স্বপ্ন নাকি মৃত্যুযাত্রা? আমাদের করণীয়
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের প্রত্যাশা-২ প্রকল্প এবং প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে ‘স্বপ্ন নাকি মৃত্যুযাত্রা? আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ১৮ এপ্রিল ২০২৬ সিলেটের একটি অভিজাত হোটেলে।
অংশগ্রহণকারী
আরিফুল হক চৌধুরী এমপি, মাননীয় মন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, খান মো. রেজা-উন-নবী, বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব), সিলেট বিভাগ, মো. হাফিজ আহমেদ, পরিচালক, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট; জনি লাল দেব, সহকারী পুলিশ সুপার, ৭ এপিবিএন, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট; শরিফুল ইসলাম হাসান, সহযোগী পরিচালক, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্লাটফর্ম, ব্র্যাক; মো. নাজমুস সাকিব, সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, সিলেট; মো. সালাহ উদ্দিন, উপপরিচালক, বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যালয়, সিলেট; জাকির হোসেন, জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক, সিলেট সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টিটিসি); মাহবুবুল মান্নান চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত অঞ্চলপ্রধান, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, সিলেট; মুকতাবিস-উন-নূর, সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব; মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব; রোকসানা আক্তার, সৌদি আরব ফেরত কর্মী; সুজন মিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ থেকে ফেরত আসা শ্রমিক; সুমরকুমার দাশ, স্টাফ রিপোর্টার, প্রথম আলো সিলেট।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আরিফুল হক চৌধুরী এমপি
মাননীয় মন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
আমি নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর আজকের বৈঠকের মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। এসব তথ্য কীভাবে কাজে লাগানো যায় এবং বিদ্যমান সমস্যা থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব, সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করব।
মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে দেখেছি, প্রতারণার মাধ্যমে অনেক মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন—কখনো প্রতারিত হচ্ছেন, আবার কখনো ঝুঁকি জেনেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বাস্তবতা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে আইন ও নীতিমালা সংস্কার ও কার্যকর কাঠামো তৈরিতে আমরা কাজ করছি। আমরা জানি দেশে–বিদেশে একটি শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট বা চক্র গড়ে উঠেছে, যারা সাধারণ মানুষকে প্রতারণার জালে ফেলছে। বর্তমান সরকার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। লিবিয়াসহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানব পাচারকারী চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের চিহ্নিত করে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাঁদের বিচার করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
চারটি জেলায় বিদেশগামীদের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশের বাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সরকার প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে জাপানের শ্রমবাজারের জন্য এন৪ বা এন৫ স্ট্যান্ডার্ডের (জাপানি ভাষাদক্ষতা পরীক্ষা) ভাষা শিক্ষক আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
দালালদের টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়া থেকে বাঁচাতে সরকার একটি সিস্টেম তৈরির কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ক্যাশ লেনদেনের বদলে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেমের মাধ্যমে প্রবাসীরা সহায়তা পেতে পারেন।
দেশে ১০০টির বেশি প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে, তবে সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে। দ্রুত কাজ শুরু করতে বিদ্যমান অবকাঠামো—মাদ্রাসা, স্কুল ও অব্যবহৃত সরকারি ভবন—ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেসব স্থাপনা ব্যবহারহীন পড়ে আছে, সেগুলো কাজে লাগিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে। কোথায় শ্রমপ্রবণতা বেশি, তা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হবে।
সব পরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। আপনাদের মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ভবিষ্যতেও আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি।
খান মো. রেজা-উন-নবী
বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব), সিলেট বিভাগ
চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক সম্পর্ক ও বিদেশে শ্রমের চাহিদা থাকায় আমাদের দেশের মানুষ কাজের খোঁজে বিদেশে যাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট, যা অনেক সময় পরিসংখ্যানে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। অতীতে দারিদ্র্য কম দেখানোর প্রবণতা ছিল এবং আন্তর্জাতিক সূচকের শর্ত পূরণেও পরিসংখ্যানগত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, ফলে প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়েছে।
বেকারত্বের কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিদেশে কর্মসংস্থানের খোঁজে যান। কিন্তু তথ্যের অভাব ও দালাল চক্রের কারণে অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়। সরকারি জনশক্তি কর্মসংস্থান অফিসের প্রচার ও সক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ভালো কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও ভুল তথ্য ও প্রতারণার কারণে অনেকে অনিরাপদ পথে বিদেশে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। তাই নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
জেলা পর্যায়ের জনশক্তি অফিসে জনবল ও সক্ষমতার ঘাটতির কারণে তথ্য সঠিকভাবে পৌঁছায় না। এতে মানব পাচার, নারী পাচার ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের মতো চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে অভিবাসনব্যবস্থা গড়ে তুললে শোষণ কমানো সম্ভব।
লিবিয়াসহ কিছু দেশে অমানবিক পরিস্থিতিতে মানুষকে নির্যাতন করে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তাই তৃণমূল পর্যায়ে উঠান বৈঠক, মসজিদ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমামদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো এবং বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তথ্য সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দালাল চক্র নির্মূল, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সবাই মিলে কাজ করলে আমরা অবশ্যই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব।
মো. হাফিজ আহমেদ
পরিচালক, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট
ওসমানী বিমানবন্দরে চাকরির সূত্রে আমি প্রবাসীদের আসা-যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আছি। আমাদের কাজের অবস্থান এমন একটি জায়গায়, যেখানে আমরা কখনোই প্রবাসী যাত্রীদের জন্য বাধা সৃষ্টি করি না; বরং কীভাবে সেবা ও সহায়তা আরও সহজ, কার্যকর ও মানবিক করা যায়, সেটিই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
‘স্বপ্ন নাকি মৃত্যুযাত্রা’—আজকের আলোচনার বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। আমি মনে করি, ঝুঁকিমুক্ত জীবনের আশায় আমরা অনেক সময় নিজেরাই আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। সমাজ, পরিবার এবং বিশেষ করে বেকারত্বের চাপ অনেক মানুষকে বাধ্য করছে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে। প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা অনেক সময় মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আজ আমরা যেসব ভুক্তভোগীর কথা শুনেছি, তাদের অনেকেই বিদেশে যাওয়ার জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা, এমনকি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছেন। এই বিপুল অর্থ ব্যয় করেও তাঁরা পথে নানা ধরনের হয়রানি, কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। এসব ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন এবং পরবর্তী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। এই তিন ধাপ যদি যথাযথভাবে কার্যকর করা যায়, তাহলে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত হবে।
একই সঙ্গে আমি মনে করি, দূতাবাসভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কোন দেশে গেলে কত খরচ লাগবে, কী ধরনের কাজ পাওয়া যাবে—এসব তথ্য যদি দূতাবাস থেকে সঠিকভাবে ও সহজভাবে মানুষ জানতে পারে, তাহলে বিভ্রান্তি অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি এই তথ্যগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করাও জরুরি।
সবশেষে আমি বিশ্বাস করি, প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন এবং পরবর্তী তদারকি যদি আরও জোরদার করা যায়, তবে আমরা এই মৃত্যুযাত্রার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই মুক্ত হতে পারব।
শরিফুল ইসলাম হাসান
সহযোগী পরিচালক, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম, ব্র্যাক
মিসর, সুদান, ইথিওপিয়া বা তিউনিসিয়া নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া বা অন্য কোনো দেশও নয়—সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যান। এই প্রথম হওয়া গৌরবের নয়, লজ্জার। এক দশক ধরে এই পরিস্থিতি চলছে। এভাবে যাওয়ার পথে প্রায়ই মানুষ প্রাণ হারায়। এই মানবিক বিপর্যয় রোধ করা জরুরি।
বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল, যেমন মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ ৮-১০টি জেলার মানুষ এভাবে বিদেশ যেতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। পৃথিবীর সব সম্পদ দিয়েও একজন মানুষের জীবন ফেরানো যায় না—এই জীবন রক্ষাই আমাদের আলোচনার মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে এক কোটির বেশি মানুষ বিদেশে আছেন। প্রতিবছর ১০–১২ লাখ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন এবং গত বছর ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। তবে গত পাঁচ দশকেও অভিবাসন খাতে সুশাসন আসেনি। বরং পদে পদে দুর্ভোগ।
খেয়াল করলে দেখবেন, স্থানীয় পর্যায়ে সেবা অপ্রতুল, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো শহরকেন্দ্রিক, ফলে দালাল চক্র সক্রিয়। এতে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার খরচ অনেক বেশি, আয় কম। আবার লোকজন প্রশিক্ষণ না নিয়ে বেশি টাকা খরচ করে যেনতেনভাবে বিদেশে যেতে চায়। সংকট সমাধানে সচেতনতা যেমন জরুরি তেমনি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার।
আমরা অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচার কমাতে কাজ করছি। সচেতন করার চেষ্টা চলছে সারা দেশে। ফেরত আসাদের পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, গত আট বছরে বিমানবন্দরে প্রায় ৩৯ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাদের কাউন্সেলিং ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে।
আমরা নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে চাই। এ জন্য পাঠ্যক্রমে অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা যুক্ত করা, স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা, সর্বোপরি রাষ্ট্রের উদ্যোগ জরুরি। সরকার, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। মানুষের জীবন রক্ষা এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য
জনি লাল দেব
সহকারী পুলিশ সুপার, ৭ এপিবিএন, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট
বর্তমানে আমি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগে কর্মরত আছি। এ দায়িত্ব পালনের সুযোগকে আমি সৌভাগ্য হিসেবে দেখি, কারণ যাঁদের রেমিট্যান্সে আমাদের দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সেই প্রবাসী ভাইবোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে আমরা যুক্ত থাকতে পারছি। তাঁরা যখন বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিদেশে যাচ্ছেন বা দেশে ফিরছেন, তখন তাঁদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
আমাদের জনবল ও সক্ষমতায় বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখানে তিন শ জনের বেশি সদস্য থাকার কথা থাকলেও আমরা আছি প্রায় এক শ জনের মতো। এই সীমিত জনবল নিয়েই আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যাতে কোনো প্রবাসী বা যাত্রী নিরাপত্তাহীনতায় না পড়েন এবং তাঁদের যাত্রা নির্বিঘ্ন হয়।
বিমানবন্দর–সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানব পাচারকারী ও চোরাচালানকারীদের একটি সক্রিয় গোষ্ঠী রয়েছে, যারা সাধারণ যাত্রীদের নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। আমরা অপরাধী চক্রগুলোকে শনাক্ত করার কাজ করে যাচ্ছি।
আমরা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কাজ করছি। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী এবং সাধারণ পোশাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন, যাতে কেউ যাত্রীদের ভুল পথে প্রলুব্ধ করতে না পারে বা মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত কোনো চক্র সক্রিয় হতে না পারে। আমরা এই নজরদারি আরও জোরদার করার চেষ্টা করছি।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রথমবার বিদেশে যাওয়া অনেক মানুষকে বিভিন্ন চক্র সহজ লক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করে, বিশেষ করে মাদকদ্রব্য বা চোরাচালানের কাজে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় তাঁরা বুঝতেও পারেন না যে তাঁরা একটি অপরাধ চক্রের অংশ হয়ে যাচ্ছেন। আমরা এসব ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছি এবং যাত্রীদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং সুরক্ষিত যাত্রা নিশ্চিত করা আমাদের অঙ্গীকার। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
মো. নাজমুস সাকিব
সহকারী পরিচালক, জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, সিলেট
আমাদের অফিসে সরকারি মাধ্যমে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের নিবন্ধন, আঙুলের ছাপ ও তিন দিনের প্রাক্-সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানে বৈধ অভিবাসন, দালাল এড়িয়ে চলা ও নিরাপত্তা বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। বাস্তবে অনেকেই প্রশিক্ষণের আগেই দালাল চক্রে পড়ে। প্রায় ২ হাজার ৯০০ লাইসেন্সধারী এজেন্সি বিদেশে কর্মী পাঠায়; কিন্তু সবাই ঢাকাকেন্দ্রিক। স্থানীয়ভাবে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যকর উপস্থিতি নেই, অথচ এটি জরুরি।
