গোলটেবিল বৈঠক
পরিবার পরিকল্পনা কাজে সমন্বয় জরুরি
‘শহর এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা: অংশীজনদের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ’ শীর্ষক বৈঠকের আয়োজন করে সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো।
দেশের শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও জনসংখ্যা স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু নগরের নিম্নবিত্ত এলাকায় উচ্চ প্রজননহার এবং পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতির অভাব উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতায় মানুষ মানসম্মত সেবা পাচ্ছে না। ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। দাতা সংস্থার প্রকল্প শেষ হলেও সরকারি দায়বদ্ধতা শেষ হয় না। তাই অর্থের অজুহাতে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার থেকে পেছানো যাবে না। উপকরণের ঘাটতি দূর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে জনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
‘শহর এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা: অংশীজনদের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো উঠে আসে। গতকাল রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। দ্য চ্যালেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহযোগিতায় গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো।
বৈঠকে শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবার নিম্নমুখী সূচক ও পেছনের কারণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) মর্জিয়া হক। তাঁর মতে, কেবল সূচক বিশ্লেষণ নয়, বরং সেবার মান ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো নিরসন এখন সময়ের দাবি।
সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নিয়ে ধোঁয়াশায় শহরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ভোগান্তি এখনো আগের মতো উল্লেখ করে মর্জিয়া হক বলেন, যেসব মানুষ শহরে নিয়মিত বসবাস শুরু করছে, তাদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব রয়েছে। অনেক মানুষ প্রাথমিক সেবার জন্য স্থানীয় ফার্মেসির ওপর নির্ভরশীল হলেও তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মর্জিয়া হক আরও উল্লেখ করেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিকল্পিত উদ্যোগ থাকলেও বিভিন্ন বাধায় সেটার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। যার প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটা অন্যতম। শহুরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকে না উল্লেখ করে মর্জিয়া হক বলেন, এটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা না করলে আগামী দিনে শহরাঞ্চলে পরিবার পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্যের টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে
শহরাঞ্চলের পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বর্তমানে স্থবিরতা বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস চৌধুরী। তাঁর মতে, সংকট কাটাতে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনকে একটা ভালো ভূমিকা রাখতে হবে। সে জন্য তাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালনাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।’ তিনি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এই স্থবিরতা কাটানো সম্ভব বলে মত দেন।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ১৫-১৬ বছর বয়সী কিশোরীদের গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। বক্তব্যে তিনি শহুরে শ্রমজীবী নারী ও বস্তিবাসীর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা, ধর্মীয় ও সামাজিক বাধা দূরীকরণ, স্বনির্ভরতা ও হেলথ ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠনের পরামর্শ দেন।
দেশের দ্রুত বর্ধনশীল নগর জনসংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন চট্টগ্রাম সিটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমাম হোসেন। তিনি নগর স্বাস্থ্য কৌশলের অস্পষ্টতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দূর করা, বেসরকারি চিকিৎসকদের ভূমিকা আবার মূল্যায়ন ও সমন্বিত গাইডলাইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য খাতের অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের চিফ অব পার্টি ইমরানুল হক। এতে তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে প্রথমবার দেশে প্রজননহার বেড়েছে। ২০২২ সালে পরিবারপ্রতি সন্তানের সংখ্যা ছিল ২ দশমিক ৩। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪। প্রজননহার সবচেয়ে বেশি শহরের বস্তি এলাকায়। শহরে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, অভিবাসন, বস্তি ও অপরিকল্পিত বসতি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। এতে গত ৩০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে অর্জিত সাফল্যগুলো ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম। তিনি দেশের টেকসই উন্নয়নে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যা প্রসঙ্গকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে বাজেটে পরিবার পরিকল্পনা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ গ্রহণের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
নগরীর ভাসমান ও বস্তিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। পরিবার পরিকল্পনায় বেসরকারি সংস্থানির্ভর প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই কর্মকর্তা বলেন, প্রজেক্ট শেষ হয়ে গেলে সেবাগুলো যাতে বন্ধ হয়ে না যায়। কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টেকসই ও বিশেষায়িত নগর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের আহ্বান জানান সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহেদা ফিজ্জা কবির।
বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে জোরালো ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানান এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দীন খান।
সমন্বিত নগর স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি নিশ্চিতের মাধ্যমে বর্তমান স্থবিরতা কাটানোর তাগিদ দেন আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সাইদ রুবায়েত।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ইউনিটের সহকারী প্রধান মো. আবুল কাশেম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগরস্বাস্থ্য প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডা. সাদিয়া আফরোজ, নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলি, সিডার স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ জহিরুল ইসলাম, ইউএনএফপিএর নগরস্বাস্থ্যের প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট আজমল হোসেন, হিস্প বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হান্নান খান, সাজেদা ফাউন্ডেশনের উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক এবং যুব প্রতিনিধি খুশি রবি দাশ।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।