জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সমতা: নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা
বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সমতা: নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
ড. মো. সাইমুম পারভেজ
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়
আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন এলেও নারীর দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। তাই প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে, টোকেন প্রতিনিধিত্ব নয়। এ ধরনের আলোচনা নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের নানা ধরনের সংকটে নারীর ওপর বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। দুর্যোগের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি, বাস্তুচ্যুতি ও চলাচলের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ক্ষেত্রেও নারীদের বেশি ক্ষতির শিকার হতে দেখি। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, কমিউনিটি থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের উপস্থিতি আমরা এখনো সেভাবে দেখতে পাই না।
আমরা শুধু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছি না, এর সমাধানেও কাজ করছি। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় কমিউনিটি পর্যায়ের বৃক্ষরোপণে ৮০ শতাংশ নারীকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা করেছি। প্রতিটি জেলায় স্থানীয় ও দেশীয় জাতের গাছকে উৎসাহিত করা হবে এবং নারীদের হাতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা থাকবে। কোথাও কোথাও রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ—দুই দায়িত্বই নারীদের দেওয়া হবে।
এটিকে শুধু সরকারি প্রকল্প হিসেবে নয়, সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে চাই। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় জেন্ডার, বিশেষ করে প্রজননস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য ও পানি সম্পর্কিত বিষয়গুলো যুক্ত করা জরুরি। উপকূলের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও পানির সংকট ও খাদ্যনিরাপত্তার সমস্যা বাড়ছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক নারী ও পুরুষের কণ্ঠ নিশ্চিত করতে হবে।
এনএপিতে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পানির বিষয় অন্তর্ভুক্তির জন্য আলোচনা করা হবে।
সেখ ফরিদ আহমেদ
যুগ্ম সচিব, ত্রাণ কর্মসূচি অধিশাখা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়
আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৫ হাজার ২০০ কিলোমিটার খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের সঙ্গে যুক্ত। খালের দুই পাড়ের দরিদ্র নারী–পুরুষকে সম্পৃক্ত করে মাছ ও শাকসবজি চাষ এবং সামাজিক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই বছর সরকারি সহায়তায় পরিচালনার পর স্থানীয় মানুষের হাতে এর দায়িত্ব দেওয়া হবে। উপকারভোগীদের ৫০ শতাংশ নারী ও ৫০ শতাংশ পুরুষ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমে ২০টি খালে এটি পাইলট হিসেবে শুরু হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির সঙ্গে পানির সংকট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সামাজিক পটভূমির কারণে উপকূলের নারীরা যে বেশি দুর্ভোগ পোহান, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগেও নারী, শিশু ও বয়স্করা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অঞ্চলভেদে নারীদের বাস্তবতাও ভিন্ন। কোথাও নারীরা মাঠে কাজ করেন, আবার কোথাও সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে তা করতে পারেন না। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শিক্ষার বিস্তার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিতে হবে।
শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। ছেলে ও মেয়ের কাজ আলাদা করে দেওয়ার যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা নারীর সক্ষমতাকে সীমিত করে। এই পরিবর্তন এক দিনে হবে না, তবে পরিবর্তনের শুরুটা আমাদের নিজেদের জায়গা থেকেই করতে হবে।
ফারাহ কবির
কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ
উপকূলীয় সাতক্ষীরা এলাকায় তিন বছরের গবেষণায় আমরা দেখেছি, পানির সংকট ও লবণাক্ততার কারণে নারী-পুরুষ উভয়েই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যে এর প্রভাব রয়েছে।
সুপেয় পানির সংকটে ৯০ শতাংশ পরিবারে স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলেও চিকিৎসা ব্যয় বহনের সক্ষমতা না থাকায় অনেকে সেবা নিতে পারেন না। নারীর এসব ঝুঁকির সঙ্গে জেন্ডার বৈষম্য ও সামাজিক কাঠামোর প্রভাবও যুক্ত হচ্ছে। তাই শুধু জীবিকার বিকল্প বা প্রশিক্ষণ নয়, এসব সামাজিক ও কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে হবে।
উপকূলীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। ওপর থেকে পরিকল্পনা চাপিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। নারীকে কৃষক বা মৎস্যজীবী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে শুধু দায়িত্ব দিলেও হবে না; দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, উপকরণ ও সহায়তা দিতে হবে।