সিলেটে মাত্র কয়েকটি এজেন্সি সরাসরি কাজ করে, বাকিগুলো ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে দালাল হিসেবে কাজ করছে। এতে নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। তাই সেবাকেন্দ্রগুলোতে আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। অনেকে সরাসরি বিদেশে পাঠানোর অনুরোধ করেন, কিন্তু ভিসা ও কর্মসংস্থান এসব এজেন্সির মাধ্যমেই হয়, ফলে দালালের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ২০২৫ সালে আমরা ৩৫ হাজার ২৯০ জন এবং ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৬ হাজার ২৯০ জনের নিবন্ধন ও বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করেছি। মধ্যপ্রাচ্যের জটিলতায় সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
সিলেটে আরও শতাধিক লাইসেন্সধারী এজেন্সি থাকা এবং একটি রেটিং–ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ সহজে সঠিক এজেন্সি বেছে নিতে পারেন।
মো. সালাহ উদ্দিন
উপপরিচালক, বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যালয়, সিলেট
সিলেটের প্রায় সব জেলার মানুষ পাসপোর্টের জন্য আসেন এবং প্রতিদিনই তাঁদের সঙ্গে আমার সরাসরি কথা হয়। আমি লক্ষ্য করেছি, তরুণ ও যুবকদের মধ্যে যেকোনোভাবে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। মধ্যপ্রাচ্যগামী ব্যক্তিদের মধ্যেও একই প্রবণতা রয়েছে। এ কারণে অনেকেই অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন। যাঁদের অধিকাংশেরই কারিগরি দক্ষতা নেই এবং শিক্ষাগত যোগ্যতাও তুলনামূলকভাবে কম।
বর্তমানে পাসপোর্ট সেবার মান আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। সরকারের নতুন নীতিমালার কারণে এখন পাসপোর্ট পাওয়া অনেক সহজ। জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলে এবং বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি হলে; আর ১৮ বছরের নিচে হলে জন্মনিবন্ধন থাকলে সহজেই আবেদন করা যায়। নির্ধারিত ফি ব্যাংকে জমা দিয়ে আঙুলের ছাপসহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যায়।
আমাদের তিন ধরনের সেবা রয়েছে—সাধারণ, জরুরি ও অতি জরুরি। অতি জরুরি সেবায় আজ সকালে বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করলে বিকেলের মধ্যেই ঢাকায় পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব। সাধারণ সেবার ফি পাঁচ বছরের জন্য ৪ হাজার ২৫ টাকা, ১০ বছরের জন্য ৫ হাজার ৭৫০ টাকা; আর অতি জরুরি সেবার ফি ১০ হাজার ৩৫০ টাকা।
সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তৃণমূল পর্যায়ে পরিবার ও অভিভাবকদের নিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শুধু যাঁরা বিদেশে যাবেন, তাঁদের নয়, তাঁদের পরিবারেরও সচেতনতা প্রয়োজন।
যে দেশে যাবেন, সেই দেশের ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা আগে থেকেই অর্জন করা জরুরি। অন্তত ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এই প্রস্তুতি থাকলে প্রতারণা ও ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
জাকির হোসেন
জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক, সিলেট সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)
ভাষা প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিয়ে বলতে চাই, আমাদের কেন্দ্রে ইতিমধ্যে জাপানি, ইতালীয়, কোরিয়ান ও আরবি ভাষার কোর্স চালু আছে এবং নিয়মিত চলছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহায়তায় কিছু প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এর আওতায় ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স এবং খাদ্য প্রস্তুতসংক্রান্ত তৃতীয় স্তরের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব কোর্সে ভাষাশিক্ষার সঙ্গে কারিগরি দক্ষতাও যুক্ত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে ইতালিতে কাজের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
আমাদের কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি; কিন্তু বড় সমস্যা হলো যাঁদের এই প্রশিক্ষণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাঁরা অনেকেই আসেন না; বরং কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এমন শিক্ষার্থীরাই বেশি আসেন, যাদের তাৎক্ষণিকভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে যাঁরা বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশই কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই যাচ্ছেন। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ কোনো দক্ষতা অর্জন না করেই বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। এটি উদ্বেগজনক।
আমি মনে করি, সচেতনতা আরও বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে যেতে হলে একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, তা ভাবা প্রয়োজন। যেমন সৌদি আরবে এখন দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যমে কর্মী নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা অন্য দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও চালু করা গেলে আমাদের কর্মীরা আরও দক্ষ হয়ে বিদেশে যেতে পারবেন এবং প্রতারণার ঝুঁকিও কমবে।
