আব্দুল কাইয়ুম

ওয়ার্ল্ডফিশ আমাদের দেশে মাছের উন্নয়নে এমন অনেকগুলো কাজ করছে, যা আমরা চিন্তাও করতে পারিনি। যেমন ওয়ার্ল্ডফিশ আমাদের দেশে বড় আকারের রুই-কাতলা মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে গবেষণা ও সমাধান বের করেছে। আমরা বিশ্বে মাছ উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে আছি। আর অ্যাকোয়াকালচার, অর্থাৎ মাছের সঙ্গে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ উৎপাদনে পঞ্চম ও সামুদ্রিক মাছ উৎপাদনে ১১তম অবস্থানে আছি। এ খাতে আমাদের অবস্থান আরও ভালো করা সম্ভব। এ বিষয়ে করণীয়সমূহই আজকের আলোচনার বিষয়। এ বিষয়গুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করি।

ড. মনজুরুল করিম

default-image

মৎস্য খাতের উন্নয়নে ওয়ার্ল্ডফিশ ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কাজ করছে। বিশ্বের ১১টি দেশে সংস্থাটি কাজ করলেও বাংলাদেশের কার্যক্রমই সবচেয়ে বড়। ফিড দ্য ফিউচার বাংলাদেশ অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড নিউট্রিশন অ্যাক্টিভিটি, ওয়ার্ল্ডফিশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প। প্রকল্পটির কার্যক্রম বান্দরবান, কক্সবাজার ও দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলাসহ মোট ২৩টি জেলায় চলমান। এর লক্ষ্য হচ্ছে, বাজার পদ্ধতির উন্নতির মাধ্যমে অ্যাকোয়াকালচার সেক্টরে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন। অধিক উৎপাদনশীলতা অর্জন, বাজারপদ্ধতি শক্তিশালী করা এবং পুষ্টি বিষয়ে জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা এ লক্ষ্য অর্জন করতে চাই। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য, পাঁচ বছরে চার লাখ খামারিসহ মৎস্য খাতের অন্যান্য স্টেক হোল্ডারের কাছে পৌঁছানো।

আমাদের কাজের ভিত্তিতে ও পূর্ববর্তী গবেষণায় মৎস্য খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু সমস্যা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধে৵ অন্যতম হলো, ক্ষুদ্রঋণ ও অর্থায়ন সুবিধার বিষয়টি। একটু পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে স্বাধীনতার প্রায় ১০ বছর পর গ্রামপর্যায়ের ক্ষুদ্র কৃষকদের নিয়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু হয়। এর ২৮ বছর পর মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের যাত্রার মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিকতা পায়। সেখানে সুপারিশ ছিল, এমএফআইয়ের সঙ্গে ব্যাংকগুলো যেন অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করে। পরে কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি চালু হয়। যার আওতায় সব ব্যাংককে আওতায় আনা হয়। তারপর এজেন্ট ব্যাংকিং, সাবব্রাঞ্চ ও কন্ট্যাক্ট ফার্মিংয়ের মতো বিষয়গুলো আসে। এত কিছুর পরেও ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের জন্য অর্থায়ন জটিলতার বিষয়টি এখনো বিদ্যমান। আমরা দেখতে পেয়েছি, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এ খাত দ্রুতই এগোচ্ছে। তবে তা মূলত বাণিজ্যিক খামারকে কেন্দ্র করে। আমাদের দেশে বসতভিটায় আনুমানিক ১৫ লাখের বেশি ছোট পুকুর আছে; কিন্তু এখানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ ধরনের পুকুরের উন্নয়নের বিষয়টিও আমাদের ভাবতে হবে। কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি যে মাঠপর্যায়ে সঠিক ও সময় উপযোগী তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। মৎস্য খামারিরা কোনো ব্যাংকে গেলে, ভালো ঋণ পাবেন, কীভাবে পাবেন, পদ্ধতি কী, শর্ত কী; এ–সংক্রান্ত তথ্যের অপর্যাপ্ততার কারণে ক্ষুদ্র মাছচাষি অনেক পিছিয়ে যান। ফলে তাঁরা মহাজনের কাছে যান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা প্রয়োজন এবং তা প্রচারণার মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। ঋণ নেওয়ার পর কীভাবে তা ব্যবহার করতে হবে, এ বিষয়ে গাইডলাইন থাকলে ঋণের কার্যকারিতা বাড়বে। আমরা অনেকেই পলিসি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কোন পলিসির উন্নয়ন করা প্রয়োজন, এটি কোথায় সুপারিশ করা হবে, কে বাস্তবায়ন, মনিটর ও ফলাফল শেয়ার করবেন; তা নিয়ে দিকনির্দেশনা ও ফলোআপ করা প্রয়োজন।

মো. ইমতিয়াজ হক

default-image

অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য আহরণে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর অ্যাকোয়াকালচার উৎপাদনে রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে। বাংলাদেশে প্রতিবছর একজন মানুষ গড়ে প্রায় ২৩ কেজির মতো মাছ খায়। এটি একদিকে ভালো, তবে এটি বাড়ানোর সুযোগ আছে। মাছ বেশি খেলে পুষ্টির ঘাটতি কমবে, পাশাপাশি আর্থিক প্রবৃদ্ধিও ভালো হবে। আমরা বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করি। এর ১ দশমিক ২৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন ক্ষুদ্র স্কেল ফিশারিজের অবদান। আমাদের উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ভালো, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সাদা মাছ রপ্তানির বাজারে আসতে পারেনি। ফলে ৯৭ শতাংশের বেশি মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়।

আমাদের প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মার্কেট সিস্টেমস অ্যাপ্রোচ অনুসরণ করে

অ্যাকোয়াকালচার খাতের প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। যার ফলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পরেও যেন বেসরকারি খাত এটিকে একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে চলমান রাখে। অ্যাকোয়াকালচার খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্প বেশকিছু ক্ষেত্রে যেমন— ইনপুট এবং ফিড, তথ্যভিত্তিক বাজারব্যবস্থা, প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্তিকরণ, ফরোয়ার্ড মার্কেট, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ইত্যাদি কাজ করে থাকে। এ ছাড়া নারী ও তরুণদের বাজারব্যবস্থার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রকল্পের বেশকিছু পদক্ষেপ রয়েছে এবং পাশাপাশি নিউট্রিশন সেনসেটিভ বিহেভিয়ার নিয়েও কাজ করা হয়।

বাংলাদেশ অ্যাকোয়াকালচার অ্যাক্টিভিটি ২০১৯ সাল থেকে প্রান্তিক চাষিদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (অ্যাকসেস টু ফিন্যান্স) বিষয়ক পদক্ষেপ নিয়ে আসছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো, মাছচাষিদের প্রয়োজনীয় সময়ে আর্থিক জোগান নিশ্চিত করা। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে যে মাছ চাষের জন্য যে মানের খাবার কিংবা ওষুধের প্রয়োজন হয়, সেটা প্রায় পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার কারণে কিনতে পারে না এবং খুচরা বিক্রেতারাও ভালো মানের পণ্য বাকিতে দিতে পারেন না, ফলে চাষিদের নির্ভর করতে হয় নিম্নমানের পণ্যের ওপর অথবা অর্থ জোগানের জন্য নির্ভর করতে হয় স্থানীয় মহাজনদের ওপর, যেখানে তাঁদের চড়া মূল্যে সুদ দিতে হয়।

আমরা ইন-পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম (আইপিআরএস) নিয়ে কাজ করছি, যেখানে রপ্তানি বাজারের চাহিদাগুলো পূর্ণ করার চেষ্টা করছি। এ ধরনের প্রযুক্তি অনেক ব্যয়বহুল। এসব প্রযুক্তি রপ্তানিমুখী বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে; কিন্তু এখন বিনিয়োগের ঘাটতি এই সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান বাধা।

