাদা প্রচারের প্রয়োজন নেই; মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। মূল সমস্যা হলো এজেন্সি ও টিটিসির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। প্রশিক্ষণ ও বিদেশে পাঠানোর মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি নীতিমালায় নির্ধারিত অন্তত ১০ শতাংশ প্রশিক্ষিত জনবল নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
সাব-এজেন্ট বা মিডলম্যানদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে কোন সংস্থা—মন্ত্রণালয়, বিএমইটি না অন্য কেউ—এ বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকায় তারা অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ নেয়। তাদের একটি সিস্টেমের আওতায় আনা গেলে হয়রানি ও প্রতারণা কমানো সম্ভব।
স্থানীয় সরকার পর্যায়েও বড় ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরা জানেন না, তাঁদের এলাকার কেউ বিদেশে যাচ্ছেন কি না। ফলে কেউ গোপনে চলে যান। ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট তালিকা থাকলে সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান করা সহজ হতো।
নারী কর্মীদের নিরাপত্তায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। প্রশিক্ষণে উপস্থিতি এখন অনলাইনে মনিটর করা হচ্ছে। তবে দূতাবাসসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন, যাতে বিদেশে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের ঋণ ইস্যুটি নীতিনির্ভর—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় দরকার। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো নিশ্চিত করলে প্রতারণা কমবে এবং অর্থনীতি উপকৃত হবে।
মো. ইসহাক
উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কুমিল্লা
দুটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমটি হলো একটি কার্যকর ও সমন্বিত ডেটাবেজ বা তথ্যভান্ডার। বিশ্বের যেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা কর্মসংস্থানের জন্য যাচ্ছেন, সেসব দেশের দূতাবাসে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। কোন কর্মী কোন দেশে গেলেন, এ তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে নথিভুক্ত থাকলে প্রয়োজনের সময় দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়টি হলো ভাষা প্রশিক্ষণ। যে কর্মী যে দেশে যাবেন, তাঁকে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষার ওপর অন্তত ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং এর সনদ নিয়েই বিদেশে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ বা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশেই একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। ভাষা জানা থাকলে কর্মীরা সহজে কাজ করতে পারবেন এবং সমস্যাও কমবে।
মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বিদেশগামী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি নেই। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক থাকলেও তা কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে কিছু চিঠি পাওয়া যায়, যেখানে বিদেশগামীদের তথ্য উল্লেখ থাকে, কিন্তু নিয়মিত ও বিস্তারিত তথ্য আদান–প্রদান না থাকায় কার্যকর সমন্বয় গড়ে ওঠে না।
এ কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি বিশেষ সেল গঠন করা উচিত, যেখানে বিদেশগামী কর্মীদের তথ্য, প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা যাবে।
রওনক জাহান
সিনিয়র অফিসার, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কুমিল্লা অঞ্চল
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই একটি অভিযোগ শোনা যায়—প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে না বা অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ মূলত সরকারি অর্থ। বাস্তবতা হলো, ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশ সময়মতো ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখায়। ফলে ঋণ আদায় ব্যাহত হলে নতুন গ্রাহকদের জন্যও ঋণ প্রদান কঠিন হয়ে পড়ে এবং পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপের সৃষ্টি হয়।
ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পক্ষে এককভাবে মাঠপর্যায়ে গিয়ে সবাইকে সচেতন করা সব সময় সম্ভব নয়। তাই সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদেরও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
কুমিল্লা একটি প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হলেও এখানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখা মাত্র চারটি। ১৭টি উপজেলার মধ্যে কুমিল্লা শাখা টমসন ব্রিজ এলাকায় অবস্থিত, যার আওতায় ৯টি উপজেলা পরিচালিত হচ্ছে। অথচ সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন কর্মকর্তা। এত সীমিত জনবল দিয়ে এত বড় পরিসরে সেবা দেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখা থাকলে সেবা সহজে সবার নাগালে পৌঁছানো সম্ভব হবে। তবে বর্তমানে ফান্ডের ঘাটতি ও ঋণআদায় সংক্রান্ত সমস্যা চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