মাহবুবুল মান্নান চৌধুরী
ভারপ্রাপ্ত অঞ্চলপ্রধান, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, সিলেট
বিদেশে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী সরকারি মাধ্যমে বিদেশে যেতে প্রায় ১ লাখ ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাগে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি খরচ করে বিদেশ যাচ্ছেন।
এর একটি প্রধান কারণ হলো বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া। এজেন্সিগুলোও কিছুটা লাভ করতে পারে, তবে সেই লাভ যদি আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। যেখানে সরকারি খরচে ১ লাখ ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিদেশে যাওয়া সম্ভব, সেখানে অতিরিক্ত খরচ মানুষের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় অনেকে আমাদের কাছে এসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার ঋণ নিতে বাধ্য হন, যার মাসিক কিস্তি প্রায় ১৪ হাজার টাকার মতো দাঁড়ায়। বিদেশে গিয়ে অনেকেরই কাজ পেতে চার থেকে পাঁচ মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যে তাঁরা ঋণের বোঝায় আরও বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
দক্ষতা না থাকায় এবং কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে বিদেশে গিয়ে অনেকেই নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। পরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরে এসে তাঁরা পুনর্বাসনের চেষ্টা করেন, যেখানে আরও জটিলতা দেখা দেয়। আমরা বিভিন্ন সময় ৮ শতাংশ সুদের ঋণের মাধ্যমে কিছু সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা সফল হচ্ছে না।
অবৈধ ও অনিয়মিতভাবে বিদেশযাত্রার ক্ষতি কতটা ভয়াবহ, তা এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়। এ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
মুকতাবিস-উন-নূর
সভাপতি, সিলেট প্রেসক্লাব
ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের সাম্প্রতিক মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতির আশায় বিদেশযাত্রা অনেক সময় দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।
বৈধভাবেও, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অনেক কর্মী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি ও বেতন পান না, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন; নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঝুঁকি আরও উদ্বেগজনক, যা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞানের অভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় আমাদের শ্রমিকেরা মূলত নিম্নমানের কাজে যুক্ত থাকেন। প্রতিটি জেলায় ভাষা শিক্ষা ও কাজভিত্তিক ন্যূনতম প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি, যাতে তাঁরা দক্ষ হয়ে ভালো সুযোগ পান।
নতুন শ্রমবাজারও বিবেচনায় নিতে হবে। কিছু দেশে কনস্ট্রাকশন খাতে নির্মাণশ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে। জাপানের মতো দেশে সম্ভাবনা থাকলেও ভাষা শিক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই সুযোগ হারান এবং দালালের ওপর নির্ভরশীল হন।
বিদেশে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থী মূলত কাজের উদ্দেশ্যে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেন, ফলে তাঁরা আইনি জটিলতায় পড়েন। তাই এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বিদেশে অনিয়মিত বাংলাদেশিদের বৈধ করার সুযোগ তৈরি করা গেলে তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব।
মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন
সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব
গত ১০ বছরের একটি চিত্র তুলে ধরলে দেখা যায়, অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, আড়াই লাখের বেশি মানুষ অবৈধ পথে পাচার হয়ে বিদেশে গেছেন এবং অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বন্দী হয়েছেন।
সিলেট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দালালচক্র এবং ঢাকাভিত্তিক সিন্ডিকেট এই অবৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়ার মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এর সঙ্গে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের কিছু গোষ্ঠীও যুক্ত রয়েছে, যারা এই চক্রকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। যদি এই মূল চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে এই অবৈধ অভিবাসন অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব
সিলেটে দেড় শতাধিক ট্রাভেল এজেন্সি লাইসেন্সধারী হলেও বাস্তবে পাঁচ শতাধিক এজেন্সি অবৈধভাবে সক্রিয়, যারা ৮ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে মানুষকে বিদেশে পাঠাচ্ছে। আমি ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় গিয়ে দেখেছি কীভাবে একটি সিন্ডিকেট বাংলাদেশিদের পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে প্রায় ৬০০ জনকে আটক করা হয়।