জলবায়ু ও জেন্ডার সম্পর্কিত নীতিমালা ও বাজেট থাকলেও বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ না করলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। পরিবেশ, নারী ও শিশু, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা বাড়াতে তাঁদের স্বীকৃতি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রয়োজনীয় বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।
আজমান আহমেদ চৌধুরী
কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ
সমতার জায়গা থেকেই আমাদের শুরু করা দরকার। পানির সংকট মানবসৃষ্ট হোক বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফল, সংকটটি বাস্তব। কিন্তু পানি সংগ্রহের দায়িত্ব শুধু নারীর—এটি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বিষয়, জলবায়ুর কারণে নয়। সাতক্ষীরায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নারীরা পানি আনছেন, অথচ পুরুষেরা মনে করেন, এটি তাঁদের দায়িত্ব নয়। এই জেন্ডার বৈষম্য ভাঙতে প্রজন্মগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
দুর্যোগের পর কর্মক্ষম পুরুষেরা বাইরে চলে গেলে পরিবারে আয়ের সংকট তৈরি হয়। এ অবস্থায় নারীদের আয় ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। আমরা পানি উদ্যোক্তা তৈরির একটি উদ্যোগ নিয়েছি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পরিশোধনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা নারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাঁদের ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক মূলধনের সুযোগও তৈরি করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারীর স্বাস্থ্যেও পড়ছে। অবকাঠামো নির্মাণেও জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। আমার মনে হয়, শুধু অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করলেই হবে না; নারীর নেতৃত্বের সক্ষমতা তৈরিতেও বিনিয়োগ করতে হবে।
যেসব নারী জলবায়ুর সংকট নিজেরা মোকাবিলা করছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই জেন্ডার বৈষম্যের চর্চা বদলাতে হবে। তাহলেই জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় নারীর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব, ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম
সুন্দরবনের পানির সংকটের সব দায় জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। ফারাক্কার কারণে পানির সংকট, পদ্মা থেকে বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রত্যাহার এবং সুন্দরবন পর্যন্ত পানির প্রবাহ—এসব বিষয়ও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। সাত মাস বৃষ্টি হলেও সেই পানি ধরে রাখতে পারছি না। তাই স্থানীয়ভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কার্যকর উপায় খুঁজতে হবে।
নারী ও কিশোরীর সক্ষমতার ক্ষেত্রেও এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনে কাঁকড়া কমে যাওয়ায় কুমির লোকালয়ে আসছে, নারীরা কুমিরের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। আবার কাঁকড়ার প্রজনন নষ্ট করার সঙ্গে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়টিও আমাদের বুঝতে হবে। বাল্যবিবাহও নারীদের পিছিয়ে দিচ্ছে। বিয়ের পর কোনো মেয়ে স্কুলে ফিরতে চাইলেও সামাজিক নিয়মের কারণে তাকে অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে ফিরতে দেওয়া হয় না। এসব বিষয়ে আমাদের আরও সোচ্চার হতে হবে।
সুন্দরবন রক্ষায় মানুষকে সুন্দরবন থেকে দূরে সরিয়ে দিলেই হবে না। সুন্দরবনের মানুষই এর ওপর নির্ভরশীল এবং তাঁরা সুন্দরবন ধ্বংস করেন না। স্থানীয় অভিযোজন ও জীবনযাপনের পদ্ধতিগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ুর ওপর সব দায় না চাপিয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডের দায়ও স্বীকার করতে হবে। তাহলেই সুন্দরবন ও এর মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
মো. শামসুদ্দোহা
প্রধান নির্বাহী, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে হলে লবণাক্ততার সঙ্গে নারীর এক্সপোজার বা সংস্পর্শের বিষয়টি দেখতে হবে। পানি সংগ্রহ, চিংড়ির পোনা ধরা, কাঁকড়ার ঘেরে কাজসহ নানা কারণে নারীরা দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকেন। এ কারণে তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
নারীরা কেন এত বেশি লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকছেন? এর পেছনে তাঁদের কাজের ধরন, সামাজিক ও আর্থিক বাস্তবতা এবং সস্তা শ্রম হিসেবে নারীর শ্রম ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে। দাদন, ঋণব্যবস্থা ও বনসম্পদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নানা ধরনের শোষণও তাঁদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব সংকটকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখলে হবে না; এখানে শাসনব্যবস্থার সংকটও রয়েছে।
পানিসংকট মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো সমন্বিত ও টেকসই নয়। তাই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে সেবাব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে।
একই সঙ্গে শুধু অবকাঠামোকেন্দ্রিক নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে অভিযোজন পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করলেই নারী ও কিশোরীর ঝুঁকি কমানো এবং সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
লিপি রহমান
নির্বাহী পরিচালক, বাদাবন সংঘ
২০১৬ সালে বাগেরহাটে আমাদের কাজ শুরু হয়। শুরু থেকেই নারীর অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করছি। মোংলায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশেষ করে নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ঝুঁকিতে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে নারীরা কীভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং তাঁদের জীবন-জীবিকায় এর কী প্রভাব পড়ছে—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আনা প্রয়োজন।
এসব ঝুঁকির পেছনে কী কারণ কাজ করছে, কেন তা যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যাচ্ছে না এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে কী করা প্রয়োজন—এসব বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়, এর কারণগুলো বুঝে কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে বের করাও আমাদের লক্ষ্য। এ জন্য আমরা প্রমাণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করছি, যাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়গুলো তুলে ধরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
এই গবেষণার মাধ্যমে উপকূলীয় নারী ও কিশোরীর বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আজকের আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের মতামত ও অভিজ্ঞতা আমাদের গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সহায়ক হবে।
স্নিগ্ধা রেজওয়ানা
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে হলে পানির সঙ্গে জেন্ডারের সম্পর্ক বুঝতে হবে। নারীরা পানি সংগ্রহ ও গৃহস্থালির কাজে যুক্ত থাকায় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে বেশি আসেন। নিরাপদ পানি সংগ্রহের জন্য ঋণে ‘পিংক ট্যাংক’ পেলেও মাসিক ব্যবস্থাপনায় সেই পানি ব্যবহারের সুযোগ তাঁরা পান না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমাদের গবেষণায় দেখেছি, উপকূলীয় নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকিকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন বা লবণাক্ততার ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। চিংড়িঘেরের বিস্তার, দাদন, ঋণব্যবস্থা, বনসম্পদ সংগ্রহ এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থার নানা সংকটও নারীদের দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে থাকতে বাধ্য করছে। বাল্যবিবাহ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও নারীর প্রতি সামাজিক নিয়ন্ত্রণও তাঁদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।
উপকূলের স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেবাব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। শুধু অবকাঠামোকেন্দ্রিক নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে অভিযোজন পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সংকট বিবেচনায় নিয়েই নারী ও কিশোরীর ঝুঁকি কমিয়ে তাঁদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দিলরুবা হায়দার
প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, ইউএন উইমেন
জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে আমাদের পরিমাণগত গবেষণা দরকার। আমরা অনেক বিষয় জানি, কিন্তু সেগুলোর পক্ষে শক্ত প্রমাণ দিতে হলে সংখ্যাভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জেন্ডার কর্মপরিকল্পনাকেও আমাদের গবেষণার আওতায় আনতে হবে। সেখানে থাকা প্রকল্প ও সূচকগুলো পর্যালোচনা করাও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখতে গিয়ে শুধু লবণাক্ততা বা পানির সংকটের দিকে তাকালে হবে না, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবও দেখতে হবে। সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলেই নারী ও কিশোরীর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সামগ্রিক প্রভাব আমরা বুঝতে পারব। এ ছাড়া বনায়নের জন্য উপযুক্ত জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বাংলাদেশের বাঁধগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সামাজিক বনায়নে নারীরা বড় ভূমিকা পালন করেছেন। একইভাবে বনায়ন কার্যক্রমে নারীদের যুক্ত করতে পারলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সমতা ও নারী-কিশোরীর সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হলে গবেষণা, তথ্য ও বাস্তব উদ্যোগ—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
ইকবাল কবীর
সাবেক পরিচালক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ
উপকূলের বাস্তবতার সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মানিয়ে নিতে হবে। মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমরা কমিউনিটির অংশগ্রহণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে জলবায়ু-সহনশীল ও নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবার মডেল তৈরি করেছি।
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এর সঙ্গে পানি, স্বাস্থ্য, জীবিকা, সামাজিক রীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যক্তিগত পরিচর্যায় বৈষম্য এবং চিংড়িঘেরসহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নারীর শ্রম বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় তাঁদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
উপকূলের অনেক নারী জরায়ু প্রোল্যাপ্সের সমস্যা সামাজিক সংকোচে গোপন রাখেন এবং চিকিৎসা নেন না। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাজ করায় তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু অপসারণের প্রয়োজন হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার বৈষম্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আন্তসম্পর্কিতভাবে বিবেচনা করে নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মুমিতা তানজিলা
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
নারীকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ হিসেবে দেখলে তাঁর সক্ষমতার জায়গাটি আড়ালে থেকে যায়। নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা, দৈনন্দিন জীবনে অর্জিত দক্ষতা এবং স্থানীয় জ্ঞান ও চর্চাকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিতে নারীদের শুধু সুবিধাভোগী নয়, সক্রিয় অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
সুন্দরবন এলাকার ৪০০ বনজীবী পরিবারের ওপর আমাদের একটি গবেষণায় দেখেছি, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ায় বননির্ভর মানুষের জীবিকায় প্রভাব পড়েছে। স্থায়ী অভিবাসন কম হলেও মৌসুমি অভিবাসনের ক্ষেত্রে নারীদের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু ও জেন্ডার বিষয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণগত তথ্য নেই। তাই বড় পরিসরে পরিমাণগত গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরি করা জরুরি।
উপকূলের স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেবাব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। শুধু অবকাঠামোকেন্দ্রিক নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে অভিযোজন পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সংকট বিবেচনায় নিয়েই নারী ও কিশোরীর ঝুঁকি কমিয়ে তাঁদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মাহফুজা পারভীন
বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
সচেতনতা বাড়ানো, স্থানীয় জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা গেলে নারীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন। উপকূলের লবণাক্ততার জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলে হবে না। এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ, পানি উত্তোলন এবং স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। লবণাক্ততা দ্রুত কমবে না, তাই এর সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
পানির সংকট মোকাবিলায় পুকুরগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে কৃত্রিম জলাভূমিতে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে যে পরিবর্তন আসছে, তার প্রভাব বননির্ভর মানুষের জীবিকার ওপরও পড়ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা, পানিপ্রবাহ ও জীবিকার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতিনির্ভর সমাধান কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
ডা. জেবুন্নেসা রহমান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
মানসিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর জোর দিতে চাই। অতিরিক্ত গরম, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি নারী ও কিশোরীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। দুর্যোগে গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় নিরাপদ প্রসব ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রয়োজনীয় সবজি বেশি দামে কিনতে হয়, যা নারী ও কিশোরীর পুষ্টিতে প্রভাব ফেলে। খাদ্যসংকটে অপুষ্টির পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জেন্ডার-সংবেদনশীল জলবায়ু অভিযোজন
নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগে মাতৃ ও শিশুসেবার ধারাবাহিকতা, জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও রেফারেল ব্যবস্থার পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পারভীন সুলতানা
নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট
আমি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা থেকে এসেছি। কয়েক বছর আগে ৬০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে একটি জাল কিনেছিলাম। সেই জাল দিয়ে স্বামী-স্ত্রী পশুর নদে মাছ ধরি। মাছ দেওয়ার বিনিময়ে দাদন শোধ করলেও ঋণের চক্র থেকে বের হতে পারছি না। মাছ ধরার পাশাপাশি সংসারের কাজ ও সুপেয় পানি সংগ্রহের বাড়তি চাপ, শারীরিক অসুস্থতা এবং দাদন শোধের চিন্তা সামলাতে হয়।
পশুর নদের পাড়ের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ নদীনির্ভর। আমাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা পানিতে থাকতে হয়। লবণাক্ততার কারণে চুলকানি, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছি। তাপমাত্রা বাড়ায় কৃষিকাজেও সমস্যা হচ্ছে। বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত বেশি মাছ ধরতে হয়, তখন দাদনের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ে। ১ হাজার টাকা নিলে মাছ বিক্রি করে ৬০০ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। ফলে মাছ ধরেও সংসার চালাতে পারছি না।
কুসুম আক্তার
নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট
আমি মোংলার নিচু অঞ্চলের মানুষ। প্রতিদিন দেড়–দুই কিলোমিটার হেঁটে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। সংসার চালাতে বাবার সঙ্গে বাড়ির পাশে দুই বিঘা জমিতে চিংড়ি চাষ করি। দিনের বড় সময় লবণাক্ত পানিতে থাকায় প্রায়ই গায়ে চুলকানি হয়। এক বছরে চিকিৎসায় ১৭–১৮ হাজার টাকা খরচ করেও এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাইনি।
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, তাপদাহ, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ঘরবাড়ি, কৃষি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। পানি আনতে গিয়ে নারীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হয়, অনেক সময় ইভ টিজিংয়ের শিকার হতে হয়। অর্থনৈতিক সংকটে মেয়েদের পড়াশোনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং বাল্যবিবাহও হচ্ছে। চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারায় অনেকে সময়মতো চিকিৎসা ও পরীক্ষা করাতে পারছেন না। সরকারের উদ্যোগ চাই, ব্যবস্থা চাই।
ফারিহা জেসমিন
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাদাবন সংঘ
আমরা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করি। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারীরা কীভাবে সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হচ্ছেন, তা আমরা মাঠে দেখছি।
মোংলায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। পুরুষেরা জেলে পরিচয়পত্র পেলেও নারীরা তা পাচ্ছেন না। ফলে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে নারীদের দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাজ করতে হচ্ছে। এতে চর্মরোগ, গর্ভপাতসহ নানা শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জেন্ডার বৈষম্য কীভাবে নারীর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, সেটিই আমাদের গবেষণার মূল বিষয়। অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কারণে বহু নারী ও কিশোরী একাকী জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে বাণিজ্যিক জলযান ও বহিরাগতদের উপস্থিতি, অন্যদিকে জীবন-জীবিকার সংকট এসবের যৌথ প্রভাবে তাঁরা যৌন নিপীড়ন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও বাল্যবিবাহের উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ছেন। অতএব, নারীদের স্বীকৃতি ও তাঁদের অধিকার সুরক্ষা করা অত্যন্ত আবশ্যক।
সারাবান তহুরা জামান
নারীবাদী আইনজীবী ও উন্নয়ন পেশাজীবী
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলের নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্য, জীবিকা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (এনএপি) নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং পানির লবণাক্ততার প্রভাব আরও বিশদভাবে বিবেচনা করতে হবে। দুর্যোগের সময় মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, রেফারেল ব্যবস্থা ও স্থানীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে জীবিকার সংকটে নারীরা যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হতে বাধ্য না হন, সে জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রান্তিক নারীদের শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্রিয় অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারি সংস্থাগুলোকে আরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জলবায়ু অভিযোজনের অগ্রগতি বুঝতে জেন্ডারভিত্তিক তথ্য ও কার্যকর পর্যবেক্ষণব্যবস্থাও জরুরি।
সুপারিশ:
এনএপিতে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য ও লবণাক্ততার প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করা।
স্থানীয় বাস্তবতা ও জ্ঞানভিত্তিক অভিযোজন পরিকল্পনা করা।
জেন্ডারভিত্তিক তথ্য ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
নারীকে কৃষক ও মৎস্যজীবী হিসেবে স্বীকৃতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।
নারীর নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করা।
বাল্যবিবাহ ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় উদ্যোগ জোরদার করা।
অভিযোজন পরিকল্পনায় নারী ও কিশোরীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
অংশগ্রহণকারী:
ড. মো. সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; সেখ ফরিদ আহমেদ, যুগ্ম সচিব, ত্রাণ কর্মসূচি অধিশাখা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়; ফারাহ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ; আজমান আহমেদ চৌধুরী, কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ; গওহার নঈম ওয়ারা, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব, ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম; মো. শামসুদ্দোহা, প্রধান নির্বাহী, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট; লিপি রহমান, নির্বাহী পরিচালক, বাদাবন সংঘ; স্নিগ্ধা রেজওয়ানা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; দিলরুবা হায়দার, প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, ইউএন উইমেন; ইকবাল কবীর, সাবেক পরিচালক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ; মুমিতা তানজিলা, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি; মাহফুজা পারভীন, বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ডা. জেবুন্নেসা রহমান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; পারভীন সুলতানা, নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট; কুসুম আক্তার, নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট; ফারিহা জেসমিন, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাদাবন সংঘ; সারাবান তহুরা জামান, নারীবাদী আইনজীবী ও উন্নয়ন পেশাজীবী; সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।