গোলটেবিল বৈঠক
সম্প্রীতির সিলেট গড়ি, সহিংসতা শূন্য করি
এফসিডিওর সহায়তায় ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘সহিংসতা নয়, গড়ি সম্প্রীতির সিলেট’ শীর্ষক গোলটেবিল নির্বাচনী সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় গত ২৭ জানুয়ারি ২০২৫, সিলেটের একটি অভিজাত হোটেলে।
অংশগ্রহণকারী:
খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।
হাবিবুর রহমান, সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও আমির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, সিলেট জেলা।
আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী; সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।
মো. জয়নাল আবেদীন, সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী ও সেক্রেটারি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, সিলেট জেলা।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সভাপতি, সিলেট জেলা বিএনপি এবং সিলেটের ৬টি সংসদীয় আসনের বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনী কাজের সমন্বয়ক।
মাহমুদুল হাসান, সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ), কেন্দ্রীয় কমিটি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), সিলেট।
কিবরিয়া সরওয়ার, মেম্বার সেক্রেটারি, সিলেট জেলা এনসিপি।
সৈয়দা শিরিন আক্তার, সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সিলেট।
মোহাম্মদ জহিরুল হক, উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।
আব্দুর রহমান রিপন, পরিচালক, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
সমর বিজয় সী শেখর, সভাপতি, সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতি।
সাইদুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।
লুবনা ইয়াছমিন, সভাপতি, সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
আবদুল করিম চৌধুরী, সমন্বয়ক, সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন, সিলেট।
আসমা আক্তার, সিনিয়র আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, সিলেট।
আনোয়ার হোসেন, বিশেষ প্রতিবেদক, প্রথম আলো।
সুমনকুমার দাশ, স্টাফ রিপোর্টার (সিলেট), প্রথম আলো।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর
সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
নানান মত ও পরিচয়ের মানুষের সহাবস্থানেই সিলেটের পরিচয়। বাংলাদেশ এখন এমন এক সংকটকাল অতিক্রম করছে, যেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ছাড়া অন্য কোনো পথ গ্রহণযোগ্য নয়। গত দেড় দশকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে ১৮-২০ কোটি মানুষের আর কোনো ভুলের খেসারত দেওয়ার সক্ষমতা নেই। আর পাঁচ-দশ বছর ভুল সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করার মতো সামর্থ্য এই রাষ্ট্রের নেই।
আগামী দিনের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হতে হবে স্থিতিশীলতা অর্জন। আমি আশাবাদী; কারণ, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর আজ দেশের সব রাজনৈতিক দল একটি বিষয়ে একমত—নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে আর কোনো রাজনৈতিক বিভেদ বা সহিংসতা এই দেশের জন্য সহনীয় নয়। সে কারণেই নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজন এবং প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ সীমিত রাখার বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এতে ক্ষমতার পরিবর্তন আর শূন্য-সম খেলার বিষয় থাকবে না।
গণতন্ত্রে বিশ্বাস মানে শালীনতা ও পরিমিতিবোধ মেনে চলা। নির্বাচন মানে জীবন-মরণ লড়াই নয়। ভালো ধারণা ও কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যেতে হবে, কোনো ষড়যন্ত্র বা অশালীন পথ নয়। সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একমাত্র পথ হলো দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার পালাবদলকে নিয়মতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা।
হাবিবুর রহমান
সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও
আমির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, সিলেট জেলা
সম্প্রীতিই সিলেটের সবচেয়ে বড় সম্পদ। বহুদিন ধরে আমরা এই সম্প্রীতি ধরে রেখেছি। সিলেটে সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখতে হলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় থাকলে সিলেটে সামগ্রিক সম্প্রীতি আরও দৃঢ় হবে—এটাই আমার বিশ্বাস।
আজকের বাস্তবতায় আমাদের তরুণদের ভাষা বুঝতে হবে। প্রজন্ম বদলেছে, আর সেই পরিবর্তন বুঝতে ভুল করলে আমরা বড় ভুল করব।
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশ ও সিলেটকে সন্ত্রাস থেকে মুক্ত করা। যদি আমরা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে পারি, তাহলে অন্য সমস্যাগুলো আপনাআপনি গৌণ হয়ে যাবে।
জনসংখ্যা বোঝা নয়—সঠিক নীতিতে এটিকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। পাশাপাশি চা-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, খাসিয়া জনগোষ্ঠীর মানবিক জীবন এবং সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব।
এই নির্বাচনটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। আমি মনে করি, সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনের মানসিকতাই সহিংসতার পথ বন্ধ করতে পারে।
জুলাই গণ আন্দোলনে যারা আমরা শরিক ছিলাম সবাই যেন যার যার পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করি। শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণময় রাষ্ট্র গড়তেই আমরা এই পথে এগোতে চাই।
আরিফুল হক চৌধুরী
সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী; সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
সহিংসতামুক্ত থাকার যে দৃষ্টান্ত সিলেট এত দিন ধরে ধরে রেখেছে, সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি মনে করি, এই অর্জনকে শুধু টিকিয়ে রাখলেই হবে না, এটিকে আরও সমৃদ্ধ ও সুসংহত করতে হবে। সিলেটে সম্প্রীতি আছে, ছিল এবং থাকবে—এই বিশ্বাস আমার রয়েছে।
সিলেট-৪ আসনকে আমি শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখি। দুঃখের বিষয়, গ্যাস-তেলসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে কক্সবাজারের পর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এলাকা হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগ আমি এখনো দেখি না। তাই অতীতের কথা না টেনে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাই জরুরি।
আমার মতে, প্রথম কাজ হওয়া উচিত দ্রুত একটি সম্ভাব্যতা যাচাই ও একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন। কংক্রিট আর নকশার গণ্ডিতে আটকে না থেকে এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ—রাতারগুল, বিছনাকান্দি, সাদা পাথর—এই জায়গাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
দীর্ঘ ড্রাইভওয়ে, সেবাকেন্দ্র ও ন্যূনতম অবকাঠামো গড়ে তুললেই প্রাকৃতিকভাবে নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনোভাবেই যেন সহিংসতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। সম্প্রীতির সিলেট গড়াই আমাদের সবার দায়িত্ব।
মো. জয়নাল আবেদীন
সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী ও
সেক্রেটারি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, সিলেট জেলা
নদী-পাহাড়ে ঘেরা সিলেটের প্রকৃতিই আমাদের মানুষকে স্বভাবত শান্ত রেখেছে। এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী শান্তিপ্রিয়, আর সেই কারণেই সিলেটকে বলা হয় সম্প্রীতির বন্ধনের ভূমি। সামাজিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই। কিন্তু এই শান্ত প্রকৃতির আড়ালে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বৈষম্যের ইতিহাসও আছে, যেগুলোর জন্য আমাদের বারবার সংগ্রাম করতে হয়েছে।
সিলেট বিভাগের গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামোর দিকে তাকালেই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়। একসময় ছয়-আট ফুট প্রশস্ত রাস্তা করার প্রস্তাব থাকলেও দীর্ঘ এক দশক ধরে ডিপিপি অনুমোদনের ফাইল একনেকের টেবিলে আটকে আছে। বাস বা ছোট গাড়ি একসঙ্গে চলাচল করতে পারে—এমন রাস্তার অনুমোদন সিলেট ছাড়া দেশের আর কোথাও আটকে নেই। গত ১৫ বছরে এত মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এই সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সিলেট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। মেঘালয়ের বড় বেসিনের কারণে এখানে প্রথমেই ফ্ল্যাশ ফ্লাড হয়। হাওর উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায় প্রতিবছর ফসল তলিয়ে যায়। এত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও সিলেটে কর্মসংস্থান নেই। বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক। শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থাও দুর্বল।
আমি বিশ্বাস করি, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে এই অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। তবে সবকিছুর আগে প্রয়োজন শান্তি ও সম্প্রীতি। সহিংসতা নয়, ঐক্য আর মানবিক উন্নয়নই হোক সিলেটের ভবিষ্যৎ পথ।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী
সভাপতি, সিলেট জেলা বিএনপি এবং সিলেটের ৬টি সংসদীয় আসনের বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনী কাজের সমন্বয়ক
সম্প্রীতি ও সহিংসতামুক্ত অবস্থান—এই দুই বৈশিষ্ট্য সিলেটকে ঐতিহাসিকভাবেই আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। এখানকার মানুষ বরাবরই সহনশীল, আর সেই সহনশীলতাই আমাদের গর্ব।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আমি দেখছি, অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলই একটি সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী সিলেট গড়ার কথা বলছে। অতীতের ঐতিহ্য লালন করে সামনে এগোনোর যে আকাঙ্ক্ষা, সেটি বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে একটি অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্ব যথেষ্ট নয়; প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। কেন্দ্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সমর্থন ও স্থানীয় দক্ষ মানবসম্পদ—এই দুটির সমন্বয় না হলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আসে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, গত ১৭ বছরে সিলেট কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন পায়নি। বেহাল যোগাযোগব্যবস্থা তার বড় উদাহরণ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার বহুগুণ বেড়েছে অথচ সিলেটের চার জেলায় উল্লেখযোগ্য প্রকল্প নেই, এটা আমাদের বঞ্চনারই প্রমাণ। সিলেটে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বা রাজনৈতিক সন্ত্রাস আমরা চাই না। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা তা প্রতিরোধে কাজ করছি। তবে মাদক, কিশোর গ্যাং, চুরি-ছিনতাই, জুয়া—এসব সামাজিক সমস্যাও বাস্তব। সুযোগ পেলে এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা কাজ করব।
মাহমুদুল হাসান
সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ), কেন্দ্রীয় কমিটি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
ইতিহাস বলে যে নির্বাচন হলেও সিলেটে সহিংসতার পরিমাণ খুবই কম। কারণ, স্থানীয় নেতা থেকে বড় নেতা—সবাই ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দেন। সাধারণ মানুষ চায়, নির্বাচিত ব্যক্তি তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করুক, পরিবারের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করুক আর বিজয়ী হোক বা না হোক, সব প্রার্থী যেন জনগণের জন্য কাজ করে।
সিলেটে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব বেশি; কারণ, তাদের নেতৃত্বে যদি সংহতি থাকে, সহিংসতা বা বিভাজন আর বৃদ্ধি পাবে না।
স্থানীয় জনগণকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে; নির্বাচনকেন্দ্রিক অশান্তি প্রতিহত করতে সচেতন থাকতে হবে। সম্প্রীতি ধরে রাখতে হলে নেতৃত্বকে সক্রিয় হতে হবে, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
রাষ্ট্রের অযত্নে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলো, যেমন যুবকদের কর্মসংস্থান, পর্যটনশিল্প, শিক্ষার সুযোগ—উন্নয়নের পথে যুক্ত করতে হবে। সিলেটকে বৈষম্যহীন, সহিংসতামুক্ত ও সমৃদ্ধিশালী জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষ, স্থানীয় নেতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মিলিতভাবে সিলেটকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে কাজ করতে হবে। সহযোগিতা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করতে পারি, সিলেট হবে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত, যেখানে সহিংসতার কোনো স্থান থাকবে না।
মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), সিলেট
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সিলেটে বড় ধরনের সহিংসতা নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এখানকার সম্প্রীতির বন্ধন ভাঙতে বারবার উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। জোয়ারা বাজারে ফেসবুককেন্দ্রিক উসকানিতে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। চার দিন পর্যন্ত খবর প্রকাশেও বাধা দেওয়া হয়েছে। পরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে আমাদের দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বৈঠকের পর মামলা হয়। এটাই প্রমাণ করে, সিলেটে সহিংসতা স্বাভাবিক নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে উসকে দেওয়া হয়।
মাজারে হামলা, বিচ্ছিন্ন লুটপাট—এসব আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। সিলেটের মানুষ স্বাভাবিকভাবে সাম্প্রদায়িক বা সহিংস নয়, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উসকানিতেই এসব ঘটনা ঘটে।
এই বাস্তবতায় আমি মনে করি, নির্বাচনী রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা জরুরি। উসকানিমূলক ভাষা নয়, শালীন ও যুক্তিনির্ভর প্রতিবাদেই রাজনীতি হওয়া উচিত। দুর্নীতিমুক্ত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় রূপান্তর ছাড়া উত্তরণ সম্ভব নয়। শুধু ভোট নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেটের উন্নয়নে জবাবদিহিই মুখ্য। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে জলাবদ্ধতা, বন্যা, খাল-বিল দখল বন্ধে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষক ও চা-শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষা না করলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।
কিবরিয়া সরওয়ার
মেম্বার সেক্রেটারি, সিলেট জেলা এনসিপি
আমাদের সিলেট অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবেই সহনশীল, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক উসকানিতে মাঝেমধ্যে অপ্রয়োজনীয় সহিংসতা সৃষ্টি হয়। জুলাই ২০২৪ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে নানা সময়ে রাজনৈতিক উসকানি ও গুজব সিলেটবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
আমরা লক্ষ করেছি, সহিংসতা মূলত ক্ষমতার লোভ ও বিবেকহীনতার ফল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে জনস্বার্থে কাজ করা। নাগরিকের বিবেক যদি সক্রিয় হয়, সমাজে পুলিশের প্রয়োজন কমে। সুতরাং রাজনীতিতে বিবেকের ভালো দিককে কাজে লাগানো উচিত, যাতে কেউ খারাপ কাজ করতে না পারে। আমরা নির্বাচনের আগে কাজ করতে চাই—গুজব প্রতিরোধ ও তথ্য যাচাই নিশ্চিত করা নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব কমাতে প্রার্থী ও দলের নিজস্ব নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। আইনের প্রতি আস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সহিংসতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব।
আমাদের লক্ষ্য হলো সিলেটকে একটি শান্ত, সম্প্রীতিশীল ও নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিবেশে উন্নীত করা। জনসাধারণের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুশাসন এবং সচেতন নাগরিকত্বের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করতে পারি, সিলেট হবে সহিংসতামুক্ত, সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ। এতে যুবসমাজের সৃজনশীলতা, শিক্ষার উন্নয়ন ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
সৈয়দা শিরিন আক্তার
সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সিলেট
আমরা চাই একটি সম্প্রীতিশীল বাংলাদেশ, যেখানে নারী, প্রান্তিক ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নিরাপদ থাকবে। নির্বাচনের আগে কখনো কখনো পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক চাপের কারণে এই সম্প্রতি ধাক্কা খায়। চা–বাগানের শ্রমিক, প্রান্তিক নারী—এসব জনগোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন দলের চাপ লক্ষ করা যায়। অনলাইনে নারীদের হয়রানি, ভোটার বা প্রার্থী হিসেবে হুমকি—সবই একটা বড় সমস্যা।
নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও হার-জিতকে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। বড় রাজনৈতিক দলের নেতাদের দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারে শূন্য সহিংসতার নীতি প্রচলন করা, যাতে কেউ আক্রমণের শিকার না হয়। দিন শেষে আমরা সবাই বাংলাদেশের মানুষ। যারা জিতবে বা হারবে—সবাই মিলে দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে।
নারী, প্রান্তিক ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। উচ্চকক্ষে এই জনগোষ্ঠীর স্থান নিশ্চিত করা মানে তাদের চাহিদা ও আশা-প্রত্যাশা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আমরা সব ধর্ম, বর্ণ ও ভৌগোলিক অবস্থার ভেদাভেদ ভুলে মানুষ হিসেবে একসঙ্গে কাজ করে সিলেট ও বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ ও সমৃদ্ধ পরিবেশ গড়তে পারি।
সিলেটের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্প্রীতি বজায় রাখা, সহিংসতাকে অগ্রাধিকার না দেওয়া এবং সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা—এসবকেই আমরা সিলেটের নতুন পরিচয় হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
মোহাম্মদ জহিরুল হক
উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট
নির্বাচন আর সহিংসতা—এই দুই শব্দ পাশাপাশি এলেই সম্প্রীতির প্রশ্নটা সামনে আসে। সহিংসতা একমাত্রিক নয়; এর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, গ্রাম ও ব্যক্তিগত—অনেক স্তর আছে। নির্বাচন যতই কাছে আসে, এই প্রতিটি স্তরেই আশঙ্কা বাড়ে। অতীতের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—সেসব নির্বাচনে উত্তেজনা ছিল, কিন্তু সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ছিল।
নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন ও পরে—এই তিন সময়ে সহিংসতার ঝুঁকি থাকে। জুলাই আন্দোলনের সময় যে অস্ত্র লুট হয়েছে, তার সব উদ্ধার হয়নি। দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেই একধরনের অস্তিত্বগত ভয় কাজ করছে—হারলে সব শেষ হয়ে যাবে। এই ভয় থেকেই সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়। অথচ অতীতে পরাজয় মেনেও দেশ চলেছে, সরকার ও বিরোধী দল কাজ করেছে।
সিলেট সম্প্রীতির অঞ্চল হলেও আমরা চোখ বন্ধ করতে পারি না। সিলেটের বড় অংশ সীমান্তঘেঁষা, সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে অবৈধ উত্তোলন ও প্রাণহানি নিয়মিত ঘটনা। এই বাস্তবতাও নির্বাচনী সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি দেখি তা হলো, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক সৌহার্দ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এখানে যে সহনশীলতা ও সৌহার্দ্য আমরা দেখছি, তা জনগণের সামনে দৃশ্যমান করতে হবে। নির্বাচনে হারলেও দেশ ও উন্নয়নের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দরকার।
আব্দুর রহমান রিপন
পরিচালক, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
বাংলাদেশের মধ্যে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলো সিলেট। এই শহরে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা সবাই একে অপরের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় রেখেছেন। কিন্তু বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর কিছু কার্যক্রমে দেখা গেছে যে এই সম্প্রীতি কিছুটা দূরে সরে গেছে। আমার দৃষ্টিতে সিলেটবাসী এবং ব্যবসায়ীরা চাই শান্তি ও স্থিতিশীলতায় কাজ করতে; তাঁরা সরকারের সঙ্গে ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চান, কোনো ঝামেলা বা হুমকির মধ্যে যেতে চান না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আমরা আশাবাদী ছিলাম দেশ স্থিতিশীলতায় ফিরে আসবে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে আগের সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসছে। আমরা যেভাবে বিগত সরকারের আমলে ট্যাক্স বা ভ্যাটের জটিলতায় ভুগতাম, এখন আবার সেই একই ঝামেলার দিকে যাচ্ছি। এখনো তেমন কোনো পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি না, সামনে কী হবে, তা নিয়ে সত্যিই সংশয় কাজ করে।
রাজনীতিতে হিংসা ও প্রতিহিংসার পথ থেকে বের হতে হবে। নির্বাচন মানেই একজন জিতবে, অন্যজন হারবে—কিন্তু পরাজিত প্রার্থীরও মিলেমিশে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। এই মানসিকতা ছাড়া সুন্দর, শান্তিপূর্ণ সিলেট গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আমরা চাই ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক জীবন শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হোক। নির্বাচনও হোক ন্যায্য, সহিংসতা ও প্রতিহিংসামুক্ত। সিলেটের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য যদি বজায় থাকে, তবে তা শুধু এই শহরের জন্য নয়, দেশের জন্যও এক সুন্দর উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সমর বিজয় সী শেখর
সভাপতি, সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতি
সিলেট বাংলাদেশের একটি সম্প্রীতির শহর, এখানে প্রান্তিক নৃগোষ্ঠী, চা–শ্রমিক ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বাস করে। বিগত নির্বাচনের সময় দেখা গেছে, প্রান্তিক সম্প্রদায় প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আমি সব বড় দলের প্রার্থীদের আহ্বান জানাই, আগামী নির্বাচনে আপনারা নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করুন যে সিলেট একটি সম্প্রীতির জেলা, এখানে সহিংসতা বা বৈষম্য কাম্য নয়। এই সম্প্রীতির বন্ধন বজায় রাখতে হবে এবং প্রচারেও তুলে ধরতে হবে। চা–শ্রমিকদের মতো বঞ্চিত সম্প্রদায়ের কথা বিশেষভাবে ভাবতে হবে। নতুন সরকার যারা আসবে, তাদের দায়িত্ব হবে এই প্রান্তিক ও বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
আমরা লক্ষ করেছি যে অনেক প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট দিতে সচেতন নয়, ভোট দিতে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের ধারণা নেই। এটি প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের আগে, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে এই সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে।
সিলেটের জন্য আমাদের প্রত্যাশা একটাই—সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত, সম্প্রীতির ভিত্তিতে পরিচালিত একটি নির্বাচনী পরিবেশ। প্রার্থীদের উচিত এই মানসিকতাকে ইশতেহার ও প্রচারাভিযানে প্রতিফলিত করা, যাতে সিলেটবাসী শান্তি, নিরাপত্তা ও সমানাধিকার উপভোগ করতে পারে।
সাইদুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট
সত্যি বলতে, সিলেটের সম্প্রীতির জন্য আলাদা করে খুব বেশি কিছু করার দরকার পড়ে না। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, বাংলাদেশের অন্যান্য নির্বাচনী হটস্পটের তুলনায় সিলেটে সহিংসতা সব সময়ই কম। ১৯৭৩ সালে সংসদীয় আসনে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত সিলেটের নির্বাচনী সহিংসতার উদাহরণ খুবই কম।
সিলেটে যে সামাজিক বন্ধন দেখি, তা অনন্য। এখানে ধর্মীয় চর্চা আছে, সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে, আছে প্রবাসী সংযোগ। সুখে না এলেও দুঃখে সবাই পাশে দাঁড়ায়। এই সমাজে ‘সহিংসতা’ শব্দটা সহজে মানায় না।বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই সহিংসতা—এই ধারণা আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে। বাস্তবে ২০০৮ বা ২০১৪ সালের নির্বাচনে সিলেটেও কিছু ঘটনা ঘটেছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নির্বাচন মানেই ভয় নয়, আতঙ্ক নয়। আমরা চাই নির্বাচন হোক সহিংসতামুক্ত।শূন্য সহিংসতাই আমাদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সিলেট তার সম্প্রীতির ঐতিহ্য দিয়েই উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।
লুবনা ইয়াছমিন
সভাপতি, সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
সহিংসতা নেই—এভাবে বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সিলেটে সহিংসতা আছে, প্রকাশ্যে আসুক বা না আসুক, বাস্তবতায় তা বিদ্যমান। এই সত্যটা মেনে নিয়েই আমাদের সম্প্রীতির কথা বলতে হবে। সহিংসতা শুধু মারধর বা প্রকাশ্য সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; এর নানা রূপ আছে, নীরবে দমনও তার অংশ।
