কপ-৩০: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘কপ-৩০: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক গত ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
অংশগ্রহণকারী
এ কে এম সোহেল,
অতিরিক্ত সচিব ও প্রধান (জাতিসংঘ উইং), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়।
মির্জা শওকত আলী,
পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন), পরিবেশ অধিদপ্তর।
তাসলিমা ইসলাম,
প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি।
বারিশ হাসান চৌধুরী,
পলিসি অ্যান্ড ক্যাম্পেইন কো–অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি।
সরদার মো. আসাদুজ্জামান,
সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি, ইউএনডিপি বাংলাদেশ।
হরজিৎ সিং,
গ্লোবাল এনগেজমেন্ট ডিরেক্টর,ফসিল ফুয়েল নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি।
লিডি ন্যাকপিল,
সমন্বয়ক ও সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, এশিয়ান পিপলস মুভমেন্ট অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।
আসাদ রহমান,
চিফ এক্সিকিউটিভ, ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ (ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড)।
শাহ রাফায়েত চৌধুরী,
সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট, ফুটস্টেপস বাংলাদেশ।
সোহানুর রহমান,
এক্সিকিউটিভ কো–অর্ডিনেটর, ইয়ুথ নেট গ্লোবাল।
আফজাল হোসেন,
নির্বাহী পরিচালক, রালফাও, রাজশাহী।
মো. হাফিজুর রহমান,
জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, সাতক্ষীরা।
আবুল কাশেম ফারুকী,
শিক্ষক, ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
মুমতাহিনা রহমান,
গবেষণা সহযোগী, সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ, ব্র্যাক।
শেখ নূর আতায়ে রাব্বি,
অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি,সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী,
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আলোচনা
তাসলিমা ইসলাম
প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি
কপ-৩০ নিয়ে সবাই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আলোচনা করেছে। আমি প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দিতে চাই। বেলার টিম বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে একটি ছোট গবেষণা করেছে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ও কলমা ইউনিয়নে কৃষক, মৎস্যজীবী ও দরিদ্র নারীসহ প্রায় ৫০ জনের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, যাঁদের ৯৪ শতাংশ মানুষ তাঁদের পানীয়, কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে পানির প্রাপ্যতার দুর্দশার জন্য বিএমডিএকে দায়ী করেছেন। অনেকেই কৃষিকাজ করতে পারছেন না। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, অস্থায়ীভাবে কাজের জন্য অন্যত্র চলে যাচ্ছেন, ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এলাকাবাসী প্রতিকার পেতে এখন মামলা করতে চান।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বৈশ্বিক তুলনামূলক গবেষণা করা হয়েছে। দেখা গেছে, ২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ২১০০টি জলবায়ু মামলা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধান ছাড়াও বিএমডিএ আইন, ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট আইন, পরিবেশ আইন ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন রয়েছে। আইনি লড়াইয়ের মূল ভিত্তি হলো সংবিধান, যেখানে জীবনের অধিকার ও পরিবেশের অধিকার স্পষ্ট। ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আদালতের সাম্প্রতিক মতামত রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা তুলে ধরে, যা আমাদের সাহস জোগাচ্ছে। চলনবিলের উদাহরণে দেখা যায়, লস অ্যান্ড ড্যামেজ কাঠামোর মূল উপাদান যেমন ক্ষতির ধরন, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতি সবই বিদ্যমান।
আমাদের আইনি ভিত্তি মজবুত ও প্রস্তুতি সম্পন্ন। কপ-৩০ আমাদের জন্য শুধু প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নয়, বরং এই আইনি প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনারও প্রতীক।
ধারণাপত্র উপস্থাপন
বারিশ হাসান চৌধুরী
পলিসি অ্যান্ড ক্যাম্পেইন কো–অর্ডিনেটর, বেলা
ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ৩০ ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। এটি প্যারিস চুক্তির দশ বছর পূর্তি এবং আদিবাসী অধিকার রক্ষার মঞ্চ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বহুপাক্ষিকতার সংকট থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার ডেলিগেট অংশগ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি নেগোশিয়েশনে প্রভাব ফেললেও সিভিল সোসাইটি সক্রিয়ভাবে তাদের শক্তি প্রদর্শন করেছে। কপ৩০ থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি এসেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মুতিরাও পলিটিক্যাল প্যাকেজ। এটি উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন এজেন্ডাকে একত্রিত করে একটি কাভার ডিসিশন আকারে এসেছে। গ্লোবাল ইমপ্লিমেন্টেশন এক্সেলারেটর ও বাকু টু বেলা রোডম্যাপ চালু করা হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে এক দশমিক তিন ট্রিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে পাবলিক ফাইন্যান্সের বেসলাইন ধরা হয়েছে ৩০০ বিলিয়ন ডলার।
অ্যাডাপ্টেশন ফাইন্যান্স আলোচনার টেবিলে আনা হয়েছে ও ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি তিন গুণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বেলেম অ্যাকশন মেকানিজম বা জাস্ট ট্রানজিশন দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নত কর্মসংস্থান ও জ্বালানি রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশনের ৬০টি সূচক চূড়ান্ত করা হয়েছে। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে, প্রথম ব্যাচে ২৫০ মিলিয়ন ডলার ছাড় দেওয়া হবে।
ব্রাজিল ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ) ঘোষণা করেছে, যা বন রক্ষায় এক দীর্ঘস্থায়ী ‘প্যাঁয় ফর পেরফরমান্স’ ফান্ড হিসেবে কাজ করবে, যেখানে দেশগুলো বন সংরক্ষণ করলে সরাসরি অর্থ সহায়তা পাবে । এই ফ্যাসিলিটিটি ১২৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার প্রতি হেক্টরে ৪ ডলার আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বন সংরক্ষক দেশগুলোর । তবে প্রতি হেক্টরে ৪ ডলারের প্রণোদনা যথেষ্ট কি না, সে প্রশ্নের পাশাপাশি টিএফএফএফের কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। কারণ, ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও এই পর্যন্ত মাত্র ৬ বিলিয়নের মতো বিনিয়োগ এসেছে। টিএফএফএফ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু অর্থায়ন, বন সংরক্ষণ ও আদিবাসী অধিকার রক্ষার এটি একটি মাইলস্টোন। কিন্তু এটির সফলতা নির্ভর করছে সময় ও প্রয়োজনীয় প্রশ্নের সমাধানের মাধ্যমে।
সরদার মো. আসাদুজ্জামান
সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি,
ইউএনডিপি বাংলাদেশ
কপ-৩০ প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি আলোচনার জায়গা, যেখানে দেশীয় অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলেও এটি চলমান প্রক্রিয়া, যা সময়সাপেক্ষ। ফেনীর অপ্রত্যাশিত বন্যা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে স্থানীয় জ্ঞান ও প্রস্তুতি অপরিহার্য। উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় অভিজ্ঞতা অভিযোজন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন মডেল বিশ্বে নেতৃস্থানীয়, লজিক প্রজেক্টসহ সফল উদাহরণগুলো তুলে ধরেছে। তবে প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে না; তাই জাতীয় অর্থায়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
ইউএনডিপি ও ফরাসি সরকারের সহায়তায় বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে, যাতে জাতীয় বাজেটে জলবায়ু অর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত হয়। ঝুঁকি ও তথ্য বিশ্লেষণও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। বন ও জীববৈচিত্র্যসংক্রান্ত উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও হাওর অঞ্চলের অভিযোজন পরিকল্পনা সুসংগঠিত করা সম্ভব। ন্যাপকে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন ও অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সরকার সিবিআই বা জলবায়ু ঝুঁকি সূচক তৈরি করেছে, যা স্থানীয় সরকার বাজেট বরাদ্দে প্রাধান্য পাচ্ছে। আগে জনসংখ্যা বা যোগাযোগের ভিত্তিতে বাজেট যেত, এখন ঝুঁকির মান বিবেচিত হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে জলবায়ু বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই সচেতনতা কাজে রূপান্তর করা হলে আমরা আরও সামনের দিকে এগোতে পারব এবং শক্তিশালী দেশ হিসেবে গড়ে উঠব।
