পাহাড়ে জুমচাষের গুরুত্ব: বাস্তবতার আলোকে করণীয়

জাবারাং কল্যাণ সমিতি ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘পাহাড়ে জুমচাষের গুরুত্ব: বাস্তবতার আলোকে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৬ আগস্ট ২০২৬ রাঙামাটির একটি হোটেলে।

‘পাহাড়ে জুমচাষের গুরুত্ব: বাস্তবতার আলোকে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরাছবি: সুপ্রিয় চাকমা

দীপেন দেওয়ান

সংসদ সদস্য, পার্বত্য রাঙামাটি

জুমচাষ সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর একটি চাষব্যবস্থা। তাই এটিকে শুধু কৃষি হিসেবে নয়, পরিবেশ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহ্য হিসেবে দেখতে হবে।

সমতলের কৃষির সঙ্গে পাহাড়ের জুমচাষের তুলনা করা ঠিক হবে না। পাহাড়ের বাস্তবতায় ধানের পাশাপাশি নানা ধরনের ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুমচাষকে অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ করা গেলে এর সম্ভাবনা অনেক বাড়বে। জুম পাহাড়ে উৎপাদিত রাসায়নিকমুক্ত পণ্যের মূল্য তুলনামূলক বেশি, বাজারেও এর চাহিদা ব্যাপক। সঠিকভাবে বাজারজাত করা গেলে এটি পাহাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

জুমচাষ আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। তাই এ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এর ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। এটি আমাদের অধিকার, আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও একটি অংশ। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রচারণা ও উদ্যোগের অভাবে আমরা সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।

জুমচাষকে আরও জনপ্রিয় ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। গবেষক, কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ, কৃষি মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাহাড়ের বাস্তবতা বিবেচনায় জুমচাষকে উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে আমি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত।

রাজা দেবাশীষ রায়

চিফ, চাকমা সার্কেল

জুমচাষকে কৃষিপদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি ও প্রণোদনার আওতায় আনার দাবির সঙ্গে আমি একমত। তবে জুমচাষকে শুধু কৃষি হিসেবে দেখলে হবে না; বন, জীববৈচিত্র্য, বন্য প্রাণী, পাখি, মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতিকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলেই এর প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব।

দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে জুমকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। জুমচাষ টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু কৃষিবিদ নয়, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী—সবার গবেষণা প্রয়োজন।

কেন মানুষ এখনো জুমচাষ করছে, শ্রমসংকট, অভিবাসন, পারিবারিক পরিবর্তন কিংবা ‘মালেইয়া’ ‘লাক্সা’ ও ‘বালা’র মতো পারস্পরিক শ্রমবিনিময়ের ঐতিহ্য কীভাবে বদলাচ্ছে—এসব না বুঝে জুমচাষের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।

জুমচাষের সবচেয়ে বড় অবদান শুধু উৎপাদনে নয়; পুষ্টিনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও বহু দেশীয় ঔষধি উদ্ভিদ সংরক্ষণেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। তাই প্রদর্শনী প্লট, বীজ সংরক্ষণ, স্থানীয় জাতের বৈচিত্র্য রক্ষা এবং নিয়মিত গবেষণার উদ্যোগ নিতে হবে।

বাজারব্যবস্থার কারণেও জুমচাষে পরিবর্তন এসেছে। চাহিদার কারণে আদা, হলুদ ও ধান্য মরিচের মতো ফসল বেশি উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ দুর্গম এলাকার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও বাজারে পৌঁছানোর বাস্তবতা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। নীতিনির্ধারণেও এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

কাজল তালুকদার

চেয়ারম্যান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি এমন যে, এখানে জুমচাষ কোনো বিকল্প নয়; বরং প্রয়োজন। কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর অনেক জুমের জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় কিছু পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু জুমচাষ শেষ হয়ে গেছে—এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। আমি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এখনো জুমচাষের ধারাবাহিকতা দেখেছি।

ব্রিটিশ আমল থেকে বন বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জুমচাষকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ এটি পাহাড়ের মানুষের জীবন, খাদ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জুমচাষে পরিবর্তন আসবে, নতুন জাতের ফসলও আসবে। কারণ, মানুষ বেশি উৎপাদন ও আয়ের পথ খুঁজবে। তবে জুমের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বাদ অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

জুমচাষের অনেক বৈজ্ঞানিক দিক রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জুমের ছাই প্রাকৃতিক সার ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। অথচ জুমচাষকে দায়ী করে ভূমিধস বা পরিবেশ ধ্বংসের মতো অভিযোগ তোলা হলেও এর পক্ষে যথেষ্ট গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ আমরা দেখি না।

স্থানীয় জাত সংরক্ষণের জন্য সিড ব্যাংক গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে জুমের উৎপাদনকে জাতীয় কৃষি উৎপাদনের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করে জুমচাষিদের স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় তাঁরা সরকারি সহায়তা, ব্যাংকঋণ বা কৃষির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাই জুমচাষিদের তালিকা করে কৃষক কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জুমচাষ পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আদা, হলুদসহ বিভিন্ন জুমের ফসল ইতিমধ্যে বাজারে মূল্য তৈরি করেছে। তাই গবেষণা, নীতিগত স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে জুমচাষকে আরও শক্তিশালী করা উচিত।

নিরূপা দেওয়ান

সাবেক সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ আজ নানা সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে পাহাড় ও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই জুমচাষ টিকে ছিল। এখনো জুমচাষকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, জুমচাষিরা সরকারের কোনো প্রণোদনাও পান না।

অথচ পাহাড়ধস বা পরিবেশগত নানা সংকটের জন্য প্রায়ই জুমচাষকে দায়ী করা হয়, যা আমাদের নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

জুমের বিভিন্ন দেশীয় ধান ও বীজের বৈচিত্র্য সংরক্ষণে আমরা যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পারিনি। অভাবের কারণে অনেক সময় মানুষ সংরক্ষণের বীজও খেয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। তাই রাইস ব্যাংক, সিড ব্যাংক ও দেশীয় বীজ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

জুমচাষ নিয়ে একটি গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। নতুন প্রজন্ম কেন জুম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেটিও গবেষণার বিষয়। তারা নতুন পেশায় যাবে, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু জুম যে আমাদের জীবন–জীবিকা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের অংশ—এই বোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করতে হবে।

জুমচাষিদের জীবন–জীবিকা রক্ষায় সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। জুমচাষকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষকদের উপযুক্ত সহায়তা ও পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বছরের একটি বড় সময় তাঁদের আয়ের সুযোগ থাকে না, তাই এই বাস্তবতা বিবেচনায় নীতিগত সহায়তা জরুরি।

গবেষণা, সংরক্ষণ, সরকারি স্বীকৃতি ও গণসচেতনতার মাধ্যমে জুমচাষের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাহলে শুধু জুমচাষ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন–জীবিকা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব সংরক্ষিত হবে।

ড. খালেদ মিজবাহউজ্জামান

অধ্যাপক, বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

আমি দীর্ঘদিনের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জুমচাষ শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; এটি পাহাড়ের মানুষ, স্থানীয় সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জীবনব্যবস্থা। তাই জুমকে আমি তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি—জুতসই, লাগসই ও টেকসই। পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা, মানুষের জীবন–জীবিকা ও পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে জুমচাষ এখনো সবচেয়ে উপযোগী ব্যবস্থা।

তবে বাস্তবতা বদলেছে। আগে একটি জুমের জমি ২০ থেকে ২৫ বছর পতিত রেখে আবার চাষ করা হতো। এখন সেই আবর্তকাল কমে যাওয়ায় মাটির উর্বরতা, অণুজীব ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ কমছে। অন্যদিকে মানুষের আয় বাড়ানোর প্রয়োজন, বাজারের চাহিদা ও উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে হাইব্রিড জাত, সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও বেড়েছে। এটিকে মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।

জুমের স্থানীয় ফসলগুলো ভূমির নিজস্ব সম্পদ। এসব স্থানীয় জাত সংরক্ষণ না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করা কঠিন হবে। তাই বীজ সংরক্ষণ, স্থানীয় শস্যের পরিচিতি বৃদ্ধি ও নতুন প্রজন্মকে এসব সম্পদের গুরুত্ব জানানো জরুরি।

