প্রযুক্তি সহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা: প্রতিরোধ ও করণীয়

বিএনএনআরসি ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফেসিলিটেটেড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় গত ১৩ এপ্রিল এই গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে। প্রকল্পটি ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)’ কর্মসূচির অংশ, যা সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বিএনএনআরসি ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফেসিলিটেটেড জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় গত ১৩ এপ্রিল এই গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করেছবি : প্রথম আলো

নিলোফার চৌধুরী মনি

সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ সম্পাদক

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আমার ১০ বছরের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়। অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি; উল্টো টাকা চেয়ে ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব আসে। পরে অপহরণের ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়, পরিচিতদের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা সাক্ষাৎকারও প্রচার করা হয়। পুলিশকে জানালেও কোনো মীমাংসা হয়নি।

কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ—কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানো, গাজীপুরে মানুষ পুড়িয়ে

হত্যা এবং ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে একজন নারীকে পিটিয়ে হত্যা—কোনো ক্ষেত্রেই প্রতিকার হয়নি। সরকার বদলেছে, পরিস্থিতি বদলায়নি। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা কতটা ন্যায়বিচার পাবে—সেটাই প্রশ্ন।

সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে ৮৮ শতাংশের কোনো প্রতিকার নেই। ২০২৬ সালে শাহবাগে সারাদিন গালাগালি, বটবাহিনীর সক্রিয়তা থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় নি। রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত থেকেও যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থাই বা কী—প্রশ্ন ওঠে।

প্রশাসনের সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি থাকলে তা স্পষ্ট করা জরুরি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই প্রস্তুতির দায়িত্ব কার? সরকার, গণমাধ্যম, নাকি এনজিও? ভুক্তভোগীরা কেন সুরক্ষা পান না— এটি জানা  জরুরি।

অনলাইনে সহিংসতার শিকার হওয়ার পর একজন নারী মানসিকভাবে যে আঘাতপ্রাপ্ত হন, তা সহজে সারে না। এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে আরও জোরালো ব্যবস্থা নিতে হবে।

মো. মেহেদি–উল সহিদ

যুগ্ম সচিব, মহাপরিচলক, বিটিআরসি

একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করি—২০২৫ সালে বিটিআরসি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ১,৩২৩টি কনটেন্ট অপসারণের অনুরোধ করে, যার মধ্যে ১,২২৩টি অপসারণ হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৯২.৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে যৌনতা বিষয়ক কনটেন্ট প্রায় ৯০ শতাংশ এবং শিশুসংক্রান্ত কনটেন্ট প্রায় ৯৮ শতাংশ অপসারণ করা হয়েছে। এই চিত্র যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি উদ্বেগজনকও।

ফেক আইডির প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের একাধিক আইডি কেন থাকবে—এটি ভাবনার বিষয়। এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হলেও সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। সচেতনতা এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, যেমন এসিড সহিংসতা প্রতিরোধে দেখা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর গাইডলাইন সবসময় আমাদের দেশীয় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না, ফলে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ জটিল হয়। বিদ্যমান আইন কার্যকর হলেও সময়ের সঙ্গে তা পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। সরকারি সংস্থার প্রচারণা এখনো অপর্যাপ্ত। অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ জানেই না। এই ঘাটতি দূর করা জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব জায়গা থেকেই সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

কমিশনের পক্ষ থেকে আমি বিষয়গুলো উত্থাপন করব। ইন্টারনেট সহজলভ্য করা, ফ্রি ওয়াইফাই জোন বাড়ানো—এসব উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী করতে হবে। আইন শুধু করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক এনডিসি

যুগ্ম সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ

নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার বুলিং ও নাগরিকের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এই বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারে কোনো ঘাটতি নেই।

আইনগত দিক থেকে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সাইবার সুরক্ষা আইন—এখানে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সংজ্ঞা, বিচারব্যবস্থা, শাস্তি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন—এতে ব্যক্তিগত তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস, অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বা ফাঁস হলে প্রতিকার এবং দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। তৃতীয়ত, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৬—যেখানে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত ডেটা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। এই আইনগুলো নতুন, বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া।

আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে—মানুষ এই আইন ও সুবিধাগুলো সম্পর্কে জানে না। সরকারি কাঠামো ও সংস্থা থাকলেও তথ্য সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। তাই সচেতনতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি। সরকার মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনার করছে, পাশাপাশি সিভিল সোসাইটিও কাজ করছে। তবে আমাদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে।