হরজিৎ সিং
গ্লোবাল এনগেজমেন্ট ডিরেক্টর,
ফসিল ফুয়েল নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি
জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে শক্তিশালী দেশগুলো এখনো উৎপাদন ও সম্প্রসারণ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ৮০টিরও বেশি দেশ কপ৩০ সম্মেলনে অংশ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আদালতের মতামত নতুন বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে কাজ করছে, যা জলবায়ু ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করতে পারে। বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি হ্রাসে পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং আইসিজের রায়ের পর জনগণও এই ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন সম্মেলনে সক্রিয় ভূমিকা, জ্বালানি রূপান্তরের জন্য উন্নত দেশ থেকে প্রযুক্তি ও অর্থায়নের দাবি তোলা। কলম্বিয়ার মতো দ্রুত কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করে দেশীয় কাঠামো ও সমন্বয় শক্তিশালী করতে হবে।
দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা প্রসারিত করে ভারত ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের সঙ্গে প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। বাণিজ্য ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়াই সমাধান।
দেশীয় প্রতিবেদন ও প্রচারণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজ ও মিডিয়াকে বাস্তব অবস্থা বোঝাতে হবে। নাগরিক সমাজও এই লড়াইয়ের অংশ হিসেবে সক্রিয়। কপ৩০–এর এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে, যদিও প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফাঁক আছে, বাংলাদেশ বাস্তবিক দিক থেকে প্রস্তুতি, সমন্বয় ও সচেতনতায় এগিয়ে রয়েছে এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দৃঢ় অবস্থান নেবে।
লিডি ন্যাকপিল
সমন্বয়ক ও সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার,
এশিয়ান পিপলস মুভমেন্ট অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
এসব জলবায়ু সম্মেলন থেকে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আসেনি। ভবিষ্যতে যে আসবে, সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সফলতা ও ব্যর্থতার মানদণ্ডে মাপলে এ সম্মেলনও কার্যকর কোনো কিছু দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এর মানে এই প্রক্রিয়াগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। এসব সম্মেলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, এখানে এমন নীতি ও কাঠামোর ওপর আলোচনা হয়, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলে নীতি বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। সেই নীতিগুলো ভয়ানক প্রভাব ফেলতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মানুষ ও পরিবেশে।
আমাদের অংশগ্রহণ শুধু আলোচনা করার জন্য নয়, এটি সেই ক্ষতি ঠেকানোর প্রয়াস। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে তাদের অধিকারের সুরক্ষা দিতে এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে তাদের অবস্থান দৃঢ় রাখতে এই উপস্থিতি প্রয়োজন। বড় কোনো ফলাফল এখনো দেখা যায়নি, তবে ছোট ছোট অর্জন আছে। এই ছোট অর্জনগুলো ভবিষ্যতের বড় বিজয়ের পথ তৈরি করবে।
যদিও সম্মেলনগুলো প্রত্যাশিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ, তবু অংশগ্রহণ ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা অপরিহার্য। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে রক্ষা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করতে এই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। ছোট অর্জনকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, এগুলো ভবিষ্যতে শক্তিশালী ফলাফল ও নীতি বাস্তবায়নের পথ খুলে দিতে পারে।
আসাদ রহমান
চিফ এক্সিকিউটিভ,
ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ (ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড)
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা ২ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা মোকাবিলায় ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা জরুরি। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও এর জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থায়ন, যা ২৪ থেকে ৪২ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। মূল প্রশ্নটি হলো ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও একটি সুষ্ঠু জ্বালানি রূপান্তর। বর্তমান বিশ্বে শক্তিশালী দেশগুলো খাদ্য ও জ্বালানিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আমাদের উচিত প্রযুক্তি সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ও মিথেন নির্গমন হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে দূষণকারী ও অর্থের প্রয়োজন যাদের, তাদের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করা জরুরি, কারণ আমরা কেবল নীতিনির্ধারণ নয়, সাধারণ মানুষের জীবন ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কথা বলছি। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ বাবদ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘ প্রক্রিয়ায় থাকা সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের দাবি উপেক্ষা করা যাবে না।
নতুন সম্মিলিত লক্ষ্য বা এনসিকিউজি নির্ধারণের প্রক্রিয়া জটিল হলেও সঠিক রোডম্যাপ ও ৯.১ অনুচ্ছেদসহ প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য জ্বালানি উত্তরণের পথ তৈরি করা সম্ভব।
শাহ রাফায়েত চৌধুরী
সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট, ফুটস্টেপস বাংলাদেশ
গত বছরের বন্যার সময়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী এলাকায় বন্যার সময় বাবার কবরের আশেপাশে পানি উঠে গিয়েছিল। আমি তখন উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছিলাম। চোখের সামনে সিস্টেমের ব্যর্থতা দেখেছি—বিদ্যুৎ নেই, রাস্তাঘাট খারাপ, মানুষজন আতঙ্কিত হচ্ছে। অস্থায়ী যাতায়াতের জন্য নৌকা বানানোর চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতা বোঝায়, কেন আগেভাগেই প্রস্তুতি ও সমন্বয় অপরিহার্য।
ফান্ড এক্সেস এখনো সীমিত, প্রাইভেট সেক্টরেরও কার্যকর ভূমিকা নেই। তাই গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশনের মাধ্যমে অন্তত দেখানো প্রয়োজন, যাতে প্রকল্প ও অর্থায়ন সঠিকভাবে পৌঁছায়। বাংলাদেশের পজিশন বোঝা এবং কপ ও এসবি পর্যায়ে সক্রিয় ইনপুট দেওয়া অপরিহার্য। বর্তমানে ১৯টি ট্র্যাক আমরা ফলো করি, কিন্তু শক্তিশালী প্রতিনিধিত্বের অভাব আছে। প্রস্তুতি জোরদার করা, অভিজ্ঞদের যুক্ত করা এবং সমন্বয় বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
মূল শিক্ষা হলো, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। প্রস্তুতি, সমন্বয় ও সতর্ক পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা কপ৩০ ও পরবর্তী পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারব। কপ৩১–এর জন্য বাস্তবতা মেনে, ধৈর্য ও সতর্কতায় লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং আশা রাখা অপরিহার্য।
সোহানুর রহমান
এক্সিকিউটিভ কো–অর্ডিনেটর, ইয়ুথ নেট গ্লোবাল
দ্রুত হতাশ হয়ে যাওয়ার কিছু নেই। কপ একটি মাল্টিল্যাটারাল প্রসেস। এই প্রসেসে ইউএস ও ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সম্মেলনটি হয়েছে। মুতিরাও বা পলিটিক্যাল প্যাকেজ এসেছে, কিন্তু কোনো বাস্তব পাথওয়েজ আসেনি, যা বড় চ্যালেঞ্জ। গ্লাসকোতে ফেজ আউট–ফেজ ডাউনের ডিবেট দেখায়, কিন্তু আমরা এখনই ফেজ আউট পর্যায়ে নেই। ফাইন্যান্সিয়াল ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট ছাড়া তেল, গ্যাস, কয়লা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
দুবাইতে প্রথমবার ট্রানজিশন অ্যাওয়ে ফ্রম ফসিল ফুয়েল, ট্রিপল রিনিউয়েবল এনার্জি, ডাবলিং এফিশিয়েন্সি ইস্যু আনা হয়েছে। এবার ৮০টি রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তবে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট নয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের নাম ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি টার্গেটে কতটা অন্তর্ভুক্ত তা জানা জরুরি।
সিবাম বা কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট নিয়ে চাপ রয়েছে, যা বাংলাদেশের আরএমজি খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আমরা জানি সবকিছু কপ থেকেই পাব না, তবে এসবি পর্যায়ে আমাদের অবস্থান তৈরি করে নেক্সট কপের দিকে এগোতে হবে। কিন্তু ন্যাপ অর্থাৎ ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যানের জন্য ফান্ড মোবিলাইজ করা জরুরি, নাহলে মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আফজাল হোসেন
নির্বাহী পরিচালক, রালফাও, রাজশাহী
বরেন্দ্র অঞ্চলে শীত ও খরার সঙ্গে মানুষ এখন পানীয় জলের জন্যই সংকটে। গেজেট প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৯ হাজার গ্রামকে জলসংকটাপন্ন ঘোষণা করে, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। পিএমডিএর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে; গ্রাউন্ড ওয়াটার নেই, ডিপ টিউবওয়েলও কাজ করছে না। ফলস্বরূপ, পানিবাণিজ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে। অতীতে প্রাকৃতিক পুকুর ও নদী যেমন মহানন্দা, ছোট যমুনা, বড়ালগুলো বরেন্দ্রের পানি নিয়ন্ত্রণ করত। আদিবাসীদের চিরায়ত জ্ঞান ও বন ব্যবস্থাপনা উপেক্ষিত হয়েছে।
বর্ধিত বাণিজ্যিক চাষ ও ভূমি পরিবর্তনের কারণে মাটি ও কৃষিজীবনের ক্ষতি হচ্ছে। এ অঞ্চলে কেঁচোর মতো প্রজাতি হ্রাস পেয়েছে, যা জৈব সার ও উর্বরতা কমাচ্ছে। তাই স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সামাজিক ও কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে পানি ও পরিবেশ রক্ষা জরুরি। বিশেষ অঞ্চল হিসেবে বরেন্দ্রকে ঘোষণা করতে হবে, যাতে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে জল, কৃষি ও বন সংরক্ষণ করা যায়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এই বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। বরেন্দ্রের টিকে থাকা এবং মানুষের জীবন ও উৎপাদন রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মো. হাফিজুর রহমান
জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, সাতক্ষীরা
আমি সুন্দরবন লাগোয়া সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা থেকে এসেছি। প্রতিবছর এই অঞ্চল দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বাঁধ ভাঙন ও অন্যান্য সমস্যায় জর্জরিত থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে স্পষ্ট, কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথাযথভাবে উঠে আসে না। আমরা স্থানীয়ভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি, কিন্তু সরকারি নীতিনির্ধারক বা পরিকল্পনায় আমাদের কথা কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয় না।
আমাদের দাবি, এই অঞ্চলের সমস্যা সমাধান অ্যাডাপটেশনের পরিকল্পনার অংশ হতে হবে এবং উন্নয়নের জন্য বাজেট ও ফিন্যান্সিয়াল সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবনকে আমরা জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করেছি, কিন্তু সুরক্ষা কার্যক্রম প্রায়ই কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে।
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ যখন জীবিকার জন্য নির্ভরশীল ও কর্মসংস্থান সীমিত, তখন তারা প্রয়োজনে স্থানীয় বন ও সম্পদ ব্যবহার এড়াতে পারে না। ফলে প্রতিবছর কপ বা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এলেও প্রান্তিক মানুষের সমস্যার সমাধান আশানুরূপ হয় না।
আবুল কাশেম ফারুকী
শিক্ষক, ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কপ–৩০–এর পর বাংলাদেশ যে ফান্ডিং পায়, সেটি আমাদের অ্যাডাপটেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে কী হবে, তা আগেভাগে বুঝতে না পারলে পরিকল্পনা সঠিকভাবে সাজানো যাবে না। অ্যাগ্রিকালচার ও দুর্যোগের দিক থেকে ঝুঁকি বাড়ছে, কিন্তু কোন অঞ্চলে কতটুকু বৃদ্ধি পাবে, তা কোয়ান্টিফাই করতে হলে সঠিক মডেলিং দরকার। আন্তর্জাতিকভাবে উপলব্ধ ক্লাইমেট মডেলিং ডেটা পাওয়া যায়, তবে তা অনেক কোর্স রেজল্যুশনের। ফলে ছোট স্কেলের কাজ করা সম্ভব নয়।
আমাদের নিজস্ব ক্লাইমেট মডেলিং করার জন্য ফান্ডিং ও সক্ষমতা প্রয়োজন। আপাতত আমরা ডাউন-স্কেলিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ডেটা ব্যবহার করে ছোট স্কেলে ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট বুঝতে পারি। যেমন কোন অঞ্চলে বৃষ্টি বৃদ্ধি বা কমবে, বন্যার ঝুঁকি কতটা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি অ্যাগ্রিকালচারে কী প্রভাব ফেলবে—এসব জানা অত্যন্ত জরুরি। ফিউচারে মিটিগেশন ও অ্যাডাপটেশন কার্যকর করতে হলে এই প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। ন্যাশনাল লেভেলে একটি ক্লাইমেট মডেলিং বা ডাউন-স্কেলিং প্ল্যাটফর্ম থাকা উচিত, যা দেশের পরিকল্পনা ও ফান্ডিং ব্যবহারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