জুমচাষ কোনো দয়ার বিষয় নয়; এটি পাহাড়ের প্রয়োজন থেকে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা। স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় শস্য সংরক্ষণের স্বার্থেই জুমচাষকে টিকিয়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের বাস্তবতা বিবেচনায় ভূমি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে জুমচাষকে আরও টেকসই করার উদ্যোগ নিতে হবে।

জুয়াম লিয়ান আমলাই

সভাপতি,

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার আন্দোলন, বান্দরবান

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে জুমচাষ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জুম হারিয়ে গেলে আমাদের সংস্কৃতিরও বড় একটি অংশ হারিয়ে যাবে। আমি নিজেও একটি জুমিয়া পরিবারের সন্তান। দীর্ঘদিন নিজে জুমচাষ করেছি বলেই এর বাস্তবতা আমি কাছ থেকে দেখেছি।

দুঃখের বিষয়, জুমচাষকে প্রায়ই বন ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। আমি এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই। কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক অবশ্যই আছে, কিন্তু শুধু জুমচাষকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এ বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

জুমচাষের নিজস্ব একটি সুসংগঠিত পদ্ধতি রয়েছে। বৃষ্টির সময়, ধান, ভুট্টা, তুলা ও তিলের বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার এবং ধাপে ধাপে ফসল পরিচর্যা—সবকিছুই নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। বিশেষ করে তিল চাষের ক্ষেত্রে সময়মতো সংগ্রহ করতে না পারলে মৌসুমি বৃষ্টিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় এনে জুমচাষের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আমার প্রত্যাশা, জুমচাষকে গুরুত্ব দিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। তবে সেই উন্নয়ন এমন হতে হবে, যাতে জুমের নিজস্ব ব্যবস্থা, এর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা অক্ষুণ্ন থাকে।

জুমচাষ শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; এটি পার্বত্য জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের অংশ। তাই জুমচাষের বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে সমানভাবে বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করা উচিত।

নাইউপ্রু মারমা মেরি

সদস্য, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ

জুমচাষ একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও ঐতিহ্য মেনে পরিচালিত হয়। এর সঙ্গে আমাদের শিকড়, খাদ্যাভ্যাস, জীবনধারা, পূজা-পার্বণ এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ গভীরভাবে জড়িত। নবান্ন উৎসব ঘিরে যে আনন্দ ও সামাজিক বন্ধন ছিল, তা আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অনেকে এখনো জুমচাষকে পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু এই ধারণার বিপরীতে যথেষ্ট তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও প্রচার হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের গবেষক, রাজা, সমাজনেতা এবং জুমচাষ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের উদ্যোগে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন যে জুমচাষকে এককভাবে পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ী করা ঠিক নয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে এ বিষয়ে নিয়মিত সংলাপ হওয়া দরকার।

জুমচাষ এখন অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, আয়ের সংকট এবং পরিবর্তিত বাস্তবতায় অনেকেই এই পেশা থেকে সরে যাচ্ছেন।

তাই এখনো যাঁরা জুমচাষের সঙ্গে যুক্ত আছেন, তাঁদের শনাক্ত করে কীভাবে কার্যকর সহায়তা দেওয়া যায় এবং জুমচাষকে টিকিয়ে রাখা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

জেলা পরিষদ, সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আলোচনা, সংলাপ ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে জুমচাষকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ, এটি শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; আমাদের কমিউনিটির জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই জুমচাষের গুরুত্বকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এর ধারাবাহিকতা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।

বিপ্লব চাকমা

প্রধান, জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, এসআইডি সিএইচটি, ইউএনডিপি

২০০১ সালে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে জুমচাষিদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি দেখেছি, প্রায় শতভাগ জুমচাষি সুযোগ পেলে জুমচাষ ছেড়ে অন্য জীবিকায় যেতে চান। কারণ, শুধু জুমচাষের আয় দিয়ে একটি পরিবারের সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ সম্ভব হয় না। বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় তাঁরা বাধ্য হয়েই জুমচাষ করে থাকেন।

বর্তমানে ধীরে ধীরে অনেক জুমের জমি বাগানে রূপান্তরিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক চাহিদাই মানুষকে সেই পথে নিয়ে যাচ্ছে। তাই যদি আমরা জুমচাষকে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চাই, তাহলে শুধু আবেগ দিয়ে হবে না; কার্যকর নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।

জুমচাষিদের এখনো কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁরা কৃষকদের জন্য নির্ধারিত নানা সরকারি সুবিধা ও প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত। অথচ কৃষি যেহেতু পার্বত্য জেলা পরিষদের হস্তান্তরিত বিষয়, তাই জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জুমচাষিদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া সম্ভব। যেমন মৎস্যজীবীরা কার্ড ও প্রণোদনা পান, তেমনি জুমচাষিদের জন্যও আলাদা সহায়তা চালু করা যেতে পারে।

বান্দরবানের মৌজাগুলোতে হেডম্যানদের কাছে কারা জুমচাষ করেন, তার তালিকা রয়েছে। ফলে প্রকৃত জুমচাষিদের শনাক্ত করা কঠিন নয়।

অশোক কুমার চাকমা

নির্বাহী পরিচালক, মোনঘর    

আগে জুমে নানা জাতের ধান, শস্য, সবজি ও মসলা চাষ হতো। কিন্তু আজ দেশীয় ধানের বৈচিত্র্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় বেশি ফলনের আশায় খরাসহিষ্ণু বা উচ্চফলনশীল জাতের ধান ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সঙ্গে কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণের ব্যবহারও বেড়েছে। এটি কোনো আদর্শ বিকল্প নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন। কারণ, পাহাড়ে মানুষকে কোনো না কোনোভাবে চাষ করতেই হবে, খাদ্য উৎপাদন করতেই হবে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা নীতিগত। জাতীয় কৃষিনীতি এখনো জুমচাষকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে জুমচাষিরা সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন কৃষি ও জুমচাষ হস্তান্তরিত বিষয় হলেও জুমচাষিদের জন্য কার্যকর উদ্যোগ বা বাজেট বরাদ্দ খুবই সীমিত।

জুমচাষ টিকিয়ে রাখতে হলে নীতিগত স্বীকৃতির পাশাপাশি গবেষণা অপরিহার্য। কোন ফসল কোন পাহাড়ি এলাকায় উপযোগী, কীভাবে দেশীয় জাত সংরক্ষণ করা যাবে এবং খাদ্য ও অর্থকরী ফসলের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব—এসব বিষয়ে গবেষণা করতে হবে। আমি আশা করি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে এবং জুমচাষিদের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত হবে।

সুচরিতা চাকমা

নির্বাহী পরিচালক, প্রগ্রেসিভ

জুম শুধু ধান উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধান কাটার পর ‘রাইন্যা’পর্যায়ে এক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি সংগ্রহ করা যায়। লাউ, মরিচসহ নানা ফসল জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগে জুমচাষিরা ভালো জাতের বীজ সংরক্ষণ করে পরের বছরের জন্য রেখে দিতেন।

সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগগুলোর মাধ্যমে জুম এলাকার জন্য সিড ব্যাংক গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে জুমচাষিদের তালিকাভুক্ত করে তাঁদের সংরক্ষিত বীজ কোম্পানির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেলে তা আয়বর্ধনমূলক উদ্যোগ হিসেবেও কাজ করবে।

জেলা পরিষদ ও কৃষি বিভাগের মাধ্যমে জুমচাষিদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরির বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে জুমচাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। অনেক সময় প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবে তাঁরা এমন কিছু কাজ করেন, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব জুমচাষের কৌশল তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার।

পাশাপাশি ‘রাইন্যা’সহ জুমচাষের নানা ঐতিহ্যবাহী ধারণা ও পরিভাষাও সবার কাছে পরিচিত করা প্রয়োজন।

দীনেন্দ্র ত্রিপুরা

নির্বাহী পরিচালক, তৈমু

সম্প্রতি একটি কর্মশালায় কৃষি বিভাগ, বন বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। সেখানে কৃষি বিভাগের একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে জুমচাষ সম্পর্কে তাঁর পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।

বাস্তবে জুমচাষিরা এখনো নিজেদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেই চাষাবাদ করে আসছেন। কিন্তু তাঁদের সহায়তায় সরকারের কোনো কার্যকর কারিগরি সহায়তা বা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেই।

আজ জুমচাষ এমন এক সংকটে পৌঁছেছে যে এর অস্তিত্বই বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জুমচাষ নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত জরুরি।

গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত এই চাষাবাদ পদ্ধতিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

জুমচাষকে পরিবেশের জন্য যতটা ক্ষতিকর বলা হয়, বাস্তবে সেগুন চাষ বা সীমান্ত সড়ক নির্মাণের তুলনায় তার প্রভাব বেশি নয়। জুমচাষের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সরকারি সহযোগিতার বিকল্প নেই।

গবেষণা, কারিগরি সহায়তা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে জুমচাষকে টিকিয়ে রাখা এবং পাহাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা ও ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

লালসা চাকমা

নির্বাহী পরিচালক, কাবিদাং   

দেশীয় বীজ সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগে আলাদা কোনো সিড ব্যাংক ছিল না। কুমড়া, লাউসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হতো, এমনকি বাঁশের চুঙার ভেতরও রাখা হতো। কিন্তু এখন অনেক দেশীয় বীজ হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

জুমচাষিদের কাছ থেকে জেনেছি, জুমচাষে জায়গা নির্বাচন, বড় গাছ সংরক্ষণ ও ছড়ার দুই পাশে গাছ না কাটার মতো নিয়ম প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। আবার জুমের ছাই যে ফসলের জন্য উপকারী, মরিচগাছে আগুনের চুলার ছাই ব্যবহার করে আমি নিজেও তার সুফল পেয়েছি। 

নাগাল্যান্ডে একটি সাংস্কৃতিক মেলায় গিয়ে দেখেছি, তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নানা বীজ সংরক্ষণ করে প্রদর্শন করছে। আমাদেরও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অনেক দিন পর ‘ক্যাচবিচি’ খাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এমন অনেক দেশীয় বীজ এখন হারিয়ে যাচ্ছে। তাই জুমচাষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে দেশীয় বীজ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

ভবতোষ দেওয়ান

সহসভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্ক   

বর্তমানে আমাদের মৌজায় জুমচাষ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় জুমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা দেশীয় ধানের বীজই ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন সেই বীজ আর সহজে পাওয়া যায় না; এর জায়গা দখল করছে হাইব্রিড বীজ। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে জুমে গিয়ে দেখেছি, জায়গা নির্বাচন ও জমি প্রস্তুতের পর ধানের সঙ্গে তিল, কলা, মিষ্টিকুমড়া, কাঁকরোলসহ নানা ফসলের বীজ একসঙ্গে বপন করা হতো। একই জমিতে এত বৈচিত্র্যময় ফসলের চাষই ছিল জুমের সবচেয়ে বড় শক্তি ও বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। বেশি লাভের আশায় অনেক কৃষক ধানের বদলে ভুট্টা, মিষ্টিকুমড়া ও অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষ করছেন। সম্প্রতি এমন একজন চাষির সঙ্গে কথা বলেছি, যিনি জুমের জমিতে ভুট্টা চাষ করে লক্ষাধিক টাকার ফসল বিক্রি করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, জুম কি তার ঐতিহ্যগত ধাননির্ভর চরিত্র হারিয়ে নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

প্রভাংশু ত্রিপুরা

জুমচাষি ও সভাপতি, পিআইসি, কাপতলা পাড়া, খাগড়াছড়ি   

আমি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কাপতলা পাড়ার মানুষ। আমাদের এলাকায় প্রায় সবাই জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। সমতলের চাষযোগ্য জমি না থাকায় জুমই আমাদের প্রধান জীবিকা এবং জীবন ধারণের ভিত্তি।

আমাদের জুমে শুধু ধান নয়, প্রায় সব ধরনের ফসল উৎপাদন হয়। শুকনা মাছ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্যই আমরা জুম থেকে পাই। বিভিন্ন ধরনের সবজি, মসলাজাতীয় ফসলসহ নানা শস্য জুমে উৎপাদিত হয়, যা আমাদের পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বর্তমানে জুমচাষের পাশাপাশি আমরা কলা ও বিভিন্ন ফলের চাষও করছি। এসব চাষ আমাদের আয়ের অতিরিক্ত উৎস তৈরি করেছে। তবে জুমচাষই এখনো আমাদের প্রধান ভরসা এবং পাহাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার মূল ভিত্তি।

পাহাড়ের বাস্তবতায় জুমচাষের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এই চাষাবাদকে টিকিয়ে রাখতে এবং জুমচাষিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

ফুলরানি ত্রিপুরা

জুমচাষি, ভাঙামুড়া পাড়া, খাগড়াছড়ি

আমি একজন জুমচাষি। আমাদের জীবিকা মূলত জুমচাষের ওপরই নির্ভরশীল। জুমের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে প্রথমে জমি প্রস্তুত করি। শুকিয়ে গেলে আগুন দিয়ে জমি পরিষ্কার করার পর সেখানে ধান রোপণ করি। তবে জুমচাষ শুধু ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই জমিতে আমরা কলা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, হলুদ, আদাসহ নানা ফসল একসঙ্গে আবাদ করি।

জুমের এই বহুমুখী চাষাবাদ আমাদের পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করে আমরা সংসারের খরচ চালাই।

জুমচাষ পাহাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একই জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনের সুযোগ থাকায় এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করে।

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা

নির্বাহী পরিচালক, জাবারাং কল্যাণ সমিতি

জুম শুধু একটি চাষপদ্ধতি নয়, এটি একটি জীবনব্যবস্থা। এ জীবনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন এলে তার প্রভাব সরাসরি আমাদের জীবন ও জীবিকায় পড়ে। আজকের আলোচনায় যেসব বিষয় উঠে এসেছে, সেগুলোর প্রতি যদি সরকারের সুদৃষ্টি থাকে, তাহলে জুমচাষি ও তাঁদের জীবিকা রক্ষায় আমরা নতুন আশার আলো দেখতে পারি।

জুমকে আরও বেশি একাডেমিক আলোচনায় আনা এবং এ বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। জুমকে ঘিরে এখনো অনেক কিছু জানার সুযোগ আছে। জুমচাষিরা সারা বছর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না। বিশেষ করে চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত তাঁরা সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেন। এ সময় সরকার কীভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সুযোগ রয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে এ সময় জুমচাষিদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হলে তা তাঁদের বড় সহায়তা হতে পারে, এখানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সুপারিশ

  • জুমচাষকে জাতীয় কৃষিনীতি অনুযায়ী কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

  • জুমচাষিদের কৃষক পরিচয়পত্র ও সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে।

  • জুমচাষের জন্য পৃথক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

  • দেশীয় ধান, সবজি ও অন্যান্য জুম ফসলের বীজ সংরক্ষণে সিড ব্যাংক গড়ে তোলা জরুরি।

  • জুম ফসলের ন্যায্যমূল্য, বাজার সংযোগ ও ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে।

  • জুমচাষ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

এছাড়াও গোলটেবিলের আরও অংশ নেন:

অম্লান চাকমা, প্রকল্প সমন্বয়মকারী, গ্রাউস, বান্দরবান।

নুকু চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, রাঙামাটি।

সমীর মল্লিক, পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক, খাগড়াছড়ি।

যুগান্তর বিকাশ ত্রিপুরা, প্রতিনিধি, খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি (কেএমকেএস), খাগড়াছড়ি।

মায়া চাকমা, উপজেলা সমন্বয়কারী, আশিকা ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েটস, রাঙামাটি।

প্রান্ত দেবনাথ, সদস্য, ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, রাঙামাটি।

জয়ন্তী দেওয়ান, খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি, প্রথম আলো।

পার্থ শঙ্কর সাহা, সহকারী বার্তা সম্পাদক, প্রথম আলো।

বিনোদন ত্রিপুরা, কর্মসূচি পরিচালক, জাবারাং কল্যাণ সমিতি, খাগড়াছড়ি।

সঞ্চালক:

ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।