গোলটেবিল বৈঠক
ক্ষুদ্রঋণ খাতে নীতিগত সহায়তা দাবি
প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘ক্ষুদ্রঋণ খাতের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা: বাজেট ২০২৬-২৭ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ দাবি জানান।
দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে ক্ষুদ্রঋণ খাত। তবে বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও চড়া সুদের কারণে এই খাত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্রঋণ খাতের জন্য বিশেষ নীতিগত ও অর্থসহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এমন মতামত জানান। ‘ক্ষুদ্রঋণ খাতের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা: বাজেট ২০২৬-২৭ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এই বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করেছে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর জোট ‘ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)’ এবং প্রথম আলো।
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউসেপ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল করিম।
দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের প্রায় সমপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি খাত হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ। এটিকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।হোসেন জিল্লুর রহমান, নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি
দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে গোলটেবিল আলোচনায় বক্তৃতা করেন সিডিএফের চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার, পিএমকের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এনামুল হক, উন্নয়ন খাতবিশেষজ্ঞ দেওয়ান এ এইচ আলমগীর, এসকেএস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রাসেল আহমেদ, পিদিম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এডভিন বরুণ ব্যানার্জি, দিশার প্রধান নির্বাহী মো. সহিদ উল্লাহ, সিডিএফের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।
প্রবৃদ্ধির নতুন চালক ক্ষুদ্রঋণ খাত
অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের প্রায় সমপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি খাত হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ। প্রবৃদ্ধির আলোচনায় প্রথম দুটি খাত যেভাবে গুরুত্ব পায়, ক্ষুদ্রঋণ খাত সেভাবে আলোচনায় আসেনি। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এখন ক্ষুদ্রঋণ খাতকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতির কথা তুলে ধরে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, পুরো খাত বর্তমানে একটি ব্র্যান্ডিং সংকটে ভুগছে। এ সময় তিনি ‘এনজিও’ শব্দের পরিবর্তে ‘এমএফআই’ (মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন) বা ‘ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান’ শব্দকে সামনে আনার তাগিদ দেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান আসন্ন বাজেটে কিছু নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার যে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল ঘোষণা করেছে, তা সরাসরি এমএফআইয়ের মাধ্যমে বিতরণের প্রস্তাব দেন তিনি।
হোসেন জিল্লুর রহমানের অন্যান্য পরামর্শের মধ্যে রয়েছে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় শস্যবিমার প্রসারে কৃষকদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য মওকুফ করা। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমাতে তাদের সঞ্চয় সংগ্রহের নিয়মকানুন আরও সহজ করা। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (এমআরএ) সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এ খাতের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
সভায় ইউসেপ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল করিম বলেন, এমআরএর ভূমিকা কেবল নিয়ন্ত্রক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সংস্থাটিকে এই খাতের উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করতে হবে। ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই নারী। সরকারও নারীর ক্ষমতায়নে আগ্রহী। তাই এনজিওগুলোকে নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
অর্থায়ন বড় সমস্যা
ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র অর্থায়ন সংকটে রয়েছে বলে বৈঠকে জানান ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমরা কোনো অনুদান চাই না; স্বল্প সুদহারের ঋণ চাই। এই অর্থ আমরা সঠিক সময়ে ফেরত দেব। খেলাপি বা পাচার হবে না; বরং এর বিনিময়ে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে।’
ক্ষুদ্রঋণ খাতে সঞ্চয় নীতিমালার বৈষম্যের কথা তুলে ধরে পল্লী মঙ্গল কর্মসূচির (পিএমকে) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এনামুল হক বলেন, ‘একটি ব্যাংক যেখানে জনগণের জমানো টাকার ১০০ শতাংশই ঋণ হিসেবে দিতে পারে, সেখানে আমাদের হাত বেঁধে রাখা হয়েছে। আমাদের দাবি, সঞ্চয় সংগ্রহের সীমা তুলে দেওয়া হোক।’
ক্ষুদ্রঋণের চড়া সুদের হার নিয়ে ঢালাও অভিযোগ করা হয় মন্তব্য করে উন্নয়ন খাতবিশেষজ্ঞ দেওয়ান এ এইচ আলমগীর বলেন, মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ায় এমএফআইদের খরচ অনেক বেড়ে যায়। বড় ও সফল ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমানত বা সঞ্চয় সংগ্রহের অনুমতি দিলে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কমানো সম্ভব।
পিদিম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এডভিন বরুণ ব্যানার্জি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপকূলীয় এলাকার মানুষ ঋণের কিস্তি দিতে পারেন না। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকের চড়া সুদ ঠিকই শোধ করতে হয়। এটি একতরফা আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে। এই সংকট মোকাবিলায় আগামী বাজেটে একটি বিশেষ পুনঃ অর্থায়ন তহবিল রাখার প্রস্তাব করেন বরুন ব্যানার্জি।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের কাজের স্বীকৃতি দাবি করে এসকেএস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ করছে। তাদের বেশির ভাগই আবার নারী। অথচ জাতীয় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই খাত অবহেলিত থাকছে।
এনজিও খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে বলে বৈঠকে জানান দিশার প্রধান নির্বাহী সহিদ উল্লাহ। তিনি বলেন, এই সংকট নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়লে সরকার ১২ বছরের জন্য ঋণ পুনর্নির্ধারণ ও মাত্র ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে নতুন ঋণের সুবিধা দেয়। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ খাতের গ্রাহকদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা নেই।
সিডিএফের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাজেটের মূল লক্ষ্যই হলো উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা ঘাটতি থাকা অঞ্চলে দেওয়া। ক্ষুদ্রঋণ খাত একটি বড় ঘাটতি অঞ্চল। কিন্তু এখানে বরাদ্দের পরিবর্তে উল্টো বেশি কর আদায় করা হয়।
ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার বলেন, সরকার সৃজনশীল অর্থনীতি ও নতুন উদ্ভাবনের খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, যার বড় অংশজুড়ে রয়েছেন নারীরা। আগামী বাজেটে এসব খাতে বিশেষ কর সুবিধাও থাকবে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়।