গোলটেবিল বৈঠক
যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষায় শিশুর কথা শুনুন, শিশুকে সময় দিন
‘শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ: যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক বৈঠকের আয়োজক ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ও প্রথম আলো। সহযোগী সিডব্লিউসিএস ও নারী মৈত্রী।
যৌন নির্যাতনের ঘটনার অর্ধেকের বেশি ঘটছে ঘরে ও পারিবারিক পরিবেশে। পরিচিতজনের মাধ্যমেই শিশু সবচেয়ে বেশি যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে। তাই যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে শিশুর কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। শিশুকে সময় দিতে হবে, শেখাতে হবে কী কী বিষয় যৌন নির্যাতনের মধ্যে পড়ে। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য উঠে আসে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ: যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে করণীয়’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকটির সহযোগী আয়োজক ছিল সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজ (সিডব্লিউসিএস) ও নারী মৈত্রী। বৈঠকে শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে আইন বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি, সমন্বিত রেফারেল পথ, শিশুবান্ধব বিচার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জবাবদিহি, জাতীয় তথ্যব্যবস্থা, বাজেট ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবা—এই ছয় বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়।
বৈঠকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দিতে সন্তানকে সময় দিতে হবে। সন্তান যৌন নির্যাতন নিয়ে কথা বললে তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। আর অনলাইনে সন্তান যাতে যৌন নির্যাতনের ফাঁদে না পড়ে, সে জন্য সন্তান কী করে সেদিকেও নজর দিতে হবে। শিশুকে যৌনতাবিষয়ক শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষার পাঠ দিতে হবে যাতে সে বুঝতে পারে, কোন কোন বিষয় যৌন নির্যাতনের মধ্যে পড়ে।
এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক (নিবন্ধন ও অডিট) যুগ্ম সচিব মো. খলিলুর রহমান খান বলেন, শিশুকে নিরাপদ রাখা ও শিশুর প্রতি নজর রাখার মধ্যে ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্যাতন প্রতিরোধে জোর দিতে নির্যাতনকারীরও মনঃসামাজিক সমস্যা শনাক্ত করে সমাধানের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে দ্বিধা না করে অভিযোগ করতে হবে, যাতে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। অনেক নিম্নবিত্ত পরিবার অর্থের বিনিময়ে অপরাধীর সঙ্গে আপস করে ফেলে। এসব ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশ কাজ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যই শিশুদের অপ্রস্তুত মুহূর্তের ছবি বিভিন্ন অ্যাপ এ দিয়ে দিচ্ছে। পুলিশ এ ধরনের কিছু অ্যাপ বন্ধ করেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (শিশু সুরক্ষা ইউনিট) সমীর মল্লিক বলেন, শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে উন্নত দেশের মতো পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো বাধ্যতামূলক করা দরকার। কমিউনিটিভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কমিটির (সিবিসিপিসি) কাজ সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগে জোরদার করা উচিত বলে মন্তব্য
করেন তিনি।
সমস্যা সমাধানে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন হলিক্রস কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার শিখা গোমেজ। তিনি বলেন, মায়েরা যেন শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিষয়ে সচেতন করেন, যাতে কোনো ঘটনা ঘটলে শিশুরা চুপ না থাকে।
মাদ্রাসাসহ আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন রোধে প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, শিক্ষকদের পরিবারসহ আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী।
বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা। তিনি বলেন, শিশুরা পরিবারেও নিরাপদ থাকতে পারছে না। দিনে দিনে শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের চেয়ারপারসন সামিয়া আফরিন বলেন, শিশুদের যৌনতাবিষয়ক শিক্ষা দেওয়ার কথা বললে অনেকে ক্ষুব্ধ হন। এর মানে এই নয়, শিশুকে যৌনতা শেখানো হচ্ছে। যৌনতাবিষয়ক শিক্ষা দেওয়া দরকার, যাতে শিশুটি সচেতন হতে পারে যে কোনটি যৌন নির্যাতন এবং কীভাবে সে সুরক্ষা পেতে পরিবারের কাছে ঘটনা প্রকাশ করতে পারে। গণমাধ্যমকেও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের পরিচালক (কর্মসূচি ও পরিকল্পনা) মো. জাহিদুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ শিশু। বাস্তব জগৎ ও অনলাইন—দুই মাধ্যমেই ঘটছে শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন ও শোষণের ঘটনা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংকলিত তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে ২৪১ শিশুধর্ষণ, ১৪১ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে, ২১ শিশুকে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে। ৫৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে ঘর ও পারিবারিক পরিবেশে। অপরাধীদের ১০ জনের ৯ জনই ছিল শিশুর পরিচিত।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ৫৩ শতাংশ শিশু অনলাইনে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে জানিয়েছে। শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—তিন স্তরেই কাজ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান বলেন, শিশুকে শাস্তি দিয়ে শৃঙ্খলা শেখানোর ধারণা একদম ভুল। কোনো শিশু যদি নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষকের কাছে যেতে না চায়, তাহলে ওই শিক্ষকের কাছে শিশুকে জোর করে পাঠানো যাবে না। শিশুর কথা শুনতে হবে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এ দেশে নিযুক্ত পরিচালক (কান্ট্রি ডিরেক্টর) কবিতা বোস বলেন, সম্ভ্রম হারানোর দোহাই দিয়ে শিশুর যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে মা–বাবা চুপ থাকেন। বাল্যবিবাহকেও নির্যাতন হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।
সিডব্লিউসিএসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ইশরাত শামীম বলেন, অনলাইন গ্রুমিং, পাচার ও যৌন শোষণের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
শিশুরা যাতে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করতে সাহস পায়, সে লক্ষ্যে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন নাগরিকতা সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আজিজা আসফিন। সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক (শিশু সুরক্ষা ইউনিট) আবদুল্লা আল মামুন, টেরে দেস হোমস ফাউন্ডেশনের এ দেশে নিযুক্ত উপপরিচালক (ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর) জিনিয়া আফরোজ, টেরেদেস হোমস নেদারল্যান্ডসের কান্ট্রি ম্যানেজার নজরুল ইসলাম, ‘শিশুরাই সব’–এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার, সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটির সহকারী পরিচালক (কর্মসূচি) মো. আকরাম হোসাইন, সবুজের অভিযান বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বেগম, দুই শিশু প্রতিনিধি আবু হেনা রুমি ও ফারহান ইসলাম জনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আক্তার ডলি।
বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।