কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিতকরণ

আন্তর্জাতিক কৈশোর স্বাস্থ্য সপ্তাহ (১২-১৯ অক্টোবর ২০২৬) উপলক্ষে ‘কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিএজিএসবি) ও প্রথম আলো। এই আয়োজনে সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

‘কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলোর কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

অংশগ্রহণকারী

অধ্যাপক ডা. কোহিনূর বেগম

সভাপতি, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিএজিএসবি); সাবেক সভাপতি, ওজিএসবি।

অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম

সভাপতি, অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ, (ওজিএসবি)।

অধ্যাপক ডা. রওশন আরা

সাবেক সভাপতি, ওজিএসবি; চেয়ারপারসন, প্ল্যানেটারি হেলথ একাডেমিয়া।

অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা

মহাসচিব, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ

(পিএজিএসবি); সাবেক মহাসচিব, ওজিএসবি।

অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন মোল্লা

শিশুবিশেষজ্ঞ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ।

অধ্যাপক ডা. সালেহা বেগম চৌধুরী

মহাসচিব, এন্ডোমেট্রিওসিস অ্যাডেনোমাইয়োসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ইএএসবি); সাবেক সহসভাপতি, ওজিএসবি।

অধ্যাপক ডা. সুলতানা আফরোজ

বিভাগীয় প্রধান, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ,

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

অধ্যাপক ডা. নাজনীন বেগম

বিভাগীয় প্রধান, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ,

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন

মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

ডা. শারমিন আব্বাসি

সহযোগী অধ্যাপক, বন্ধ্যত্ব ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিভাগ, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

ফারহান আহমেদ

সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার,

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

ফিরোজ চৌধুরী

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।

আলোচনা

অধ্যাপক ডা. কোহিনূর বেগম

সভাপতি, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিএজিএসবি);

সাবেক সভাপতি, ওজিএসবি

কিশোর-কিশোরীদের বয়স ১০ থেকে ১৯ বছর। এই সময়টা শৈশব ও প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের মধ্যবর্তী একটি পরিবর্তনকাল। এ সময়ে শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন ঘটে এবং তাদের স্বাস্থ্যসমস্যাও প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে আলাদা। তাই তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এই বয়সে যেমন নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তেমনি যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সুরক্ষারও বড় সুযোগ রয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সহিংসতার কারণে সৃষ্ট মানসিক ও শারীরিক সমস্যার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। আজকের কিশোর-কিশোরীরাই ভবিষ্যতে একটি সুস্থ জাতি গড়ে তুলবে।

কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে আমরা সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; স্কুল, সহপাঠী, অভিভাবক, বেসরকারি সংস্থা, সমাজকর্মীসহ সবারই রয়েছে। যেকোনো কর্মসূচি নেওয়ার আগে সেটি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য থাকতে হবে। শুধু কর্মসূচি গ্রহণ করলেই হবে না, বাস্তবায়নের সময়ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক জায়গায় কিশোর-কিশোরীদের জন্য কর্নার থাকলেও সেগুলোর যথাযথ পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় আসবাব নেই। এসব কেন্দ্রের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিবীক্ষণ প্রয়োজন।

কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন, যেমন ওজিএসবি ও পিএজিএসবিকে সম্পৃক্ত করা দরকার। তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের দেশে কিশোরীদের মাসিকসংক্রান্ত সমস্যাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে এ ধরনের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে সরকার, পেশাজীবী, গণমাধ্যম ও অন্যান্য অংশীজনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম

সভাপতি, অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ, (ওজিএসবি)

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কিশোর-কিশোরী। এই জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার নির্ধারিত চারটি বিষয়—যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সহিংসতা প্রতিরোধ—বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে ওজিএসবি বিভিন্নভাবে কাজ করছে। শিশু ও কৈশোর গাইনোকোলজিকে স্বতন্ত্র চিকিৎসা শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা কাজ করেছি, যাতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যসমস্যায় বিশেষ মনোযোগ দেওয়া যায়। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরি ও নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখছি। ২০১৬ সালে ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ করে আমরা কিশোর স্বাস্থ্য কর্নার প্রতিষ্ঠা করেছি, যা তৃণমূল থেকে মেডিক্যাল কলেজ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।

সরকারের উদ্যোগে দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাব রয়েছে। এসব ক্লাবে তারা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ পায়। এ ছাড়া সুখী জীবন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা ও যৌনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়নে কাজ করেছি। স্কুলভিত্তিক একটি মডেলও তৈরি করেছি, যেখানে কৈশোরের পরিবর্তন, মাসিকের পরিচ্ছন্নতা, যৌনস্বাস্থ্য, পিসিওএস ও এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

দেশে ১৮ বছরের আগে বিয়ে না দেওয়ার নিয়ম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে অল্প বয়সে বিয়ে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কিশোরীদের পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও নিরাপদ গর্ভনিরোধক নিশ্চিত করার জন্য আমরা সরকারকে সুপারিশ করছি। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাতজনিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। অল্প বয়সে গর্ভধারণে প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, প্রসবজনিত জটিলতা, অপরিণত শিশু জন্ম ও কম ওজনের শিশুর ঝুঁকি বেশি থাকে। ওজিএসবির হাসপাতাল ও আইআরসিএইচে সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের স্বল্পমূল্যে সেবাও দেওয়া হচ্ছে।

অধ্যাপক ডা. রওশন আরা

সাবেক সভাপতি, ওজিএসবি;

চেয়ারপারসন, প্ল্যানেটারি হেলথ একাডেমিয়া

আমরা কি কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছি? পরিবার থেকেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কৈশোরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে, তৈরি হয় নতুন চাহিদা। পরিবেশের প্রভাবও তাদের ওপর পড়ে। অথচ পরিবারে এসব বিষয়ে আমরা খুব একটা আলোচনা করি না, তাদেরও যথাযথ মূল্যায়ন করি না। পরিবার থেকে সচেতনতা তৈরি করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করতে পারলে আমরা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব।

কিশোর-কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সরকার চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপরও। বছরে এক দিন আলোচনা করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; সারা বছর তাদের স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে ভাবতে হবে। অনেক কিশোর-কিশোরী ক্লাব তৈরি হলেও কোথাও বসার ব্যবস্থা নেই, কোথাও আবার সুযোগ থাকলেও কিশোর-কিশোরীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। অথচ এসব জায়গায় তাদের নিজেদের মধ্যে কথা বলা, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা এবং সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ থাকা দরকার।

পরিবারেও আমরা কিশোর-কিশোরীদের কথা বলতে বাধা দিই। মাসিক শুরু হওয়া স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন। এ বিষয়ে মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরও জানা প্রয়োজন। ভাইয়েরাও যেন বোনের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে আনতে পারে—সেই স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাদের মুখ বন্ধ করে না রেখে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে।

পরিবেশদূষণসহ পারিপার্শ্বিক নানা পরিস্থিতি কিশোর-কিশোরীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সহিংসতা ও বুলিংও ভয়াবহ সমস্যা হয়ে উঠেছে। স্কুলে বুলিংয়ের কারণে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও পড়াশোনা করতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে হয়রানির ঘটনাও ঘটছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে।

অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা

মহাসচিব, পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিএজিএসবি);

সাবেক মহাসচিব, ওজিএসবি

বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সহিংসতা প্রতিরোধ—এই চার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের ক্ষমতায়ন, মতপ্রকাশের অধিকার ও স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের পেশাজীবী সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।

ওজিএসবি সরকারের কারিগরি সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। সরকারের কাছে অ্যাডভোকেসি, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে আমরা ভূমিকা রাখতে পারি।

স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে হলে কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী, দরিদ্র, গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য দূর করা জরুরি। এ জন্য প্রয়োজনীয় সেবাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।

কিশোরীদের পিসিওএস, অনিয়মিত মাসিক ও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ সম্প্রতি ছয়টি স্কুল ও কলেজে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জানার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। তাই এ বিষয়ে আরও উদ্যোগ নিতে হবে।

কিশোর-কিশোরীদের মতামত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারে তাদের শুধু সন্তান হিসেবে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করতে হবে। স্যানিটারি প্যাড সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা এবং স্বাস্থ্যসম্মত মাসিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার, পরিবার ও পেশাজীবীদের একসঙ্গে কাজ করা জরুরি।

অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন মোল্লা

শিশুবিশেষজ্ঞ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ

এত দিন আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবিনি। স্বাস্থ্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শারীরিক, মানসিক ও প্রজননস্বাস্থ্য। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ও মননে প্রজননস্বাস্থ্যকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) পাঠ্যক্রমেও এ বিষয়ে স্বতন্ত্র অধ্যায় নেই; বিষয়টি শারীরস্থান ও শারীরবৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই চিকিৎসাশিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাপূর্ব শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়েও কৈশোরস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে কৈশোরের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে অস্পষ্টতা ও গোপনীয়তার বাধা দূর হবে।

কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় নির্দেশিকা প্রয়োজন। এতে প্রান্তিক এলাকার কিশোর-কিশোরী, দরিদ্র ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। শুধু আলোচনা বা সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যক্রম ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করা জরুরি।

কৈশোরস্বাস্থ্যসেবায় গোপনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চিকিৎসার তথ্য ও নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সবার জন্য সেবা পাওয়ার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে স্বাস্থ্যসমতা মানে সবাইকে একই ধরনের সেবা দেওয়া নয়; বরং প্রত্যেকের প্রয়োজন, প্রতিবন্ধকতা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সেবা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

দরিদ্রদের বিনা মূল্যে বা সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দিতে হবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য চলাচল, ওঠা-বসা, সেবাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা পাওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এসব বিষয়ে নিয়ম থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী ও সচ্ছল ব্যক্তিরাই বেশি সুযোগ পান। তাই বিদ্যমান নির্দেশিকা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক ডা. সালেহা বেগম চৌধুরী

মহাসচিব, এন্ডোমেট্রিওসিস অ্যাডেনোমাইয়োসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ইএএসবি);

সাবেক সহসভাপতি, ওজিএসবি

প্রজননস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাসিক। এখনো সমাজে মাসিক নিয়ে নানা কুসংস্কার ও ট্যাবু রয়েছে। সাধারণত ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সে মাসিক শুরু হলে অনেক কিশোরী দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তাদের জানাতে হবে, মাসিক স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া, এটি লজ্জার বিষয় নয়। মাসিকের পরিচ্ছন্নতা ও সম্ভাব্য সমস্যাগুলো সম্পর্কেও তাদের সঠিক তথ্য দিতে হবে।

মাসিক শুরুর প্রথম দিকে অনিয়মিত হতে পারে, যা নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিশোরীদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) একটি পরিচিত সমস্যা। মাসিকের অনিয়ম বা শারীরিক পরিবর্তনের কারণে তাদের মানসিক দুশ্চিন্তা হতে পারে। তাই সহানুভূতিশীল পরামর্শ ও অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি। শুধু আলট্রাসনোগ্রামে সিস্ট দেখা গেলেই পিসিওএস শনাক্ত করা উচিত নয়; স্থায়ী লক্ষণগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।

আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ এখনো বড় সমস্যা। ১৮ বছরের আগে বিয়ের ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি প্রতিরোধে বাল্যবিবাহ বন্ধের পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও স্কুল স্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ হলে উপযুক্ত বিশেষায়িত সেবাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে সরকার, চিকিৎসক, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই তাদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক ডা. সুলতানা আফরোজ

বিভাগীয় প্রধান, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ,

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

কিশোরীদের মাসিক ও মাসিকের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে যথাযথভাবে বোঝানো হয় না। অথচ মাসিক একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, প্রজননস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; এটি কোনো রোগ নয়। কিন্তু এ নিয়ে সমাজে নানা ভুল ধারণা, লজ্জা, সংকোচ ও কুসংস্কার রয়েছে। কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে প্রথমেই এসব বাধা দূর করতে হবে।

কিশোরীদের বয়সোপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে। মাসিক কেন হয়, কীভাবে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হয়, কোন লক্ষণ স্বাভাবিক এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন—এসব বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে ও নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে।

মাসিকের সময় স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। স্যানিটারি প্যাড বা উপযুক্ত বিকল্পের নিরাপদ ব্যবহার, প্রয়োজনমতো পরিবর্তন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানি এবং ব্যবহৃত সামগ্রীর সঠিক নিষ্পত্তি সম্পর্কে তাদের জানাতে হবে। পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্বও বোঝাতে হবে।

মাসিকের সমস্যাকে অবহেলা করা যাবে না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অসহনীয় ব্যথা, দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকা কিংবা বারবার অনিয়মিত মাসিক হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এসব সমস্যার পেছনে রক্তস্বল্পতা, হরমোনজনিত সমস্যা বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের মতো কারণ থাকতে পারে।

এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ শুধু হাসপাতাল বা ব্যক্তিগত চেম্বারে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে কার্যক্রম চালাতে হবে।

চিকিৎসক, শিক্ষক, অভিভাবক, গণমাধ্যম ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ডা. নাজনীন বেগম

বিভাগীয় প্রধান, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

কিশোরীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তারা শুধু স্বাস্থ্যসেবার গ্রহীতা নয়, নিজেদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারও। কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে হলে তাদের মতামত, অনুভূতি ও অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মা–বাবাকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কিশোরীরা নির্ভয়ে নিজেদের সমস্যা প্রকাশ করতে পারে এবং তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হয়। পরিবারে মাসিক, বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন। কোনো সিদ্ধান্ত তাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ভয় দেখানো বা লজ্জা দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে তাদের উৎসাহিত করতে হবে।

কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। বয়স ও পরিপক্বতা অনুযায়ী সহজ ভাষায় রোগের প্রকৃতি, চিকিৎসার বিকল্প, সেগুলোর ভালো-মন্দ দিক এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের জানাতে হবে, যাতে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামত নেওয়া এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্মতি প্রদানের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলোর গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আলাদাভাবে তাদের মতামত শোনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কিশোরীদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের বয়স, পরিপক্বতা, নিরাপত্তা ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্যসেবায় সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কিশোরীদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এভাবেই তাদের অধিকার ও আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন

মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় কিশোরীদের স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিই; কিন্তু কিশোরদের প্রজননস্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাসিক ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে আলোচনা হলেও ছেলেদের বয়ঃসন্ধিকালের স্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে কথা হয় না। এসব বিষয়ে বাবা, ভাই বা বড়দের সঙ্গে কথা বলতে তারা অস্বস্তি বোধ করে। ফলে অনেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তাই ছেলে ও মেয়ে উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কৈশোর থেকে মেনোপজ ও অ্যান্ড্রোপজ পর্যন্ত প্রজননস্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার ব্যাপকতা প্রায় ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, আর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘাটতি ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ। কিশোরদের মধ্যে মানসিক সমস্যার হার ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, আর কিশোরীদের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। শহরের তুলনায় গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা মানসিক সমস্যায় বেশি ভুগছে। বয়ঃসন্ধিকাল শারীরিক, মানসিক ও আবেগ বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এ সময়ে ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ, আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা ও আত্মহানির প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

বর্তমানে গ্যাজেটের ব্যবহার ও সম্পর্কের জটিলতা কিশোর-কিশোরীদের ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আত্মহত্যা ও ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের ক্ষতি করার প্রবণতাও উদ্বেগজনক।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্কুল, মেডিকেল কলেজ ও সামাজিক পর্যায়ে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং, মনোরোগ চিকিৎসা, পারিবারিক সচেতনতা ও যথাযথ রেফারালের ব্যবস্থা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিতে হবে।

ডা. শারমিন আব্বাসি

সহযোগী অধ্যাপক, বন্ধ্যত্ব ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিভাগ,

আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ, সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তাদের চিন্তাভাবনা, জীবনযাপন, স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণমাধ্যমের প্রভাব রয়েছে। চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিন গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

প্রথমত, স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরি করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ভয়, লজ্জা ও ভুল ধারণা কাজ করে। টেলিভিশন, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পৌঁছে দিয়ে এসব কুসংস্কার দূর করা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, কিশোর-কিশোরীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এবারের প্রতিপাদ্যের মূল কথাই হলো আমাদের বিষয়ে আমাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। গণমাধ্যম তাদের অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও প্রত্যাশা তুলে ধরে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।

তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, শারীরিক গঠন নিয়ে হীনম্মন্যতা, ভুয়া স্বাস্থ্যতথ্য ও ক্ষতিকর কনটেন্ট কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, পুষ্টিহীনতা, মাদকাসক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের বাধাগুলোও তুলে ধরতে হবে। এ জন্য চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের কাজের সমন্বয় প্রয়োজন।

ফারহান আহমেদ

সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার,

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড

কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে আমাদের সবারই দায়িত্ব রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে কাজ করার পাশাপাশি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসেরও সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, মানসম্মত ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সুস্থ জীবনযাপনে অবদান রাখাও আমাদের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে চাই আমরা।

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা প্রতিটি ওষুধের গুণগত মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি।

যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, অস্ট্রেলিয়ার টিজিএ, যুক্তরাজ্যের এমএইচআরএ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএমপিসহ আন্তর্জাতিক মান ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে এসকেএফের অবস্থান আমাদের এই অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

আজকের আলোচনায় কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।

আমি মনে করি, এই লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সবার পাশাপাশি এসকেএফের মতো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কল্যাণে আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই। পিএজিএসবি এবং প্রথম আলোকে এসকেএফের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

সুপারিশ

  • কিশোর-কিশোরীদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

  • দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, প্রান্তিক এবং গ্রাম ও শহরের সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

  • কিশোর স্বাস্থ্য কর্নার ও ক্লাবগুলোর পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা এবং কার্যকারিতা নিয়মিত পরিবীক্ষণ করতে হবে।

  • সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, যৌন হয়রানি ও ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।

  • স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরকার, চিকিৎসক, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও গণমাধ্যমের সমন্বয় বাড়াতে হবে।

  • বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি কিশোরীদের পরিবার পরিকল্পনা ও নিরাপদ গর্ভনিরোধক সেবা দিতে হবে।