আর্থিক বিষয়ের জ্ঞান (ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি) আনুষ্ঠানিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে, সেখানেও বেশকিছু পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। এ পর্যন্ত প্রকল্পের মাধ্যমে ছয় হাজার ক্ষুদ্র চাষি আর্থিক জ্ঞান সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, এর ৬০ শতাংশ নারী এবং তাঁদের মধ্যে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্পের মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

এম এ হাকিম

default-image

মৎস্য খাতে অর্থায়ন তিনটি উৎস থেকে করা যেতে পারে। সেগুলো হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, এনজিও ও অনানুষ্ঠানিক উৎস। মাছের খাদ্য বিক্রেতারাও এখন ঋণ দিচ্ছেন। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ও সংস্কৃতি মৎস্য–ব্যবসা বান্ধব নয়। সার্বিকভাবে তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্পকারখানায় ঋণ দিয়ে থাকে। আমি তাদের দোষারোপ করছি না। তারা কেবল মাছ চাষ নয়, কৃষি খাতেই ঋণ কম দেয়। তারা মৎস্য ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে মনে করে। যেহেতু তারা সঞ্চয়কারীদের অর্থ ঋণ হিসেবে দেয়, তাই তারা জামানত চাইবে, এটা অস্বাভাবিক নয়। এ ছাড়া মাছ চাষে একাধিক মালিকানাও একটি বড় সমস্যা। ব্যাংক এ রকম ক্ষেত্রে (লিজ ফাইন্যান্সিং) অর্থায়ন করতে চায় না। আবার চাষিরা কোলেট্রাল না দিতে পারায় অনেক ক্ষেত্রে ঋণের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এফডিআর করে জমা রাখতে হয়। এ সামর্থ্য কয়জন চাষির আছে আমি জানি না।

এনজিও খুব বেশি ঋণ দিতে পারে না। আমার জানা মতে, নিয়ম অনুসারে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। এনজিও ঋণে জামানত লাগে না। মাছের খাদ্য বিক্রেতারা শর্তসাপেক্ষে মাছচাষিদের ঋণ দেন। শর্ত হলো তাঁদের কাছে মাছ বিক্রি করতে হয়। এতে চাষিরা কম দাম পান। আমরা প্রস্তাব হচ্ছে, সরকার তাঁদের মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট ঋণের নির্দিষ্ট অংশ মৎস্য খাতের জন্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। আমি নেপালে দেখেছি পিছিয়ে পড়া খাতের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ বরাদ্দ করা হয়। আমরা এখন খাদ্য নিরাপত্তার পরিবর্তে পুষ্টি নিরাপত্তার কথা বলি। মাছ এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি সরকারকে ভাবতে পারে। আমাদের দেশে অনেক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। এরাও শিল্পক্ষেত্রে কাজ করে। মাছ চাষের জন্য কিছু ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে।

শাহিনা পারভিন

default-image

উপকূলীয় অঞ্চলের নারী কৃষকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাঁরা যখন মৎস্য খাতে বিনিয়োগ করতে যান, তখন ঋণের অপ্রতুলতা একটি সমস্যা। তাঁদের কাছে এ–সংক্রান্ত তথ্যও নেই। ফলে তাঁরা কাছাকাছি পাওয়া যায় এমন সুযোগ নেন, অর্থাৎ মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন। এ ক্ষেত্রে সুদের হার উচ্চ হওয়ায় তাঁরা লাভবান হতে পারেন না।

