আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

আজকের আলোচনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে সবার সচেতনতা প্রয়োজন। শুধু নারীদের সচেতন হলে হবে না, পুরুষদেরও সচেতনতা জরুরি। জরায়ুমুখে যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রথম আলোয় এ বিষয়ে নিউজ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের কাছে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধের বিষয়টি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। আজকের আলোচনায় অনেক পরামর্শ আসবে বলে আশা করি। 

গুলশান আরা

আজকের গোলটেবিল বৈঠকে সবাইকে স্বাগত জানাই। জানুয়ারি মাস জরায়ুমুখ ক্যানসার সচেতনতার মাস। বিশ্বব্যাপী এই  মাস সম্মান ও গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) এই মাস নিয়মিতভাবে উদ্‌যাপন করে আসছে এবং বিভিন্ন রকম সেমিনার সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে পালিত হয়। 

জরায়ুমুখ ক্যানসার হলো সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতা। একটি প্রতিরোধযোগ্য অসুখেও প্রতিবছর বিশ্বে তিন লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। জরায়ুমুখের ক্যানসার যাঁদের ধরা পড়ে, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী মারা যান। 

এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়। সেটা হলো আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বের ২১টি দেশ থেকে  জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল করা হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলোদেশের ৯০ শতাংশ কিশোরীর এইচপিভি ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি।

এটা করতে হলে আজকের আলোচনার মতো বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা চালিয়ে যেতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের আলোচনা। প্রতি ১০ কিশোরীর ৯ জনকে ভ্যাকসিন দিতে হবে, ৭ জনকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনতে হবে ও ৯ জন ক্যানসার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হবে। ওজিএসবিতে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলে তিনটি কমিটি আছে। এ কমিটি জরায়ুমুখ ক্যানসারের সার্বিক দিক নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। 

ফেরদৌসী বেগম

জরায়ুমুখ ক্যানসারের ধারণাটি আমাদের কাছে বেশ কিছুদিন ধরে পরিচিত। বিশেষ করে এইচপিভির টিকা আবিষ্কারের পর থেকে বিষয়টি আরও সামনে এসেছে। কারণ, এইচপিভির ভাইরাস থেকেই জরায়ুমুখের ক্যানসার হয়। আর এইচপিভির টিকা আবিষ্কারের পর জরায়ুমুখের ক্যানসার নিরাময় সম্ভব। এখন কিশোরীদের এই টিকা দিলে তাদের  ক্যানসার থেকে  রক্ষা করা যায়।

২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের ৯০ শতাংশ কিশোরীকে এইচপিভি টিকা দিতে হবে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ নারীকে স্ক্রিনিং করতে হবে। জরায়ুমুখের ক্যানসার আক্রান্ত নারীদের  চিকিৎসা করতে হবে। ভ্যাকসিন, স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা—তিনটি সমানতালে চালিয়ে যেতে হবে। সব ডাক্তার যে এ বিষয়ে সচেতন, তা নয়। ডাক্তারসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে।

গণমাধ্যম একটি বিরাট শক্তি। তারা যেন মানুষের কাছে এ বার্তা নিয়ে নিয়মিত যায়। এক মাস ধরে মাতৃ ও জরায়ুমুখের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছি। আশা করি, এটা সবার দৃষ্টিতে আসবে। 

আটটি বিভাগে আটটি ক্যানসার ইনস্টিটিউট তৈরি হচ্ছে। বছরে প্রায় আট হাজার নারীর জরায়ুমুখের ক্যানসার হয়। তাঁদের চিকিৎসা দিতে হবে। একজন ক্যানসার চিকিৎসক তৈরি করতে প্রায় ছয় বছরের বেশি সময় লাগে। এত দিন কি রোগীরা চিকিৎসা পাবেন না? খুব জটিল না হলে সাধারণ গাইনিকোলজিস্টরা ক্যানসারের প্রশিক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা দিতে পারেন। তাহলে তঁারাই ক্যানসারের চিকিৎসা দিতে পারবেন। ওজিএসবির দায়িত্ব এ কাজগুলো ভালোভাবে করা। আমরা সেটা করছি। ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে করতে চাই। 

ফারহানা দেওয়ান

জরায়ুমুখ ক্যানসার একটি নীরব ঘাতক। এই ক্যানসারে যাঁরা আক্রান্ত হন, তাঁরা সাধারণত একটু দেরি করে আসেন। তখন এটা নিরাময় করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। অনেকের মৃত্যু হয়। 

এখন একটি ভালো খবর হলো, জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে। এ ভ্যাকসিন দিয়ে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

বাংলাদেশে ভ্যাকসিনের পরিস্থিতি কী। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড অর্গানাইজেশন (গ্যাভি) অনেক আগেই জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করেছিল। বাংলাদেশে এর পাইলট প্রকল্প হয়েছিল। এর মাধ্যমে ৩৩ হাজার মেয়েকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, পরে বড় পরিসরে ভ্যাকসিনেশন চালু করা হবে। কিন্তু করোনার সময় পুরো বিষয়টি পিছিয়ে গেছে। সরকারিভাবে এখন কোনো এইচপিভি  ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না। প্রাইভেট সেক্টরে ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস জরায়ুমুখের ক্যানসারের একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছে। এটা ‘প্যাপিলো ভ্যাক্স’ নামে বাজারজাত হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়েছে।

উন্নত দেশে ৮৮ শতাংশ মেয়ে ও ৪৪ শতাংশ ছেলে ক্যানসারের ভ্যাকসিন নিয়েছেন। স্বল্প আয়ের দেশে মেয়ে ৪০ শতাংশ আর ছেলে ৫ শতাংশ ভ্যাকসিন নিয়েছেন। 

 যেসব দেশের মেয়েদের ৮৮ শতাংশ ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হয়েছে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে তাঁদের দেশের ১০০ শতাংশ নারী ভ্যাকসিনের আওতায় আসবেন।  

আমাদের দেশে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ মেয়েকে ভ্যাকসিনেটেড করতে হবে। তাহলে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে, যেন ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ মেয়েকে ভ্যাকসিনেটেড করা য়ায়। 

তানভীর হোসেন

শুধু জরায়ুমুখ ক্যানসার নয়, সব ক্যানসার নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। দেশের প্রায় অধিকাংশ মানুষের রোগ নিয়ে ধারণা কম। তার ওপর ক্যানসার নিয়ে ধারণা আরও কম। আমরা যাঁরা ডাক্তার, তাঁরাই–বা কতটুকু সচেতন, সেটা একটা প্রশ্ন।

২০১৬-১৭ সালে সরকার জরায়ুমুখের ক্যানসারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়েদের টিকা দেওয়া শুরু করে। ৫৬ হাজার মেয়েকে এই টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। সরকারিভাবে কোনো ভ্যাকসিন দিতে গেলে আগে এর বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করে দেখতে হয়। আমার পঞ্চম শ্রেণি থেকে থেকে দশম শ্রেণির মেয়েদের টিকা দিয়েছিলাম। মানুষ এটা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছিল। 

আমরা খুব ভাগ্যবান যে আমাদের দেশের মানুষ ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী। বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ ভ্যাকসিন নিতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে পর্যন্ত তাদের জনগণকে টিকা দিতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ১৯৭৯ সাল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর অধিকাংশ শূন্য থেকে এক বছর বয়সের শিশু এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের নারী। ইপিআই তাদের কাজ করে যাচ্ছে।  আমরা স্কুল ভ্যাকসিনেশনে যাব। এ জন্য শিক্ষকদের মোটিভেট করতে হবে। আশা করছি, এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে আমরা এইচপিভি ভ্যাকসিন পাব।  এইচপিভি  টিকাদানের সব ক্ষেত্রে ওজিএসবি আমাদের পাশে থাকবে বলে আশা করি।

সামিনা চৌধুরী

আমরা কীভাবে বাংলাদেশে এইচপিভি ভ্যাকসিন নিয়ে এলাম, সেটা বলতে চাই। এটা নিয়ে প্রথমে আমাদের মধ্যে আলোচনা করি। আমাদের সদস্যরা স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জরায়ুমুখের ক্যানসারের বিষয়ে সচেতন করেছে। সরকারিভাবে ২০১৬ সালে গাজীপুরে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। কিন্তু এরও আগে ওজিএসবি এই ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করে। এখানে অধ্যাপক ডাক্তার ফজলুল করিমের কথা বলতে হয়। তিনি ২০০৮ সালে আমাদের বললেন যে বাংলাদেশে এইচপিভি ভ্যাকসিন আনতে হবে। তিনি আমাদের ওজিএসবির সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি করলেন। আমাদের অনেক চেষ্টার ফলে শেষ পর্যন্ত এইচপিভি ভ্যাকসিন আনতে সক্ষম হই। 