শুধু টাকার লোভ নয়, শিক্ষার ঘাটতিও এই সমস্যার পেছনে বড় কারণ। সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার দুরবস্থা এবং এসএসসি পর্যায়ে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার মতো চিত্র উদ্বেগজনক। তাই বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে, যারা বৈধভাবে বিদেশে গিয়ে দেশের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনতে পারবে।
সমস্যাগুলো সমাধানে সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।
রোকসানা আক্তার
সৌদি আরব ফেরত কর্মী
আমি সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার বাসিন্দা। সুনামগঞ্জের এক দালালের মাধ্যমে আমি সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। সেখানে কষ্ট করে কিছু অর্থ উপার্জন করি, কিন্তু কাজের জায়গায় নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হই। একপর্যায়ে ঋণ করে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হই।
দেশে ফিরে এসে সামাজিকভাবে আমি অপমান ও অবহেলার মুখে পড়ি। জীবনযাপন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিকভাবে সংসার চালানোও সম্ভব হচ্ছিল না।
এ অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের প্রত্যাশা-২ প্রকল্প আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। তাদের সহযোগিতায় আমি একটি দোকান করতে সক্ষম হই। দোকানের আয় দিয়ে আমি এখন আমার সংসার ভালোভাবে চালাতে পারছি। ধীরে ধীরে আমি কিছুটা স্বাবলম্বী হয়ে উঠি।
এরপর আমি ‘জয়িতা’ পুরস্কারও পাই। আমাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এই পুরস্কার পাওয়ার পর পরিবার ও সমাজে আমার সম্মানও ফিরে আসে।
দালাল চক্র বন্ধে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। এই চক্রের কারণে আমার মতো বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হয়ে জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন এবং চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
এমন একটি নিরাপদ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে আমার মতো আর কেউ দালালের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত না হন এবং বৈধ ও নিরাপদ পথে বিদেশযাত্রা নিশ্চিত করতে পারেন।
সুজন মিয়া
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপফেরত কর্মী
আমি ছাতক উপজেলার সীমতলা গ্রামের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে ওমানে গিয়ে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ করি। সেখানে কিছুদিন পর আকামা নিয়ে সমস্যার কারণে দুবাই চলে যাই, এরপর কাতারে গিয়ে কাজ করি।
পরে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আবার দুবাই ফিরে আসি। আবার ওমান হয়ে ইরান, তুরস্ক, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া ও সার্বিয়া যাই। নানা দেশে টিকে থাকতে অবৈধভাবে কাজ করি। বৈধ কাজের সুযোগ না পেয়ে আবার গ্রিসে ফিরে আসি। এরপর গ্রিস থেকে বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া হয়ে ইতালি পেরিয়ে ফ্রান্সে পৌঁছাই। ফ্রান্সে আমি প্রায় চার বছর আট মাস কাজ করি এবং বৈধ হওয়ার চেষ্টা করি। ট্যাক্স দিয়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও বৈধ কাগজ পাওয়ার আগেই আমি ধরা পড়ে বাংলাদেশে ফেরত চলে আসি।
আমি সব সময় বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার চেষ্টা করেছি। জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন দেশে কাজ করেছি, তবে অনেক জায়গায় কাজের সুযোগ সীমিত ছিল এবং বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সমস্যায় পড়েছি। দেশে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হই এবং একটি পোলট্রি ফার্ম চালু করি।
এরপর অস্ট্রেলিয়ার জন্য ভিসার চেষ্টা করি। এ সময় দালাল ও এজেন্সি ১৭ লাখ টাকা নিয়ে আমাকে ভুয়া ভিসা দিয়েছিল। আমি চাই, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সুপারিশ
১. সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসন ও মানব পাচারবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
২. মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে অভিবাসন ও মানব পাচার যুক্ত করতে হবে।
৩. অসাধু দালাল চক্র ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. সমুদ্রপথে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা গ্রহণ করতে হবে।
৫. লিবিয়া এবং অন্য দেশে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬. বিদেশযাত্রার আগে বাধ্যতামূলক কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণ চালু করা।
৭. জেলা পর্যায়ে রিক্রুটিং এজেন্সির সেবা বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
৮. অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনতে সরকার–নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের সীমা কার্যকর করা।
৯. ফেরত আসা কর্মীদের জন্য পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা বাড়াতে হবে।
১০. অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।