আমরা দেখেছি মাছের খাবারের দাম অনেক বেশি। এ কারণে কৃষকের ভাবনা হলো বেশি পরিমাণ খাবার দিলে তাঁদের লাভ কম হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের যথেষ্ট অসচেতনতা রয়েছে। পুকুরে কতটুকু পানি থাকা দরকার বা গভীরতা কতটুকু হতে হবে, এ রকম বিষয়ে তাঁরা জানেন না। উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যার প্রয়োজন হয় না, একটু বৃষ্টি হলেই ঘেরগুলো প্লাবিত হয়ে যায়। মাটি-পানি পরীক্ষা কৃষকদের জন্য সহজলভ্য নয়। অনেকটা সময় পার হলেও মাছের পোনার মান বোঝার সুযোগ নেই। এ কারণে অনেক কৃষক বিনিয়োগ করেও লাভের মুখ দেখছেন না।

মৎস্য খাতে বিনিয়োগকারীরা মাছের সঠিক দাম পান না, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে বাজারে প্রবেশাধিকার না থাকা ও মধ্যস্বত্বভোগী। উপকূলীয় অঞ্চলে ভেটকির মতো মাছ উৎপাদন কমে গেছে। এ অঞ্চলে ভেটকি মাছ চাষের বিপুল সম্ভাবনা আছে। ফলে আমাদের থাইল্যান্ডের মতো কৃত্রিম খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।

রিয়াজ আহমেদ

default-image

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অনেকগুলো সফলতার গল্প রয়েছে। তবে মৎস্য খাতের সফলতার গল্পগুলো আমরা কম বলি। আমরা ছোটবেলা থেকেই মাছে–ভাতে বাঙালি কথাটি শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু ৩০ থেকে ৪০ বছর আগে বাঙালির পাতে কতটুকু মাছ ছিল, তা এখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারব। মৎস্য খাতে আমাদের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে পারলে আমরা মাছ খাওয়ার পরও অনেক মাছ রপ্তানি করতে পারব।

প্রতিটি প্রকল্পেরই একটি মেয়াদকাল থাকে। উন্নয়নের পরিভাষায় আমরা একে টেকসই বলে থাকি। এর জন্য আমরা সর্বোত্তম যেটি করতে পারি, তা হচ্ছে পলিসি পর্যায়ে কাজ করা। এখন প্রকল্পের বাকি সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে কীভাবে পলিসি বাস্তবায়নে কাজ করা যায়, তা ভাবতে হবে। একসময় সরকারি কিংবা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কৃষি খাতে ঋণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু পলিসি বাস্তবায়নের ফলে এটি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসেছে। আমার মনে হয় এখনই সর্বোত্তম সময় মৎস্য খাতের জন্য আলাদা ঋণ বরাদ্দ রাখার।

রুমানা আখতার

default-image

ব্যাংক এশিয়া ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেগুলেটরি অনুমতি নিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালুর করে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আট বছরে আমরা ৫৩ লাখ জনগণকে ব্যাংকের ছত্রচ্ছায়ায় আনতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের ৯২ শতাংশ গ্রাহক প্রান্তিক পর্যায়ের। আমাদের এখন প্রায় পাঁচ হাজার তিন শ এজেন্ট রয়েছে। আমরা একক ব্যবসায়ীদের দিয়ে এজেন্সি পরিচালনা করি। আমরা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেছি, ডাকঘরের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেছি। ব্যাংকের একটি বড় সমস্যা ছিল মানুষের কাছে পৌঁছানো, অর্থাৎ জনগণের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা। এমএফএস এ ক্ষেত্রে অনেক অনেক সফলতা পেয়েছে।

আমরা যে কৃষিঋণ দিচ্ছি, তার ১০ শতাংশ মৎস্য খাতে দেওয়ার বিধান আছে। গত বছর কৃষি খাতে আমরা প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। এ বছর আমাদের ৪৫০ কোটি টাকা ঋণ দওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ কোটি টাকা ঋণ কিন্তু মৎস্য খাতে দেওয়া হবে।

ওয়ার্ল্ডফিশের সঙ্গে কাজের শুরুতে আমরা একটি মডেল নিয়ে এসেছি। আমরা বারবার মার্কেট লিংকেজের কথা বলি। যেসব খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কৃষকেরা ইনপুট কেনেন, তাঁদের কাছে একটি খাতা থাকে যেখানে হাতে লেখা একটি ডেটাবেজ থাকে। এসব ইনপুট খুচরা বিক্রেতাদের এজেন্ট ব্যাংকিয়ের আওতায় মাইক্রো মার্চেন্ট নামে আলাদা একটি ভুক্তি তৈরি করেছি। তাদের সক্ষমতা হচ্ছে তার মোবাইল ফোনে একটা অ্যাপ্লিকেশন থাকবে এবং তিনি সীমিত আকারে ব্যাংকিং সেবা দিতে পারবেন। ইনপুট খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কৃষকের এত দিনের সম্পর্ক থেকে আমরা কৃষকের সক্ষমতা ও ক্রেডিটি হিস্ট্রি সম্পর্কে বুঝতে পারি। এর ভিত্তিতে তাদের আমরা অর্থায়ন করেছি৷ এখানে আমরা ফিশ কার্ড দিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছি। আমরা ৮ শতাংশ সুদের হারে কৃষকদের ঋণ দিচ্ছি। আর প্রণোদনা প্যাকেজ হলে ৪ শতাংশ সুদ হারে ঋণ দিই।

মো. মোশাররেফ হোসেন

default-image

অর্থে প্রবেশাধিকারের জন্য চাহিদা ও জোগান দুটোই জরুরি। এখন ব্যাংক প্রথমে দেখবে উদ্যোক্তাকে দেওয়া ঋণ পরিশোধ হবে কি না। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা যায়। আর্থিক জ্ঞান না থাকায় অনেকেই মহাজনি ঋণের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ধরতে পারেন না। তাঁরা ব্যাংকে যাওয়ার চেয়ে মহাজনের কাছে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেখানে কাগজপত্রও কম লাগে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নেই। সেন্ট মার্টিনের একজন শুঁটকি ব্যবসায়ী হয়তো প্রচুর পরিমাণে মাছ উৎপাদন করেন। তিনি কিন্তু জানেন না কীভাবে বা কোথায় রপ্তানি করবেন।

বিশ্বে মাছ উৎপাদনে আমাদের অবস্থান সম্মানজনক হলেও রপ্তানি সেভাবে নেই। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো বিশেষ করে নরওয়ের কথা বলা যায়। তাদের দেশ একটা নির্দিষ্ট সময় বরফে ঢাকা থাকলেও বাকি সময়ে উৎপাদিত মাছ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করে।

মৎস্য রপ্তানি বাড়াতে সরকার আলাদা ইকোনমিক জোন করতে পারে, যেখানে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে রপ্তানির জন্য মাছ প্রক্রিয়াজাত করা হবে। আমাদের ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় সব খাতকে একইভাবে বিবেচনা করে। আসবাবের ব্যবসা আর মৎস্য চাষের অর্থায়ন এক নয়। একটা পুকুর শুকিয়ে তৈরি করে ধানি পোনা চাষ করলে মাছ বড় হতে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ব্লক-বাটিক, বিউটি পারলারের মতো প্রথাগত নারী উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি মৎস্য চাষে নারীর সম্পৃক্ততা ভালো। তাই তাঁদেরও অর্থায়ন করতে হবে।

কে এম আইরীন আজিজ

default-image

বাংলাদেশে মৎস্য খাত বেশ সফল একটি খাত। এখানে বিনিয়োগের সুযোগ অনেক। এখানে উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আরও কিছু পদ্ধতিতে তাদের অর্থায়ন করতে হবে। আমাদের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ভিয়েতনাম প্রতি হেক্টরে যে পরিমাণ উৎপাদন করে, আমাদের সে তুলনায় কয়েক গুণ কম। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। সমুদ্র বিজয়ের পর আমরা বড় একটি এলাকার মালিকানা পেয়েছি। আমরা সামুদ্রিক সম্পদের জরিপ করতে পারি। এ ছাড়া এসব এলাকায় মাছ ধরার নৌকাগুলোতে বিনিয়োগ করা যায়। আমাদের উৎপাদিত মাছের সিংহভাগ খাওয়া হয়। ফলে রপ্তানির দিকে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়নি। যারা মাছ প্রক্রিয়াজাত করে, তাদেরকে বিনিয়োগ করা যায়। এগুলো সবই ছোট আকারের বিনিয়োগ। আমরা কৃষি খাতে কিছু স্টার্টআপ দেখলেও মৎস্য খাতে এমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কিছু পলিসি সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা কৃষকদের ডিজিটাল ক্রেডিট দিতে পারছি না। অন্য যাঁরা এটি নিয়ে কাজ করেন, আমরা তাঁদের সঙ্গে পার্টনার হতে পারি। এ জন্য আর্থিক জ্ঞান ও ডিজিটাল শিক্ষা থাকতে হবে। আমরা চাইব সব লেনদেন যেন ডিজিটাইজড হয়।

মাজেদ হোসেন মাহিন

default-image

অ্যাকোয়াকালচার খাতে আইপিআরএস ছাড়াও আরও অনেক প্রযুক্তি বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বেসরকারি খাত জানে না এগুলো কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ জন্য সরকারের মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে। আমরা এখন অ্যাকোয়াকালচারে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগে অবদান রাখি। রপ্তানি বাজারে নির্দিষ্ট বিনিয়োগ পরিকল্পনা করলে একে ২ দশমিক ৫ বা ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে। গুচ্ছ অর্থায়নের বিষয়ে আমরা আমাদের প্রকল্পের শুরুতে কাজ করেছি। অ্যাকোয়াকালচার উৎপাদন জোন তৈরিতে মৎস্য বিভাগ উদ্যোগ নিতে পারে। কারণ, তারা জানে কোন ধরনের উৎপাদন কোন অঞ্চলে হচ্ছে। ব্যাংক বা এমএফএসের ক্ষেত্রে এটি জানা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে তারা আসলে বিনিয়োগ কার ওপর করবে, কোথায় করবে?

মাইক্রো মার্চেন্ট বা এজেন্ট ব্যাংকিং মডেলে খুঁজে খুঁজে সুবিধাভোগী বের করা বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। সে ক্ষেত্রে মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে গুচ্ছ অর্থায়নকে ত্বরান্বিত করার একটি বড় সুযোগ আছে। আমাদের সব নীতিমালায় বড় চাষিদের দিকে লক্ষ করছি। কারণ, এখানে বিনিয়োগ নিরাপদ, ঝুঁকি কম থাকে। অথচ আমাদের ছোট আকারের ফিশারিগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অবদান রাখছে। তাদের সহায়তা করলে আমাদের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ বা তিন গুণ হতে পারে। তা ছাড়া প্রান্তিক চাষিদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণের আয়োজন বেশ জরুরি। ও কার্যকর। এক্ষেত্রে ইউএসএআইডির অর্থায়নে ও পার্টনার সংস্থাদের সহযোগিতায় ওয়ার্ল্ডফিশ পরিচালিত অ্যাকোয়াকালচার অ্যাক্টিভিটি প্রকল্প এলাকায় উল্লেখ্যযোগ্য ও প্রশংসনীয় কিছু কাজ করে যাচ্ছে।

মাকসুদা আক্তার

default-image

কৃষিতে আমাদের মূলত তিনটি খাত রয়েছে—শস্য, মৎস্য ও প্রাণিজসম্পদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ ২০২১-২২ নীতিমালায় বলা আছে, আলাদাভাবে মৎস্য খাতে ঋণ দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ৮ শতাংশ হারে সরল সুদে ঋণ দিই। আমাদের এ ঋণ আদায়ে অনেকক্ষেত্রে সমস্যা হয়। কিন্তু কোনো এনজিওর মাধ্যমে দিলে ঋণ আদায়ের হার প্রায় শতভাগ। আমরা এখন উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে ঋণ দিয়ে থাকি। তাদের বলা হচ্ছে, যারা ঋণ নেবে, তাদের কাউন্সিল অফিসে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তাদের সহায়তায় আমরা কোন ঋণ, কত দিনের জন্য, কোন এলাকায় বিতরণ করা যাবে, তা জেনে নিই।

কেবল সোনালী ব্যাংক নয়, সব বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণের বিষয়ে অনেক পরিষ্কার। আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে ঋণের বিষয়ে উৎসাহিত করি। বর্তমানে মৎস্য খাতে ক্ষতি কম হয়, খরচও কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২১-২২–এর নীতিমালা অনুযায়ী, মাছ চাষের জন্য ঋণ দিতে পারি, উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের ট্রলার, নৌকা ও জাল কেনার জন্য ঋণ দেওয়া যায়, বাড়ির পাশে হাজা-মজা পুকুরে মাছ চাষে ঋণ দেওয়া যায়। দেশের অনেক তরুণ চাকরি ছেড়ে দিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। এসব শিক্ষিত তরুণের পেছনে সরকারি ব্যাংকগুলো অর্থায়নে এগিয়ে আসছে। আমরা ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খুলে ঋণ দিই। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হয়।

মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া

default-image

সরকারের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা সহায়তা এবং আমাদের সাহসী চাষিদের কারণেই বিগত এক দশকে আমাদের মৎস্য খাত ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি আমাদের জিডিপিতে সরাসরি অবদান রাখছে। বিবিএসের তথ্যমতে, আমাদের কৃষিতে উপখাত হিসেবে ২২ শতাংশ অবদান রাখছে৷ এটি কৃষি খাতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদান। বাংলাদেশে ২ কোটি ৭৪ লাখ খামার আছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ খামারি পরিবার। তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি ক্ষুদ্র খামারি। ৪ দশমিক ১ মিলিয়নের এখনো যেকোনো ধরনের ঋণসহায়তায় এক্সেস নেই৷ কৃষি বা মৎস্য হোক, তাদের ঋণের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লিঋণ নীতিমালায় এ বছরে ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত আনুপাতিক হারে অর্জিত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মোট কাজের ৮৫ শতাংশ হচ্ছে কৃষিঋণ। এর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মৎস্য খাত।

নারী উদ্যোক্তাদের নিজস্ব জমি কিন্তু তাঁর ঋণপ্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসারে প্রতিটি ঋণের প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে হয়। প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে গিয়ে দেখা যায়, তা কেবল নারী উদ্যোক্তা নন, পুরুষ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক সময় দেখা গেছে, একজন জেলে ঋণ চেয়েছেন। আর ঋণের জন্য দেখানো পুকুরের মালিক হচ্ছেন তাঁর দাদা। আর দাদার ১৫ জন নাতি, তাঁদের একজন ঋণ চেয়েছেন। বাকিরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না। ফলে এ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।

কৃষি বা মৎস্য খাতে অর্থায়নের চাহিদা কখনো বিশ্লেষণ করা হয়নি। আমি এ–সংক্রান্ত কোনো জরিপ পাইনি। সীমানা নির্ধারণ ব্যতীত কাজ করা অসম্ভব। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মাছের খাদ্যের জন্য বরাদ্দ আছে। এটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ, খাদ্যের দাম তো ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে আবাদযোগ্য জমি নষ্ট হচ্ছে। যার কারণে এ খাতের খুব বেশি বিস্তার সম্ভব নয়। ফলে আমাদের এই জায়গাগুলোকে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। রপ্তানির জন্য সনদ, গুণগত মান, খাদ্য ও মাছের মান নিশ্চিত ও মাছের আকার বৃদ্ধি করতে হবে।

ড. মোহা. সাইনার আলম

default-image

মৎস্য খাত যেভাবে অবদান রাখছে, সে হিসাবে মৎস্য খাতে যৌক্তিক বিনিয়োগ হয়নি। এবারের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ছিল ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এ খাতে বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ১ শতাংশের নিচে। এ বছর মাছের উৎপাদন হয়েছে ৪৬ লাখ মেট্রিক টন। আর অ্যাকোয়াকালচার উৎপাদন হয়েছে ২৫ লাখ মেট্রিক টন। ৪ লাখ হেক্টর পুকুরে ২৫ লাখ চাষি উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে প্রান্তিক কৃষকদের অবদান এক–তৃতীয়াংশ। আর বাকি দুই–তৃতীয়াংশ উৎপাদন করেছে মাত্র ১০ শতাংশ বাণিজ্যিক কৃষক। সরকার এখন ২০৩০ সালের মধ্যে মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে ৪৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে ৬৫ লাখ মেট্রিক টনে ও ২০৪০ সালের মধ্যে ৮৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করতে চায়। আমরা স্বাদু পানির উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে আমরা জোর দিচ্ছি। অ্যাকোয়াকালচারের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর অন্যতম হচ্ছে পাঙাশ, তেলাপিয়া, কই, রুই, কাতল। এগুলোর বীজ ও খাদ্য আমাদের প্রধান সংকট। ভিয়েতনামের পাঙাশের সঙ্গে আমাদের মাছের রং ও স্বাদ মেলে না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে নিম্নমানের মাছের খাদ্য। রপ্তানির জন্য এ বিষয়গুলোর পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে হবে।

রেণু পোনা তৈরি করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি এ দেশে হবেই। চিংড়ি আমরা বেশি রপ্তানি করি। আমাদের বর্তমান রপ্তানির মধ্যে ৪৫ শতাংশ হচ্ছে চিংড়ি, ৫৫ শতাংশ হচ্ছে ফিন ফিশ। ফিন ফিশ রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে। সরকারের অনুমোদনের পর ভারতের সেভেন সিস্টার্সে পাবদা ও গুলশা মাছ রপ্তানি হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তা এখন সরকারের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। কেবল খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়, ব্যালেন্স ডায়েট নিশ্চিত করা। কারণ, এটি ছাড়া কখনোই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না, এসডিজি অর্জন করা যাবে না। মৎস্য খাতকে অগ্রাধিকার না দিলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পাঁচটি এসডিজি কখনোই অর্জন করা যাবে না।

ফিরোজ চৌধুরী

আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য ওয়ার্ল্ডফিশ ও প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ। মৎস্য খাত আমাদের সম্ভাবনাময় একটি খাত। এ খাতে উন্নয়নে করণীয় কিছু সুপারিশ আলোচনায় উঠে এসেছে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট সবাই এ সুপারিশগুলো বিবেচনায় নেবেন।

............................

সুপারিশ

-বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট ঋণের নির্দিষ্ট অংশ মৎস্য খাতের জন্য নির্ধারণ করে দিতে হবে।

-মাছ চাষের জন্য ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থাকা জরুরি।

-মৎস্য খাতে রপ্তানি বাড়াতে বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

-ঋণ পরিশোধে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি।

-মাছ রপ্তানি বাড়াতে সরকার আলাদা ইকোনমিক জোন তৈরি করতে পারে।

-কৃষকদের ডিজিটাল ক্রেডিট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

-বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের মৎস্য বিভাগের সমন্বয় প্রয়োজন।

-কৃষি বা মৎস্য খাতে অর্থায়নের চাহিদা বিশ্লেষণ করতে হবে।

-রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে প্রক্রিয়াজাত মাছের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

-মৎস্য খাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য পলিসি পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

-মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন