ইয়ুথ কনক্লেভ ২০২৬: শুধু অংশগ্রহণ নয়, চাই কার্যকর যুব নেতৃত্ব
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘ইয়ুথ কনক্লেভ ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয় ১২ এপ্রিল ২০২৬ বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে।
গাজী মো. সাইফুজ্জামান
মহাপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর
বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই যুব। অর্থাৎ যুবরাই দেশের পরিবর্তনের প্রধান শক্তি। এই বয়সে যে কাজ করা যায়, তা অন্য বয়সে সম্ভব নয়।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কাজই হলো যুবসমাজকে দায়িত্বশীল, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। আমরা মূলত ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যুবদের প্রশিক্ষণ দিই, প্রয়োজনীয় ঋণসহায়তার মাধ্যমে তাঁদের কর্মক্ষম করে গড়ে তুলি, যাতে কর্মসংস্থান হয় এবং তাঁরা উদ্যোক্তায় পরিণত হয়ে দেশ ও জাতির অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রতিবছর আমরা প্রায় ৩ লাখ মানুষকে প্রশিক্ষিত করে থাকি। ১৯৮১ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ লাখ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এই যুবরা সমাজে বিভিন্নভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন। বাজারে যে মাছ, মাংস, সবজি, ডিম ও পোলট্রি ফিড সরবরাহ দেখি, তার বড় অংশই এই প্রশিক্ষিত যুবদের অবদান। যুবদের কল্যাণে আমরা ভলান্টারি ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছি। যুব সংগঠনগুলোকে মন্ত্রণালয় থেকে পুরস্কৃত করা হয়। যুব কার্যক্রমের মাধ্যমে যাঁরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদের জাতীয় যুব দিবসে পুরস্কৃত করা হয়, যাতে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন।
এই যে একটি শ্রেষ্ঠ সময় আপনারা পার করছেন, এটি মানুষের কল্যাণে যখন নিবেদন করবেন, দেশ ও জাতি উপকৃত হবে, সারা পৃথিবীর মানুষ তাকিয়ে রইবে আপনাদের এই নিবেদনের জন্য।
কবিতা বোস
কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সব কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে যুবরা। আমরা তাদের কথা শুনি ও তাদের সক্ষমতাকে সম্মান জানাই। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে চার কোটি যুব। আমরা মনে করি, পৃথিবীর সব সভ্যতা ও জাতি পরিবর্তনের মূল শক্তি হলো যুবরা।
কোনো সমাজকে ধ্বংস করতে হলে যুবসমাজকে দুর্বল করলেই যথেষ্ট, আর উন্নয়ন বাস্তবায়িত করতে হলে তাদের কেন্দ্রে রাখতে হয়। এই বিশ্বাস থেকেই আমরা চাই শুধু উপস্থিতি নয়, যুবদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও তাদের কণ্ঠস্বর সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত করা হোক।
এবারের ‘ইয়ুথ ইকোয়ালিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’–এ ১০২টি সংগঠন ৬৪ জেলার প্রতিনিধিত্ব করেছে, সেখান থেকে ছয়টি সংগঠন নির্বাচিত হয়েছে। এটি মূলত একটি প্রতীকী উদ্যোগ, যেন একজনকে দেখে অনেকে শিখতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রকল্পগুলো তিন মাসে শেষ হয়ে গেলেও এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি।
আমরা আশা করি, দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের বাস্তবায়নে আপনারা এগিয়ে যাবেন। আমরা সব সময়ই আপনাদের পাশে আছি আর ভবিষ্যতেও থাকব। আমরা আশাবাদী, আজ যে সংগঠনগুলো ছোট, একদিন তারা অনেক বড় হবে। তাদের উদ্যোগে একদিন তাদের নিজের এলাকায় এ ধরনের আয়োজন হবে, তাদের মাধ্যমে নতুন তরুণ সংগঠক ও উদ্যোক্তারা স্বীকৃত হবেন। আজ ছয় বিজয়ী ভবিষ্যতে আরও ৬০০ প্রতিষ্ঠানের অনুপ্রেরণা হবে।
শাহীন আনাম
নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
তরুণদের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা—আমরা বলি তারা ভালো হবে, সমাজসেবামূলক কাজ করবে ও গণতান্ত্রিক আচরণ করবে, সহিংসতা প্রতিরোধ করবে, ঠিকভাবে পড়াশোনা করবে। কিন্তু বিনিময়ে আমরা তাদের কী দিচ্ছি, সেটাও ভাবতে হবে। তাদের কথা বলার প্ল্যাটফর্ম দরকার, যেখানে তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে এবং নীতিনির্ধারণে তাদের মতামতের ভিত্তিতে পরিবর্তন আনা হবে।
যুব ক্ষমতায়নকে এনজিও প্রকল্পে সীমিত রাখলে হবে না; প্রকল্প স্বল্পমেয়াদি। ফান্ড শেষ হলে উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু যুবদের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় অধরা রয়ে যায়। তাই আমাদের প্রজেক্টের বাইরে গিয়ে ‘আউট অব দ্য বক্স’ চিন্তা করতে হবে। কেন তরুণেরা ধৈর্য হারাচ্ছে কিংবা সহিংসতার দিকে ঝুঁকছে, সেই বিচ্ছিন্ন কারণগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সামাজিক এই অস্থিরতায় মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের ওপর বাল্যবিবাহ, সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথে নানা বাধা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। তরুণেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে—পড়ালেখা, দক্ষতা ও চাকরির মধ্যে সমন্বয় নেই। হতাশা থেকে মাদকাসক্তি বাড়ছে, সমাজের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। মাদক সমস্যা সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
আর তরুণদের বলি, হতাশ হয়ো না; হতাশা দেশকে ভারাক্রান্ত করে। আমরা স্বাধীন একটি দেশ পেয়েছি। এই দেশকে সুন্দর করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
মতিউর রহমান
সম্পাদক, প্রথম আলো
আপনারা যাঁরা যুব সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন, সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমরা বহু বছর ধরে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি।
প্রথম আলো সব সময় বলে, আমরা বাংলাদেশের জয় দেখতে চাই। নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতির লক্ষণ আমরা দেখি—বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-তরুণদের ঐতিহাসিক ভূমিকা আমাদের নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে।
প্রথম আলো ২৭ বছর ধরে পত্রিকা প্রকাশ করছে। এ ছাড়া আমরা কিশোর-তরুণদের জন্য বিজ্ঞানচিন্তা ও কিশোর আলো প্রকাশ করছি।
তরুণদের জন্য গণিত অলিম্পিয়াড, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ভাষা প্রতিযোগ, আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল আয়োজন করি।
প্রথম আলো ট্রাস্ট এ পর্যন্ত দেড় হাজারের মতো শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দিয়েছে। তাদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী।
এসব আয়োজনের মাধ্যমে আমরা সমাজ ও শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে চাই।
আপনারা যেসব সুন্দর উদ্যোগ নিয়েছেন, সেগুলো আমাদের জানাবেন। আমরা তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেব—এটি অন্যদের জন্য প্রেরণা হয়ে উঠবে।
পরিবর্তন এক দিনে আসে না, এর জন্য দরকার সময়, প্রচেষ্টা ও জাতীয় ঐক্য। পরিবর্তন কখন আসবে, সে জন্য অপেক্ষা করলে হবে না, বরং আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
জিনস টু টোটস, খুলনা
এই সংগঠনটির উদ্যোগ ছিল পুরাতন জিনস প্যান্ট সংগ্রহ করে তা দিয়ে টেকসই ‘টোট ব্যাগ’ তৈরি করা। এটি একই সঙ্গে বর্জ্য রিসাইকেল করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীভাঙন বা লবণাক্ততার কারণে বাস্তুচ্যুত নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করার একটি দ্বিমুখী উদ্যোগ।
নবপ্রভাত ফাউন্ডেশন, রংপুর
এই সংগঠনের উদ্যোগটির নাম ‘ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সিভিক ইনক্লুশন’। সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া বা বৈষম্যের শিকার তরুণদের জন্য একটি ‘ইয়ুথ ডাইভারসিটি পার্লামেন্ট’ তৈরি করার কাজ করছে। যেখানে তরুণেরা কোনো ভয় ছাড়াই নিজের মতামত ও নিজেকে প্রকাশ করতে পারবেন।
কোস্টাল এডুকেশন অ্যান্ড ডাইভারসিটি ইম্প্রুভমেন্ট অর্গানাইজেশন, সাতক্ষীরা
এই সংগঠনের উদ্যোগ ছিল ‘উপকূলীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি ও কমিউনিটি রেসপন্স’। উপকূলীয় এলাকার মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে দুর্যোগ প্রস্তুতিবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করায় গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি।
এফএফসিআরজে, বাগেরহাট
ফাইট ফর কোস্টাল রাইটস অ্যান্ড জাস্টিস (এফএফসিআরজে) সংগঠনটির উদ্যোগ ছিল ‘গার্ড গার্লস লিডিং ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড প্রিভেন্টিং চাইল্ড ম্যারেজ’। তারা মেয়েদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং বাল্যবিবাহ রোধে ছেলেদেরও সম্পৃক্ত করে। সংস্থাটি উপকূলীয় মানুষের অধিকার এবং ন্যায্যতার জন্য কাজ করে।
কেপ সি, সাতক্ষীরা
এই সংগঠনের উদ্যোগের নাম ‘ভয়েস টু ভেঞ্চার ব্রিজ’, যা ডিজিটাল পদ্ধতিতে গল্প বলার মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করে। সংগঠনটি মূলত উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। তারা কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল স্টোরিটেলিং স্কিল শেখায়, যাতে তারা এসব সফলতার গল্প সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারে ও নিজেরাও সফল উদ্যোক্তা হতে পারে।
ইয়ুথ অ্যাকশন ফর ডেভেলপমেন্ট, ঢাকা
এই সংগঠনের আইডিয়াটি ছিল ‘শি স্পিক থ্রু দ্য লেন্স’। তারা আলোকচিত্রের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির কাজ করে। এই উদ্যোগ মূলত একটি গবেষণামূলক টুল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ও সুপারিশ ব্যবহার করে বাল্যবিবাহের হার কমিয়ে আনার কাজ করছে সংগঠনটি।