মুমতাহিনা রহমান
গবেষণা সহযোগী, সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ, ব্র্যাক
কপ৩০–এ ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি ফাইন্যান্সিং মেকানিজমকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখানো হয়েছে। ট্রপিক্যাল অঞ্চলে বন জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও এথনিক মাইনরিটিদের জীবিকা নির্ভরতার জন্য অপরিহার্য। এই ফ্যাসিলিটি দীর্ঘমেয়াদি, পারফরম্যান্স-ভিত্তিক এবং বার্ষিক পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। কোনো দেশের ডিফরেস্টেশন বৃদ্ধি পেলে ফান্ডিং কমে যাবে; ফলে দেশগুলো বন সংরক্ষণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনায় আগ্রহী হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু সুন্দরবন নয়, চিটাগাং হিল ট্র্যাকটস, বরেন্দ্র অঞ্চল ও সোশ্যাল ফরেস্ট্রি প্রজেক্টগুলোও প্রাধান্য পাচ্ছে। সম্প্রতি বরগুনা অঞ্চলে চলা এক ইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্টে দেখা গেছে, স্থানীয় লোকজন মূলত নদী ও জলভূমিনির্ভর কাজ করছে, কিন্তু ৮০ শতাংশ মানুষ বন সংরক্ষণ বা সংশ্লিষ্ট কাজেও যুক্ত হতে ইচ্ছুক।
এটি বাস্তবায়িত হলে তারা মনিটরিং ও কো-ম্যানেজমেন্ট কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবে, কমিউনিটি বেজড কনজারভেশন কর্মসূচি কার্যকর হবে এবং এথনিক কমিউনিটির পারস্পরিক জ্ঞান নষ্ট হবে না।
ফাইন্যান্সিং মেকানিজমের মাধ্যমে বনায়ন কর্মসূচিকে ব্যয় নয়, একটি বড় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যাবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বনভূমির ২৫ শতাংশ সংরক্ষিত রয়েছে, বনায়ন কার্যক্রম আরও ৪ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে। যদি এই মেকানিজমকে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান ও নীতিমালার সঙ্গে সংযুক্ত করে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে তা বন সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে কার্যকর এবং টেকসই হবে।
শেখ নূর আতায়ে রাব্বি
অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি,
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল ৯–এর ফাইন্যান্স ইস্যু সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল কপ৩০–এ। এই কপে আর্টিকেল ৯–এর আওতায় ফাইন্যান্স–সংক্রান্ত একটি ওয়ার্ক প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত আসে, যেখানে আর্টিকেল ৯.১, ৯.২ ও আংশিকভাবে প্রাইভেট ফাইন্যান্সের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে আর্টিকেল ৯.৫ ও ৯.৭–এ থাকা ফাইন্যান্স রিপোর্টিং ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলো উন্নত দেশগুলোর চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত বাদ পড়ে যায়। আমি এটিকে ফাইন্যান্স ট্রান্সপারেন্সির ক্ষেত্রে একটি বড় সমঝোতা হিসেবে দেখি।
আর্টিকেল ৯.২–এ উন্নত দেশগুলোর জন্য পাবলিক ফাইন্যান্স দেওয়ার আইনি দায়ের কথা থাকলেও, প্রাইভেট ফাইন্যান্স যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আগামী ওয়ার্ক প্রোগ্রামে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি ফুটনোট যুক্ত করে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, এই ওয়ার্ক প্রোগ্রামে এনসিকিউজির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করা যাবে না, যা প্রত্যাশার তুলনায় বড় সীমাবদ্ধতা। গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপটেশনের ক্ষেত্রে ৫৯টি ইনডিকেটর অনুমোদন পেলেও, এগুলোর সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক দায় যুক্ত করা হয়নি। এসব ইনডিকেটরের অনেকগুলোর বেসলাইন নেই এবং জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যানের ক্ষেত্রে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির সহায়তার কথা বলা হলেও, বাস্তবায়নের স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ট্রেড ইস্যু কপের মূল প্রক্রিয়ায় এলেও, ঋণসংক্রান্ত সমস্যাগুলো আলোচনায় আসেনি।
মির্জা শওকত আলী
পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন),
পরিবেশ অধিদপ্তর
কপ৩০-এ বড় কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল না। নিউ কালেক্টিভ কোয়ান্টিফাইড গোল নিয়ে কপ২৯ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ না হলেও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ব্রাজিলের বেলেমে নিয়মিত এজেন্ডাগুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে। গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপ্টেশন (জিজিএ) নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা ছিল একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হবে, যা জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
নেগোসিয়েশনে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হয়, ধীরে ধীরে লক্ষ্য পূরণ হয়। অ্যাডাপ্টেশন ফিন্যান্স ২০২৫ সালে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে এবং ২০৩৫ সালে ১২০ বিলিয়ন ডলার হবে। এবারের কপে ১২০ বিলিয়নের সংখ্যা অনুপস্থিত থাকলেও ক্লাইমেট ফিন্যান্সের ৯.১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুই বছরের রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে, যা উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থের হিসাব রাখতে সাহায্য করবে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে; ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প জমা দেওয়া হবে, ইতিমধ্যে ৮১৭ মিলিয়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
জাতীয় পর্যায়ে এনডিসি জমা দিয়ে রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে, ন্যাপ বাস্তবায়ন চলছে। বিটিআর রিপোর্টে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হবে। গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইনের লিকেজ রোধে ৫ মিলিয়ন টন কার্বন কমানো হয়েছে, যা কার্বন ট্রেডিংয়ে ব্যবহৃত হবে। কার্বন মার্কেট ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডে যাবে।
এ কে এম সোহেল
অতিরিক্ত সচিব ও প্রধান (জাতিসংঘ উইং),
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়
বিচ্ছিন্নভাবে কোনো সুফল আসে না। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজ, মিডিয়া, শিক্ষাবিদ ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করা।
বৈশ্বিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার খুবই কম, তবে ৩০ বছরের সংগ্রামের পর এটি আমাদের কাছে বড় অর্জন। জিসিএফের মতো আন্তর্জাতিক ফান্ড থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদন পাওয়াও অকল্পনীয় ছিল। প্রকল্প প্রস্তাব থেকে বাস্তবায়ন সময় কমিয়ে ছয় মাসের মধ্যে আনার নির্দেশ এসেছে। ন্যায়সংগত রূপান্তর ও জেন্ডার সংবেদনশীল অর্থায়ন এখন সময়োপযোগী। প্রান্তিক নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি আমাদের জলবায়ু অভিযোজন মডেলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি, খাল-পুকুর সংস্কার, লিজ ও সামাজিক ব্যবস্থার সমস্যা সমাধানে বিদেশি অর্থায়ন প্রয়োজন। প্যারিস চুক্তির পর আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ৪৭৪ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ঋণ ২৫ মিলিয়ন ডলার। আমাদের কপে যাওয়ার লক্ষ্য হলো এই অধিকার প্রতিষ্ঠা। মাত্র ৮৩ জন প্রতিনিধি নিয়েও আমরা প্রতিটি আলোচনায় সক্রিয় ছিলাম। উন্নয়ন সহায়তা দেশীয় কাজে লাগানো, প্রশাসনিক ব্যয় ১০ শতাংশের নিচে রাখা এবং দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কাজে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমরা বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে দর-কষাকষি করছি, ঋণের কিস্তি দীর্ঘ করে এবং ডেট সোয়াপের মাধ্যমে দেশের জন্য বেশি সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।
সুপারিশ
জাতীয় অর্থায়ন কাঠামোর সঙ্গে প্রকল্পভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন সংযুক্ত করা
ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান বাস্তবায়ন ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণ জোর দেওয়া
দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, সমন্বয় ও সতর্কতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ গ্রহণ
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকা রক্ষায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ফান্ড ব্যবহার করা
কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা