পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জীবিকায়নের ধরন, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাধাসমূহ
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জীবিকায়নের ধরন, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাধাসমূহ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২১ মে ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
অংশগ্রহণকারী
দীপেন দেওয়ান এমপি, সাবেক মন্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়; কাজল তালুকদার, চেয়ারম্যান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ; চঞ্চু চাকমা, সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ; এডউইন কুক্ কুক্, ফার্স্ট কাউন্সেলর, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশ; শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন; মেহের নিগার ভুঁইয়া, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশ; বিপ্লব চাকমা; চিফ, লাইভলিহুডস অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ; মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর; মো. মনিরুজ্জামান, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাঙামাটি; জুলহাস আহমেদ, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বান্দরবান; নিখিল চাকমা, প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন; জাগরণ চাকমা, সিনিয়র রিপোর্টার, দ্য ডেইলি স্টার; বিপ্লব চাকমা, নির্বাহী পরিচালক, আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটস; শান্তি বিজয় চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্ক; কাজলী তঞ্চঙ্গ্যা, সুবিধাভোগী, পিআরএলসি প্রকল্প। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আলোচনা
দীপেন দেওয়ান এমপি
সাবেক মন্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়
পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বয়ের ঘাটতি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ ও বেসরকারি সংস্থাসমূহ কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে অনেক সময় একই কাজের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। পার্বত্য চুক্তির পর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হলেও তার সুফল প্রত্যাশিতভাবে অর্জিত হয়নি। তাই আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের ভূমিকা আরও কার্যকর করা এবং বিদ্যমান সমন্বয় কাঠামোর বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালীকরণ জরুরি।
পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে কৃষি, সড়ক, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। একই সঙ্গে জমি, কৃষি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বয় জোরদার ও পার্বত্য চুক্তির ধারাগুলো বাস্তবায়নে কাজ করতে চাই।
উন্নয়নের জন্য অর্থ ও অবকাঠামোর পাশাপাশি আস্থা, সংলাপ ও সহযোগিতার পরিবেশ জরুরি। পার্বত্য চুক্তির পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থা বাড়াতে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে নেতিবাচক ধারণা বদলে ইতিবাচক ধারণা গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন নয়, সম্ভাবনার অঞ্চল হিসেবে দেখতে হবে। এ অঞ্চলের উন্নয়ন ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বয় ও পারস্পরিক আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এগুলো নিশ্চিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
কাজল তালুকদার
চেয়ারম্যান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
আমি বিশেষভাবে জুমচাষের বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। জুমচাষ সরকারিভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় চাষিরা সরকারি সুযোগ–সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের অবহেলায় এই চাষ পিছিয়ে আছে, যদিও পার্বত্য অঞ্চলে হলুদসহ নানা ফসলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
জুমচাষকে স্বীকৃতি না দিলে চাষিরা বঞ্চিতই থেকে যাবেন। আমি আগে প্রস্তাব দিয়েছিলাম এটিকে আউশ মৌসুমের আওতায় এনে উৎপাদনের হিসাব করা হোক। ব্রিটিশ আমলের আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জুমচাষ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ গবেষণা ও আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে এ চাষকে আরও উন্নত করা সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাপ্তাই হ্রদ। এটি এখন মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে থাকলেও জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সেখানে মাছ উৎপাদন ও রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। আমি মনে করি, কাপ্তাই হ্রদ জেলা পরিষদের অধীনে আনা হলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে এতে, যা এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহার করা যাবে।
বাঁশ চাষের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতসহ অনেক দেশে বাঁশকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বাঁশ পরিবহনে কর দিতে হয়। বাঁশকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কর প্রত্যাহার করা হলে এর উৎপাদন আরও বাড়বে।
চঞ্চু চাকমা
সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ
শুধু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষের জীবন–জীবিকার বাস্তবতা ও বাধাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ যেসব সংস্থা পাহাড়ের মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে, সেটি অনেকটা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো। প্রকৃত উন্নয়ন করতে হলে সমস্যার আরও গভীরে গিয়ে কাজ করতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নকে শুধু প্রকল্প বা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে হবে না; এটিকে রাজনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করতে হবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সমতল থেকে আসা মানুষের বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ভারত প্রত্যাগত বহু শরণার্থী পরিবার এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। তাঁদের পুনর্বাসন, ভূমি ও বসবাসের বিষয়গুলো সুরাহা না হলে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়ন কঠিন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন–জীবিকা এখনো কৃষি, মৎস্য, ভূমি ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাই উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় সেখানকার মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ, পরিবেশ ও জীবিকা—উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে।
পার্বত্য চুক্তি ও জেলা পরিষদ আইনে উন্নয়নের প্রয়োজনীয় ভিত্তি রয়েছে। এসব আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং পরিষদগুলোর প্রকৃত ক্ষমতায়ন করা গেলে উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে। পার্বত্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এসব বাস্তবতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এডউইন কুক্ কুক্
ফার্স্ট কাউন্সেলর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস এবং এসডিজি অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে চরম দারিদ্র্য এখনো বিদ্যমান, বিশেষ করে পার্বত্য তিন জেলা— বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির মতো পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোতে। এ অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়ন্ত্রণ কম, ফলে বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে উপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন, দারিদ্র্য নিরসনে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। এ লক্ষ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘পার্টনারশিপ ফর রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস’ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, যা প্রায় ২০ হাজার পরিবারের জীবিকা উন্নয়নে কাজ করছে। এই প্রকল্পের মূল তিনটি উপাদান হলো সহনশীল জীবিকা, পুষ্টি ও কমিউনিটি মবিলাইজেশন। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্থিতিশীলতা জোরদার করা হচ্ছে।
ইউএনডিপির সহায়তায় আমরা রাজনৈতিক অর্থনীতি, এসডিজি স্থানীয়করণ এবং আইনি কাঠামো নিয়ে গবেষণা করেছি, যা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে।
কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, বাজার সংযোগ, সেবায় প্রবেশাধিকার ও জীবিকার বহুমুখীকরণ জরুরি। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি যৌথ অঙ্গীকারও অপরিহার্য। আমি বাংলাদেশ ও বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই উন্নয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অব্যাহত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি।
শাহীন আনাম
নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনজীবিকা এখনো দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও বিকল্প জীবিকার অভাবে সংকটাপন্ন। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় সহযোগী সংগঠনগুলো একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০ হাজার দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারের জীবন–জীবিকার উন্নয়ন, পুষ্টিঘাটতি মোকাবিলা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এই প্রকল্প কাজ করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি জীবনজীবিকার উন্নয়নও জরুরি। তবে একটি প্রকল্প সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা।
টেকসই উন্নয়নে শিক্ষা, পানি, বিদ্যুৎ, ভূমি জটিলতা, নিরাপত্তা–সংকট, অবকাঠামোগত ঘাটতি এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা প্রয়োজন। ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্যানিং শিল্প স্থাপনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, যা কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে।
নারীদের শ্রমের স্বীকৃতি, কাজের চাপ কমানো এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা আরও অধিক উৎপাদনশীল কাজে অংশ নিতে পারেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই ও রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের জন্য শুধু প্রকল্প বাস্তাবয়ন নয়, সরকারের দৃঢ় সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত জরুরি।
মেহের নিগার ভুঁইয়া
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা উন্নয়নে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০ হাজার পরিবারকে সহায়তা দিয়ে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়; তাই সরকারি সহায়তা ছাড়া এই উদ্যোগ টেকসই করা যাবে না।
তিন পার্বত্য জেলায় সীমিত পরিসরে কাজ করলেও অল্প সময়েই সংগঠিতকরণ, পুষ্টি ও সহনশীল জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দুর্গম এলাকায় গিয়ে দেখেছি, মানুষের জীবন কতটা কষ্টকর—দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও অনেক জায়গায় পৌঁছানো কঠিন। পানির সংকট এখনো সবচেয়ে বড় সমস্যা; মা-বোনদের দীর্ঘ সময় পাহাড় বেয়ে পানি আনতে হয়। সোলার প্রযুক্তিতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, তাই এর সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা জরুরি।
আমাদের প্রকল্পে পুষ্টি উপাদানের মাধ্যমে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ, বীজ সহায়তা ও দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
ভূমি অধিকার সমস্যা সমাধানে ল্যান্ড কমিশন ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা ইউএনডিপির সহায়তায় তিনটি গবেষণার সুপারিশ শিগগিরই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে শেয়ার করব। কৃষি প্রযুক্তিতে স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কফি-কাজুবাদাম চাষ, জুমচাষের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
বিপ্লব চাকমা
চিফ, লাইভলিহুডস অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংরক্ষিত বন এবং কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বড় অংশ ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় কার্যত অল্প জমিতেই জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। বন পুনরুদ্ধারে অন্তত ৫০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা পানির সংকট মোকাবিলায়ও সহায়ক হবে।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে জেলা পরিষদের আওতাধীন ভূমির জন্যও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ করা গেলে ঝিরি-ঝরনায় পানি উৎস ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাঁশকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা গেলে এর উৎপাদন বাড়বে। পানি সংরক্ষণেও বাঁশ অত্যন্ত কার্যকর। পার্বত্য চট্টগ্রামের নদীগুলো দেশের পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এবং মিঠা পানির অন্যতম উৎস হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া কাপ্তাই হ্রদের পানি ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বছরব্যাপী নৌ যোগাযোগ চলমান রাখা গেলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে, যা বিপণনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় জেলা পরিষদভিত্তিক পরিকল্পনা কার্যকরী হলেও অনেক সময় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পসমূহ থেকে তিন পার্বত্য জেলা বাদ পড়ে যায়, যা কাম্য নয়। এ ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও আধুনিক চাষাবাদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগের মূল কাজ নতুন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। পার্বত্য অঞ্চলের কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জ পানির সংকট ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা। এ সমস্যা মোকাবিলায় সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
জুমচাষ এ অঞ্চলের ঐতিহ্যগত ও জনপ্রিয় চাষপদ্ধতি হলেও পুরোনো জাতের বীজ ব্যবহৃত হওয়ায় উৎপাদন কম হয়। উচ্চ ফলনশীল জাত ও আধুনিক চাষপদ্ধতি যুক্ত করা গেলে জুমচাষে উন্নতি হবে এবং কৃষকেরা উপকৃত হবেন।
এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষ অন্যতম সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে উঠে আসছে। এটি কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতাও কমাতে পারে। কফি চাষকে জাতীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য অঞ্চলে এখন কফি, আম, ড্রাগনসহ নানা ফলের চাষ হচ্ছে। তবে দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পান না। এ সমস্যা সমাধান করা গেলে পাহাড় দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।
মো. মনিরুজ্জামান
উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), রাঙামাটি
পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মূল কাজ নতুন ও টেকসই প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনা, পুনর্বাসন এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যার সমাধানেও আমরা কাজ করি। পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে এনজিওগুলো কাজ করলেও সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন জরুরি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিন পার্বত্য জেলার উন্নয়নে যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। এসব অবকাঠামো তৈরি করা গেলে এখানকার মানুষ নিজেরাই উন্নয়নের পথ তৈরি করতে পারবেন।
বাজারসংযোগের অভাব ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। একবার লোকসান হলে অনেকেই সেই ফসল আবার চাষে আগ্রহ হারান।
পার্বত্য অঞ্চলে হর্টিকালচার ও ফলবাগানের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত মেগা প্রকল্প এবং অ্যাগ্রো–ইকোলজিক্যাল ট্যুরিজম গড়ে তোলা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং পাহাড়ের অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
ড. জুলহাস আহমেদ
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বান্দরবান
প্রাণিসম্পদ বিভাগ টিকাদান, চিকিৎসাসেবা, প্রশিক্ষণ ও খামার পরিদর্শনের কাজ করছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উঠান বৈঠকের মাধ্যমেও কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।
বান্দরবানের ভৌগোলিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় জনবলসংকট ও যোগাযোগ দুর্গমতার কারণে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিও প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে এবং আমরা কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। লক্ষ্য হচ্ছে দক্ষ টিকাপ্রদানকারী তৈরি করা, যাতে দুর্গম এলাকায় গবাদিপশু ও হাঁসমুরগির টিকাদান নিশ্চিত করা যায় এবং নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন বজায় থাকে।
জনবলসংকট বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিকের আওতা বাড়ানো জরুরি। সমতলের সব জেলায় এই কর্মসূচি চলমান থাকলেও তিন পার্বত্য জেলায় এ সেবা চলমান নেই। সব উপজেলায় চালু হলে দুর্গম এলাকায় সেবা পৌঁছানো সহজ হবে।
বান্দরবানে পুষ্টিহীনতাও বড় সমস্যা। প্রাণিজ আমিষ পুষ্টির প্রধান উৎস হলেও অভ্যাসগত কারণে অনেকে তা গ্রহণ করেন না। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
নিখিল চাকমা
প্রজেক্ট কো–অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
বাংলাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ ভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে হলেও সেখানকার জনসংখ্যা দেশের মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু ভূমির বড় অংশ সংরক্ষিত বন, চাষ অনুপযোগী পাহাড় ও জলাশয়ের (কাপ্তাই লেক) অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জীবন–জীবিকার জন্য ব্যবহারযোগ্য জমি খুব সীমিত। কাপ্তাই হ্রদ নির্মাণের সময় বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি (৪০ শতাংশ প্রায়) পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে প্রধানত জুমচাষ ও সীমিত সমতল কৃষিজমির ওপরই এখানকার প্রান্তিক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এ অঞ্চলের প্রায় ৮৩ শতাংশ মানুষ কৃষি কিংবা কৃষিভিত্তিক জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি, সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক ও খাদ্য অনিরাপত্তা তাঁদের বড় চ্যালেঞ্জ। জুমচাষিরা বছরের কয়েকটি মাস খাদ্যসংকটের মধ্যে থাকেন। এই বাস্তবতায় আমরা ২০২৩ সালে পিআরএলসি প্রকল্প শুরু করি। এর আওতায় প্রায় ২০ হাজার দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি জীবিকায়ন, পুষ্টি উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অ্যাডভোকেসি—এই চার মূল বিষয় নিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। কৃষকদের মাঠপর্যায়ে হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের প্রকল্পটি সহায়তা প্রদান করছে। দুর্গম স্থানে পণ্য কেনাবেচার জন্য সংগ্রহশালা স্থাপন এবং নারী ব্যবসায়ীদের জন্য উপযোগী বাজারশেড নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ১০০ যুবককে বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২২৫ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষি সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এবং ৯৮ জন কমিউনিটি লাইভস্টক কর্মী তৈরি করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে নারীদের গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্প সুবিধাভোগীদের প্রায় ৭৮ শতাংশ নারী।
জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি ২০ হাজার পরিবারকে নগদ অর্থসহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যা তারা গবাদিপশু পালন, কৃষিকাজসহ বিবিধ অর্থ উপার্জনকারী কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করেছে।
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। তাই প্রকল্পে বহুপক্ষীয় অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় ও প্রথাগত জ্ঞানকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের অভিজ্ঞতায় প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জুমচাষিদের স্বীকৃতি না দেওয়া, প্রযুক্তি ও সম্প্রসারণসেবার সীমিত প্রবেশের সুযোগ, বাজারসংযোগের দুর্বলতা ও বিকল্প জীবিকায়নে অভাব। তাই জুমচাষিদের স্বীকৃতি, বাজারব্যবস্থা উন্নয়ন, পাহাড় উপযোগী কৃষিপ্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও কৃষিভিত্তিক সেবার বিস্তার প্রয়োজন।
অবকাঠামো ও বাজারসংযোগ, জলবায়ু সহনশীল জীবিকা, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন–জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
জাগরণ চাকমা
সিনিয়র সাংবাদিক, দ্য ডেইলি স্টার
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও পর্যটন—এসব আলোচনা হলেও পাহাড়ের মানুষের বাস্তব জীবন নিয়ে আলোচনা কম হয়। পাহাড়ের সংকট অর্থনৈতিক নয়; আস্থা, রাজনৈতিক বিভাজন ও টেকসই ভবিষ্যতের সংকট। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও শিক্ষার সীমাবদ্ধতায় সাধারণ মানুষ চাপে রয়েছে, শিক্ষিত তরুণেরাও নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
রাজনৈতিক বিভক্তি অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নয়; মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গেও সম্পর্কিত। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ শুধু প্রকল্প নয়, উন্নয়নের সুফলে নিজেদের অংশীদারত্ব চায়। রাজনৈতিক সংলাপ, আস্থার পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ জরুরি।
টেকসই উন্নয়ন ও শান্তির জন্য রাজনৈতিক আস্থা, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সব সম্প্রদায়ের মানুষ সমান মর্যাদায় বাঁচতে পারে।
বিপ্লব চাকমা
নির্বাহী পরিচালক, আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটস
পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবিকায়নের প্রধান ক্ষেত্র হলো গাছ, মাছ, বাঁশ, মিশ্র ফল, কৃষিপণ্য ও পর্যটন। তবে উৎপাদনকারীরা সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান না; মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হন। বিভিন্ন খাতভিত্তিক উৎপাদনকারী দল গঠন করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পণ্যের মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে পণ্য প্রদর্শন ও বাজারজাতকরণের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। উৎপাদনকারী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে তা কার্যকর হবে। পাশাপাশি সরকারি সেবার পরিধিও বাড়ানো দরকার।
পার্বত্য অঞ্চলের অনেক ছড়া ও নদী ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। জরিপের মাধ্যমে পানির উৎস পুনরুদ্ধার এবং উপযোগী বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। পর্যটন খাতেও স্থানীয় পণ্যের বাজার তৈরি করা জরুরি। বাঁশ, বেত বা কাঠের ছোট পণ্য স্থানীয়ভাবে তৈরি করে প্রদর্শন ও বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে পর্যটকেরা আকৃষ্ট হবেন।
বাসক, সজনে পাতাসহ ঔষধি গাছের চাষ সম্প্রসারণ এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন।
শান্তি বিজয় চাকমা
সাধারণ সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্ক
পার্বত্য অঞ্চলে পানিসংকট এখন বড় বাস্তবতা। শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় পানির উৎস শুকিয়ে যায় এবং দূষিত পানি ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি সরবরাহের উদ্যোগ যেখানে নেওয়া হয়েছে, সেখানে মানুষ উপকৃত হচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম দুর্গম এলাকায় আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
জুমচাষ পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা হলেও জুমচাষির কৃষিঋণসহ নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রান্তিক ও হতদরিদ্র জুমচাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে নারীরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনার মুখে পড়ছেন।
উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানোও বড় চ্যালেঞ্জ। বিলাইছড়ির মতো এলাকায় কৃষিপণ্য উৎপাদন হলেও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কৃষকদের কাদা মাড়িয়ে বাজারে যেতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।
কাপ্তাই লেকের পানি কমে যাওয়ায় এখন দুর্গম এলাকায় যেতে একাধিক নৌযান বদলাতে হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদের খনন বা ড্রেজিংয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
কাজলী তঞ্চঙ্গ্যা
সুবিধাভোগী, পিআরএলসি প্রকল্প
আগে প্রচলিত চাষাবাদে তেমন ফল পেতাম না, এখন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নানা রকম শাকসবজি ফলাতে পারছি। উৎপাদনও বেশি হচ্ছে। পিআরএলসি প্রকল্পের মাধ্যমে আমি শিখেছি কীভাবে পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হয়। আগে মুরগি পালন জানতাম না, এখন প্রশিক্ষণ নিয়ে আমার বাড়িতে ৫০–৬০টি মুরগি পালন করছি।
আগে কেবল রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতাম। এখন জৈবপদ্ধতি ব্যবহার করি। জৈব সার এখন নিজেরাই উৎপাদন করছি। আমাদের গ্রামে প্রায় প্রতিটি ঘরেই মুরগি, ছাগল ও বাগান রয়েছে আর নারীরা এখন গবাদিপশু ও কৃষিকাজে উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন।
তবে এখনো বড় সমস্যা হলো পানির সংকট ও যোগাযোগের দুরবস্থা।
পানি আনতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে, রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় বাজারে পণ্য নিতে সমস্যা হয় এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। পণ্য সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থাও নেই। সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে গ্রামীণ নারীরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারেন এবং আয় বাড়াতে পারে।
জুমচাষিদের নীতিগত স্বীকৃতি দিয়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে তাঁরা কৃষিঋণ ও সরকারি সুবিধা পান।
কফি, কাজুবাদাম, ফলের চাষ ও ঔষধি গাছের মতো উচ্চমূল্যের ফসল সম্প্রসারণে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
কৃষি ও জীবিকায় আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল জাত এবং জলবায়ুসহনশীল চাষাবাদ সম্প্রসারণ করতে হবে।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণব্যবস্থা (যেমন শুকানো, ক্যানিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প) সম্প্রসারণ করতে হবে।
বাঁশ ও বনজ সম্পদকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নীতিগত সুবিধা ও করকাঠামো সংস্কার করতে হবে।
পাহাড়ি নদী–ছড়া রক্ষায় জরিপ, উপযুক্ত বৃক্ষরোপণ ও বন পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ায় নারীসহ স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাঁদের প্রথাগত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে।
অংশগ্রহণকারী:
দীপেন দেওয়ান এমপি, সাবেক মন্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়; কাজল তালুকদার, চেয়ারম্যান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ; চঞ্চু চাকমা, সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ; এডউইন কুক্ কুক্, ফার্স্ট কাউন্সেলর, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, বাংলাদেশ; শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন; মেহের নিগার ভুঁইয়া, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, রেজিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, বাংলাদেশ; বিপ্লব চাকমা; চিফ, লাইভলিহুডস অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ; মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর; মো. মনিরুজ্জামান, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাঙামাটি; জুলহাস আহমেদ, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বান্দরবান; নিখিল চাকমা, প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন; জাগরণ চাকমা, সিনিয়র রিপোর্টার, দ্য ডেইলি স্টার; বিপ্লব চাকমা, নির্বাহী পরিচালক, আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটস; শান্তি বিজয় চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্ক; কাজলী তঞ্চঙ্গ্যা, সুবিধাভোগী, পিআরএলসি প্রকল্প। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।