আমাদের গাইনিকোলজিস্টদের চেম্বারে যেসব মা আসতেন, তাঁদের মেয়েদের এই এইচপিভি ভ্যাকসিন দিতে বলতাম। তাহলে ভবিষ্যতে তাঁরা জরায়ুমুখের ক্যানসার থেকে রক্ষা পাবেন। তখন মায়েরা তাঁদের মেয়েদের তো ভ্যাকসিন দিতেন এবং নিজেরা নিতে চাইতেন।

এখন আমাদের কিশোরদের কথাও ভাবতে হবে। কারণ, এইচপিভি ভ্যাকসিন কিশোরদেরও অনেকগুলো ক্যানসার প্রতিহত করে। স্বল্প পরিসরে হলেও ওজিএসবির মাধ্যমে শুরুটা হয় ২০০৮ সালে। এইচপিভি ভ্যাকসিন নিয়ে আমরা ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করেছি।

গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় আমরা ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সের দরিদ্র মেয়েদের ওপর গবেষণা করেছি। এইচপিভি ভ্যাকসিন দিয়েছি। আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি যে বাংলাদেশের মেয়েদের ওপর এই ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ কার্যকর।

বেগম রোকেয়া আনোয়ার

ওজিএসবি অনেক বড় সংস্থা। আজ এখানে ক্যানসার ও ক্যানসার প্রতিরোধের বিষয় নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা করছে। এটাও অনেক বড় বিষয়। এ জন্য ওজিএসবিকে ধন্যবাদ।

২০১১ সালে  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চিন্তা করল ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ক্যানসার রেজিস্ট্রি থাকতে হবে। কারণ, একটা দেশে ক্যানসার রেজিস্ট্রি থাকলে ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ণয় সম্ভব হয়। কী পরিমাণ রোগী আক্রান্ত হয়, কতজন ফলোআপে আসে, সেটা বোঝা যায়। কতজনের মৃত্যু হয়, সেটাও জানা যায়। এ জন্য ক্যানসার রেজিস্ট্রির মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিরোধ কর্মকৌশল সহজ হয়। এর মাধ্যমে কী পরিমাণ সম্পদ কোথায় প্রয়োজন, কতজন ভ্যাকসিন ও স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আসবে, কতজন ক্যানসারে আক্রান্ত, কতজনকে রেডিওথেরাপি দিতে হবে, কতগুলো রেডিওথেরাপি মেশিন লাগবে ক্যানসার রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে এসব বিষয় ধারণা পাওয়া যাবে। 

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর তিনটি দেশের মধ্যে একটা দেশে ক্যানসার রেজিস্ট্রি আছে। আমরা এখনো সেভাবে রেজিস্ট্রি তৈরি করতে পারিনি। তবু কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে অনেক কাজ হচ্ছে। সমন্বয়হীনতার জন্য আমাদের এখানে ক্যানসার রোগীর রেজিস্ট্রি হচ্ছে না। আমাদের সবার ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। এটা দিয়ে কাজ শুরু করলে কোনো সমস্যা হবে না। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিজস্ব ক্যানসার রেজিস্ট্রি আছে। ক্যানসার রেজিস্ট্রির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি প্রতিবছর আমাদের হাসপাতালে ১ হাজার ৫০০ জরায়ুমুখ ক্যানসারের রোগী আসে। তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ অনেক দেরি করে আসে। ফলে তাদের রেডিওথেরাপি দিতে হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ বছর পর্যন্ত বয়সের মেয়েদের ৯০ শতাংশ ভ্যাকসিনের আওতায় আনা। ৭০ শতাংশ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা এবং ৯০ শতাংশ ক্যানসারের রোগীর চিকিৎসা দেওয়া। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই ক্যানসার রোগীর রেজিস্ট্রি তৈরি করতে হবে।

আশরাফুন্নেসা

যেসব নারীর বয়স ৩০ বছর, তাঁদের আমরা ক্যানসারের পূর্বাবস্থা পরীক্ষা করতে পারব। জরায়ুমুখ পরীক্ষার কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে। এর মধে্য ভায়া পরীক্ষায় জরায়ুমুখ সাদা দেখা গেলে ধারণা করা হয় যে এটা হয়তো ক্যানসারের পূর্বাবস্থা। জরায়ুমুখ সাদা মানেই সব ক্ষেত্রে ক্যানসারের পূর্বাবস্থা না। কোনো ক্ষত হওয়ার জন্যও জরায়ুমুখ সাদা হতে পারে। তখন ক্যানসার নিশ্চিত হওয়ার জন্য উন্নত পরীক্ষা করতে হয়।