সমস্যাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। সমাজকে না বুঝে আলাদাভাবে কোনো সংস্থা একা সমাধান দিতে পারবে না। সম্মিলিত উদ্যোগই এখানে মূল বিষয়।

ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান এনডিসি

পরিচালক (যুগ্ম সচিব), এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। সমাজ কীভাবে তা গ্রহণ করে, সেটিই মূল বিষয়। সামাজিক চাপ থাকলেও বাস্তবে মানুষের আচরণ অনেক সময় ভিন্ন পথে যায়। সমাজ যদি অপরাধ বা অনৈতিকতাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে, তাহলে কোনো একক প্রক্রিয়া যথেষ্ট নয়।

সচেতনতা জরুরি হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক প্রতিরোধ। অতিরিক্ত প্রচার অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে, যা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই কিছু ক্ষেত্রে সংযম ও কৌশলগতভাবে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

এ ধরনের ক্ষেত্রে এনজিওগুলোর ভূমিকা মূলত প্রকল্প ও নিবন্ধন অনুমোদনের মধ্যে সীমিত। তবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে প্রকল্পগুলো দ্রুত অনুমোদন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার হওয়া জরুরি।

 ‘ভুক্তভোগী’ শব্দটি অনেক সময় নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আরও দুর্বলভাবে উপস্থাপন করতে পারে—ভাষার এই দিকটি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

মানহানি মামলার ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের বিষয়, রাষ্ট্রীয় নয়; প্রমাণের দায়ও এখানে জটিল। শুধু আইন নয়, সামাজিক সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন থেকেও সমাধান খুঁজতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় এনজিওসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

মো. জাহিদুল ইসলাম

অতিরিক্ত ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সামাজিক ও প্রযুক্তিগতভাবে বহুমাত্রিক হয়ে গেছে। এখানে আইন, প্রযুক্তি, প্রশাসন এবং সমাজ—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। আমরা শুধু ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া না দিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চাই।

আমাদের কাজে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে—আইনি প্রক্রিয়া, আদালতের অনুমোদন, প্রমাণ সংগ্রহ ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার জটিলতা। বিশেষ করে অনলাইন প্রতারণায় বিভিন্ন দেশের সংগঠিত চক্র থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়। তবুও আমরা সাইবার অপরাধ শনাক্ত, তদন্ত ও প্রতিরোধে কাজ করছি এবং ২৪/৭ মনিটরিং সিস্টেম চালু রয়েছে।

একই সঙ্গে আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ তথ্য ও আইনগত সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন নয়। ফলে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় অভিযোগ করতেও দ্বিধা করে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাই সমাজকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।

এসব সমস্যার সমাধান এককভাবে কোনো সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। সমন্বিত উদ্যোগ, আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা—এই চারটি বিষয় একসাথে কাজ করলেই আমরা কার্যকর ফল পাবো।

সুমন আহমেদ শাওন, পিপিএম-সেবা

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের লিগ্যাল অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন সেল (এলআইসি) শাখার তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সেল পরিচালিত হয়। এই সেলটি ২০১৯ সাল থেকে চালু আছে এবং এখানে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০০০৮৮৮, ফেসবুক পেজ Police Cyber Support for Women-PCSW এবং ই–মেইল [email protected] ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার নারীরা অভিযোগ জানাতে পারেন।

নারীরা অনলাইনে সবচেয়ে বেশি ডক্সিংয়ের শিকার হন, যেখানে বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য

অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে হুমকি দেওয়া হয়; এ ধরনের ঘটনার হার প্রায় ৪৮ শতাংশ।

ডক্সিং ও ব্ল্যাকমেইলিং সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে—প্রায় ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৭ শতাংশে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তায় সমাধান সম্ভব।

অনেক ভুক্তভোগী আইনগত প্রক্রিয়ায় যেতে অনিচ্ছুক থাকেন, যার কারণ পারিবারিক চাপ, গোপনীয়তা বা আস্থার অভাব। আমরা তাদের থানা ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যেতে উৎসাহিত করি এবং তদন্তে কারিগরি সহায়তা দিই।

সচেতনতা কার্যক্রম, হটলাইন ও ফেসবুক পেইজ প্রচার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন জুয়া ও প্রতারণা প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।

মাসুদা ইয়াসমিন

উপ পরিচালক, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর

প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা একটি বহুমাত্রিক বিষয়, যেখানে সামাজিক, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় এবং সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব জরুরি। এই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের আইনগত সহায়তা কার্যক্রম এখন ‘আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর’ থেকে বিস্তৃত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে, যা আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে কাজ করে। প্রতিটি জেলা আদালতে আইনি সহায়তাকেন্দ্র রয়েছে। এসব জায়গায় গিয়ে ও হেল্পলাইন নম্বর ১৬৬৯৯–এ কল করে ধনী–দরিদ্র যে কেউ সরকারি খরচে  আইনি সহায়তা ও পরামর্শ নিতে পারবেন। অনেকেই জানেন না কোথায় গেলে কী ধরনের সহায়তা পাবেন—এই হেল্পলাইনটি তাদের জন্য একটি প্রাথমিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা প্রথমেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং সামাজিক ও পারিবারিক সম্মান নিয়ে আতঙ্কে থাকেন। তাই তাদের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সচেতনতা বাড়ানো দরকার, কারণ এখনো অনেকেই আইনি অধিকার ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন না।

ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও সহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে প্রযুক্তি সহিংসতার নয়, বরং ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়।

Suvra Kanti Das

শাহনাজ মুন্নী

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আমার সহকর্মী, পরিচিতজন ও পরিবারের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রযুক্তিসহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিকার পাওয়ার পথ সম্পর্কে মানুষ সচেতন নয় এবং প্রথমে মনে করেন এর কোনো সমাধান নেই। পুলিশ বা সাইবার সেলে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেকে যান না। পরিচয় না থাকলে সহায়তা না পাওয়া, পুলিশের প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হবে—এই ভয় কাজ করে। ফলে অনেকেই নীরব থাকেন।

২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি কর্মশালার মাধ্যমে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বুঝতে পারি, যেখানে সমস্যার ব্যাপকতা উঠে আসে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক নারী সহায়তা চেয়েছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন নারী প্রযুক্তিসহায়ক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রথমত, সচেতনতা বাড়ানো—কোথায় গেলে প্রতিকার পাওয়া যায় এবং কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায় তা জানানো। দ্বিতীয়ত, ঘটনার পর প্রতিকারের পথ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। তৃতীয়ত, এসব ঘটনার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানানো।

আমাদের সাইবার স্পেস আসলে আমাদের সামাজিক মানসিকতারই প্রতিফলন। তাই মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। শুধু আইন থাকলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা বাস্তবেই প্রতিকার পান।

কানিজ ফাতেমা

সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ উইমেন ইন আইটি

আমরা প্রত্যাশার দুটি বড় জায়গায় সফল হয়েছি - নাগরিকের হাতে মোবাইল ও ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া এবং নারীর ক্ষমতায়ন। এই ক্ষমতায়নের সঙ্গে সক্ষমতার ঘাটতি রয়ে গেছে, বিশেষ করে সাইবার জগতে।

দেশে ৯০ শতাংশের বেশি পরিবারে মোবাইল ফোন এবং ৭২ শতাংশে স্মার্টফোন রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৭৮ শতাংশ নারী প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানির শিকার হন এবং তাদের মধ্যে ৮৮ শতাংশই আইনি সহায়তা নেন না। মূল সমস্যা হলো ভুক্তভোগী ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, যদিও আইন ও নীতিমালা বিদ্যমান এবং হালনাগাদ হচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতায় নারীরা দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়েন—অনলাইন হয়রানি এবং পরে পরিবার-সমাজের চাপ। ভুক্তভোগীকে দোষারোপের প্রবণতার কারণে তারা আইনি সহায়তা নিতে পিছিয়ে যান।

ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু রাষ্ট্র বা পুলিশের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে হবে না। প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীরা যেন সহজে আইনি সহায়তা নিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন একটি মৌলিক অধিকার। প্রযুক্তি যেন সহিংসতার নয়, বরং ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়—তার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

Suvra Kanti Das

এ এইচ এম বজলুর রহমান

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিএনএনআরসি

প্রযুক্তিসহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা শুধু অনলাইন নয়, অফলাইনেও ঘটে। বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ, অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র, অফলাইন রেকর্ডিং ডিভাইস, গোপন ক্যামেরা কিংবা

কলম ও চশমায় সংযুক্ত ক্যামেরার মতো প্রযুক্তিও এতে ব্যবহৃত হয়।

এ বাস্তবতায় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করা, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সমন্বিত সাড়া ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন ‘প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলা ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যা নাগরিকতা: সিইএফ কর্মসূচির অংশ। এতে অর্থায়ন করেছে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসাল্টিং গ্রুপ।

প্রকল্পটি ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরা—এই ছয় জেলায় এবং ৯টি কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে প্রায় এক বছর ধরে সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে।

মো. নুরুল ইসলাম,

ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট, নাগরিকতা: সিইএফ কর্মসূচি

নাগরিকতা: সিইএফ কর্মসূচি মূলত এসডিজি ৫ এবং এসডিজি ১৬-কে লক্ষ্য করে কাজ করছে। এর আওতায় বর্তমানে সারা দেশে ২৬টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার মধ্যে বিএনএনআরসির টিএফজিবিভি বিষয়ক প্রকল্পও রয়েছে।

ই-গভর্ন্যান্স, ডিজিটাল সেবা ও নাগরিক সুবিধা প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজ হয়েছে, তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষ করে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এখন বড় সমস্যা। বিভিন্ন

তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে, কিন্তু প্রায় ৭৫ শতাংশই তা রিপোর্ট করছে না।

আমাদের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে

আসা দরকার। এই মানসিকতার  পরিবর্তন না হলে সহিংসতা কোনো না কোনোভাবে চলতেই থাকবে। আমাদের কর্মসূচিতে সচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নীতিগতভাবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দিষ্ট দল থাকা প্রয়োজন, যারা নিয়মিত প্রযুক্তির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত সুপারিশ দিতে পারে। একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যা ভুয়া তথ্য ও বড় ডিজিটাল ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

সৈয়দ আলমাস কবীর

চেয়ারম্যান,

বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা শুধু নারীদের বিষয় নয়; প্রযুক্তি ব্যবহারকারী যেকোনো মানুষই এর শিকার হতে পারে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে, কারণ সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এই সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করে।

বিভিন্ন প্রযুক্তি মাধ্যমে তথ্য গোপন থাকার সুবিধার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজে ছদ্মনামে এসব কার্যক্রম চালাতে পারে। তাই প্রযুক্তি বন্ধ করা নয়, বরং সচেতনতা তৈরি করাই মূল পথ।

এই সচেতনতা ৩৬০ ডিগ্রির হতে হবে—শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষকে ডিজিটাল আচরণবিধি শেখাতে হবে।এটি শুধু সেমিনারে নয়, শিক্ষাক্রম ও সাংস্কৃতিক মাধ্যমেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবার তথ্য সহজ ও জনপ্রিয় করতে হবে। আইনকেও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়মিত আপডেট করতে হবে, বিশেষ করে এআই, ভুয়া কনটেন্ট ও নতুন সাইবার ঝুঁকি বিবেচনায়।

শামীমা আখতার

চেয়ারপারসন,

বাংলাদেশ উইমেন ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম

আমি বিশেষভাবে বিটিআরসির প্রতি অনুরোধ জানাই, যেন সামাজিক দায়বদ্ধতা ও প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের বিষয়গুলো আরও শক্তিশালী করে কমিউনিটি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়।

স্কুল পর্যায়ে ১১-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে নীরব সাইবার বুলিং হচ্ছে, যা অনেক সময় ভুক্তভোগী ও অভিভাবক কেউই শনাক্ত করতে পারেন না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি সাইবার বুলিং মনিটরিং টিম থাকা জরুরি, যারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বিটিআরসি, বাংলাদেশ পুলিশ, সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট, জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সবাই যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

জাতীয় সংসদে আলোচনা ও স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সাইবার বুলিং ও প্রযুক্তিসহায়ক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ডিজিটাল যুগে মানবিকতা, গণতন্ত্র ও মর্যাদা রক্ষায় এই ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মোহাম্মদ আব্দুল হক

সেক্রেটারি জেনারেল,

বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম

বর্তমানে আমরা এমন এক বাস্তবতায় আছি, যেখানে আমার অজান্তেই আমার নামে বা আমার কণ্ঠ/ছবি ব্যবহার করে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি হয়ে ভাইরাল হতে পারে। এআই ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারও এখন সাধারণ হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভয়েস ক্লোনিং, মুখমণ্ডল ক্লোনিং এবং এআই-নির্ভর ভুয়া বক্তব্য প্রচারের ঘটনা বাড়ছে।

এআই–ভিত্তিক আইন ও নীতি, প্রযুক্তিসহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজে সন্তানদের ডিজিটাল পরিবেশে বড় করার বিষয়টিও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এককভাবে নয়, সম্মিলিত আলোচনা ও সচেতনতা জরুরি। পাশাপাশি জেন্ডার সংবেদনশীল জাতীয় আচরণবিধি এবং ভিডিও কনটেন্ট গাইডলাইন প্রণয়নও প্রয়োজ

শিউলি সাহা

আন্দোলন সম্পাদক,

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বরিশাল

মোবাইল সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজ ব্যবহারে সহিংসতার ছবি ও ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ সাহায্যের বদলে নীরব দর্শক হয়ে থাকছে—যা উদ্বেগজনক।

প্রশ্ন হলো, ক্ষতিকর বা নেগেটিভ কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও প্রত্যাহারের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা যায় কি না। এতে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন বা সংশ্লিষ্ট সেবা সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা একেবারেই কম। বরিশালের মতো এলাকায় দেখা যায়, অনেক নারীই জানেন না তারা এই সহায়তা নিতে পারেন। ব্যাপক প্রচারণা ছাড়া এটি পৌঁছানো কঠিন, তাই নাটক, গান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে ক্যাম্পেইন জরুরি।

প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে এই সহিংসতা পুরোপুরি কমানো সম্ভব নয়।

সানজানা আফরোজ

সদস্য,

শান্তি মিত্র সমাজ কল্যাণ সংস্থা, ময়মনসিংহ

আমার জেলায় বিএনএনআরসির প্রশিক্ষণের পর নারীদের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক কর্মশালা করি। সেখানে দেখা যায়, অনেক নারীই বুঝতে পারেন না যে তাঁরা ডিজিটাল সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

প্রথমে নিজের অবস্থান বোঝা জরুরি। না বুঝলে প্রতিকারের পথেও যাওয়া হয় না। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা এবং বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

এ ছাড়া ৯–১৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুরাও ডিজিটাল ঝুঁকিতে রয়েছে, একই সঙ্গে তারা অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। তাই তাদের নিরাপত্তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

প্রতিকারের ক্ষেত্রে প্রতিটি আইডি জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যুক্ত করার মতো ব্যবস্থা এবং সামাজিক মাধ্যমে আইডি ভেরিফিকেশন নিয়ে ভাবা যেতে পারে, যাতে ফেক আইডি ও অপব্যবহার কমে।

বন্দনা চাকী

মানবাধিকার কর্মী, কুষ্টিয়া

পারিবারিক সহিংসতা এখন ভিন্ন রূপে সমাজের ভেতরে ডিজিটালভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। সহিংসতা কমেনি, বরং নতুন আকারে আরও বিস্তৃত হয়েছে, যার পেছনে অন্যতম কারণ মূল্যবোধের অবক্ষয়।

পারিবারিকভাবে সেই মূল্যবোধ ধরে রাখতে না পারা এবং সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে পারস্পরিক নির্ভরতার ধারণা দুর্বল হয়ে যাওয়াও একটি কারণ। এতে সন্তানরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু প্রযুক্তি নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অপব্যবহারও শিখে ফেলছে এবং অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে সহিংসতাকে অনুকরণ করছে।

সাইবার পুলিশের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। অনেকে এখনো জানে না তারা কোথায় সহায়তা পেতে পারে, জানলেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। তাই তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও অপরাধের পাশাপাশি বিচার ও ফলাফল তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দেখা যায়।

সুপারিশ  

  • প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ জোরদার করা।

  • সুস্পষ্ট নীতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করা।

  • প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও প্রতিকারব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

  • বিদ্যমান আইন–নীতিতে টিএফজিবিভিকে পৃথক ও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা।

  • প্রতিরোধ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিন্ন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা।

  • ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ, সহজ ও দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

  • আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা।

  • ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করার সংস্কৃতি জোরদার করা।

  • সচেতনতা কার্যক্রমকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে নিয়মিত কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।

  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রচার জোরদার করা।

  • গণমাধ্যম ও কমিউনিটিকে সচেতনতা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা।

  • সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট সেবাদাতাদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা।

  • ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ ও অভিযোগ নিষ্পত্তিতে জবাবদিহি বাড়ানো।

  • জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয় জোরদার করা।

  • জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।

  • আইসিটি ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ কমিটিতে টিএফজিবিভি অন্তর্ভুক্ত করা।

  • স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

  • অভিযোগ সহায়তা ও সচেতনতা কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা।

এ ছাড়া আরও অংশ নেন: মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহিশন লিড ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির জেন্ডার ফোকাল ফারজানা হক, উন্নয়নকর্মী এস এম মোর্শেদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ভিউজ বাংলাদেশের  সম্পাদক রাশেদ মেহেদী, একাত্তর টিভির বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ শারমীন, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি জান্নাতুল বাকেয়া কেকা, দ্য ডেইলি স্টার–এর সাংবাদিক জেবা মোবাশ্বিরা

সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।