আমি যদি নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলি, সেখানেও একই চিত্র দেখি। কোনো নারী ব্যবসা বা নেতৃত্বে এগোতে চাইলে তাকে অনেক সময় ওপরে উঠতে দেওয়া হয় না। উল্টো তাকে নিয়ে রিউমার ছড়ানো হয়, তার নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে। নির্বাচনের পর আমরা যদি সবাই মিলে কাজ করতে চাই, তাহলে আগে নিজেদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। এই বিবেক যদি স্বচ্ছ ও শক্ত থাকে, তাহলেই সহিংসতা কমবে, সম্প্রীতি টিকে থাকবে।
আমরা কাজ করতে চাই, কাজ করতে পারি—কিন্তু সম্প্রীতি ছাড়া সেই কাজ সম্ভব নয়। আমি যদি কাজ করতে চাই আর বিরোধিতার নামে বলা হয়, তাকে নিয়ে কাজ করা যাবে না—সেখানেই বাধা তৈরি হয়, সেখান থেকেই সহিংসতার জন্ম হয়। আমরা সেই পরিস্থিতি চাই না।
আবদুল করিম চৌধুরী
সমন্বয়ক, সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন, সিলেট
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও সিলেটে সেই দিকটি কমই দেখা গেছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো, সিলেটের রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং স্থানীয় নেতৃত্বের দায়িত্বপরায়ণতা। বিগত মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং অন্য জনপ্রতিনিধিরা বিরোধী দলের হলেও জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন, যা সিলেটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তাই সহিংসতার চেয়ে সম্প্রীতি এখানে বেশি প্রাধান্য পায়।
সম্প্রতি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস–সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির একটি সিদ্ধান্তে সিলেটকে বিশেষ জেলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ঢাকাসহ ছয়টি জেলা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে, যেখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি দপ্তরের লোকবল বৃদ্ধি এবং বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে। সিলেটকে বাইরে রাখার এই সিদ্ধান্তে অনেকেই সংক্ষুব্ধ হয়েছেন।
সিলেটে যে ঐক্য ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি আছে, তা ধরে রাখতে হবে। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে সহিংসতা এড়িয়ে চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিজয়ী হোক বা পরাজিত, সবাই মিলিত হয়ে সিলেটকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত, সিলেটের সম্প্রীতি ও শান্তি রক্ষা করাই আমাদের সবার মূল দায়িত্ব।
আসমা আক্তার
সিনিয়র আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, সিলেট
এই আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য আপনাদের প্রতি আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। আপনারা সময় নিয়ে এসেছেন এবং মনোযোগ দিয়ে পুরো আলোচনা শুনেছেন। এই মনোযোগটাই আমাকে আশাবাদী করে।
আমি সব সময় আমার বিশ্বাস থেকেই একটি অনুরোধ করি—আসুন, আমরা আগে দেশটাকে ভালোবাসি, দেশের মানুষের কথা ভাবি, নিজের স্বার্থটা একটু পরে রাখি। বাস্তবে অনেক সময় উল্টোটা ঘটে যায়, সেটাই আমাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু এই অনুরোধটা করা দোষের কিছু নয়; একজন মানুষ হিসেবে এ প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। প্রথম আলোকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ—এই আলোচনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আজকের এই সময়টুকু আমার জন্যও খুব ভালো কেটেছে।
আমরা যে সম্প্রীতির বাংলাদেশের কথা বলেছি, সেটাই আমি সিলেটসহ দেশের সব জায়গায় দেখতে চাই। সহিংসতা নয়, শান্তি আর সহমর্মিতাই হোক আমাদের পথ। এটাই আমার আশা ও প্রত্যাশা।
সুপারিশ:
নির্বাচনী প্রচারণায় শূন্য সহিংসতা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা জরুরি।
নির্বাচনে জনগণকে নিরাপদ ও সচেতনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
গুজব ও উসকানিমূলক তথ্য প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভোটের ফলাফল মেনে নেওয়া এবং পরাজিত প্রার্থীর সঙ্গে মিলেমিশে দেশের উন্নয়নে কাজ করা উচিত।
নির্বাচনের আগে, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে সহিংসতা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।