জরায়ুমুখ পরীক্ষার অনেকগুলো পদ্ধতির মধ্যে ২০০৩ সালে ভায়া পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। কারণ, সরকার এটা বিনা মূল্যে দিতে পারবে। সরকার ইউএনএফপিএর প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করে। সবাই সিদ্ধান্ত নেয় যে ভায়া বিনা মূল্যে সারা দেশে প্রচলন করতে হবে। সেখান থেকেই শুরু। তারপর এর পাইলটিং হয়েছে। ২০১০ সালে এই সেবা প্রায় সব জেলায় পর্যায়ের হাসপাতালে পৌঁছে গেছে। এসব হাসপাতালের নার্স ও ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারপর ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কর্মসূচি স্তিমিত হলো। ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রকল্পের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় নতুনভাবে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে সেবাটি পৌঁছে দেওয়া হলো। ২০১৮ সালে ইলেকট্রনিক ডেটা ট্র্যাকিং ও জনভিত্তিতে স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। নারীদের প্রধান ক্যানসার হচ্ছে ব্রেস্ট ক্যানসার। দ্বিতীয় প্রধান ক্যানসার হচ্ছে জরায়ুমুখ ক্যানসার। 

প্রতিবছর ১৩ হাজার নারীর ব্রেস্ট ক্যানসার হচ্ছে এবং প্রায় এর অর্ধেক নারী মারা যাচ্ছেন। আর জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন ৮ হাজার নারী। ২০০৬ সাল থেকে সরকার এই দুই ধরনের ক্যানসারের পরীক্ষা চালু করেছে। হিট দিয়ে এবং জরায়ুমুখ কেটে চিকিৎসা করা যায়। জরায়ুমুখ  ক্যানসারের চিকিৎসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয় না।

কমিউনিটি ক্লিনিক থেকেই ইলেকট্রনিক ডেটা ট্র্যাকিং শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১০ লাখের বেশি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সবাইকে ডেকে স্ক্রিনিং করাই হচ্ছে পপুলেশন–বেজড স্ক্রিনিং। ২০১৮ সালে ২০০ উপজেলায় পাইলটিং শুরু করেছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বলেছেন। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। ভায়া পদ্ধতিতে সারা দেশে স্ক্রিনিং চালু আছে। এইচপিভি -ডিএনএ খুব ভালো পরীক্ষা, কিন্তু এটা অনেক ব্যয়বহুল। বাংলাদেশের সব নারীকে যেন স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা যায়, সে জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

সাবেরা খাতুন

ক্যানসার স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি। উন্নত দেশে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ জরায়ুমুুখ ক্যানসার কমেছে শুধু স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে। প্যাপস নামক একটা স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে সেটা করা হয়েছিল। ২০০৩ সালে ভায়া পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদের দেশে স্ক্রিনিং শুরু হয়েছিল। 

গত ২০ বছরে আমার জানামতে, কাভারেজ ১৫ শতাংশ। কিন্তু আজ আলোচনায় এসেছে ২০ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৭০ শতাংশ করতে হবে। ৭ বছরে আমরা কি ৭০ শতাংশ পূরণ করতে পারব। সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। 

যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ বছর বয়সে সবচেয়ে বেশি জরায়ুমুখের ক্যানসার ধরা পড়ে। আমাদের দেশে ধরা পড়ে ৪০ বছর বয়সে। জরায়ুমুখ  ক্যানসার ১৫ বছর পর্যন্ত প্রি-ক্যানসার অবস্থায় থাকতে পারে। তাই নারীদের ২৫ বছর বয়স থেকে স্ক্রিনিং করা উচিত। 

আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের হার হলো ৫৪ শতাংশ। অল্প বয়সে যৌনজীবন শুরু হলে জরায়ুর ক্যানসার দ্রুত হতে পারে। ভায়া স্ক্রিনিং পাঁচ বছর পরপর করতে হয়। কিন্তু এইচপিভি স্ক্রিনিং ১০ বছর পরে করলে হয়। ভায়া স্ক্রিনিংয়ে ৪০ শতাংশ ফলস পজিটিভ আসতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলা হয়েছে, ৩৫ ও ৪৫ বছরে একবার স্ক্রিনিং করলে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ জরায়ুমুখ  ক্যানসার দূর করা যায়। 

যেসব নারীর বয়স ৫০ বছরের বেশি, তাঁদের ভায়া টেস্ট অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। ভায়া স্ক্রিনিংয়ের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকে আলাদা সেটআপ লাগবে। কিন্তু এইচপিভি টেস্টে সেটা লাগবে না। ভায়া স্ক্রিনিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্র্যাকটিসের দরকার হয়। এইচপিভি টেস্ট যে কেউ সহজেই করতে পারেন। এইচপিভি দিয়ে ডিএনএ টেস্ট করে জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং করা যায়। 

আমাদের সরকার দেশে অনেক বড় কাজ করছে। জরায়ুমুখ  ক্যানসার প্রতিরোধেও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। 

শিরিন আক্তার বেগম

আমরা এখন ভায়া পদ্ধতিতে স্ক্রিনিং করছি। আমাদের দেশের জন্য এটা ঠিক আছে। আমাদের দেশে প্যাপসমিয়ার করে দেখা গেছে সুফল পাওয়া যায় না। ভায়া করার জন্য যে উপকরণ দরকার, সেটা আমাদের আছে। প্রায় ৪৩টি হাসপাতালে এই সুবিধা আছে। ভায়া রিপোর্ট দেখে সাথে সাথেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।এখানে বায়োপসি রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নাই।চিকিৎসা দেওয়ার পরে  যখন বায়োপসি রিপোর্ট হাতে পৌছাবে তখন শুধু মিলিয়ে নিলেই হবে। প্রয়োজনে আবার চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে আবার নাও হতে পারে। আগের চিকিৎসাই যথেষ্ট হবে বেশির ভাগ রোগীর জন্য। 

ভায়া করার জন্য খুব বেশি উপকরণের দরকারও হয় না। তাই যেকোনো জায়গায় ক্যাম্প করে চিকিৎসা দেওয়া যায়। আমি মুম্বাই টাটা মেমোরিয়ালে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। প্রায়ই দেখতাম যে ওরা একটা পিকআপ নিয়ে বের হয়ে গ্রামে যাচ্ছে। সারভিক্স দেখে সঙ্গে সঙ্গে ট্রিটমেন্ট দিচ্ছে। আমরাও সারভিক্স দেখে পজিটিভ হলে চিকিৎসা দিচ্ছি। এইচপিভি ডিএনএ এখন পর্যন্ত ব্যয়সাশ্রয়ী না। তাই আমাদের দেশে ভায়া পদ্ধতিতে জরায়ুমুখ ক্যানসারের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। যখন ভায়া পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না, তখন তাকে এইচপিভি ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে স্ক্রিনিং করার জন্য রেফার করতে হবে।

সাহানা পারভীন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ নারীর জরায়ুমুখের ক্যানসার ও ক্যানসারের পূর্ববর্তী অবস্থার চিকিৎসা দিতে হবে। কিন্তু সেটা কীভাবে হবে, জানা নেই। অধিকাংশ স্ক্রিনিং হয় ঢাকা শহরে। দেশ ৪৬টি কোলনোস্কপি সেন্টার আছে। এর মধ্যে ২৩টি সেন্টারে থার্মাল ও ২০টি সেন্টারে লিফ হয়। প্রকৃত চিকিৎসা হলো লিফ। সব কোলনোস্কপি সেন্টারে লিফের ব্যবস্থা করতে হবে।

জরায়ুমুখ ক্যানসারের পূর্ববর্তী অবস্থার চিকিৎসা লিফ দিয়ে করা যায়। জরায়ুমুখ ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু আমরা যদি লিফের মাধ্যমে জরায়ুমুখ ক্যানসারের পূর্ববর্তী অবস্থার চিকিৎসা দিতে পারি, তাহলে এই ক্যানসার আর হবে না। দেশের সব মেডিকেল কলেজে কোলনোস্কপি সেন্টার তৈরি করতে হবে। এসব সেন্টারের জন্য প্রশিক্ষিত ডাক্তার, হেলথ কেয়ার অ্যাডভাইজার, গাইনিকোলজিস্টসহ সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে জরায়ুমুখ ক্যানসারের চিকিৎসার কাভারেজ আরও বেড়ে যাবে। 

করোনা পরীক্ষার জন্য যে পিসিআর মেশিন আনা হয়েছে, এসব মেশিনের মাধ্যমে এইচপিভি ভাইরাসের পরীক্ষা করা যাবে। পরীক্ষায় এইচপিভি ভাইরাস পজিটিভ হলে তঁাদের চিকিৎসা দিতে হবে। কোলনোস্কপি সেন্টার আরও বাড়াতে হবে। আমাদের কাছে কি তথ্য আছে সারা দেশে কত রোগীর ডায়াগোনসিস হয়, কতজন জরায়ুমুখ ক্যানসারে মারা যান, কতজন স্ক্রিনিং করাতে পারেন? জরায়ুমুখের ক্যানসার কী, ক্যানসারের পূর্বাবস্থা কী, এর যে চিকিৎসা আছে—এসব ব্যাপকভাবে মানুষকে জানাতে হবে।

দেশের সব মেডিকেল কলেজে সব সুযোগ-সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ অনকোলজি সেন্টার তৈরি করতে হবে। আমাদের কাছে ক্যানসারের রোগীরা এমন সময় আসেন, যখন আর তেমন কিছু করার থাকে না। প্রাথমিক অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে যদি চিকিৎসা দেওয়া যায়, তাহলে অনেক রোগী বেঁচে যেতে পারেন। হাসপাতালগুলোয় ক্যানসার চিকিৎসার পর্যাপ্ত মেশিনের ব্যবস্থা করতে হবে।

রওশন আরা বেগম

জরায়ুমুখ ক্যানসার একমাত্র ক্যানসার, যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু স্বাধীনতার আজ ৫১ বছর পরও আমরা জরায়ুমুখ  ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারিনি। এটা খুবই দুঃখজনক। একজন ক্যানসারের রোগীর রেডিওথেরাপি নিতে কয়েক মাস লেগে যায়। এই যে জরায়ুমুখ ক্যানসারে নারীরা মারা যাচ্ছেন, এর কোনো খবরও প্রকাশিত হয় না। আজ  শতাধিক বেসরকারি ও ৩২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ আছে। 

বেসরকারি পর্যায়ে এই চিকিৎসার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। জরায়ুমুখ ক্যানসারের স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা অনেকটা সহজে দেওয়া যায়। এ চিকিৎসার ব্যবস্থা কেন বেসরকারি হাসপাতালে থাকবে না? সেটি একটি বড় প্রশ্ন। এটা বেসরকারি হাসপাতালের জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত, যেন জরায়ুমুখের স্ক্রিনিং অন্তত হয়। 

ওজিএসবির পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। ২০৩০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালকে জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে। বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ক্যানসারের চিকিৎসা দিচ্ছে। কিন্তু এদের বাধ্য করতে হবে এরা যেন জরায়ুমুখ ক্যানসারের স্ক্রিনিং করে।

বেসরকারি হাসপাতালে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করেন। তাঁদের স্ক্রিনিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ক্যানসারের রেজিস্ট্রি করা অত্যন্ত জরুরি। কমিউনিটি ক্লিনিক স্ক্রিনিং করতে পারবে না, কারণ সেখানে মানবসম্পদের অভাব আছে। এখন বেসরকারি হাসপাতালকে বাধ্য করতে হবে, তারা যেন জরায়ু ক্যানসারের স্ক্রিনিং করে। 

নাজমা হক

দেশে ক্যানসার রোগীর রেজিস্ট্রি নেই বললেই চলে। তবে জরায়ুমুখ ক্যানসারের রেজিস্ট্রি কিছুটা আছে। সব ক্যানসার রেজিস্ট্রি না হলে বিশ্বের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য হয় না। জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে জরায়ুমুখ  ক্যানসারের রেজিস্ট্রি হচ্ছে। ফলে কোনো রোগী দুবার হওয়ার আশঙ্কা থাকছে না। এই উদাহরণ নিয়ে সব ক্যানসারের রেজিস্ট্রি করা যেতে পারে। 

আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন-সহযোগীরা কাজ করে। কিন্তু এই দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় হলে রেজিস্ট্রি সম্ভব হতো। 

ক্যানসার প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে যে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার, সেটা হচ্ছে না। পোলিওর মতো রোগও ভ্যাকসিন দিয়ে নির্মূল করা গেছে। স্ক্রিনিংয়ের জন্য একটা সপ্তাহ নির্ধারণ করতে হবে। সেই সপ্তাহে সব মা স্ক্রিনিং করার জন্য হাসপাতালে আসবেন। এভাবে নারীদের স্ক্রিনিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

এখন ভায়া স্ক্রিনিং চলতে থাক। কিন্তু ধীরে ধীরে এইচপিভি–ডিএনএ স্ক্রিনিংয়ে যেতে হবে। এটা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। এইচপিভির দাম কমানো ও ইপিআইয়ের মাধ্যমে ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে সবাইকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা প্রয়োজন। 

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে উন্নত রেফারেল সিস্টেম আছে। আমাদেরও রেফারেল সিস্টেম খুবই দুর্বল একে উন্নত করতে হবে। 

মো. নিজামুল হক

টেলিথেরাপি, রেডিও আইসোটোপ ইত্যাদির মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়। ক্যানসার হাসপাতালের এক হিসাবে, ২৫ শতাংশ নারী জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসার মাধ্যমে এঁদের ভালো করা সম্ভব। শুরুতে জরায়ুমুখ ক্যানসার ধরা পড়লে থেরাপি বা অপারেশনের মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব। 

দেরি হলে অপারেশনের পর রেডিওথেরাপি দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কেমো ও রেডিওথেরাপি একসঙ্গে ব্যবহার করে চিকিৎসা দিতে হয়। সাত থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে থেরাপি শেষ করতে হবে। স্টেজ-১ রোগীদের প্রায় ১০০ শতাংশ ভালো করা সম্ভব। স্টেজ-২-এ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, স্টেজ-৩-এ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ, স্টেজ-৪-এ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ রোগী ভালো হয়। যত দেরি হবে, তত রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা কমে যাবে। 

রেডিয়েশনে যে ক্ষতি হয়, সেটা চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব। সরকারি হাসপাতালে রেডিয়েশনের খরচ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। বেসরকারি পর্যায়ে এটা ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। সব বিভাগীয় শহরে রেডিওথেরাপি সেন্টার করার উদে্যাগ আছে। জরায়ুমুখের ক্যানসার নির্মূলে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার কমিটি থাকা দরকার। একই সঙ্গে সবাই মিলে সচেতনতা সৃষ্টি করা একটি বড় কাজ। 

ফারহানা লাইজু 

আজকের এই আলোচনা অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে ওজিএসবির সঙ্গে থাকতে পেরে আমরা গর্বিত। জরায়ুমুখ ক্যানসারের অনেক বিষয়  নিয়ে আলোচনা হলো। এই ক্যানসার প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়। প্রতিরোধ করতে পারলে নির্মূল করা সম্ভব হবে।

ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস লি. প্রথম থেকেই  নতুন ওষুধ উৎপাদনে কাজ করছে এবং বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ২০১১ সালে আমরা প্রথম ভ্যাকসিন উৎপাদন করি। তখন থেকেই আমাদের চেষ্টা ছিল জরায়ুমুখ ক্যানসারের ভ্যাকসিন উৎপাদন। 

অনেক চেষ্টার পর ২০২২ সালের জুলাই মাসে প্যাপিলো  ভ্যাক্স নামে আমরা জরায়ুমুখ ক্যানসারের ভ্যাকসিন বাজারজাত করতে সক্ষম হই। এই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলে  আপনাদের পাশে থেকে যেন জনগণের সেবা করে যেতে পারি, এটাই আমাদের উদ্দেশ্য।

গুলশান আরা

ওজিএসবি, ইনসেপ্‌টা ফার্মাসিউটিক্যালস লি. ও প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আলোচকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করছি।

সুপারিশ

  • জরায়ুমুখের ক্যানসার রোধে কিশোরীদের অবশ্যই এইচপিভি ভ্যাকসিন দিতে হবে। 

  • বছরে প্রায় আট হাজার নারীর জরায়ুমুখের ক্যানসার হয়। তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। 

  • জরায়ুমুখের ক্যানসারে প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী মারা যান। প্রতিরোধের উদ্যোগ দরকার।  

  • জরুরি ভিত্তিতে গাইনিকোল-জিস্টদের ক্যানসার চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সারা দেশে যেন এ চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে।

  • জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। 

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ৵ অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই ক্যানসার রেজিস্ট্রি তৈরি করতে হবে। 

  • এইচপিভি-ডিএনএ পদ্ধতির পরীক্ষা ব্যয়বহুল। এ ব্যয় কমাতে হবে। 

  • সারা দেশে ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী মেয়েদের এইচপিভি টিকা দিতে হবে।