ঋণের জন্য আবেদনকারীর বিএমইটি কার্ড, বৈধ ভিসা, পাসপোর্ট ও নিজ এলাকার জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। পাশাপাশি একজন সক্ষম জামিনদার প্রয়োজন, যিনি প্রয়োজনে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেবেন।
মো. মাইন উদ্দিন
সহকারী পরিচালক, প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, কুমিল্লা
প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার মূলত বিদেশে থাকা প্রবাসীদের সেবা প্রদান করে। এটি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অধীন জেলা পর্যায়ের অফিস, যা ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কার্যক্রম শুরু করে। এর আগে এসব সেবা জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের মাধ্যমে দেওয়া হতো।
প্রবাসীরা বিদেশে সমস্যায় পড়লে এই সেন্টারের মাধ্যমে আবেদন করলে দূতাবাসের সাহায্যে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। দেশে প্রবাসী বা তাঁদের পরিবারের প্রয়োজনেও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেবা প্রদান করা হয়।
প্রবাসী কর্মীদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য ভাতা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে বিএমইটি কার্ডধারীদের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বিমানবন্দর থেকে মৃতদেহ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে বিনা মূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবাও চালু রয়েছে। এ ছাড়া মৃতদেহ দেশে আসার পর ২৫ হাজার টাকা এবং যোগ্য ক্ষেত্রে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়।
বিদেশে বকেয়া বিমা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রেও দূতাবাসের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করা হয়। বিমানবন্দরের নিকট ওয়েজ আর্নার্স ডরমিটরিতে প্রবাসীদের রাত্রিযাপনের সুবিধা রয়েছে।
নারী কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য বিদেশে সেফ হোম চালু আছে এবং আইনি সহায়তার জন্য দূতাবাসে আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ইকবাল মাহমুদ
ডেপুটি টিম লিডার, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন
২০২৩ সালের ‘বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন’ সংশোধনে দালালদের নিয়মতান্ত্রিক করার কথা বলা হয় এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এ বিষয়ে একটি বিধিমালাও প্রণয়ন করা হয়। বাস্তবে বিধিমালা থাকলেও দালালদের নিবন্ধন ও কার্যক্রম কাঠামোর মধ্যে আনার ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
রিক্রুটিং এজেন্সি ভিসাপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও কর্মী সংগ্রহসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ দালালদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। তাদের স্বীকৃতি না দিলে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর সদিচ্ছা প্রয়োজন, পাশাপাশি নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিগতভাবে সাব-এজেন্টদের বিষয়ে বিধিমালা তৈরি হলেও এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়। একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করে সাব-এজেন্টদের নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেমনটি রিক্রুটিং এজেন্সির ক্ষেত্রে করা হয়।
জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করে কাজ করা হলেও তা সীমিত। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থায়ী কমিটি গঠন করা গেলে এটি আরও কার্যকর হবে।
মেরিনা সুলতানা
পরিচালক (প্রোগ্রাম), রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)
অভিবাসন খাতে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ একইভাবে বিদেশে অবস্থান করেন না, তাই স্বচ্ছতা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ বিদেশে গিয়ে কোনো না কোনোভাবে প্রতারণার শিকার হন। এ সমস্যা সমাধানে দেশ ও দেশের বাইরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। মৌলিক ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতার অভাবে অনেক কর্মী নির্যাতনের শিকার হন, কম বেতন পান এবং নিজেদের অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।
পাসপোর্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে প্রতারণা হচ্ছে, তাই সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জেলা পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি থাকলেও সেটিকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
দালালদের নিবন্ধন, আইনি সুরক্ষা জোরদার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব।
জেসিয়া খাতুন
পরিচালক, ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন
প্রতিবছর শ্রমবাজারে ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ যুক্ত হন, যার মধ্যে ১০ থেকে ১১ লাখ বিদেশে যান। কাঠামোগতভাবে আমরা একটি বড় ঘাটতি দেখতে পাই। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই খাত পরিচালনা করলেও জাতীয় বাজেটে তাদের বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম, অথচ প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য সংস্থারও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে মাইগ্রেশন কর্নার চালু করা গেলে তথ্য তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানো সহজ হবে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় মাঠপর্যায়ে দালালদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গত তিন বছরে মিডিয়েশনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটিকে ইউনিয়ন পর্যায়ের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এটি আরও কার্যকর হবে।
এনজিও, তথ্য মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ফারজানা আলম মজুমদার
সদস্য, বায়রা, কুমিল্লা
আমাদের প্রধান সমস্যাগুলো শুরু হয় দালাল ও নিয়োগব্যবস্থার মধ্যেই। লাইসেন্সবিহীন দালাল, ভুয়া প্রতিশ্রুতি, নগদ লেনদেন, প্রতারণা এবং চুক্তিপত্র গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এসব কারণে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। সব দালালকে বিএমইটির মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি।
লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেল বাধ্যতামূলক করা দরকার, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে দ্রুত ঋণ অনুমোদন ও সেবা সম্প্রসারণও জরুরি।
বিএমইটি, জেলা প্রশাসন, টিটিসি, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় কম। একই তথ্য বারবার সংগ্রহ করা হয়, কিন্তু অভিন্ন কোনো ডাটাবেজ নেই। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়। এ জন্য একটি একীভূত জাতীয় অভিবাসন ডাটাবেজ তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ফাতেমা আক্তার
প্রবাসফেরত নারী
আমি বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়েছি। সেখানে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না, অনেক সময় খারাপ মানের খাবার দেওয়া হতো। থাকার ব্যবস্থাও ভালো ছিল না এবং সারাক্ষণ শুধু কাজ করানো হতো। বেতনও নিয়মিতভাবে দেওয়া হয়নি, পাশাপাশি আমাদের যথাযথভাবে দেখাশোনাও করা হয়নি।
আমি প্রথমে ওমান গিয়েছিলাম এবং সেখানে পাঁচ বছর কাজ করেছি। পরে ছুটিতে দেশে ফিরে আবার সৌদি আরবে যাই এবং সেখানে দুই বছর কাজ করি। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে দেশে ফিরে আসতে হয়।
ওমানে পাঁচ বছর কাজ করেছি মাত্র বারো হাজার টাকা বেতনে। আর সৌদি আরবে দুই বছর কাজ করে কিছুদিন প্রায় তিন হাজার টাকার মতো বেতন পেয়েছি। কাজের তুলনায় এই বেতন খুবই কম ছিল।
বর্তমানে আমার বয়স বেড়ে গেছে এবং পাসপোর্টেও বয়স বেশি দেখানো হয়েছে, অনেক চেষ্টা করেও এখন আর যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখন আমি অসুস্থ অবস্থায় বাসায় আছি।
সুপারিশ:
১. জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে নিয়মিত (মাসিক) সমন্বয় সভা ও অগ্রগতি ট্র্যাকিং প্রাতিষ্ঠানিক করা।
২. ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিবাসন তথ্য ও অভিযোগ সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করে স্থানীয় পর্যায়ে সেবা ও সমন্বয় জোরদার করা।
৩. বিএমইটির নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে সমন্বিত ‘সার্ভিস ডে’ বা ওয়ান-স্টপ সেবা ব্যবস্থা চালু করা।
৪. প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একীভূত অভিবাসন ডেটাবেজ তৈরি ও কার্যকর করা।
৫. জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সহজপ্রাপ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
৬. জেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।
অংশগ্রহণকারী:
মো. ইউসুফ মোল্লা, প্রশাসক, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন;
মো. সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা জেলা প্রশাসন;
সাইফুল মালিক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল), বাংলাদেশ পুলিশ, কুমিল্লা;
মো. আতিকুর রহমান, সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়;
ক্যাথরিন সিসিল, চিফ অব পার্টি, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল;
বদরুল হুদা, সভাপতি, মাল্টি-পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ), কুমিল্লা;
কামরুজ্জামান, অধ্যক্ষ, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কুমিল্লা;
মো. ইসহাক, উপপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কুমিল্লা;
রওনক জাহান, সিনিয়র অফিসার, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, কুমিল্লা অঞ্চল;
মো. মাইন উদ্দিন, সহকারী পরিচালক, প্রবাসীকল্যাণ সেন্টার, কুমিল্লা;
ইকবাল মাহমুদ, ডেপুটি টিম লিডার, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন;
মেরিনা সুলতানা, পরিচালক (প্রোগ্রাম), রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু);
জেসিয়া খাতুন, পরিচালক, ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন;
ফারজানা আলম মজুমদার, সদস্য, বায়রা, কুমিল্লা;
ফাতেমা আক্তার, প্রবাসফেরত নারী;
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।