নারী-নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনে সমন্বিত উদ্যোগ

ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহযোগিতায় সেভ দ্য চিলড্রেনের সোচ্চার প্রকল্প ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনের সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৯ মার্চ ২০২৬, ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনে সমন্বিত উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরাছবি: প্রথম আলো

শবনম মোস্তারী

অতিরিক্ত সচিব, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়

আমাদের দেশে নারীর অগ্রগতি হয়েছে, এটা সত্য; কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে দেখলে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে আছেন। নেতৃত্বের তো অনেকগুলো ক্ষেত্র আছে। নারীদের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিচরণ অবাধ হতে হবে। নারী সংগঠনগুলোকে তাই নির্দিষ্ট ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।

শুধু সংখ্যা বাড়লেই নেতৃত্ব তৈরি হয় না। ইউনিয়ন পরিষদে নারী সদস্য থাকলেও যদি তাঁর প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকে, তাহলে তিনি কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। তাই নারীদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রশিক্ষণের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন অনেক উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে। এগুলোকে সমন্বিতভাবে করতে হবে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। নারী উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত। কীভাবে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে হয়, ব্যাংক থেকে লোন নিতে হয়, একটি বিজনেস প্ল্যান তৈরি করতে হয়—এই জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আমরা প্রায়ই দেখি নারীদের উদ্যোক্তা মানেই সেলাই শেখা বা কেক বানানো; কিন্তু বাস্তবে আরও অনেক ক্ষেত্র আছে—যেমন কেয়ারগিভার তৈরি করা, বিভিন্ন সেবা বা সরবরাহ–ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায়ও নারীদের অংশগ্রহণ খুব কম। এই জায়গাগুলোতে নতুন উদ্যোগ দরকার।

একই সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত—এই ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। শিল্পবিপ্লবের এই সময়ে এসব দক্ষতা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

ব্যবসা, রাজনীতি, প্রশাসন, গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই নারীর নেতৃত্ব বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সরকার একা তা করতে পারবে না। নারী সংগঠন, গণমাধ্যম ও সমাজের সক্রিয় ভূমিকা দরকার। আমরা যদি তথ্যভিত্তিক ও সমন্বিতভাবে কাজ করি, তাহলে নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।

মাশফিকা জামান সাটিয়ার

সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার, ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস

আমাদের মূল লক্ষ্য হলো নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকে একত্র করা এবং সমন্বিতভাবে কাজের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। আমরা শুরুতে ১০টি নেতৃত্বাধীন সংগঠন নিয়ে কাজ শুরু করেছি, তবে এটি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিটি সংস্থা তাদের নিজ নিজ এলাকায় একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে এবং সেই নেটওয়ার্ককে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করবে। আমাদের প্রত্যাশা—এই উদ্যোগ নারী নেতৃত্ব ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।

এই প্রকল্প নেওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ ছিল অর্থায়নের সংকট কাটানো। বিশেষ করে নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে থাকে। অনেক সময় প্রস্তাব লেখা বা যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁরা অর্থায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। আমরা চাই এই প্রকল্প তাঁদের একত্র করে সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করতে এবং তা অর্জন করতে সহায়তা করুক।

আমাদের দেশে নারী–সম্পর্কিত অনেক আইন রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং কোথায় ঘাটতি আছে তা চিহ্নিত করা। এ জন্য সরকার, দাতা সংস্থা ও জাতিসংঘের যৌথ প্ল্যাটফর্মে নীতিনির্ধারণী সংলাপের মাধ্যমে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অর্থনৈতিক শক্তি মানুষকে নেতৃত্বের জায়গায় নিয়ে যেতে সহায়তা করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে নারীরা হয়রানি ছাড়াই সেবা ও অর্থায়নের সুযোগ পাবেন এবং নিজেদের সক্ষমতা বিকাশ করতে পারবেন। এ কাজ আমরা একা করতে পারব না। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজ—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নারী নেতৃত্বের বিকাশ এবং টেকসই পরিবর্তন সম্ভব।

এ এস এম রহমত উল্লাহ

ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর, সেভ দ্য চিলড্রেন

আমরা যখন নেতৃত্বের কথা বলি, তখন সেই বিকাশ কোথায় ঘটবে, কোথা থেকে শুরু করব এবং কোথায় যেতে চাই—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তথ্য ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দিতে হবে। নারী নেতৃত্বের বিকাশ শুধু নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোর কাজ নয়। এর সঙ্গে আন্তপ্রজন্মের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক রীতিনীতিকে রূপান্তরমুখী করা, আইনি সংস্কারের কথা ভাবা ও আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই ‘সোচ্চার’ প্রকল্প কাজ করছে।

নারীরা কীভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেতে পারেন, সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা অন্যান্য সংগঠন কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। যখন নারীরা কথা বলার সুযোগ পান না বা তাঁদের পরিসর সংকুচিত হয়, তখন নারী নেতৃত্বও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে নারী সংগঠনগুলো সক্রিয় হলে এবং বহু নেতৃত্ব তৈরি হলে এই স্পেস সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আমাদের একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সরকার, বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যমসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো সক্ষমতা বৃদ্ধি। যদি আমরা এই সক্ষমতাকে প্রকল্প নকশার মধ্যেই রূপান্তরমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, তাহলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের দৃষ্টিতে নারী ও শিশু পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন নারী যখন নিরাপদ পরিবেশ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পায়, তখন সে তার সন্তানকে আরও ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারে। সেই কারণেই আমরা জেন্ডার ট্রান্সফরমেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করি, যাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে অবদান রাখা যায়।

ফওজিয়া মোসলেম

সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

আমাদের নারীদের মধ্যে আত্মসচেতনতা বেড়েছে ও নেতৃত্ব নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, শহরের তুলনায় তৃণমূলের নারীদের মধ্যেই এই সক্ষমতা ও আগ্রহ আরও বেশি। ফলে আমাদের সামনে একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনাকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাব, তার ওপরই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আগামী সংগ্রাম অনেকটা নির্ভর করবে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকটও রয়েছে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নেতৃত্বের জায়গায় নারীর অনুপস্থিতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পরিবেশের পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রায় কীভাবে প্রভাব ফেলছে এবং তা নারীদের ওপর কীভাবে নতুন সংকট তৈরি করছে, সেটিও আমাদের ভাবনায় থাকা উচিত।

নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের একটি স্পষ্ট ধারণাগত ভিত্তি দরকার। এ ক্ষেত্রে বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশন, সিডো ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিষয়গুলোকে ভিত্তি হিসেবে ধরে নেতৃত্ব তৈরি করা জরুরি। যাদের আমরা নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করব, তাদের সামনে এই আন্তর্জাতিক কাঠামো ও লক্ষ্যগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এখনো বড় বাধা। তাই যাঁরা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন, তাঁদের আইনি বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্যারালিগ্যাল প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা সহায়ক হবে।

তরুণদের সম্পৃক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের মানুষ ও তরুণদের নিয়ে যদি সচেতনতার শক্তিশালী উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারি—যেখানে বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হবে, তাহলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের পথে এগোতে সাহস পাবে।

শাহীন আনাম

নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা সহজ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক, পারিবারিক ও সামাজিক নানা বাধা রয়েছে। আমি যখন আমাদের অংশীদার সংগঠনগুলোর বৈঠক ডাকি, তখন দেখি ২৬টি সংগঠনের মধ্যে মাত্র পাঁচজন নারী সংগঠনের প্রধান হিসেবে উপস্থিত থাকেন। অথচ আমরা সচেতনভাবে নারীদের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করেছি। তবু নানা কারণে অনেক নারী সেই জায়গা ধরে রাখতে পারেন না।

এই বাস্তবতায় ‘সোচ্চার’-এর মতো উদ্যোগকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমরা নিজেরাও একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছি। সেখানে আমরা দেখেছি, কয়েক বছরের মধ্যেই নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের বড় পরিবর্তন এসেছে। এমনও হয়েছে, একটি ছোট গ্রামীণ সংগঠনের নারী নেতা আমাকে বলেছেন, এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে তাঁকে সম্মান দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। এই পরিবর্তনই আমাদের কাজের শক্তি। নারী নেতৃত্ব শুধু নারীর জন্য নয়; এটি পুরো সমাজের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন। এখন জেন্ডার ইস্যু আর শুধু নারীর বিষয় নয়, এটি উন্নয়নের বিষয়। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিচারহীনতা। ধর্ষণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার খুবই কম। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান না। তাই আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি। ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত যে কমিটিগুলো আছে, সেগুলো কার্যকর না হলে নারী বিচার পাবেন না।

একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোকেও নারী নেতৃত্বে প্রকৃত প্রতিশ্রুতি দেখাতে হবে। পরিবর্তনের জন্য সমাজের সম্মিলিত চাপ তৈরি করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শারমিন ইসলাম

টিম লিডার—জেন্ডার, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)

ইউএনডিপি বাংলাদেশ বিভিন্ন স্তরে নারী নেতৃত্বের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করা হচ্ছে। এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর ডিজিটাইজেশন ও প্রক্রিয়াগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তৃণমূল নেত্রীদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ক্ষমতায়ন কার্যক্রমে তাঁদের সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের মূল লক্ষ্য।

নারী নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ওমেন-লেড অর্গানাইজেশনগুলো ফান্ডিং সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে পারছে না।

এ ছাড়া নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা ও বিদ্যমান নেতাদের দায়িত্বশীলভাবে কার্যকর রাখা কঠিন। নারী নেতৃত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিও দেখা দেয়, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

নারী ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করেছেন, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। প্রাপ্ত নমিনেশন ও নেতৃত্বের সুযোগের স্বল্পতা, সামাজিক ন্যারেটিভ এবং পারিবারিক বাধা নারী নেতৃত্বকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই দায়িত্বশীল নেতাদের দায়িত্ব হলো পরবর্তী প্রজন্মকে প্রস্তুত করা ও নেতৃত্বের জন্য পরিবেশ তৈরি করা।

নারী নেতৃত্ব শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নারী নেতৃত্বের প্রসার এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে দরকার সংহত উদ্যোগ, সাপোর্ট, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবেশ। নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের উন্নয়ন, সহিংসতা প্রতিরোধ ও সামাজিক ন্যারেটিভ পরিবর্তনের মাধ্যমে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব।

সৈয়দা সামারা মোরতাদা

কো–অরডিনেশন অ্যান্ড পার্টনারশিপস অ্যানালিস্ট, ইউএন উইমেন বাংলাদেশ

নারী নেতৃত্ব বিকাশে তিনটি মূল ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ—পাবলিক স্পেস, সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থন এবং নারীর অংশগ্রহণ। নারীরা প্রতিদিন নানা বাধার সম্মুখীন হন, যা তাঁদের ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত করে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম, পরিবার, বন্ধু ও সমাজের সহায়তা।

ইউএন উইমেনের কাজ তিন স্তম্ভে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম, ট্রান্সফরমেটিভ ন্যারেটিভস—নারী নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়নের গল্প ও কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করা। দ্বিতীয়, স্ট্রেনদেনিং কাউন্টার পাওয়ার—সব স্টেকহোল্ডারকে একত্র করে ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট ও বিদ্যমান নেত্রীদের সমর্থন নিশ্চিত করা। তৃতীয়, ম্যাটেরিয়াল চেঞ্জেস—লিগ্যাল সুরক্ষা, অবকাঠামো ও ইনস্টিটিউশনাল ক্যাপাসিটি বিল্ডিং।

এই তিনটি ক্ষেত্র একসঙ্গে কাজ করলে নারী নেতৃত্বের প্রসার ও টেকসই পরিবর্তন সম্ভব। সামাজিক নিয়ম পরিবর্তন, ক্ষমতায়ন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করলে নারীরা শুধু নিজের নয়, পুরো সমাজের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন।

ফারজানা রেজা

ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার, সোশ্যাল প্রটেকশন, আইএলও

আইএলও শ্রম আইন ও নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাসকরণে কাজ করছে, বিশেষত মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতে নব্বই শতাংশ নারী এখনো সুরক্ষাহীন, যা নেতৃত্ব ও পেশাগত অগ্রগতির পথে বড় বাধা।

নারী নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণে প্রধান চ্যালেঞ্জ তিনটি—শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক বাধা। উচ্চশিক্ষায় নারীর সংখ্যা বাড়লেও কর্মক্ষেত্রে আসতে পারেন চারজনের মধ্যে মাত্র একজন।

প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী নারীর ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাদের অভাব এখনো লক্ষ করা যায়। আইএলও ফান্ডিং, সাপোর্ট সিস্টেম, মেন্টরশিপ এবং সমাজের সমর্থন তৈরি করে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করছে।

শোভন কাজ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতি প্রয়োগ জরুরি। আইএলও মাতৃত্বকালীন বিমা ও দিবাযত্নকেন্দ্রের মাধ্যমে কর্মজীবী নারীর প্রতি সহায়তা বাড়াচ্ছে।

সাবা নওরীন

পরিচালক, বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। ঘর থেকে বের হয়ে নেতৃত্ব নেওয়ার জন্য মেয়েদের হাতে স্বতন্ত্র অর্থ থাকা জরুরি, কারণ অর্থশক্তি ছাড়া ভোকাল লিডারশিপ সম্ভব নয়। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার দীর্ঘদিন ধরে জেলা, ইউনিয়ন ও মহানগর পর্যায় পর্যন্ত নারী নেত্রী তৈরি করছে। দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নারীদের নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরাও জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

তবে নারী নেতৃত্বের পথ সব সময় মসৃণ নয়। সামাজিক ও পারিবারিক বাধা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও পরিবারের অমর্যাদা নারীদের অংশগ্রহণে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ায়। মেয়েদের ঘর থেকে বের করার ক্ষেত্রে তাঁদের ভাই, বাবা বা স্বামী বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পুরুষদের সঙ্গে উঠান বৈঠক, আলোচনা ও কাউন্সেলিং চালিয়ে তাঁদের সমর্থন নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

আইভী আক্তার

আইন কর্মকর্তা, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর

নারীর ক্ষমতায়ন মানে হলো পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সব স্তরে নারীর পূর্ণ এবং কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ না থাকলে যে নীতি বা উন্নয়ন কর্মসূচি তৈরি হয়, তা প্রায়ই নারীবান্ধব বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী হয় না। তাই নেতৃত্বের বিকাশে নারীর অ্যাকসেস টু জাস্টিস নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন ও সুরক্ষায় যথেষ্ট আইন রয়েছে, কিন্তু লিগ্যাল ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যারিয়ার এখনো রয়ে গেছে। ধর্ষণ ও যৌতুক মামলার ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা ভুল প্রক্রিয়ার কারণে ন্যায্য বিচার প্রায়ই প্রাপ্য হয় না।

আইনি সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য। সামাজিক বাধা, বৈষম্য ও পারিবারিক চাপে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত হচ্ছে।

তাই নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনের জন্য আইন, নীতি ও সামাজিক সমর্থনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

ওমর ফারুক

পরিচালক, সোশ্যাল ট্রান্সফরমেশন, সেভ দ্য চিলড্রেন

নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনে সমন্বিত উদ্যোগের জন্য নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় সেভ দ্য চিলড্রেনের সোচ্চার প্রকল্প কাজ করছে। প্রকল্পের তিনটি মূল দিক রয়েছে।

বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে অর্গানিকভাবে তৈরি নারী নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসা। ফেমিনিস্ট চর্চা ও আন্দোলনকে যুব সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা, যাতে স্থানীয় কমিউনিটিতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করা যায়। তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের ভালো চর্চা উদ্ভাবন ও শেখার সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশে নারীর নেতৃত্ব, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক জায়গায় বাধা এখনো বিদ্যমান। প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যমান ফোরাম, যেমন চেম্বার অব কমার্স বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে নারী নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে কাজ করছে। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্প ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

মাহমুদা বেগম

নির্বাহী পরিচালক, সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন

সোচ্চার প্রকল্পে ১০টি নারী নেতৃত্বাধীন সংস্থা অংশগ্রহণ করছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, যা সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করবে। ফান্ডিং ও ডিউ ডিলিজেন্স প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্থাগুলোর নীতি ও পলিসি যেমন সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, সেফগার্ডিং ও জেন্ডার পলিসি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত স্টাফ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

সোচ্চার প্রকল্প থেকে ফেমিনিস্ট লিডারশিপ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির মাধ্যমে ১০০ ছোট তৃণমূল সংগঠনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নারী-পুরুষ সমতার চর্চা ও ফেমিনিস্ট নেতৃত্বের ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ৫৩৫টি কমিউনিটি ভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে।

প্রকল্পটি নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তনে সমন্বিত উদ্যোগের ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলবে ও দেশের নারীদের ক্ষমতায়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে আশা করি।

উবানু মারমা

উপপরিচালক, বিএনকেএস

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারী নেতৃত্বের প্রতিনিধি হিসেবে সোচ্চার প্রকল্পে বিএনকেএস কাজ করছে। বান্দরবানের মারমা কমিউনিটির নারীরা প্রথাগত ব্যবস্থায় নেতৃত্বে আসার সুযোগ পাচ্ছেন। সোচ্চার প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নারী নেতৃত্ব মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রকল্পে যুবসমাজের ক্ষমতায়নেও মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেহেতু প্রথাগত একটি ব্যবস্থা আছে, সেখানে নারীদেরও কার্বারি ও হেডম্যান পদে পুরুষের পাশাপাশি নেতৃত্বের ভূমিকাগুলোকে চিহ্নিত করে আমরা কাজ করছি।

নারী শ্রমিকদের স্বীকৃতি বৃদ্ধি ও প্রথাগত কার্বারি ও হেডম্যান পদে নারীদের অংশগ্রহণ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বান্দরবানে বর্তমানে ৬০ জন নারী কার্বারি ও ৩ জন নারী হেডম্যান থাকলেও এটি সামান্য, কিন্তু সোচ্চার প্রকল্প এটিকে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছে।

নারী নেতৃত্বকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করে টেকসই পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করা হচ্ছে।

লতিফা ইয়াসমিন লাভলী

নির্বাহী পরিচালক, কাটনারপারা নারী উন্নয়ন সংস্থা

কাটনারপারা নারী উন্নয়ন সংস্থা গাইবান্ধা ও গোবিন্দগঞ্জে মাইগ্রেশন বা বিদেশফেরত নারী-পুরুষদের নিয়ে কাজ করছে। সৌদি, জর্ডান ও লিবিয়াফেরত নারীদের আমরা সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং ও ইনকাম জেনারেটিং অ্যাকটিভিটি (আইজিএ) ট্রেনিং দিচ্ছি।

এই নারীরা প্রায়ই সমাজে অবহেলিত থাকেন। কিন্তু ট্রেনিং ও কাউন্সেলিংয়ের ফলে তাঁরা এখন সমাজে নিজ স্থান ফিরে পেয়েছেন, পরিবারে সম্পর্ক সুসংহত হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়েছেন।

সোচ্চার প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের ১০টি নারী নেতৃত্বাধীন সংস্থা একত্র করে ফ্যামিলি লিডারশিপ ক্যাম্পেইন (এফএলসি) এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

স্থানীয় ছোট সিবিওগুলোকে সমর্থন দিয়ে তাদের পলিসি ও রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ নিশ্চিত করতে চাই, যাতে সারা দেশে সমন্বিতভাবে নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও টেকসই পরিবর্তন সম্ভব হয়।

রোকসানা সুলতানা

নির্বাহী পরিচালক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স

আমাদের ১০টি নারী অর্গানাইজেশনকে সেভ দ্য চিলড্রেন একটি দায়িত্ব দিয়েছে। নারীদের সোচ্চার করাই আমাদের কাজ। আমরা ঢাকাভিত্তিক হলেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম পরিচালনা করি আর সোচ্চার প্রকল্পে আমার দায়িত্ব হলো কক্সবাজারকেন্দ্রিক কাজ করা।

কক্সবাজারে ছোট ছোট নারী সংস্থাকে আমরা খুঁজে বের করছি, যারা নিভৃতে কিন্তু অনন্য কাজ করছে। তারা দক্ষ, কিন্তু পলিসি বা নিয়মের অভাবে এগোতে পারছে না। তাদের আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছি, যাতে তারা দৃঢ়ভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। আমাদের ১০টি অর্গানাইজেশন একত্র হয়ে এক বছরের মধ্যে আরও বহু সংস্থাকে সঙ্গে আনার লক্ষ্য নিয়েছে।

আমাদের লক্ষ্য, নারী নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা ও টেকসই পরিবর্তন আনতে সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করা, যাতে প্রকল্প শেষ হলেও তারা সমাজে দৃঢ়ভাবে নিজেদের অবস্থান স্থাপন করতে পারে।

সাইদা ইয়াছমিন

প্রধান নির্বাহী, অ্যাসোসিয়েশন ফর অলটারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট

নারীদের উন্নয়নে কাজ করতে চাইলে ‘সোচ্চার’ এমন একটি উদ্যোগ, যেখানে তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের সংগঠিত করা, তাঁদের সমন্বিত করা এবং নেতৃত্ব গড়ে তোলার কৌশল তৈরি করার সুযোগ আছে।

কুড়িগ্রাম থেকে উচ্চারিত আমার কণ্ঠ আজ বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছাতে পারে সোচ্চার প্রকল্পের কারণে। আমাদের লক্ষ্য হলো, তৃণমূলের এই কণ্ঠস্বর যেন সব স্তরে পৌঁছে যায়।

অনেক নারী ও সংগঠন কাজ করতে চাইলেও প্রক্রিয়াগত নানা বাধায় পিছিয়ে যায়। তাই সাংগঠনিক সক্ষমতা ও সক্রিয়তা—দুটোই শক্তিশালী হওয়া জরুরি। সোচ্চারের মাধ্যমে আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী ও নারী সংগঠনগুলোর কণ্ঠকে সংগঠিত করে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় গড়ে তুলতে চাই।

এ উদ্যোগে তরুণ নেতৃত্বকেও আমরা যুক্ত করছি। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও আমরা থেমে নেই। নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণই ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে।

কানিজ গোফরানি কোরাইশি

প্রজেক্ট ম্যানেজার, পিএসটিসি

বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের বিকাশের ক্ষেত্রে এখনো জনসংখ্যার অনুপাতে নারীদের অংশগ্রহণ কম। দেশের প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের অর্ধেক নারী হলেও ৩০০ আসনে মাত্র ৮৭ জন নারী প্রার্থী ছিলেন।

সোচ্চার প্রকল্প তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্বকে তুলে আনার কাজ করছে। আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, আমরা নারী উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করি। ছোট পুঁজি দিয়ে কাজ শুরু করা নারীরা ডোর টু ডোর পণ্য বিক্রি করেন, ধীরে ধীরে পরিবারে অবদান রাখেন। এই নারীরাই পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।

নারীদের সুযোগ, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা দিলে তাঁরা নেতৃত্বের জায়গায় এগিয়ে আসতে পারেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠকে সমৃদ্ধ করতে, তৃণমূল পর্যায় থেকে গণতান্ত্রিক চর্চা, নারী নেতৃত্বের বিকাশে আরও বেশি ফান্ডিং, দক্ষতা তৈরি ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

সুপারিশ

  • সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, ব্যবসায়িক ও গণমাধ্যমে নেতৃত্বের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

  • নারী উদ্যোক্তা, ব্যবসা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।

  • প্রান্তিক, প্রতিবন্ধী ও তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

  • তরুণদের সম্পৃক্ত করে জেন্ডার সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে।

  • স্থানীয়, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

এ ছাড়া আরও অংশ নেন ওসমান ঢালী, চিফ অপারেটিং অফিসার, ওয়াই ওয়াই ভেঞ্চার;

রাশেদা আখতার, টেকনিক্যাল ম্যানেজার, জেন্ডার ইকুইটি অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশন, সেভ দ্য চিলড্রেন; ফারহানা আক্তার, ব্যবস্থাপক, সোচ্চার প্রকল্প, সেভ দ্য চিলড্রেন।

সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো