শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে 

বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্টের থ্রাইভ প্রোগ্রাম ও প্রথম আলো

গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) ফাহমিদা তোফায়েল, মনজুর আহমেদ, শ্যামল কুমার রায় ও জেনা দেরাখশানি হামাদানি। গতকাল ঢাকায় প্রথম আলোর কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

শিশুর উন্নয়নে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, সুরক্ষা ও বিকাশ জরুরি। মায়ের গর্ভ থেকেই শিশুর যত্ন শুরু করতে হবে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজে সমন্বয়ের অভাব, বাজেট-ঘাটতি, দক্ষ জনশক্তির অভাব, সেবার গুণগত মান ভালো না হওয়া, সব শিশুর সমানভাবে সেবা না পাওয়ার মতো বাধার কারণে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে (আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট বা ইসিডি) কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। 

গতকাল সোমবার অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্টের থ্রাইভ প্রোগ্রাম ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা। তাঁরা শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে বলেন এবং ইসিডি কার্যক্রমকে প্রকল্প থেকে স্থায়ী বাজেট-কাঠামোয় আনা ও ইসিডিসহ শিশুর বিষয় দেখভালে পৃথক শিশুবিষয়ক অধিদপ্তর গঠনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশে প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ: গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে নীতি ও বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের (ইসিসিডি) সমন্বিত নীতি-২০১৩ অনুযায়ী, শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ হচ্ছে প্রতিটি শিশুকে তার বেঁচে থাকা, সুরক্ষা, যত্ন, বিকাশ ও শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া, যা শিশুর ভ্রূণ অবস্থা থেকে কাঙ্ক্ষিত বিকাশ নিশ্চিত করবে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট ১৫টি মন্ত্রণালয় বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। মন্ত্রণালয়গুলো, বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের (বেন) চেয়ারপারসন মনজুর আহমেদ বলেন, স্থায়ী বাজেটের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ নিয়ে কাজ করতে হবে। এ কার্যক্রমকে প্রকল্প থেকে ধাপে ধাপে জাতীয় কার্যক্রমে নিয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে শিশুর জন্য যেসব বাজেট রয়েছে, সেগুলোকে সমন্বয় করে পরিকল্পনা করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে তদারকি কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। তিনি বলেন, দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যু হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে যে শিশুদের বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেন হামের মতো পরিস্থিতি আর না ঘটে। শিশুদের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে শিশুবিষয়ক অধিদপ্তর গঠনের ওপর জোর দেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক ও বিভাগীয় প্রধান (ল্যাব) শ্যামল কুমার রায় বলেন, মায়ের গর্ভ থেকে শিশুর জন্ম-পরবর্তী সময় এক হাজার দিনকে ‘গোল্ডেন ডেজ’ (সোনালি দিন) বলা হয়। কারণ, এ সময়ে পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষার মাধ্যমে যেসব শিশুর বিকাশ হয়, তারাই পরে সফল হয়। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা (এএনসি) নিতে আসা মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় মাকে পরামর্শ দেওয়া হয় যে গর্ভের শিশুর জন্য তাঁকে কী কী খেতে হবে, তাঁকে কী কী সেবা নিতে হবে, কেন সেবাকেন্দ্রে এসে সন্তান প্রসব করতে হবে।

আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস বিজ্ঞানী জেনা দেরাখশানি হামাদানি বলেন, ইসিডির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের মধ্যে। ইসিডির গুরুত্ব কী এবং কী কী বিষয় শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সে তথ্য ছড়িয়ে দিতে সংবাদমাধ্যমকে ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুপুষ্টি বিভাগের বিজ্ঞানী ফাহমিদা তোফায়েল বলেন, শিশু গর্ভে থাকার সময়টি শিশুর বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে বিনিয়োগে তাৎক্ষণিক ফল দৃশ্যমান হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হয়। এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও সচেতন করতে হবে।

ইসিডি বাস্তবায়নে চারটি ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ

বৈঠকে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্টের থ্রাইভ প্রোগ্রামের কান্ট্রি রিসার্চ ম্যানেজার মো. তারেক হোসেন। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ইসিডি নিয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান ভালো। তবে নীতি বাস্তবায়নে মূলত চারটি ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। সেগুলো হচ্ছে কাজে সমন্বয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জনশক্তি ও তদারকি, গুণগত মানের নিশ্চয়তা এবং অর্থায়ন ও পরিকল্পনা। ফলে যে মানের সেবার প্রত্যাশা করা হয়, তা পাওয়া যায় না। ইসিডির সুফল পেতে সরকারি বরাদ্দের মধ্যে আন্তমন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ইসিডি কার্যক্রমকে সমন্বয় করে তা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হবে।

ইউনিসেফের শিক্ষাবিষয়ক ব্যবস্থাপক মো. ইকবাল হোসেন ইসিডি কার্যক্রমের মাধ্যমে কতটুকু অগ্রগতি হলো, কাজের মূল্যায়ন কী, সেসব সম্পর্কে প্রতিবছর প্রতিটি মন্ত্রণালয় যেন প্রতিবেদন দেয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

সিনারগোস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এষা হোসেন শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সঙ্গে শিশুর অসতর্কতা ও অবহেলাজনিত মৃত্যু বন্ধে জোরালো পদক্ষেপ নিতে বলেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের (আইইডি) কর্মসূচি প্রধান সৈয়দা সাজিয়া জামান পাইলট প্রকল্পগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পর এই অবস্থানে এসেছে দেশ। এখানে অর্জনও আছে। এ অর্জনকে টেকসই করতে বাধাগুলো দূর করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ (সামাজিক সুরক্ষা) আনিকা রহমান বলেন, ইসিডি কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে যত বিনিয়োগ হবে, তা আরও বেশি আকারে ফেরত আসবে। ২০ বছর পর সেই শিশু দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।

ইউনিসেফের নিউট্রিশন (পুষ্টি) ও ইসিডি কর্মকর্তা মো. আজিজ খান বলেন, ইসিডি সেবা কার্যকর করতে হলে একজন মাকে বারবার এর প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে হবে। ভালো নীতি থাকার পরও দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির দুর্বলতার কারণে ইসিডি কার্যক্রম কার্যকর হচ্ছে না।

সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপক জান্নাতুন নাহার বলেন, ইসিডি সেবার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ধনীরা তাঁদের শিশুদের সেবা নিতে বেশি আসছেন। দরিদ্ররা পিছিয়ে। এ কার্যক্রমে অর্থায়ন বাড়ানো ও সেবার গুণগত মান বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

শিশুর বিকাশে এলাকাভিত্তিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আরও বাড়ানো উচিত বলে মন্তব্য করেন ‘ফুলকি’র জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক সাহানা বেগম।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী